ভরতের প্রস্তাবিত অযোধ্যার রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার স্বেচ্ছায় ফিরিয়ে দিলেন রাম। পিতৃসত্য রক্ষাই এখন তাঁর বিবেচনায় প্রথম ও প্রধান কাজ, তুলনায় অযোধ্যার রাজসিংহাসন তুচ্ছ। তাঁর মতে, ভরতের উচিত কাজ, অযোধ্যায় ফিরে গিয়ে পিতৃদত্ত রাজ্যের প্রজানুরঞ্জন। দণ্ডকারণ্যে অরণ্যবাসে রামের কোনও খেদ নেই, ভরতের মাথার ওপরে থাক রাজছত্র। তুলনায় বিজন অরণ্যের নিবিড় বনের ছায়ার আশ্রয়, এখন রামের প্রিয়। বন্যপ্রাণীদের রাজা হয়েই এখন তাঁর আত্মতৃপ্তি। রাম, ভরতকে বহু সান্ত্বনা দিলেন। ঋষি শ্রেষ্ঠ জাবালি ধর্মজ্ঞ রামকে ধর্মবিরুদ্ধ উপদেশ দিতে লাগলেন। রাঘব রামের এমন অনর্থক বুদ্ধির আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। এই পৃথিবীতে কে কার মিত্র? কার কাছে কীই বা পাওনা আছে? প্রাণীমাত্রের একাকী জন্ম আবার মৃত্যুও একাকীই। সুতরাং ইনি আমার মা, ইনি পিতা এমন যিনি মনে করেন তিনি উন্মাদ, আর কিছু নয়। কোনও ব্যক্তি গ্রামান্তরে গমন করে, কোনও গৃহের বাইরে অবস্থান করলেন, পরের দিন তিনি সেই গৃহ ত্যাগ করে প্রস্থান করলেন। তেমনই হে কাকুৎস্থ, মানুষের পিতা, মাতা, গৃহ, সম্পদ, সব কিছু আবাসমাত্র। সজ্জনগণ এগুলিতে আসক্ত হন না। যথা গ্রামান্তরং গচ্ছন্ নরঃ কশ্চিদ্বহির্বসেৎ। উৎসৃজ্য চ তমাবাসং প্রতিষ্ঠেতাপরেঽহনি। এবমেব মনুষ্যাণাং পিতা মাতা গৃহং বসু। আবাসমাত্রং কাকুৎস্থ সজ্জন্তে নাত্র সজ্জনাঃ।।
দ্বিজবর জাবালির উপদেশ—পৈতৃক রাজ্য পরিত্যাগ করে, নরশ্রেষ্ঠ রামের কণ্টকাকীর্ণ বিষম কষ্টকর কুপথের আশ্রয় নেওয়া সমুচিত কাজ নয়। রাম, সমৃদ্ধ অযোধ্যার রাজসিংহাসনের অভিষিক্ত হন। বিরহিণীতুল্যা একবেণীধরা অযোধ্যা নগরী প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে। সুরেন্দ্রর মতো রাজপুত্র রাম যথাযোগ্য মহান রাজকীয় ভোগ্যবস্তু উপভোগ করে অযোধ্যায় বিহার করুন। দ্বিজবর জাবালির মতানুসারে, রাজা দশরথ রামের কেউ নন, রামও তাঁর কেউ নন। রাজা ও রাম দুজনেই ভিন্ন ব্যক্তি, তাই জাবালির কথামতো রাম কাজ করুন। পিতার বীজ, ঋতুকালে মাতার রক্ত ও শুক্র মিলিত হয়ে ইহলোকে মানুষের জন্ম হয়। পিতা তাঁর নির্দিষ্ট গন্তব্যে গিয়েছেন, প্রাকৃতজনসুলভ মানসিকতা স্থিরবুদ্ধি তপস্বীর জন্যে নয়। রাম, বৃথা ব্যাকুল হচ্ছেন। যাঁরা ধর্ম ও অর্থে আসক্ত, তাঁদের জন্যে দুঃখ হয়, অন্যদের জন্যেনয়। কারণ তাঁরা ইহলোকে দুঃখ ভোগ করে, পরলোকেও তাঁদের দুঃখ থেকে নিস্তার নেই। লোকান্তরিত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে মানুষ অষ্টক প্রভৃতি শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেন, অন্নের অপচয়মাত্র, দেখ মৃত ব্যক্তি কী অন্ন গ্রহণ করতে পারে? যদি একজন অন্ন ভোজন করলে অপরের দেহের পুষ্টিবিধান হয়, তবে প্রবাসী ব্যক্তির উদ্দেশে শ্রাদ্ধ প্রদান করলে, পথিকের তো সেটি পাথেয় হয় না। যজ্ঞ করে, দীক্ষিত হও, তপস্যা করে, ত্যাগধর্ম গ্রহণ কর—দান ধর্মের মাধ্যমে বশীকরণের এই সব উপায়,মেধাবীগণ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন।
দ্বিজশ্রেষ্ঠ জাবালির উপদেশ,হে মহামতি রাম, এর থেকে উৎকৃষ্ট আর কিছু নেই, সেই বুদ্ধি গ্রহণ কর, প্রত্যক্ষকে আশ্রয় কর, পরোক্ষকে নয়। স নাস্তি পরমিত্যেতৎ কুরু বুদ্ধিং মহামতে। প্রত্যক্ষং যৎ তদাতিষ্ঠ পরোক্ষং পৃষ্ঠতঃ কুরু।।
দ্বিজশ্রেষ্ঠ জাবালির কথা শুনে, সত্যপরাক্রম, স্থিরবুদ্ধি রাম, সুন্দর বাক্যবিন্যাসে বক্তব্য শুরু করলেন। দ্বিজবর জাবালি, রামের হিতৈষী হয়ে যা বললেন, সেগুলি অকাজ হয়েও কাজের মতো, অপথ্য হয়েও পথ্যতুল্য বলেই মনে হয়। মর্যাদাহীন, পাপাচারী, অসচ্চরিত্র ব্যক্তি সজ্জনদের কাছে সম্মানীয় হন না। মানুষ কুলীন বা অকুলীন, বীর হন বা না হন, শুচি বা অশুচি যাই হন, চরিত্রই তাঁর পরিচয়। রামের কণ্ঠে প্রতিবাদের সুর—অনার্য আর্যতুল্য, অপবিত্র পবিত্রবৎ, অলক্ষণ সুলক্ষণসদৃশ, অসচ্চরিত্র সচ্চরিত্রের মতো হয়ে যেমন আচরণ করে, আমি যদি ধার্মিকের ভেক ধারণ করে লোকসমাজে মিশ্রিত অধর্মাচরণ করি, তবে শুভকে পরিত্যাগ করে বিধিবহির্ভূত কাজের অনুষ্ঠানে ব্রতী হব যে। অনার্য্যস্ত্বার্য্যসংস্থানঃ শৌচাদ্ধীনস্তথা শুচিঃ। লক্ষণ্যবদলক্ষণ্যো দুঃশীলঃ শীলবানিব।। অধর্ম্মং ধর্ম্মবেষেণ যদ্যহং লোকসঙ্করম্। অভিপৎস্যে শুভং হিত্বা ক্রিয়াং বিধিবিবর্জ্জিতাম্।।
তাহলে কাজ ও অকাজের পার্থক্য বোঝেন এমন কোনও বিচক্ষণ ব্যক্তি আছেন, যিনি রামকে লোকসমাজে দূষণসৃষ্টিকারী দুর্বৃত্ত বলে মনে করবেন না? রাম, কোন পথ অনুসরণ করবেন? কীভাবে স্বর্গলাভ করবেন? প্রতিজ্ঞাহীন হয়ে কোন পথে যাবেন তিনি? পৃথিবীর সমস্ত লোক যে যথেচ্ছচারী হয়ে উঠবে। কারণ প্রজাসাধারণ রাজার আচরণবিধি অনুসরণ করে থাকে। সত্যপরায়ণতা