মঙ্গলবার ১৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : সংগৃহীত।

একঝলকে

ছবি : কান্না

পরিচালনা : অগ্রগামী

ছবির নায়িকা: নন্দিতা বসু

মুক্তির তারিখ : ১২/০৪/১৯৬২

প্রেক্ষাগৃহ : উত্তরা, পূরবী ও উজ্জ্বলা

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘কান্না’ একটি নীরব অথচ হৃদয়স্পর্শী সৃষ্টি, যা মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় প্রতিভার আরেকটি উজ্জ্বল সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে নির্মিত ‘কান্না’ ১৯৬২ সালের একটি সাদাকালো সামাজিক-নাট্যধর্মী চলচ্চিত্র। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন অগ্রগামী-গোষ্ঠী এবং এতে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার, নন্দিতা বসু, সুলতা চৌধুরী, রাধামোহন ভট্টাচার্য প্রমুখ। চলচ্চিত্রটি মূলত মানবজীবনের দুঃখ, বেদনা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আবেগঘন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

দেশভাগোত্তর ষাটের দশকের বাংলা সিনেমা ছিল মূলত পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক সংকট এবং মানবিক আবেগের এক অসাধারণ ভাণ্ডার। সেই ধারার অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী ছবি ‘কান্না’। নাম থেকেই বোঝা যায়, ছবির কেন্দ্রে রয়েছে বেদনা ও অশ্রুর অনুষঙ্গ। তবে এই কান্না কেবল ব্যক্তিগত দুঃখের নয়; এটি সমাজ, পরিবার এবং মানুষের অন্তর্লোকেরও প্রতীক।
উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। দর্শক তাঁকে রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবেই বেশি চিনতেন। কিন্তু ‘কান্না’-র মতো ছবিতে তিনি আবেগপ্রবণ এবং বাস্তবধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়শক্তির ভিন্ন মাত্রা তুলে ধরেছিলেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘কান্না’-র গল্পে সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা এবং সম্পর্কের জটিলতা অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ফুটে উঠেছে। ছবির চরিত্রগুলি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। কখনও পারিবারিক সংকট, কখনও সামাজিক বাধা, আবার কখনও ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ—এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে গল্প এগিয়ে চলে। চলচ্চিত্রটির প্রাণশক্তি ছিল মূলত এর আবেগঘন পরিবেশ নির্মাণে। দর্শক চরিত্রগুলির সুখে যেমন আনন্দিত হন, তেমনি তাদের বেদনায় সমানভাবে বিচলিত হন। গল্পের গতি ধীর হলেও তা চরিত্রগুলির মানসিক জগতকে গভীরভাবে প্রকাশ করতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯২ : শিউলি বাড়ি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৩: রাজসূয় মহাযজ্ঞের প্রস্তুতিপর্বে পাণ্ডবদের দিগ্বিজয় যেন রাজনীতির আনুগত্য-আদায়ের পাঠ

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৩: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কুমারের অভিনয়, এ ছবির প্রধান আকর্ষণ। উত্তম কুমারকে অনেকেই কেবল রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে মনে রাখেন। কিন্তু তাঁর অভিনয়ের প্রকৃত শক্তি ছিল চরিত্রের আবেগকে সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতায়। ‘কান্না’-য় তিনি সংযত অভিনয়ের মাধ্যমে এক গভীর মানবিক চরিত্র নির্মাণ করেছেন।

তাঁর চোখের ভাষা, সংলাপ উচ্চারণ এবং মুখের অভিব্যক্তি চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। বিশেষ করে যন্ত্রণার মুহূর্তগুলিতে তিনি অতিনাটকীয়তার আশ্রয় নেননি; বরং নীরবতা এবং সংযমের মাধ্যমে দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করেছেন। বাংলা সিনেমায় উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল তাঁর স্বাভাবিক অভিনয়ভঙ্গি এবং চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। সমকালীন ও পরবর্তী দর্শকদের কাছেও এই গুণ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : সংগৃহীত।

নায়িকা হিসাবে নন্দিতা বসু তাঁর চরিত্রে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অভিনয়ে একদিকে কোমলতা, অন্যদিকে দৃঢ়তার প্রকাশ দেখা যায়। উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর দৃশ্যগুলি ছবির আবেগঘন পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। সুলতা চৌধুরী এবং রাধামোহন ভট্টাচার্যের মতো অভিজ্ঞ অভিনেতারাও তাঁদের ভূমিকাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছেন। পার্শ্বচরিত্রগুলির উপস্থিতি গল্পকে বাস্তবসম্মত করে তুলেছে এবং মূল কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। মনে রাখতে হবে তথাকথিত পার্শ্বচরিত্র হিসাবে যাঁরা বিখ্যাত ছিলেন ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র, তুলসী চক্রবর্তী, পাহাড়ি সান্যাল প্রমুখ তাঁদের উপস্থিতি এ ছবিতে ছিল না।

