সোমবার ৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, উত্তম কুমার ও তরুণ কুমার।

একঝলকে

● ছবি : অবাক পৃথিবী
● পরিচালনা : বিশু চক্রবর্তী
● ছবির নায়িকা: সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়
● অভিনীত চরিত্রের নাম: অর্জুন
● প্রেক্ষাগৃহ: রূপবাণী, অরুণা ও ভারতী
● মুক্তির তারিখ : ০৬/১১/১৯৫৯

ছবিটির বিশেষত্ব হল এটি উত্তম বাবুর ছেলের নামে গৌতম চিত্রমের ব্যানারে তৈরি। প্রযোজনায় উত্তম-ভ্রাতা তরুণ কুমার। আক্ষরিক অর্থে উত্তম বাবুদের পারিবারিক ছবি বললেও অত্যুক্তি হয় না। আমরা এই সময়ের উত্তম কুমারকে নায়ক হিসাবে যে পর্যায়ক্রমিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখব সেটা, খুবই দোদুল্যমান। একদিকে অনেক সুনামের অধিকারী হয়ে প্রতিটি প্রযোজক পরিচালকের সাথে গভীরভাবে শিকড় বিছিয়ে ফেলেছিলেন উত্তম কুমার নামক মহীরুহ। অন্যদিকে খ্যাতির বিড়ম্বনা স্বরূপ নগদ প্রাপ্তি শুরু হয়েছিল, স্বার্থন্বেষী মানুষদের নীরব ছুরি চালানো।

অনেকদিন পর তিনি একটা চরিত্র পেয়েছিলেন যেখানে সমাজের নীচু তলার তথা সুশীল সমাজের বাইরের লোকের ভূমিকায় তাকে অভিনয় করতে হয়েছিল। এযাবত যত চরিত্র করেছেন সেখানে সত্যের বিজয় বার্তা তার চোখে মুখে ফুটে উঠতো। কিন্তু ‘অবাক পৃথিবী’ ছবিটার তৈরি থেকেই উত্তমবাবু নিজেকে ভেঙেচুরে একটি অন্য মানের চরিত্রে দাঁড় করাতে চাইছিলেন।
আসলে সেই সময় এ ধরনের বিষয়বস্তু যে কেউ ভাবতে পারবে এটাই ছিল মানুষের ভাবনার বাইরে। প্রতিটি চরিত্রই ছিল আমাদের পাশের লোক। আমাদের সমাজেরই অভ্যন্তর থেকে উঠে এসেছিল। একটি শিশুর সরলতা এবং অর্থনৈতিক দূষণে দূষিত এক যুবক। তবুও মনের দিক থেকে সেও যেন আরেক শিশু। সরলতা তার অঙ্গের ভূষণ। আর অন্যদিকে আমাদের ঘুণধরা প্রশাসনের খামখেয়ালিপনা। যখন সে ছিল পকেটমার প্রশাসনকে অনায়াসে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে পালিয়ে বেড়াতো। আর সে যখন তার জীর্ণতা মনের মলিনতাকে সরিয়ে দিয়ে শিশুর মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে গর্বিত তখনই সে আবদ্ধ হয় আইনের বেড়াজালে।

সমাজের অন্য লোকেরা যখন আইনের কাছে প্রশ্ন জাগায় কেন তার শাস্তি হবে না তখন আইনের কচকচানি নিমেষে বন্ধ করে দেয় শিশুকণ্ঠের আর্তি। তোমাকে কেন ধরেছে, তুমিতো আমায় চুরি করে পালাওনি? তখন হাউজে এমন কোন দর্শক বাকি ছিল না, যার চোখ দিয়ে জল পড়েনি। একটি কয়েকদিনের অভুক্ত মানুষ, সামনে খাবার ফেলে পরম নিশ্চিন্ততায় কীভাবে তা গলাধঃকরণ করেন ছবির রেস্টুরেন্টের দৃশ্যটি দেখলেই তা বোঝা যায়। খাবার অর্ডার দেওয়া শুরু থেকে মাংসের হাড় চিবানো, চেয়ারে পা তুলে বসা, প্রতিটি ফ্রেমকে এক অনন্য আলপনায় এঁকে দিয়েছেন উত্তম কুমার নামক একজন ক্ষণজন্মা শিল্পসাধক।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৭৩ : ‘খেলাঘর’