ও অনির্মমতায় চিরন্তন রাজধর্ম প্রতিষ্ঠিত। তাই রাজ্য রয়েছে সত্যে, সত্যেই রয়েছে লোকসমাজ। দেবগণ ও ঋষিরা সত্যকেই সম্মান দেন, সত্যবাদী মানুষ অক্ষয়গতি লাভ করেন। সাপের তুল্য উদ্বেগজনক মিথ্যাবাদী মানুষ। সত্যনিষ্ঠ ধর্ম পৃথিবীতে সকল কিছুর মূল বলে বিবেচিত হয়। সত্যই ঈশ্বর, ধর্ম সর্বদাই সত্যাশ্রিত। সব কিছুর মূল হল সত্য, সত্য হতে উত্তম কোন কিছুই নয়। দান, যজ্ঞ, তপস্যা ও বেদ সমস্তই সত্যে প্রতিষ্ঠিত। সেই কারণেই সত্যনিষ্ঠ হওয়া প্রয়োজন। একজন পৃথিবী প্রতিপালন করে, মানুষ একাকীই বংশ রক্ষা করে থাকে, একাকী নরকগমন কিংবা স্বর্গবাস। রাম গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা করলেন,
সোঽহং পিতৃনির্দেশন্তু কিমর্থং নানুপালয়ে। সত্যপ্রতিশ্রবঃ সত্যং সত্যেন সময়ীকৃতম্।।
সেই পিতৃনির্দেশ কেনই বা আমি পালন করব না? পিতা সত্যপ্রতিজ্ঞ ছিলেন, তাঁর সেই সত্যরক্ষার নিমিত্ত আমি সত্যের নামে শপথ করেছি। সত্যনিষ্ঠ রাম তাঁর প্রতিজ্ঞারক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বললেন, লোভবশত নয়, মোহাচ্ছন্ন হয়েও নয়, অজ্ঞতার অন্ধত্বহেতু নয়, সত্যপরায়ণ রাম, গুরুজন পিতার সত্যের সেতুবন্ধন ভেঙ্গে ফেলতে পারেন না। রাম জানালেন, তিনি শুনেছেন, অসত্যসন্ধ, চঞ্চল ও অস্থিরমতি, ব্যক্তি প্রদত্ত হবি, দেব ও পিতৃগণ গ্রহণ করেন না। সত্যানুসারী সেই ধর্মকেই রাম চিরন্তন ধর্ম বলে নিশ্চিতভাবে মনে করেন, সেই কারণেই সজ্জনগণ সত্যের প্রতি এই দায়বদ্ধতাপালনকে সম্মান করে থাকেন। রাম ঘোষণা করলেন, ধর্মের আবরণে আধারিত যে অধর্মের সেবা করেন সেই অধম,নিষ্ঠুর,লুব্ধ ও পাপকর্মে লিপ্ত পুরুষ। তিনি সেই ক্ষাত্রধর্ম ত্যাগ করবেন। পাপকাজ মনে মনে স্থির করে মানুষ দেহ দ্বারা কাজটি করে থাকে, মিথ্যাচারটি জিহ্বার মাধ্যমে প্রকাশ পায়— পাতক কাজ এই তিন প্রকার। ভূমি, কীর্তি, যশ ও লক্ষ্মীর প্রার্থিত হলেন (সত্যনিষ্ঠ) পুরুষ। এনারা সত্যকে অনুসরণ করেন, তাই সত্যের সেবা করাই উচিত।
দ্বিজশ্রেষ্ঠ জাবালির উদ্দেশ্যে রামের অভিযোগ—জাবালি, রামকে অনার্য মনে করে, সদুপদেশজ্ঞানে, “এই কাজটি সঠিক,এটি কর” এমন বলেছেন, সেগুলি আদৌ সঙ্গত নয়। প্রতিবাদী রাম বলে উঠলেন, পিতার কাছে বনবাসের অঙ্গীকারবদ্ধ রাম, গুরুবাক্য অমান্য করে ভরতের অনুরোধ স্বীকার করবেন কেমন করে? দেবী কৈকেয়ী, পিতার সমক্ষে