বুধবার ১৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ।

রানি চন্দকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন অবনীন্দ্রনাথ। মুখে মুখে কত গল্প শোনাতেন তাঁকে। শোনা গল্প নিখুঁত- নির্ভুলভাবে ঠিক অবনীন্দ্রনাথের ভাষাতে লিখে ফেলতেন তিনি। এভাবেই লেখা হয়েছিল দুটি বই, ‘ঘরোয়া’ ও ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’। রবীন্দ্রনাথও রানি চন্দকে খুব স্নেহ করতেন। রবীন্দ্রনাথের বলে যাওয়া লেখারও অনুলিখন করেছিলেন রানি। রোগশয্যায় কবি মৃদুুস্বরে বলেছেন কবিতা, সে কবিতা দ্রুত কাগজে লিখে নিয়েছেন রানি চন্দ। অবনীন্দ্রনাথের তো বটেই, রবীন্দ্রনাথের অনুলিখনও যথাযথভাবে করতে পেরেছিলেন তিনি। কবির সঙ্গে তিনি ভ্রমণেও গিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন মুম্বই, ওয়ালটিয়ার ও হায়দরাবাদ।

মুম্বই ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথের একান্ত সচিব অনিলকুমার চন্দের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। সে বিবাহে রবীন্দ্রনাথেরও বড়ো ভূমিকা ছিল। কবিই পৌরোহিত্য করেছিলেন। রানি চন্দ নিজেও লিখতেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বই লিখেছেন, অবনীন্দ্রনাথকে নিয়ে বই লিখেছেন। দুই বড়ো মানুষের স্মৃতিকথার বাইরেও বেশ কয়েকটি বই আছে তাঁর। পাঠক-সমাদৃত তেমনই কয়েকটি বই, ’পূর্ণকুম্ভ’, ‘জেনানা ফটক’ ও ‘আমার মা’র বাপের বাড়ি’।
রানি চন্দের পুত্র তখন ছোটো। কাঁথায় শুয়ে থাকে। রানি তাঁর নাম রেখেছিলেন অভিজিৎ। বলা বাহুল্য, রবীন্দ্র-সাহিত্যে আছে এই নাম। ‘মুক্তধারা’ নাটকে যন্ত্রসভ্যতার সঙ্গে যে দ্বন্দ্ব, তার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অভিজিতের অবস্থান। রানি চন্দ রবীন্দ্র-নাটক থেকেই তাঁর সন্তানের নামটি গ্রহণ করেছিলেন। একটু বড় হওয়ার পর, বালক-বয়সে অভিজিৎ বড়ো ন্যাওটা হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের। কবির লেখার টেবিলের পাশে ঘুর-ঘুর করত। লেখা থামিয়ে কবি তাঁকে কাছে টেনে নিতেন। আদর করতেন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

আকাশ এখনও মেঘলা/৪২

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

মাস ছয়েক অভিজিতের বয়স তখন। মাঝরাতে একদিন তার সে কী কান্না! গৃহে তখন স্বামী ছিল না, ছিল অন্য কেউও। তিনি পড়লেন মহাবিপাকে,বিপদে। ওইটুকু দুধের শিশু, রাতদুপুরে এমন গলা ফাটিয়ে কেঁদে চলেছে, কী হল তার — মায়ের মন আকুল হয়ে ওঠে। চিন্তা- দুশ্চিন্তা মনের কোণে জাঁকিয়ে বসে। খানিক বিভ্রান্ত, দিশেহারা হয়ে পড়েন। বড়ো অসহায় মনে হয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

অবনীন্দ্রনাথ।

কথা বলার বয়স হয়নি, তাই নিজের কষ্ট মুখে বলতে পারছিল না অভিজিৎ, শুধুই চিৎকার করে চলেছিল। কাঁদতে কাঁদতে তার মুখ লাল হয়ে উঠছিল, চোখ জলে ভরে উঠেছিল। কী হল অভিজিতের, কিছুই বুঝতে পারছিলেন না রানি চন্দ। এই সংকটের মাঝে আরেক দুর্ভাবনা তাঁকে পেয়ে বসে। রানি শান্তিনিকেতন-আশ্রমের যে বাড়িতে রয়েছেন, তার পাশেই ‘শ্যামলী’। আশ্রমে রবীন্দ্রনাথের একাধিক বাড়ি ছিল, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যেখানে যখন ইচ্ছে, সেখানে থাকতেন তিনি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪০: কেঁচো খুঁড়তে কেউটে