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১০: চাঁদের ওপিঠে কালো

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৫: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি

তারপর দাঁত খোঁটা বাসের কণ্ডাকরকে পয়সা দিয়ে বাসে ওঠা, বাচনভঙ্গি কেমন যেন চেনা মানুষের ছোঁওয়া ধরিয়ে দেয়। যখন শুধু প্রেমের দৃশ্যের জন্যই তিনি দর্শকমনকে জয় করেছিলেন ঠিক তখনই এরকম এক বিপরীতধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে দর্শককে একইভাবে নিজের কুক্ষিগত করার ক্ষমতা, একমাত্র মনে হয় তিনিই দেখাতে পেরেছিলেন।

উত্তমবাবুর ১৯৫৯ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলো যদি পারস্পরিক বিশ্লেষণের দাবি নিয়ে প্রকৃত মননের অপেক্ষায় রাখি সেখানে ‘নায়ক’-পরবর্তী ‘নায়ক’-পূর্ববর্তী এই ইজমগুলো অনেকভাবে ধাক্কা খাবে। সেই দিক দিয়ে উত্তমবাবুর মতো একজন ক্ষণজন্মা অভিনেতা যিনি, কমার্শিয়াল ছবির মূলধন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর সারস্বত সাধনা অনেক অংশে কালোত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। সেটা বোঝার মতো বোধশক্তি, সেসময়ের তো নয় এ সময়েও অনেকের হয়ে উঠল না এটাই উত্তমবাবুর মতো শিল্পীর দুর্ভাগ্য।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৩: আঁধারে আছে আততায়ী

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৭: জৌরালি

নামী পরিচালকের সাথে কাজ না করলে নিজের মাপ বোঝানো যায় না এ ধরনের মিথ ভারতবর্ষের অন্যান্য চলচ্চিত্র বোদ্ধা ব্যক্তিদের কাছে সত্য হলেও উত্তমবাবুর কাছে তা খুবই ঠুনকো ছিল। আসলে উত্তমবাবুর অভিনয় মেপে দেখবার যন্ত্র আমাদের দেশে কেন, বিদেশেও আবিষ্কৃত হয়নি। এই ছবিতে তিনি তাঁর অভিনয় পারদর্শিতা যে পর্যায়ে তুলে ধরেছিলেন যথেষ্ট ভাবেই তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয়। বিধায়ক ভট্টাচার্যের কাহিনিতে সত্যিকারের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন অর্জুনরূপী উত্তম কুমার।

ছবির কাহিনি এতটাই নিটোল ছিল যে উত্তমবাবু চোখের অভিব্যক্তি দিয়ে প্রতিটি মুহূর্তকে নির্মাণ করেছেন তা এক কথায় অনবদ্য। আর কিছুদিন পর, এধরণের আরো একটি ব্যতিক্রমী চরিত্রে অভিনয় করবেন ‘রাজা সাজা’ নামক ছবিতে। আমরা এ সময়ের যে উত্তমকে পাব বা পেয়েছি সেটা গতানুগতিক সুচিত্রা উত্তমের বাঁধা গদ থেকে অনেক দূরে।
কলকাতায় বৃষ্টি

অবাক পৃথিবী ছবিতে বাবলা ও উত্তম কুমার।

এরপর আসি ছবিটির চিত্রনাট্যের ঠাস বুনন প্রসঙ্গে। শুরু থেকে শেষ অব্দি চিত্রনাট্যের গতি ভরপুর ছিল। যা আজকের দিনে দেখাই যায় না। বিষয়বস্তুর সাথে চিত্রনাট্যের নিয়মমাফিক দাম্পত্য তৈরি না হলে ছবিতে যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না তার প্রমাণ ‘অবাক পৃথিবী’ ছবিটির প্রতিটি ফ্রেম।

