
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
রান্নাঘরের দু’ কোণে দুটো তেলের কুপি জ্বলছে। তরকারি কুটছেন সুনীতি। তোলা জলে রান্নার বাসনগুলো ধুয়ে মায়ের হাতের কাছে গুছিয়ে রাখছে খুকু। সান্যাল খুড়িমার ওই আদেশখানা এখন কি বলা যাবে মাকে? মুখ দেখে আন্দাজ করবার উপায় নেই মায়ের বুকের ভেতরে ঠিক কী চলছে।
খুকু জিজ্ঞাসা করে, কী রান্না করবা মা আইজ?
সুনীতি বলেন, একখান পাঁচ তরকারি করি, তুই কি বলিস মা?
খুকু জানে মা সেটাই করবে। কারণ সব্জি সেই অনুযায়ী কাটাকুটি চলছে। ওটা মায়ের কথার কথা।
সামান্য আমতা আমতা করে একসময় বলেই ফেলল খুকু—
আসল কথাখান হইলো কি মা, সোনাদারে এখানে কেউ বাঁচাইতে আইবো না। ওর মনে হয় ভারি বিপদ। এদিকে গোটা গাও আমাদের উপর রাগে ফুসতাছে।
মায়ের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ভারি সংকোচে কথাগুলো বলছিল। কিন্তু সুনীতি এতটুকু চমকালেন না। হাতের কাজটুকু কেবল একটু থেমে গেল। বললেন—
কি কইরা বুঝলি?
মাকে বলতে পেরে খুকুর এখন যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে। স্বস্তিতে একবুক শ্বাস নিয়ে বলল—
সে কথাটা পরে বলতাছি মা, আগে কও গুরুদেব কি বললেন?
মায়ের ঈষৎ চওড়া কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। লাল পাড় সাদা মিলের শাড়ির ঘোমটাটুকু খসে লম্ফর শিখায় স্পষ্ট হয়েছে ক্লান্ত তামাটে মুখ। সারাদিনের শ্রম তো আছেই, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে এক পর্বত দুশ্চিন্তা। সবই বোঝে খুকু। তবু মায়ের স্বরে তার প্রতিফলন নেই। সেই একই নিরুত্তাপ অনুত্তেজ শান্ত কণ্ঠ।
কি কইবেন আর, শঙ্কুরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ওনার চরণে লইয়া যাইতে কইলেন, তোর সম্পর্কে বললেন, বিয়াটা দ্রুত দেওনের ব্যাপারে আর তোর বাবার জইন্য দুইখান নোট দিলেন। দুইটা পাঁচ টাকার নোট। বললেন, মশায়ের জন্য কৌটার দুধ আর ফল কিনা নিস। আসলে আমি কইছিলাম তো যে এখানে মধ্যে মধ্যে দুধের যোগান কম আসে।
খুকু জিজ্ঞাসা করে, কী রান্না করবা মা আইজ?
সুনীতি বলেন, একখান পাঁচ তরকারি করি, তুই কি বলিস মা?
খুকু জানে মা সেটাই করবে। কারণ সব্জি সেই অনুযায়ী কাটাকুটি চলছে। ওটা মায়ের কথার কথা।
সামান্য আমতা আমতা করে একসময় বলেই ফেলল খুকু—
আসল কথাখান হইলো কি মা, সোনাদারে এখানে কেউ বাঁচাইতে আইবো না। ওর মনে হয় ভারি বিপদ। এদিকে গোটা গাও আমাদের উপর রাগে ফুসতাছে।
মায়ের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ভারি সংকোচে কথাগুলো বলছিল। কিন্তু সুনীতি এতটুকু চমকালেন না। হাতের কাজটুকু কেবল একটু থেমে গেল। বললেন—
কি কইরা বুঝলি?
মাকে বলতে পেরে খুকুর এখন যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে। স্বস্তিতে একবুক শ্বাস নিয়ে বলল—
সে কথাটা পরে বলতাছি মা, আগে কও গুরুদেব কি বললেন?
মায়ের ঈষৎ চওড়া কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। লাল পাড় সাদা মিলের শাড়ির ঘোমটাটুকু খসে লম্ফর শিখায় স্পষ্ট হয়েছে ক্লান্ত তামাটে মুখ। সারাদিনের শ্রম তো আছেই, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে এক পর্বত দুশ্চিন্তা। সবই বোঝে খুকু। তবু মায়ের স্বরে তার প্রতিফলন নেই। সেই একই নিরুত্তাপ অনুত্তেজ শান্ত কণ্ঠ।
কি কইবেন আর, শঙ্কুরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ওনার চরণে লইয়া যাইতে কইলেন, তোর সম্পর্কে বললেন, বিয়াটা দ্রুত দেওনের ব্যাপারে আর তোর বাবার জইন্য দুইখান নোট দিলেন। দুইটা পাঁচ টাকার নোট। বললেন, মশায়ের জন্য কৌটার দুধ আর ফল কিনা নিস। আসলে আমি কইছিলাম তো যে এখানে মধ্যে মধ্যে দুধের যোগান কম আসে।
খুকু জিজ্ঞাসা করে বড়দা মেজদায় কি কয় মা?
ওদের দুজনের কথা বলতে গিয়ে সুনীতি যেন ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন—
দেবু, শিবু কপাল ওদের কত কামম বাড়িতে অনুষ্ঠান, গুরুদেব আইছেন তার মাঝখানে ওই দুই পোলা মা মা কইরা আকুল। আসার সময় শিবু তো ছাড়তেই চায় না। কয় মাগো মোটে একখান রাত তুমি থাকলা, এতে কি আশ ম্যাটে, আইজ গাড়িতে তুইলা দিল শিয়ালদা থিকা। সঙ্গে দই মিষ্টান্ন আরও অনেক কিছু দিত। আমি কইলাম বহন করবে কে কও দেখি তবে পোলারা থামে। কি সৌভাগ্য আমার পেটের পোলা না হইয়াও এত করে।
বুদ্ধিমতি খুকু। নিস্পলক দেখে তার মাকে।
ওদের দুজনের কথা বলতে গিয়ে সুনীতি যেন ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন—
দেবু, শিবু কপাল ওদের কত কামম বাড়িতে অনুষ্ঠান, গুরুদেব আইছেন তার মাঝখানে ওই দুই পোলা মা মা কইরা আকুল। আসার সময় শিবু তো ছাড়তেই চায় না। কয় মাগো মোটে একখান রাত তুমি থাকলা, এতে কি আশ ম্যাটে, আইজ গাড়িতে তুইলা দিল শিয়ালদা থিকা। সঙ্গে দই মিষ্টান্ন আরও অনেক কিছু দিত। আমি কইলাম বহন করবে কে কও দেখি তবে পোলারা থামে। কি সৌভাগ্য আমার পেটের পোলা না হইয়াও এত করে।
বুদ্ধিমতি খুকু। নিস্পলক দেখে তার মাকে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৬: বিষণ্ণ সকাল, নিঃসঙ্গ আদিনাথ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৯: শেফালিকার বিপদ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস
গুরুদেবের দেওয়া টাকায় স্বামীর জন্য একটা গুড়ো দুধের টিন কিনে এনেছেন সুনীতি। ফলও কিনেছেন কিছু। আঙ্গুর আপেল বাতাবি। আর এনেছেন অনেকখানি আমসত্ত্ব। এখন রান্না চলছে দ্রুত হাতে। কাঁচা লঙ্কা পাঁচফোড়নের সোমবার দিয়ে কড়াইতে ছেড়ে দিয়েছেন পাঁচমিশালি সব্জি। চাটনির যোগাড় হয়ে গেছে। টমেটো আমসত্ত্বর। পাতলা করে কাটা নারকেল আর কুঁচানো আদা দিয়ে বানানো কাঁচা মুগ ডাল ইতিমধ্যেই নেমে গিয়েছে। ভাত