প্রতিজ্ঞারক্ষা বিষয়ে রামের দৃঢ়তার স্থৈর্য্যে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। রাম তাঁর দৈনন্দিন জীবনের আভাস দিয়ে জানালেন, তিনি বনবাসকালীন নিয়ত পবিত্র ভোজ্য গ্রহণ করবেন, ফলমূলপুষ্পসহযোগে পিতৃপুরুষ ও দেবতাদের তৃপ্ত করবেন। সংযতেন্দ্রিয়, অকপট, পিতৃসত্যরক্ষায় সম্পূর্ণ নিবেদিত প্রাণ সশ্রদ্ধ রাম, কার্য্যাকার্য্য বিবেচনা করে, প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করবেন। এই কর্মভূমিতে (অরণ্যে) উপনীত হয়ে, শুভ কর্মানুষ্ঠান করাই কর্তব্য। অগ্নি, বায়ু ও চন্দ্র তাঁদের স্বকর্মের ফল ভোগ করেন। দেবরাজ শত যজ্ঞ সম্পন্ন করে, দেবলোক লাভ করেছিলেন। মহর্ষিগণ কঠোর তপস্যা করে স্বর্গলোকে স্থানলাভ করেছিলেন। অতীব তেজস্বী রাম, পুনরায় জাবালির সেই নাস্তিকতায় পরিপূর্ণ বচন শুনে আর সহ্য করতে পারলেন না। জাবালির সমস্ত কথার প্রতিবাদে সেই রাজপুত্র তখন মুখর হলেন। সত্য, ধর্ম, পরাক্রম, সর্বপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতি, প্রিয়বাদিতা, দেব-দ্বিজ-অতিথিদের পূজাই স্বর্গের পথ বলে সাধুগণ মনে করে থাকেন।
সেই কারণেই একাগ্রচিত্ত অপ্রমত্ত দ্বিজগণ, যথাযথ অর্থসম্বন্ধে উপদিষ্ট হয়ে,সত্যই উন্নতিলাভের কারণ, এটি জেনে,সত্য অবলম্বন করে, ধর্ম আচরণ করতে করতে অভীপ্সিত লোক লাভের আকাঙ্খা করে থাকেন। রাম ক্ষোভের সঙ্গে বলতে লাগলেন, আপনার তুল্য নাস্তিক ও ধর্মচ্যুত, বিষমবুদ্ধির মানুষ বিচরণ করছেন এমন মানুষকে পিতা স্থান দিয়েছেন, আমি তাঁর এই কৃতকর্মের নিন্দা করছি। নিন্দাম্যহং কর্ম্ম কৃতং পিতুস্তদ্ যৎ ত্বামগৃহ্ণাদ্বিষমস্থবুদ্ধিম্। বুদ্ধ্যানয়ৈবংবিধয়া চরন্তং সুনাস্তিকং ধর্ম্মপথাদপেতম্।। যেমন একজন স্থূলবুদ্ধির মানুষ চোরতুল্য দণ্ডার্হ তেমনই একজন নাস্তিকও স্থূলবুদ্ধিবিশিষ্ট মানুষ। প্রজাস্বার্থে সেই ব্যক্তি দণ্ডযোগ্য। পণ্ডিতরা সেই নাস্তিকদের মুখদর্শন করেন না। রামের উপলব্ধি—জাবালিভিন্ন পূর্ববর্তী ব্রাহ্মণগণ বহু শুভ কাজ করে গিয়েছেন। তাঁরা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সমস্ত কামনা ছিন্ন করেছেন বলেই তাঁদের কৃত যজ্ঞাদি কর্ম শুভ হয়েছে। ধর্মে নিরত সজ্জনসংসর্গে রত, তেজস্বী, দানগুণপ্রধান, অহিংসাপরায়ণ, নির্মলহৃদয়, মুনিশ্রেষ্ঠরাই পৃথিবীতে পূজিত হন। মহাতেজস্বী উদারমনা মহাত্মা রাম সক্রোধে এমন