কলকাতায় বৃষ্টি
সেদিন সারারাত একটুও ঘুম আসেনি গোরার। মনে পড়ছিল ভোর। মনে পড়ছিল মায়ের সংসার ছেড়ে চলে যাবার গোছগাছ। খাটের তলার মস্ত লোহার ট্রাঙ্ক টেনে বার করা হয়েছিল। বেরিয়েছিল চামড়ার দু’খানা স্যুটকেস। কালো মেঘের তর্জন গর্জন ভেদ করে প্রকৃতির ভারাক্রান্ত মুখ। টুসকি দিলেই যেন কেঁদে ভাসাবে। বাবাও থমথমে। বড় ছেলের সঙ্গে কথা বলবার পর একদম স্তব্ধ। তারপর সুনীতিকে ডেকে নির্দেশ দিলেন। বললেন, ছেলেদের তো কোনও কামে পাওয়া যায় না। মানু শঙ্কু ডুমুরের ফুল। আর গোরা একলা কত কি দ্যাখবে!
ভোর চারটায় মায়ের পাশে এসে কাজে হাত লাগিয়েছিল শুধু সেই। মায়ের দেখে কষ্ট হয়েছে। বলেছেন, যাও বাবা আর একটু ঘুমাও।
—আমাদের রওনা হওনের দেরি আছে। যা শ্রম তর। মানু শঙ্কু কি ঘুমে?
মাথা নিচু করে নিঃশব্দে ঘাড় নেড়েছিল গোরা।
আস্তে আস্তে ট্রাঙ্কের কল্কাওয়ালা লোহার ঢাকনায় হাত বুলিয়েছে। লম্বা আঙুলে টেনে নিয়েছে পাতলা ধুলোর আস্তরণ। উস্কো চুল। অবসন্ন চোখ। সুনীতি মাথায় হাত বুলোন। কষ্ট হয়!
আবারও শব্দহীন মাথা নাড়া। অর্থাৎ, হ্যাঁ।
কিয়ের তরে! একসঙ্গে আইছি একসঙ্গে যামু। কাজে কম্মে ক্ষতির ডর?
সুনীতি খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে। গোরা মাটিতে। হঠাৎই মায়ের পা দুটো জড়িয়ে রুদ্ধশ্বাসে কেঁদে ফেলেছিল। চমকে উঠেছিলেন সুনীতি। গোরা জানে বাইরের শান্তরূপের আড়ালে মায়ের হৃদপিণ্ডে এখন পর পর হাতুড়ির ঘা পড়ছে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৯: শো-কেস শহর, উপসাগরীয় শিস এবং গোরার দিনরাত্রি

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৫ : Twoকি!

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪২: কুইক অ্যাকশন

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৫: আকাশ এখনও মেঘলা

মা বলেছেন, চল বাবা ছাদে যাই, তর কথা শুনি। সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়েছে গোরা। আধ ময়লা শার্টের লম্বা হাতায় চটপট মুছে নিয়েছে চোখ। আস্তে আস্তে ছাদে পৌঁছেছে মায়ের সঙ্গে। সেই ব্রাহ্ম মুহূর্তের শুকতারা সাক্ষী করা ছাদ। মাটিতে ভিজে শিশিরের আশীর্বাদী। বেল জুঁইয়ের গন্ধে ম ম করছে প্রকৃতি। কালো আকাশের শরীরে টুকটাক আঁচড় পড়ছে নীলের। অল্প কয়েকটা কাক কোন সুদুরে ডাকছে। ছাদের ছোট্ট সিমেন্টের বেদিতে সন্তর্পণে বসেছেন সুনীতি। কিছু শোনবার অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়েছেন।
ক, কী কবি! তুই আজ আমাগো লগে যাইতে চাস না সে কথা বুঝছি বাবা। কারণটাও বুঝি না তা নয়। তর পড়াশুনা কাজকম্মের প্রভূত ক্ষতি, আমি বুঝি।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৭: জৌরালি

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি

মায়ের কোলে মাথা রেখে গোরা আকুল হয়ে বলে মা তুমি তো সব বোঝো। এখন আমার পক্ষে কিছুতেই যাওন সম্ভব নয় ,এহানে আমারে থাকতেই হইব। অন্তত আরও কিছুদিন একটা নতুন বাসার সন্ধান পাইলে তোমাদের লইয়া আসুম, ততদিন টাকা পাঠাইমু ,আমার পক্ষে যতটা সম্ভব।

কেমন ব্যাকুল লাগছিল মাকে। নদীর পাড় ভাঙার শব্দ কি শুনতে পাচ্ছিলেন সুনীতি? হু হু জলরাশির দাপটে আত্মসমর্পণ করতেই হয় তীরভূমিকে। ধরিত্রী মা প্রকৃতির মর্জিকে মাথা পেতে নেন। শুকতারা আকাশের দিকে তাকিয়ে সুনীতি দুই হাত জড়ো করে পৃথিবীর কাছে কাতর প্রণাম রাখেন। যেন প্রার্থনা করেন আরো সহিষ্ণুতার। গোরা তাঁর সবচেয়ে বুঝদার সন্তান।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৭৩ : ‘খেলাঘর’

মায়ের অঞ্জলিবদ্ধ হাত দুটো নিজের মুঠোয় শক্ত করে ধরে থাকে। কোলে মুখ গুঁজে চোখের জলে ভাসে। সুনীতির এবার আর চুপ করে বসে থাকা চলে না, উঠতেই হয়। বলেন, বোঝনা বাবা.. নিচে কত কাম ছড়ানো। তোমার বাবা ওঠবেন, খুকু ঘুমালো কিনা কে জানে, ওরে ডাকতে হইব, আমি এইবার নিচে যামু।
কিন্তু শেষ আশ্রয়টুকু যেন আঁকড়ে থাকবে গোরা।
না মা যাইওনা ..আর এক দণ্ড বস!
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

স্নেহে পুত্রের মাথায় হাত বুলিয়ে চলেন সুনীতি। বলেন, ক, কী কবি।
মা মা আমি বিবাহ করুম। বিয়েডা আমারে করতেই হইবো মা, এক নিঃশ্বাসে স্বীকারোক্তির মতো বলে ফেলে কথাগুলো। আর বলেই বোঝে, তার মায়ের বাক্শক্তি ভোরের নীলে হারিয়ে যাচ্ছে সহসা। শ্রবণ দর্শনের ক্ষমতাকেন্দ্র জড়ো করে এখন কেবল সুনীতি শুনছে আর দেখছে। গোরার দু’চোখে বিভ্রান্তি, অসহায়তা। তোতলাচ্ছে সামান্য। আকুল নিবেদনে জানাচ্ছে নিজের কৃতকর্ম। সুনীতির ধূসর অক্ষিগোলকের সামনে যেন কলাপাতায় মুড়ে বহু যত্নে নিবেদন করছে বধূর দুধেআলতা পদচিহ্ন। মাগো ওদের সম্পন্ন পরিবার শিক্ষিত বৈদ্যবংশ, সেনগুপ্ত, ভারী কোমল স্বভাবের ভদ্র মেয়ে। —চলবে।

* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content