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৫: সুন্দরবনের পাখি: বিলের বালুবাটান

শ্যামলী মাটির তৈরি বাড়ি। সে বাড়ির দেওয়াল ফুঁড়ে এই কান্নার শব্দ গুরুদেবের কানে পৌঁছোচ্ছে না তো! কানে গেলে নিশ্চিত কবির ঘুম ভেঙে যাবে — এসব ভেবে রানি চন্দ খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন! গুরুদেবের ঘরের দিকে একটা জানালা ছিল, রানি তখনই সেটি বন্ধ করে দিলেন। বন্ধ করে মনে হল, যাক, গুরুদেবের অন্তত ঘুমের আর ব্যাঘাত ঘটবে না।
কলকাতায় বৃষ্টি

মৈত্রেয়ী দেবী।

জানলাটা বন্ধ করে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়তে না ছাড়তেই শোনেন কড়া নাড়ার শব্দ। তারপরই গুরুদেবের গলা। গুরুদেব তাঁর নাম ধরে ডাকছেন। কণ্ঠে উদ্বিগ্নতা। দরজা খুলে রানি তো হতবাক! গুরুদেবের কণ্ঠে শুধু নয়, চোখে মুখেও উদ্বিগ্নতা। গুরুদেবের মুখ থেকেই জানতে পারেন রানি, এই কান্নার শব্দ শুনে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে কবি তাঁর ভৃত্য বনমালীকে জাগিয়েছেন, বনমালী উঠে আলো জ্বালিয়েছে, সেই আলোতে বায়োকেমিকের বাক্স খুঁজে পেতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। বায়োকেমিকের বাক্স থেকে ঠিক ওষুধটি খুঁজে এনেছেন তিনি। কী হয়েছে, খোকা কাঁদছে কেন, তা বুঝেই ওষুধ এনেছেন। কবি রানিকে ভরসা দিয়ে বলেছিলেন, ‘বোধহয় ওর পেটে ব্যথা হচ্ছে কোন কারণে, কান্না শুনে সেরকমই মনে হল; এই ওষুধটা খাইয়ে দে দেখিনি।’
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?

রবীন্দ্রনাথের ওষুধে শিশুপুত্রের পেটব্যথা কমেছিল কিনা, তা অবশ্য রানি তাঁর লেখায় জানাননি। অনুমান করা যায়, অনেকেই যেমন কবির ওষুধে সুস্থ হয়ে উঠত, তেমনই সুস্থ হয়ে উঠেছিল ছোট্ট অভিজিৎ।

প্রিয়জনদের নানা স্মৃতিকথায় চিকিৎসক রবীন্দ্রনাথের সাফল্যের কথা ধরা রয়েছে। রানি চন্দের মতোই কবির স্নেহভাজন ছিলেন মৈত্রেয়ী দেবী। মৈত্রেয়ী অবশ্য অবনীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা ছিলেন না। তাঁর সব যোগাযোগই ছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। মৈত্রেয়ীর পিতা দার্শনিক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বন্ধুস্থানীয়। সেই সূত্রেই কবির সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তৈরি হয়েছিল ভালোবাসা-স্নেহের বন্ধন। মৈত্রেয়ীর আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ অন্তত চারবার গিয়েছিলেন দার্জিলিংয়ের মংপুতে। মৈত্রেয়ীর স্বামী ডাঃ মনমোহন সেন ম্যালেরিয়ার ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজন হয় যে ভেষজ উদ্ভিদ, সেই সিনকোনা-চাষের মহাদায়িত্ব নিয়ে সপরিবারে থাকতেন ওই দূর-পাহাড়ে। রানির মতো মৈত্রেয়ীও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন। সব বই-ই স্মৃতিকেন্দ্রিক।
কলকাতায় বৃষ্টি