ফুটছে। এই সমস্ত আয়োজন মূলত আদিনাথের জন্য। তারপর ছেলেরা খাবে। ছেলেদের পড়ে পাবে গৌরী সুধা। খুকুর ভাগ্যে বেশিরভাগ দিন মায়ের মতই কচু বাটা। অথবা লালরঙা পুঁইশিষের ডাটা চচ্চড়ি। কিংবা সমুদ্রের ধার থেকে সস্তায় আনা কুঁচোচিংড়ি দিয়ে কচুশাকের ঘন্ট। ওই একটাই পদ। এতোটুকু অসুবিধা হয় না খুকুর। মায়ের সঙ্গে বসে একান্তে খেতে পাবার আনন্দ সব থেকে বেশি। রন্ধনরতা মায়ের দিকে তাকিয়ে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে। কি অপূর্ব রান্নার হাত মায়ের, সামান্য লতা পাতা দিয়ে রাধলেও যেন অমৃত! সতী-সাধ্বী বহু রমণীর কথা গল্পে পুরানে পড়েছে। কিন্তু তার মা যেন সকলকে ছাপিয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৪: সুন্দরবনের পাখি: গোত্রা

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৫: ডেসডিমোনার রুমাল/৫
রাতের খাবার পাট সেরে শুতে শুতে রোজই প্রায় বারোটা বেজে যায় সুনীতির। ছেলেমেয়েরা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ে। সামনেই পুকুর। শোবার আগে প্রতিদিন বেশ কয়েকটা ডুব দিয়ে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে নেন তিনি। রাতের শিশির আর ভেসে আসা শৈবালের তরঙ্গ দুহাতে সরিয়ে শীতল জলের গভীরে নিজেকে ডুবিয়ে রাখেন অনেকক্ষণ। সারাদিনের কাজের গন্ধ ধুয়ে ফেলেন শরীর থেকে। ওই প্রত্যেকটা ডুবের ভিতরে মিশে থাকে তাঁর আত্মশুদ্ধির রাত-আহ্নিক। শুচিতার গৌরব মনের মধ্যে জ্যোতির্ময়ী প্রদীপ হয়ে জ্বলে। মৃদুমন্দ বহতায় আরাম ছড়ায় হিমেল বাতাস। সে বাতাসের শরীর জুড়ে প্রকৃতির নিজস্ব শান্তি।
সপ্তর্ষিমন্ডল চেয়ে থাকে নির্নিমেষ। কালপুরুষ আশীর্বাদ পাঠায়। জারুল জামরুল পেয়ারা অশথ্থের ছায়ায় ছায়ায় সানাই বাজাতে থাকে ঝিঝির দল। স্নান সেরে জোনাকির দেখানো আলোয় জলপথ পেরিয়ে তিনি বাড়ির উঠোনে রাখেন তাঁর লক্ষ্মী-পদচিহ্ন। রাতের বেলা আর সেমিজ পড়েন না। একটা কাচা ধবধবে শাড়ির সযত্ন ভাঁজ খুলে শরীরে জড়ান। ভিজে চুল ছড়িয়ে দেন পিঠে। কপালে মস্ত সিঁদুরের টিপ। ব্যস এটুকুই প্রসাধন। এতেই নিজেকে মনে হয় পরম সৌভাগ্যবতী রাজ ঘরণী। কোটালীপাড়ার মহামান্য শ্রীল শ্রীযুক্ত অমুক দাশগুপ্ত, পূর্ববঙ্গের দোর্দন্ডপ্রতাপ উকিলবাবু কেবল তাঁরই জন্য এখন অপেক্ষমান। তাঁর স্বামী। তাঁর ঐশ্বর্য। তাঁর শক্তি। সবটুকু দিয়ে পরম পবিত্র রাত্রির নিবিড় মুহূর্তে আত্মনিবেদন করাতেই সুনীতির তুচ্ছ জীবনের পূর্ণতা। শ্যামা পল্লীর আঁধার -উঠোন এ খবর জানে। বেল জুঁই গন্ধরাজের ভরন্ত শাখারা জানে। কৃষ্ণপক্ষ শুক্লপক্ষের চন্দ্রমা জানে। আর জানে নিঝুম ঘাট। নিশুত উঠোনের আলপনা আঁকা তুলসী মঞ্চ। ভেজা শাড়ি জড়িয়ে অপার্থিব নিরালায় রাত পাখিদের সঙ্গে সুনীতি উড়ে চলেন দেওয়াল পাড়ের ফেলে আসা