কথা বলতে থাকলে, জবর জাবালি, অনুনয়সহকারে আস্তিক্যযুক্ত সত্য কথা বলতে লাগলেন। ন নাস্তিকানাং বচনং ব্রবীম্যহং ন নাস্তিকোঽহং ন চ নাস্তি কিঞ্চন। সমীক্ষ্য কালং পুনরাস্তিকোঽভবং ভবেয় কালে পুনরেব নাস্তিকঃ।। নাস্তিকদের পক্ষে বলছি না, আমি নাস্তিক নই। জগতে ‘নাস্তি’নেই বলে কিছু নেই। কালানুসারে আমি কখনও আস্তিক কখনও বা নাস্তিক হই।সেই সময় আর নেই যে সময়ে আমি নাস্তিকের মতো বাক্য উচ্চারণ করেছিলাম। হে রাম, তোমায় বনবাস থেকে নিবৃত্ত করে তোমার প্রসন্নতা বিধানের জন্যই আমার এইসব বচন শুধু উচ্চারণ করেছিলাম মাত্র। নির্বর্ত্তনার্থং তব রাম কারণাৎ প্রসাদনার্থঞ্চ ময়ৈতদীরিতম্।
ঋষি শ্রেষ্ঠ জাবালি যিনি আস্তিক্যবাদীদের ভাবধারার উত্তরসূরী তিনি রামচন্দ্রের বোধোদয়ের জন্যে যে চরম নাস্তিক্যবাদের উদাহরণ রেখেছেন সেগুলি কী নিছক রামের দৃঢ় সিদ্ধান্তের সত্যতা পরখ করবার জন্য? তাঁর মতে এই নির্বান্ধব পৃথিবীতে মানুষমাত্রই একাকী। জন্ম ও মৃত্যুতে রয়েছে নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব। সেখানে পৈত্রিক উত্তরাধিকারের কোন গল্প নেই। কুমার রাম ও রাজা দশরথের সম্পর্ক আত্মিক কোন সম্পর্ক নয়। জন্ম যেন শুধুমাত্র নরনারীর জৈবিক চাহিদার ফলে শারীরিক মিলনের ফলমাত্র। লোকান্তরিত পিতার জন্য, রামের প্রাকৃতজনসদৃশ শোকপ্রকাশ নিরর্থক। জাবালির মতে শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠান তাৎপর্যহীন, অন্নের অপচয়মাত্র। নিরীশ্বরবাদীর কণ্ঠে জাবালি বলে চলেন, যেটি প্রত্যক্ষ সেটাই গ্রাহ্য, পরোক্ষের সেখানে কোনও স্থান নেই। জাবালির একটিই লক্ষ্য, যে কোনও প্রতিষ্ঠিত মত অবলম্বন করে রামকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা। অনেকটা ঠিক ছল, বল ও কৌশল অবলম্বনের মতো। প্রথম দুটি গ্রাহ্য না হলেও তৃতীয়টি অর্থাৎ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে যদি উদ্দেশ্য সফল হয়,এই আশা হয়তো ছিল দ্বিজোত্তম জাবালির মনে। প্রত্যেকেই রামের শুভানুধ্যায়ী কিন্তু প্রত্যেকের কৌশল বিভিন্ন। সেই কৌশল যদি নাস্তিকতার মার্গানুসারী হয়েও যুক্তিগ্রাহ্য হয়, যদি রামের শক্ত পাথুরে মনে একটুও চিঁড় ধরাতে পারে, তাই হয়তো জাবালির চেষ্টার অন্ত ছিল না।
