রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
কালাদেওর গুহার মুখটির সামনে একখানি প্রশস্ত চাতাল। ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো চাতালের মধ্যিখানে একখানা যূপকাষ্ঠ। বাৎসরিক পুজো কিংবা মানতের পুজোর দিন ওই যূপকাষ্ঠেই বলি দেওয়া হয়। সেদিন চাতালটি রক্তে লাল হয়ে যায়। ভক্ত থেকে যাঁর মানসিক থাকে তিনি সেই রক্ত দিয়ে কপালে তিলক কাটেন, বুকে রক্তের পাঁচটি চিহ্ন এঁকে দেবতার প্রসাদ হিসাবে হাঁড়িয়া আর বলি-প্রদত্ত মাংসের ভাগ নিয়ে যান। বাৎসরিক পূজার দিন এ-ছাড়াও অন্তত একটি গোটা পাঁঠা গুহার অন্ধকারে বেঁধে রেখে আসা হয়। সেটি দেওর নিজস্ব ভোগ। তিনি নিজের হাতে তাকে ছিঁড়ে খাবেন, এতেই তাঁর আনন্দ। অবশ্য বলির মাংসের ভাগও উৎসর্গ করা হয়। তার পরিমাণ নিতান্ত কম নয়। পরের দিন যদি দেখা যায়, সমস্তই অন্তর্হিত হয়েছে, তাহলে ভক্তরা উল্লাসে ফেটে পড়ে সারাদিন ধরে উৎসবে মাতে।

আগে এই চাতাল ছিল না। তার প্রয়োজনও ছিল না। কারণ, তখন দেওকে গোটা হাঁস, মুরগি, পাঁঠা ইত্যাদি উৎসর্গ করা হত। সেগুলি দেও গ্রহণ করতেন, কারণ পরের দিন উৎসর্গীকৃত কোনও প্রাণিকেই আর খুঁজে পাওয়া যেত না। বলির নিয়ম হাল-আমলে হয়েছে। বলতে গেলে, মঙ্গল ওঝার সময় থেকেই বলির ব্যাপারটি ধীরে-ধীরে চালু হয়েছে। লোকে মেনেও নিয়েছে। উৎসর্গ করা মাংসের ভাগ যদি মেলে তাহলে মন্দ কী?

চাতালের সামনের দিকে রয়েছে একটি নতুন মন্দির। সেখানে কালো একখানা পাথরকে কালাদেওর প্রতিভূ হিসাবে নিত্যপুজো করা হয়। এই ব্যবস্থাও মঙ্গল ওঝার। স্থানীয় বিধায়ককে বলে বিধায়ক-তহবিলের টাকায় বছর সাত-আট হল এই নতুন মন্দির তৈরি করা হয়েছে। সামনে দিয়ে এলে প্রথমে মন্দির পড়বে। তারপর পড়বে মন্দিরের পিছনদিকের চাতাল; তারও পরে কালাদেওর গুহার মুখ। সাধারণ মানুষ কালাদেওর বাৎসরিক পুজোর দিন ছাড়া পিছনের গুহামুখে যেতে পারে না। সেদিকে যাতায়াতের রাস্তায় স্টিলের ফেন্সিং করা হয়েছে। বছরে একদিনই সেই ফেন্সিং খুলে দেওয়া হয়। আগে এই গুহামুখ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোন সীমানা-প্রাচীর ছিল না। গুহামুখ এবং চারপাশের যা-কিছু অসুরক্ষিত অবস্থায় খোলামেলাভাবে পড়ে থাকত। বিধায়ককে অনেক বলে-কয়ে গেল ভোটের আগে-আগে দু-মানুষ সমান সীমানা-প্রাচীর দিয়ে গোটা জায়গাটি ঘিরে ফেলা হয়েছে। ইউনেস্কোর হেরিটেজ লিস্টে নাম তোলবার জন্য হালে তোড়জোর শুরু হয়েছে প্রশাসনের তরফ থেকে।
দুপুরে মঙ্গল মন্দির চত্বর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বর্তমানে মন্দির প্রবেশের যে তোরণটি তৈরি হয়েছে, সেখানে বসানো গেটে তালা দিয়ে আসে। যে-কেউ আর নিজেদের খেয়ালখুশি মতো যখন-তখন মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে না এখন।