স্বদেশে। যেখানে তাল ডাব খেজুরের উঁচু উঁচু অধরা পাতার গা বেয়ে চুঁইয়ে পড়ে অনিরুদ্ধ স্মৃতির নীরব অভিমান। ওদের কত আদর করেন সুনীতি। ফেলে আসা গাভী ছাগলের অসহায় শরীরে হাত বুলিয়ে দেন । আপন মনের কথালাপে সারিয়ে তোলেন বিচ্ছেদের ক্ষত। তিন কামরার একতলা বাড়িটা সত্যিই তখন স্থান কালের গরাদ ভেঙে পৌঁছে যায় ফরিদপুরের জলজ সজীবতায়। সাত মহলা প্রাসাদের নিভৃত শয়ন মন্দিরে । তারপর সিক্ত শীতল শরীরে মশারির প্রান্ত তুলে যখন সুনীতি উঠে আসেন স্বামীর একান্ত শয্যায় সেই শীতলতায় নিজের তপ্ত স্পর্শ বুলিয়ে দিতে দিতে আদিনাথ বলেন—
তোমারে দেখলে প্রাণটা জুড়ায়। তোমারে ছুঁয়ে থাকাতেই একটু কেবল শান্তি পাই শঙ্কুর মা।
এইটুকুই প্রাপ্তি সুনীতির। আর তাঁর কিচ্ছু চাই না।
সপ্তর্ষিমন্ডল চেয়ে থাকে নির্নিমেষ। কালপুরুষ আশীর্বাদ পাঠায়। জারুল জামরুল পেয়ারা অশথ্থের ছায়ায় ছায়ায় সানাই বাজাতে থাকে ঝিঝির দল। স্নান সেরে জোনাকির দেখানো আলোয় জলপথ পেরিয়ে তিনি বাড়ির উঠোনে রাখেন তাঁর লক্ষ্মী-পদচিহ্ন। রাতের বেলা আর সেমিজ পড়েন না। একটা কাচা ধবধবে শাড়ির সযত্ন ভাঁজ খুলে শরীরে জড়ান। ভিজে চুল ছড়িয়ে দেন পিঠে। কপালে মস্ত সিঁদুরের টিপ। ব্যস এটুকুই প্রসাধন। এতেই নিজেকে মনে হয় পরম সৌভাগ্যবতী রাজ ঘরণী। কোটালীপাড়ার মহামান্য শ্রীল শ্রীযুক্ত অমুক দাশগুপ্ত, পূর্ববঙ্গের দোর্দন্ডপ্রতাপ উকিলবাবু কেবল তাঁরই জন্য এখন অপেক্ষমান। তাঁর স্বামী। তাঁর ঐশ্বর্য। তাঁর শক্তি। সবটুকু দিয়ে পরম পবিত্র রাত্রির নিবিড় মুহূর্তে আত্মনিবেদন করাতেই সুনীতির তুচ্ছ জীবনের পূর্ণতা। শ্যামা পল্লীর আঁধার -উঠোন এ খবর জানে। বেল জুঁই গন্ধরাজের ভরন্ত শাখারা জানে। কৃষ্ণপক্ষ শুক্লপক্ষের চন্দ্রমা জানে। আর জানে নিঝুম ঘাট। নিশুত উঠোনের আলপনা আঁকা তুলসী মঞ্চ। ভেজা শাড়ি জড়িয়ে অপার্থিব নিরালায় রাত পাখিদের সঙ্গে সুনীতি উড়ে চলেন দেওয়াল পাড়ের ফেলে আসা স্বদেশে। যেখানে তাল ডাব খেজুরের উঁচু উঁচু অধরা পাতার গা বেয়ে চুঁইয়ে পড়ে অনিরুদ্ধ স্মৃতির নীরব অভিমান। ওদের কত আদর করেন সুনীতি। ফেলে আসা গাভী ছাগলের অসহায় শরীরে হাত বুলিয়ে দেন । আপন মনের কথালাপে সারিয়ে তোলেন বিচ্ছেদের ক্ষত। তিন কামরার একতলা বাড়িটা সত্যিই তখন স্থান কালের গরাদ ভেঙে পৌঁছে যায় ফরিদপুরের জলজ সজীবতায়। সাত মহলা প্রাসাদের নিভৃত শয়ন মন্দিরে । তারপর সিক্ত শীতল শরীরে মশারির প্রান্ত তুলে যখন সুনীতি উঠে আসেন স্বামীর একান্ত শয্যায় সেই শীতলতায় নিজের তপ্ত স্পর্শ বুলিয়ে দিতে দিতে আদিনাথ বলেন—
তোমারে দেখলে প্রাণটা জুড়ায়। তোমারে ছুঁয়ে থাকাতেই একটু কেবল শান্তি পাই শঙ্কুর মা।
এইটুকুই প্রাপ্তি সুনীতির। আর তাঁর কিচ্ছু চাই না।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?