রঘুবর রাম শুধুমাত্র সত্যের নিরিখে জাবালির সব যুক্তি নস্যাৎ করেছেন। সত্যের ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত রামের চারিত্রিক দৃঢ়তা। তিনি, ধার্মিকের ছদ্মবেশে অধর্মাচরণ করতে পারেন না। বিভ্রান্ত রাম প্রশ্ন তোলেন সত্যপ্রতিজ্ঞ রাম যদি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হন তবে তিনি প্রজাদের অবিশ্বাসের পাত্র হয়ে দিকভ্রষ্ট হবেন। সত্যের বিকল্প কিছু নেই। সত্যাশ্রিত ঈশ্বর, ধর্মের আধার সত্য, সত্য সব কিছুর মূলে বিদ্যমান। আধ্যাত্মিকতার পথ সত্যে প্রতিষ্ঠিত। সত্যনিষ্ঠ রাম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন, পিতৃনির্দেশের সেই গুরু দায়িত্বভার তিনি অবশ্যই পালন করবেন। পিতা দশরথ সত্যপ্রতিজ্ঞ ছিলেন, সেই পরম্পরার বাহক রাম। সত্যের প্রতি সজ্জনদের গভীর আস্থা নিহিত রয়েছে। রামের সত্যের প্রতি দিকদর্শনে দ্বিচারিতার কোনও স্থান নেই। ধর্মের আবরণে অধর্মাচরণ দ্বিচারিতার নামান্তর মাত্র। সত্যনিষ্ঠ পুরুষের বলিষ্ঠতা তাঁর চারিত্রিক সত্যপরায়ণাতার দৃঢ়তায়, মিথ্যাচারে নয়। রাম ইতিমধ্যে তাঁর অনমনীয় সিদ্ধান্তে সেটি প্রমাণ করেছেন। রাম তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষায় নাস্তিক্যবাদের নিন্দা করেছেন।তিনি সার্বিক মানবধর্মের ওপরেই গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি সত্যের গুণগান করেছেন যা মানবধর্মের আলোকিত পরম্পরাগত উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা লাভ করে থাকি। সজ্জনসংসর্গাশ্রিত, দানশীল, স্বচ্ছ চরিত্রের ব্যক্তিত্বদের কে না সম্মান জানায়? তাঁদের না আছে ইহলৌকিক কোন মায়ার বাঁধন, না আছে শ্রেষ্ঠ কোনও পরলোকপ্রীতি। দ্বিজোত্তম জাবালি রামের যুক্তি অকপটে মেনে নিয়েছেন। তাঁর সত্যস্বীকারে রয়েছে, রামের একজন শুভানুধ্যায়ীর রামকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে আনবার জন্যে সৎপ্রচেষ্টার অঙ্গীকার। আস্তিক্যবাদ ও নাস্তিক্যবাদের ঊর্ধ্বে রয়েছে মানবধর্মের কতগুলি আলোকিত পরম্পরার উত্তরাধিকার—সত্যনিষ্ঠতা, ধার্মিকতা, অনৃশংসতা, মানবপ্রীতি প্রভৃতি। এগুলির মূল সত্যের গভীরে প্রোথিত রয়েছে, যা চিরন্তন এক উত্তরণের বার্তা বহন করে আনে, প্রতিষ্ঠিত করে চরিত্রের বুনিয়াদ। রাম তাঁর ব্যতিক্রম নন। এমন সত্যপরায়ণাতার ঐতিহ্যবাহী আদর্শ রাম, এখনও আছেন, ছিলেন, থাকবেন।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com