সন্ধ্যেবেলা অধিকাংশ দিনই মঙ্গলের বেশি সময় লাগে না। কালাদেওর গুহামুখে সন্ধ্যাবেলা আগুন জাতীয় দাহ্য বস্তু জ্বালানো নিষেধ। আগুন দেখলে কালাদেও ক্ষেপে যান। কালাদেওর মূল মন্দিরেও সে-কারণে প্রদীপ জ্বালানোর কোনও নিয়ম নেই। সেখানে মালসা করে নারকেলের ছোবড়ায় অগরু, ধুনো ইত্যাদি পুড়িয়ে নিবেদন করা হয়। আর যে-কোন একটি মরসুমি ফুলের মালা অঙ্গরাগ হিসাবে দেওরূপ পাথরের গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর পেন্নাম ঠুকেই মঙ্গলের সন্ধ্যারতির কাজ শেষ হয়। বিকেলের আলো একেবারে নিভে যাওয়ার আগে সে গ্রামের চৌহদ্দির মধ্যে ফিরে আসে। তবে গতামুগতিক রুটিনের মধ্যেও কখন-কখন বিশেষ কারণে তার দেরি হয়। অবশ্য মঙ্গল যেহেতু স্বয়ং কালাদেওর পূজারী, ফলে সে কালাদেওকে ভয় পায় না। কারণ, কালাদেও কখন তাঁর পুরোহিত-ভক্তদের কাউকে হত্যা করেনি। তবে মঙ্গল সবচেয়ে ভয় পায় জঙ্গলের জন্তুজানোয়ারকে। ওরা কালাদেওর দ্বারা সংরক্ষিত এলেকার বসবাসকারী। ওদের দাঁত-নখই ওদের পরিচয়পত্র। ওরা কাউকে রেয়াৎ করে না। সন্ধ্যার অন্ধকারে একা কাউকে দেখলেই অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাঘ-সিংহ নেই ঠিক কথা, কিন্তু যা আছে, তাই ভয়ে হাড় হিম করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। ভালুক, হায়েনা, সেই সঙ্গে বুনো হাতি আর তার দোসর কালাচ—এদের যে-কেউ সামনাসামনি পড়লে প্রাণ নিয়ে আর ফিরতে হবে না।

মঙ্গলের বাইক আছে, অন্য জায়গায় যখন তার যাওয়ার দরকার পড়ে তখন সে নিজস্ব বাইকে করেই যাতায়াত করে। ফলে ইচ্ছে করলেই সে বাড়ি থেকে মন্দিরে আসার জন্য বাইক ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তা সে কখনই করতে চায় না। কারণটা আর কিছু নয়, ইমেজ বজায় রাখা। স্থানীয় মানুষেরা যখন দেখে, নিজের বাইক থাকা সত্ত্বেও কালাদেওর পূজারী পায়ে হেঁটে বিপদ-আপদ মাথায় নিয়েই দু’বেলা জঙ্গলের পথে থানে আসা-যাওয়া করে, তখন তাদের কাছে মঙ্গলের এই কৃচ্ছ্রসাধন অসামান্য এক ভক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতিভাত হয়। মঙ্গল ওঝা যে কালাদেওর যেমন-তেমন ভক্ত-পূজারী নয়, এটাই স্থানীয় মানুষদের মনে গাঁথা হয়ে গিয়েছে। সেই কারণে মঙ্গল স্থানীয় লোকজনের চোখে নিজেই এক দেবতা হয়ে উঠছে। ভক্তিশ্রদ্ধার অন্ত নেই তাকে ঘিরে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৩: আঁধারে আছে আততায়ী

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১১: স্বপ্নভূমি তিলজলা

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৩: গর্গজাতক: হাঁচি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৯: রাজসূয় মহাযজ্ঞের মাহাত্ম্য ও আধুনিকতা