কিন্তু আজ পুকুরে গেলেন না সুনীতি। পা দুটোয় কিসের যেন ভার। হয়তো অনেকখানি পথ হাঁটার ক্লান্তি। গলা থেকে বুকের মধ্যিখান পর্যন্ত ক্রমশ ছেয়ে যাচ্ছে একটা গুমোট যন্ত্রণা। সারাদিনের অনাহার আর অনিয়মে বদহজম হয়ে গেল নাকি? কিন্তু শারীরিক অবিচারে মুষড়ে পড়বার মত মানুষ তো তিনি নন! অবসন্নতা ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত শরীর জুড়ে। রান্নাঘরের কপাটে শিকল দিয়ে ধীর পায়ে উঠোন পেরিয়ে পৌঁছে গেলেন পাশাপাশি তিনখানা শোবার ঘরের মধ্যিখানের গোলাকৃতি বারান্দায়। উত্তরের ঘরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে তিন ছেলে। শঙ্কুর ডান চোখের সাদা ব্যান্ডেজটা এই অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাঝখানের ঘরটায় মেয়েরা ঘুমায়। মেঝেতে পাতলা বিছানা পেতে। মধ্যিখানে খুকু আর তার দু’পাশে সুধা গৌরী। দু’জনেই দিদিকে জাপটে ধরে ঘুমোচ্ছে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৬: জীবন নিয়ে কৌতুক আর ‘যৌতুক’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!
স্নেহে বেদনায় মনটা হু হু করে উঠল সুনীতির। সহসা দুকুল ছাপিয়ে অশ্রুর বাঁধ ভাঙছে। কিছুতেই সামলাতে পারছেন না সর্বক্ষণ বন্দি করে রাখা জননী আবেগের অবাধ্য ঢেউগুলোকে। শঙ্করের চোখের চিকিৎসা এখনই হওয়া দরকার। ডান চোখের অক্ষিগোলোকে আলো প্রবেশ করছে না তার। গুরুদেব ওকে দেখতে চেয়েছেন। কবে যে নিয়ে যেতে পারবেন সুনীতি! এদিকে খুকুর সম্বন্ধটাও তো খুব বেশি দূর এগোলনা। পাকা কথা বা আশীর্বাদটা হলে একটু শান্তি পেতেন। বয়স বাড়ছে খুকুর। মেয়ে তার ভুবন মোহিনী। বিবাহযোগ্যা। কিন্তু ভাইরা যে কোনোই তোড়জোড় করে না। কী করবেন তিনি একা? ওদিকে গোরা নিজের বিবাহ সম্পন্ন করে বসল। দেবু আর গোরা, এই দুজনের ওপরেই তো শুধু সুনীতির অগাধ ভরসা। দেবু কলকাতা ছাড়ার পর এই ক’মাস নিয়মিত টাকা পাঠিয়েছে, কিন্তু গত মাস থেকে হঠাৎই মনি অর্ডার বন্ধ। আজ কলকাতার বাড়িতে তার সাথে দেখা হল। কই একবারের জন্যেও তো দেবু সেসব কথা কিছু তুললো না! দুর্ভাবনায় শরীর মন ভেঙে আসছে সুনীতির। ঘন অবসাদে চোখ জুড়িয়ে আসছে ঘুমে।
দক্ষিণ পূর্বের সবচেয়ে বড় ঘরখানায় চৌকির উপরে তাঁর স্বামী। সুনীতি জানেন আদিনাথ ঘুমোননি। প্রতিদিনের মতোই তিনি বিনিদ্র । স্ত্রী সান্নিধ্যের জন্য উন্মুখ। অথচ আজ সুনীতির শুধু শরীর নয় হৃদয়ও বিরতি চাইছে । সন্তানদের বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়বার তীব্র ইচ্ছা যেন কেড়ে নিচ্ছে
প্রতিদিনের স্বামী শয্যায় নিবেদিতা হবার নিষ্ঠ সামর্থ্য। কেন এমন হলো গুরুদেব? কখনও তো হয় না এমন!—চলবে।
দক্ষিণ পূর্বের সবচেয়ে বড় ঘরখানায় চৌকির উপরে তাঁর স্বামী। সুনীতি জানেন আদিনাথ ঘুমোননি। প্রতিদিনের মতোই তিনি বিনিদ্র । স্ত্রী সান্নিধ্যের জন্য উন্মুখ। অথচ আজ সুনীতির শুধু শরীর নয় হৃদয়ও বিরতি চাইছে । সন্তানদের বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়বার তীব্র ইচ্ছা যেন কেড়ে নিচ্ছে
প্রতিদিনের স্বামী শয্যায় নিবেদিতা হবার নিষ্ঠ সামর্থ্য। কেন এমন হলো গুরুদেব? কখনও তো হয় না এমন!—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।


