রানি চন্দ।

মৈত্রেয়ী দেবীর বইতে আছে রবীন্দ্রনাথের দেওয়া ওষুধ কতখানি অব্যর্থ। সে ওষুধে কাজ হত, রোগী সুস্থ হয়ে উঠত। তাঁর বইতে আছে এমন একটি ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ নিয়ে মৈত্রেয়ী সেদিন সবে বসেছেন,সেই আসরে অনেকেই ছিলেন। ছিলেন রবীন্দ্রনাথও। হঠাৎই ভৃত্য মহাদেব এসে খবর দেয়, গোর্খা-বেহারার পায়ে বিছে কামড়েছে। কবি তখনই ওষুধের ব্যবস্থা করলেন। প্রথমে অ্যান্টিসেপটিক না হওয়ার জন্য একটি ওষুধ, পরে বায়োকেমিক ওষুধের বই ঘেঁটে আরও একটি ওষুধ। বলে দিলেন দশমিনিট অন্তর খেতে হবে সে ওষুধ।

একটু পরেই বোঝা গেল, তেঁতুলবিছে গোর্খা ছেলেটিকে তেমন কাবু করতে পারেনি। যন্ত্রণা ধীরে ধীরে কমেছিল। তা জানার পর উপস্থিত সকলেই নানাভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, গল্প পড়ায়, কথা বলায়। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ব্যতিক্রম, উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি বারবার খোঁজ নিচ্ছিলেন, ব্যথা কমেছে কিনা!
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৬: জীবন নিয়ে কৌতুক আর ‘যৌতুক’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

কেউ অসুস্থ হলে পড়লে রবীন্দ্রনাথ এইভাবেই উদ্বিগ্ন হতেন। ওষুধ দিতেন। যতক্ষণ না অসুস্থ মানুষটি পুরোপুরি সুস্থ হয়, ততক্ষণ তাঁর উদ্বিগ্নতা রয়ে যেত। মৈত্রেয়ী দেবীর লেখা থেকেই জানা যায়, রবীন্দ্রনাথকেও একবার বিছে কামড়েছিল। হাতের কাছে ওষুধ ছিল না, অদ্ভুত উপায়ে যন্ত্রণা ভুলে থাকতে চেয়েছিলেন কবি। ভুলে ছিলেনও। কীভাবে যন্ত্রণা ভুলেছিলেন, তা রবীন্দ্রনাথই জানিয়েছিলেন তাঁকে। মৈত্রেয়ী দেবী কবির মুখের কথা তুলে দিয়েছেন তাঁর লেখায়। সে লেখা থেকে জানা যায়, বাড়িসুদ্ধু সকলে ঘুমোচ্ছিল তখন। কামড় খেয়েও কাউকে ডাকাডাকি করেননি কবি। যন্ত্রণা ভোলেন নিজেরই উদ্ভাবিত উপায়ে। ভাবতে থাকেন, ’কাকে বিছে কামড়াল, কার ওই পা, কার ওই আঙুল, সে কি আমি? কে এই দেহধারী রবীন্দ্রনাথ? আমি, আর আমার ওই যন্ত্রণাকাতর দেহ, এক তো নয়।’
কলকাতায় বৃষ্টি

অবনীন্দ্রনাথের চিঠি রানিকে।

মৈত্রেয়ী দেবী জানিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ নিজেকে নিজের দেহ থেকে পৃথক করে ভাবতে চেষ্টা করেছিলেন। সে ভাবনার মধ্যে জোর ছিল, ছিল একাগ্রতা। শেষে কবির মনে হয়েছে, না আর কোনো কষ্ট নেই। ছিলও না।

পরদিন সকালে উঠে রবীন্দ্রনাথ সে আঙুলে শুধুই ক্ষতচিহ্ন দেখেছিলেন, ব্যথা-বেদনা তেমন আর ছিল না। আসলে ইচ্ছাশক্তির জয় হয়েছিল। ইচ্ছাশক্তির জোরেই ব্যথা-বেদনা তেমনভাবে জাঁকিয়ে বসতে পারেনি রবীন্দ্রনাথের মনে। বাড়তি গুরুত্ব দিলে, সারাক্ষণ ব্যথা-বেদনার কথা ভাবলে এভাবে কমত না। বাড়ত, বাড়তেই থাকত— রবীন্দ্রনাথ তা ভালোরকম জানতেন।

* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content