শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


ছবি: প্রতীকী।

বিগত দিনে আমি চিন্তিত ছিলাম দুটি মৃত্যু সংবাদ নিয়ে। দু’জন নারীর মৃত্যু হয়েছে হঠাৎ করেই। আরও জানার আগ্রহের কারণে জানতে পারলাম, মৃত্যুর কারণ কখনও নিজেদের শারীরিক অসুস্থতাকে প্রকাশ করে চিকিৎসা না করানো। দু’জন নারী পারিবারিক বৃত্তে ভালো নারী হওয়ার উপাধি পেয়েছিলেন। উভয়ই কখনও ঝগড়া করতেন না। দু’জনেই বাড়ির কাজ খুব নিপুণ ভাবে করতেন। সবার খুব যত্ন নিতেন। দুজনের স্বামীরা স্ত্রীর মৃত্যুর পর খুব অবাক হয়ে বলেছেন, কোনওদিন জানতে পারেননি তাদের স্ত্রীদের শারীরিক অসুস্থতার কথা। মৃত্যুর পর জানতে পেরেছেন!

এই সতী হতে পারা নারীদের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় নয়। তবে এখনও কোন কোন নারীদের আমরা বলি আদর্শ নারী বা ভালো মেয়ে তার একটি বর্ণনা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলাম।
এই আদর্শ নারীদের উল্টো দিকে অবস্থান করানো হয়েছে আর এক চরিত্র কাঠামোকে সমাজের পক্ষ থেকে। যাঁদের নিয়ে মাঝে মাঝেই সংবাদমাধ্যম এবং আমরা সরব হয়ে উঠি, তাঁরা হলেন নেশা করা নারী।

নেশা করার বিবিধ উপায় আছে। পৃথিবীর সব প্রান্তেই নারী, পুরুষ, বর্তমানে অন্য লিঙ্গের মানুষ, সবাই না হলেও অনেকেই নেশা করেন। মদ্যপান করাই হোক বা সিগারেট, বিড়ি বা নানা রকমের মাদক গ্রহণ করে মানুষ নেশা করেন।

এই নেশা করার বিষয়ের মধ্যেও একটা বিভাজন রেখা দেখা যায়। অথবা বলা ভালো শাসনের ছলে স্পষ্ট করা হয় কারা নেশা করবে। সব সময় কিন্তু সমাজ বিশেষ কিছু বলবে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে মূলত মেয়েদের ক্ষেত্রে নেশা করা সহজ বিষয় নয় আমাদের দেশে। মাদকের প্রভাবে জ্ঞানহীন থাকাকে নেশা করা বলা হয়। মাদকের পরিমাপ এবং শারীরিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে একজন মানুষের নেশা হওয়ার পরিস্থিতি হয়েছে কি না। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। এতে মাত্রাতিরিক্ত নেশা করার জন্য শারীরিক ক্ষতি হতে দেখা যায়। তাই নেশা করার বিষয়টির উপর সমাজ নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। সমাজ নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইলেও সব সময় তা কার্যকরী হয় না। কারণ আমরা থাকবন্দি লিঙ্গ বিভাজন নিয়ে ব্যস্ত থাকি।
আরও পড়ুন:

বৈষম্যের বিরোধ-জবানি, পর্ব-৪৯: সঙ্গীতের সংগতে নারী পুরুষের বিরোধ জবানী | সময় Updates

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৫: গেমপ্ল্যান

অনেকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলাম ভারতীয় সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ের নেশা করার বিষয় নিয়ে। বেশির ভাগ মানুষ জানালেন তারা তাদের মেলামেশার গ্রুপ থেকে নেশা করা শিখেছেন। এই গ্রুপ আধুনিককালে বাবা-মা-সন্তানের গ্রুপ হয়েছে। সম্প্রতি এরকম উদাহরণ পাওয়া গিয়েছে। বাবা-মা-সন্তান বাড়িতে একসঙ্গে বসে মদ্য পান করছেন। প্রশ্ন করা হল, অনেক অল্প বয়সে সন্তানরা নেশা করতে শিখে যাচ্ছে। এতে এদের শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতির সম্ভবনা আছে কিনা? উত্তর খুব সহজে এল না। মোদ্দা কথা হল, সন্তান নিয়ে বাড়িতে খাচ্ছি। এই ব্যাপারটা কম জটিল। সামাজিক ভাবে গ্রহণীয়। বাড়ির বাইরে খেলে এবং কিছু সমস্যা হলে সেই বিষয়টি সামাজিক সম্মান হানির বিষয় হত। অর্থাৎ নেশা করার বিষয়টি মানুষের কাছে আকর্ষণীয়, আবার সামাজিক সম্মানহানির বিষয়টিও গুরুত্ব হয়ে ওঠে। শারীরিক ক্ষতির বিষয়টি এখনও খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তবে এই ক্ষতির হিসেবটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে মেয়েদের জন্য।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৯: সারদা মায়ের রোগ নিরাময়ের প্রচেষ্টা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা

পুরুষের কাছে সে যে পুরুষ হোন না কেন, এখানে ট্রান্স পুরুষ বা মেয়েলি পুরুষ বা আলফা পুরুষ, বা ক্রস ড্রেস পুরুষ, যার কথাই বলি না কেন তাঁরা নেশা করার মধ্যে দিয়ে নিজেদের পৌরুষত্ব ব্যক্ত করার একটি পথ খুঁজে পান। এই পথের শেষে থাকে নিজেকে সমাজের সবচেয়ে বলশালী গোষ্ঠীর অংশ মনে করার আত্মগ্লানি। তাই নেশা হয়ে ওঠে পৌরুষের প্রতীক। দুর্বল পুরুষ হয়ে থাকলে সমাজে কিছু দুর্নাম জোটে। ঠাট্টা, টিটকিরি শুনতে হয়। শারীরিকভাবে দুর্বল বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। এরকম পুরুষদের পুরুষ মহলে গুরুত্ব না থাকলেও মেয়ের-বাবাদের কাছে অনেক সময় গুরুত্ব বাড়ে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে বিয়ের বাজারে নেশা করাকে একটি খারাপ গুণ দেখা হয় না। নেশা করে মারধর করলেও অনেক সময়ে মেয়েরা বা মেয়ের বাড়ির লোকজন মেনে নেন। এই ধরনের সমস্যাকে সমস্যা বলে মানতে চায় না। বলা হয়, পুরুষ মানুষ এরকম নেশা করতেই পারেন। সারাদিন তাঁরা খুব পরিশ্রম করেন। তাই রাতে নেশা করলে খুব খারাপ ভাবে নেওয়ার দরকার নেই।

অনেক আলোচনাসভাতে শুনতে পাই, পুরুষ মানুষ নেশা করে রাস্তায় পড়ে থাকলে, তাদের স্ত্রীদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনা উচিত। নেশা করার কারণে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা না খেয়ে থাকলেও সেটা সমস্যার নয়। পুরুষদের নেশার সমস্যা কাটানোর জন্য নেশামুক্তি কেন্দ্রে বা চিকিৎসা করাতে বললে তাঁরা আরও বেশি করে নেশা করতে শুরু করেন। নেশা ক্রমেই অভ্যাসে পরিণত হয়। সেই অভ্যাস এমনই যে, খৈনি খাওয়ায় সময়ে হাতে কত সুন্দর খৈনি বানাতে পারছে সেই নিয়ে একটি ‘গ্রুপ অ্যাকটিভিটি’তে মেতে ওঠে।

এই ধরনের মেতে ওঠায় তাঁদের মধ্যে যেমন প্রতিযোগিতা থাকে তেমন নিজেদের মধ্যেকার ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। পুরুষের আত্মচেতনা এবং আলফা মেল হয়ে ওঠার বাসনা জেগে ওঠে, যখন তাঁরা একসঙ্গে বসে নেশা করেন। নেশা বেশির ভাগ সময়ই ‘গ্রুপ অ্যাকটিভিটি’। ইতিহাস বলে, মানুষ ব্রোঞ্জ যুগ থেকে নেশা করা শুরু করেছে। যুগে যুগেই নেশা করাকে দেখানো হয়েছে পুরুষের নিজেকে হালকা করার অন্যতম উপায় হিসেবে। ক্রমেই নেশা করাকে পুরুষদের একচেটিয়া অধিকারে পরিণত হয়েছে। খুব সমস্যা না হলে পুরুষদের একাংশ প্রায় সারাজীবন ধরেই নেশা করে যান।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৫: অগ্নির কি শুধুই দহনজ্বলা? মহর্ষি মন্দপালের অগ্নিস্তুতিতে অগ্নির কোন সদর্থকতার ইঙ্গিত?

এই অভ্যেসের গুরুত্ব ক্রমেই তাঁদের কার্যক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে থাকে। চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস করে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও রোজ নেশা করা কমাতে পারেন না। এই সব মানুষ যখন মেয়েদের নেশা করা নিয়ে কথা বলেন তখন তাঁরা কী বলেন?