আমরা যখন কোন ছবির প্রাণভোমরা নিয়ে আলোচনা করি তখন অধিকাংশ সময়ে চিত্রনাট্য তৈরীর ব্যাপারটিকে আলোচনার বাইরে রাখি। বেশি জোর দিই প্লেয়ার কাস্টিং সাংগীতিক বিন্যাস অভিনয়ের কুশীলবদের দক্ষতার উপর। কিন্তু ভারতবর্ষের বুকে “শোলে”-র মতো ছবি তৈরি হয়েছে শুধু ভালো চিত্রনাট্যকে মূলধন করে। আসলে অদৃশ্য ভাবে চিত্রনাট্যই ছবির নায়কের ভূমিকা পালন করে। তার কাঁধে ভর করেই কুশীলবরা নিজস্ব আকাশে ডানা মেলে ওড়ে। ১৯৫৯ সালে “অবাক পৃথিবী”-র মতো সমান্তরাল চিত্রনাট্য আমাদের দেশে খুব কমই তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৬ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী?

ছবিটির আরও একটি দিক অনাদরে মার খায় সেটা হচ্ছে ছবিতে আলোছায়ার খেলা। উত্তমবাবুর অনিন্দ্য সুন্দর মুখমণ্ডলকে কিভাবে ক্লোজআপ শটে নিয়ে রাখলে ছবিটির নান্দনিক তাৎপর্য অনেক অংশে বেড়ে থাকবে এই চিন্তা তৎকালীন ছবির ক্যামেরাম্যান পরিচালককে করে রাখতে হয়েছিল।
কোন চলচ্চিত্র-শিক্ষার্থী যদি আলোছায়ার খেলা দেখার জন্য এ ছবিটিকে মনোনয়ন করে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে ভবিষ্যতে সে অনেক দূর যাবে।

সাধারণ বাণিজ্যিক ছবিতেও যে শিল্প সচেতনতা সে সময় দেখা যেত তা যে কোন দেশের গৌরবকে অনেক অংশে বাড়িয়ে রাখতো। ছবিটির চতুর্থ মূলধন অসামান্য সংগীত পরিচালনা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভাই অমল মুখোপাধ্যায় ছবিটিতে সুর করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন এবং তিনি যোগ্যতার মাপকাঠিতে অনেককে পিছিয়েই সামনের সারিতে উঠে এসেছিলেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

এর সঙ্গে সঙ্গে আবার একটি কথা প্রাসঙ্গিকভাবে এসে পড়ে, যে যথাযথ সাংগীতিক বিন্যাসের মর্যাদা যাঁর হাত দিয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছেছিল তার নাম উত্তম কুমার ‘শূর্পনকার নাক কাটা যায়’ গানটি আজও সচ্ছন্দে যে কোনও শিল্পী গেয়ে ফেলতে পারেন। যেমন লেখার ছন্দ তেমনি সুরের মাধুর্য।পাশাপাশি উত্তমবাবুর ঠোঁট নাড়া। কোন সময় মনে হয় না যে নেপথ্য কণ্ঠ শিল্পীর গাওয়া গানটি। অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে তিনি যেভাবে চরিত্রটিকে এঁকেছিলেন তা যে কোন মহৎ ভাস্কর্যের সঙ্গে তুলনীয়।
কলকাতায় বৃষ্টি
নায়িকার চরিত্রে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ও পিছিয়ে ছিলেন না। আলট্রা মডার্ন মহিলার চরিত্রে এবং পরবর্তীকালে উত্তমবাবুর মতো দোদুল্যমান একটি চরিত্রকে তাল ঠুকে, প্রকৃত জায়গায় টিউনিং করার জন্য তাঁর যে অভিব্যক্তি, সেটাও যেকোনো সেলুলয়েডি প্রেমের কাছে আদরণীয়। বিশু চক্রবর্তী নামক একজন কমনামী পরিচালকের শিল্পী বাছাই, ক্যামেরার কাজ, শিল্পনির্দেশনা, বহির্বিশ্বে স্থান নির্বাচন সংগীত প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘অবাক পৃথিবী’ সত্যি অবাক করে দিয়েছিল দর্শকদের।

কোন উৎসবের জন্য নয়, জাতীয় পুরস্কারের মালা গলায় পরার জন্য নয়, শুধু দর্শকদের জন্য তৈরি শিশুমনের সরলতা এবং এক সামাজিক অর্থনৈতিক চাপের অলংকৃত ছবি “অবাক পৃথিবী” আজও স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।—চলবে।

* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content