অন্যদিকে অগ্রগামী-র পরিচালনা, এ ছবির অন্যতম শক্তি। তিনি গল্পের আবেগকে অতিরঞ্জিত না করে ধীরে ধীরে দর্শকের সামনে উন্মোচন করেছেন। সেই সময়ের বাংলা চলচ্চিত্রে যেভাবে পারিবারিক ও সামাজিক নাটক নির্মিত হতো, ‘কান্না’ তার একটি সুন্দর উদাহরণ। পরিচালক চরিত্রগুলির মানসিক দ্বন্দ্বকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে ছবিটি কেবল ঘটনাপ্রধান নয়, চরিত্রপ্রধান চলচ্চিত্র হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭০ : চার্চ হাসপাতালের সেই সকাল

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৫: চামচিকা

ছবিটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ হল, ক্যামেরা তথা চিত্রগ্রহণ অংশটি। সাদাকালো চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও ‘কান্না’-র ভিজ্যুয়াল নির্মাণ যথেষ্ট আকর্ষণীয়। আলো-ছায়ার ব্যবহার, ক্লোজ-আপ শট এবং আবেগঘন দৃশ্যের বিন্যাস, ছবির আবহকে আরও গভীর করেছে। বিশেষ করে দুঃখ ও নিঃসঙ্গতার মুহূর্তগুলি সাদাকালো ফ্রেমে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে।

আজকের প্রযুক্তিগত মানদণ্ডে এগুলি সাধারণ মনে হলেও, সেই সময়ে এগুলি ছিল অত্যন্ত কার্যকর চলচ্চিত্রভাষার উদাহরণ। ছবিটির আরেকটি মূল্যবান উপাদান ছিল সংগীত ও আবহসঙ্গীত। সুধীন দাশগুপ্তের মতো ক্ষণজন্মা সংগীত পরিচালকের কৃতিত্ব এ ছবিতে যথেষ্ট যুগোপোযোগী ছিল। ষাটের দশকের বাংলা সিনেমায় সংগীত ছিল কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘কান্না’-তেও গান ও আবহসঙ্গীত গল্পের আবেগকে আরও তীব্র করেছে।
আরও পড়ুন:

সাগর উঠে তরঙ্গিয়া

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

গানগুলি কেবল বিনোদনের জন্য নয়; চরিত্রের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। আবহসঙ্গীত দর্শককে চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করতে সাহায্য করে। এরপর আসা যাক সামাজিক তাৎপর্য-এ। ‘কান্না’ কেবল একটি পারিবারিক নাটক নয়; এটি মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

চলচ্চিত্রটি দেখায় যে সুখ এবং দুঃখ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পারিবারিক সম্পর্কের মূল্য, আত্মত্যাগের মহত্ত্ব এবং মানবিকতার গুরুত্ব ছবির মূল বার্তা। বর্তমান সময়ে যখন সম্পর্কের মূল্যবোধ অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তিত হয়েছে, তখন এই ধরনের চলচ্চিত্র আমাদের অতীতের সামাজিক চেতনার কথা মনে করিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৩: স্মৃতিশাস্ত্রের রক্তচক্ষু বনাম এক স্নেহশীল পিতা: মূষিক-কন্যার বিবাহ-উপাখ্যান

ছবিটির সদর্থক দিক হিসাবে উত্তম কুমারের সংযত ও হৃদয়স্পর্শী অভিনয়, আবেগঘন ও মানবিক কাহিনি, শক্তিশালী পার্শ্বচরিত্র, সাদাকালো চলচ্চিত্রের নান্দনিক চিত্রগ্রহণ, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের সুন্দর উপস্থাপনা প্রভৃতি থাকলেও এর কতকগুলি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের কিছু দর্শকের কাছে ছবির গতি ধীর মনে হতে পারে। এছাড়া আধুনিক চলচ্চিত্রের তুলনায় গল্পের উপস্থাপনায় নাটকীয়তার মাত্রা কিছুটা বেশি বলে মনে হতে পারে। তবে এগুলি মূলত সময়ের প্রেক্ষাপটজনিত বৈশিষ্ট্য।
কলকাতায় বৃষ্টি

১৯৬২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবি।

আসলে ‘কান্না’ বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের এক মূল্যবান নিদর্শন। এটি হয়তো উত্তম কুমারের সবচেয়ে আলোচিত বা জনপ্রিয় ছবিগুলির মধ্যে পড়ে না, কিন্তু তাঁর অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ছবিটি মানবজীবনের দুঃখ-বেদনা, ভালোবাসা এবং আত্মত্যাগকে সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে।

উত্তম কুমারের অনবদ্য অভিনয়, অগ্রগামীর দক্ষ পরিচালনা এবং আবেগময় কাহিনি মিলিয়ে ‘কান্না’ আজও ক্লাসিক বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয়। এটি এমন এক ছবি, যা দর্শককে কেবল বিনোদন দেয় না; বরং মানুষের অনুভূতির গভীরে পৌঁছে যেতে সাহায্য করে।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content