কলকাতা শহরের বহু অটো চালক, ট্যাক্সি চালক যাঁরা নিজেরা নেশা করেন, তাঁরা এও বলেছেন এখন মহিলাদের মধ্যেও নেশা করার প্রবণতা বেড়েছে। আমি যখন মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম, অনেক বয়স্ক মহিলাদের বিড়ি বা হুঁকো খেতে দেখা যেত। অনেক মহিলা পানও খান। ভারতের বাইরে মহিলাদের মধ্যে পান খাওয়ায় চল দেখা যায় না। সেই অর্থে ভারতের মেয়েদের মধ্যে তামাক দেওয়া পান খেয়ে নেশা করতে দেখা খুব সাধারণ ঘটনা। সেখানে হঠাৎ করে সিগারেট খাওয়া নিয়ে এত গেল গেল রব তোলার কারণ কী? ভারতীয় মেয়েদের মধ্যে মদ্যপান করার চলও লক্ষ্য করা গিয়েছে। তাহলে এখন মেয়েদের মধ্যে মধ্যে মদ্যপানের ইচ্ছে বেড়েছে এই কথার অর্থ কী?

এই সব প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষিত নেশা করা পুরুষ থেকে গুটখা, বিড়ি খাওয়া গাড়ি চালক পুরুষেরা বলেছেন, মেয়েরা মায়ের জাত। তাদের সন্তানের জন্ম দিতে হয়। এ ভাবে নেশা করলে মেয়েদের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাবে। অর্থাৎ আমরা ঘুরে ফিরে সেই জায়গায় এলাম, যেখানে এসে আমরা ভুলে যাচ্ছি মেয়েরা আসলে মানুষ। তাঁরা কোন যন্ত্র নয়, যাঁদের একমাত্র কাজ সন্তানের জন্ম দেওয়া। এও শুনলাম, স্বামী বলেছে চেয়ারে বসতে না। শরীর খারাপ হয়। তাই ট্রেনে মেঝেতে বসে যাচ্ছে। মেয়েদের আসলে সব সময় আলাদা করে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। সেই কারণে তাঁদের প্রকাশ্যে নেশা করাকে পুরুষরা গ্রহণ করতে পারছে না। পুরুষের গৃহীত নেশা করার পদ্ধতিকেই যেহেতু মেয়েরা গ্রহণ করছে, তাই পুরুষের সমস্যা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:

গীতা: সম্ভবামি যুগে যুগে, পর্ব-২৩: বন্ধু হে আমার…

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু

মেয়েরা প্রকাশ্যে নেশা করবে কিনা বা আদপে নেশা করবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। নেশা শরীরের ক্ষতি করে, সেই প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু মেয়েরা, মেয়ে বলে নেশা করতে পারবে না ,এই যুক্তি ধোপে টেকে না।

এই বিতর্কের মধ্যে আর একটি বিষয় ভাবার আছে। মেয়েরা নেশা করবে কিনা সেটি তাঁদের ‘চয়েস’ হতে পারে। কিন্তু নেশা করার পদ্ধতি অবিকল পুরুষদের মতো হবে কেন? তারা কী নিজেদের র ্যা‘ডিক্যাল’ বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন? তাঁরা নেশা করার মধ্যে দিয়ে পুরুষের সমকক্ষ হতে চাইছেন? প্রশ্ন করেছিলাম, তাঁরা নেশা করেন কেন? উত্তর খুব চমকপ্রদ। মেয়েরা কাজের জগতে এসেছেন। পুরুষের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। কাজের ফাঁকে তাঁদের মিটিং হচ্ছে। এই ‘গ্রুপ মিটিং’-এ পুরুষরা নেশা করছেন। সেই দেখে মেয়েদের একা মনে হত। ‘গ্রুপ’ এর বাইরে মনে হত তাঁদের। এই আলাদা হওয়ার পরিস্থিতি থেকে বেঁচে বেরোনোর জন্য মেয়েরা নেশা করতে শুরু করলেন।

অন্য দিকে একদলের মনে হল, তাঁরাও পুরুষের মতো গালাগালি দিতে দিতে নেশা করবেন নিজেদের স্বাধীন এবং বলিষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য। পুরুষ নিজের থেকে বয়েসে ছোট মেয়েকে বিয়ে করে দমন-পীড়ন নীতি চালাবে মনে করে। কিন্তু সেই প্রত্যাখাত মেয়েটি স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার জন্য নেশা বা গালাগালি দেওয়া বা এমন কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, যেগুলি তাদের নিজেদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি করার বদলে। প্রশ্ন জাগে, মেয়েরা কি এখন নিজেরাই পিতৃতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। নিজেরা এতদিন শিকার ছিল পিতৃতন্ত্রের, কিন্তু এখন নিজেরাই সেই ‘প্র্যাকটিস’কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ফেলছেন না তো?—চলবে।
* বৈষম্যের বিরোধ-জবানি (Gender Discourse): নিবেদিতা বায়েন (Nibedita Bayen), অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, মৌলানা আজাদ কলেজ।।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content