আজও মঙ্গলের বেশি দেরি হল না। সুনসান মন্দিরে ঢুকে সে মালসায় ধুনো, অগরু ইত্যাদি পুড়িয়ে একপাশে রেখে ফুলের মালা জড়িয়ে দিল কালো পাথরের গায়ে। মালা সে বাড়ি থেকে গেঁথে নিয়ে আসে। কোন কোন দিন সকালবেলায় অনেক ভক্ত এসে পড়লে তাদের দেওয়া ফুল মালার কিছুটা রেখে দেয়। সেগুলিই দিয়েই সন্ধ্যার পুজোটা ম্যানেজ হয়ে যায়। আজ অবশ্য সে মালা গেঁথে নিয়েই এসেছিল। ভাগ্যিস, মালা গাঁথা আগেই হয়ে গিয়েছিল। তা নাহলে উল্লাস এসে এত বকবক শুরু করে দিয়েছিল যে, মালা গাঁথার আর সময়ই পেত না। সন্ধ্যার এই সময়টায় বিশেষ কেউ আসে না। ক্বচিৎ-কদাচিৎ কেউ এসে পড়ে, তবে তারা অধিকাংশই বাইরের লোক। আজকাল ব্লগার নামের একদল মানুষ এসে মাঝেমধ্যে উৎপাত করে, মন্দিরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পড়ে থেকে ছবি তোলে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে মন্দিরের নানা তথ্য বলতে থাকে। এ-সব দিয়ে যদিও মন্দিরের নামযশ অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে বলে সে মুখে আপত্তি করে না, তবুও মনে-মনে তার একটা আশঙ্কা হয়। কোনদিন না অতি-উৎসাহের বশে এদের কেউ কালাদেওর গুহায় না ঢুকে পড়ে। এইকারণে এদের দেখলে, মঙ্গল আগেই দৌড়ায় ফেন্সিং-এর তালা লাগানো আছে কি-না দেখতে।

মন্দিরের সামনের দিকের দরজার সোজাসুজি পিছন দিকেও একখানি দরজা আছে, যা দিয়ে চাতালে পৌঁছনো যায়। সেই দরজা সাধারণত বন্ধ থাকে। আজ মন্দির বন্ধ করার আগে বিশেষ কারণে সেই দরজা খুলেছিল মঙ্গল। সব কাজ শেষ করে মন্দিরের পিছনদিক এবং সামনের দিকের দরজা বন্ধ করে, প্রবেশপথের গেটে তালা দিয়ে যখন সে বেরুল, তখন সূর্য অনেকখানি ঢলে পড়েছে। কাঁধের ঝোলাটি নিয়ে মঙ্গল হাঁটছিল বেশ খোশমেজাজেই। এ-বারে যদি প্রত্যাশামতো অর্থ পেয়ে যায়, তাহলে পার্শ্ববর্তী রাজ্যের একটা ফার্ম বেনামে কিনে ফেলতে পারবে সে। বেশ কয়েকবছর ধরেই টাকা জমাচ্ছে সে। টাকা জমানোর জন্যই তো সে বড়-ছোট ডিলগুলি ফিরিয়ে দেয় না। পুরুতগিরি করে তো আর টাকা জমিয়ে ফার্ম কেনা যায় না। কালাদেওর মন্দির তো আর বড়-বড় মন্দিরের মতো নিত্যদিন কোটি-কোটি টাকা কামায় না। কোন-কোন মাসে এত কম টাকা প্রণামী পড়ে যে, কতটা রাখবে, কতটা নেবে, তা-নিয়ে মুশকিলে পড়ে যায় সে। তাও ভাগ্যিস, পুরোহিত ভাতা পায় সে। এর সঙ্গেই স্থানীয় প্রভাবশালী অর্থবান পরিবার থেকে মাঝেমধ্যেই ক্রিয়াকর্ম করার জন্য ডাক পড়ে তার। এতেই চালিয়ে নেয় সে। কিন্তু এ-সব নিয়েই কেবল পড়ে থাকলে, তার আর ইহজীবনে উন্নতি করা সম্ভব হতো না। সেই কারণেই সে রাজি হয়েছে। মাত্র চার বছরে এই রাজি হওয়ার বিনিময়ে সে যা ইনকাম করেছে, তা জমিয়েই সে ফার্মটা কিনতে চায়। ফার্ম কেনার ব্যাপারে তাকে সুমতি সবচেয়ে বেশি উৎসাহ যুগিয়েছে। সুমতি ও-রাজ্যের একটা খারাপ-পল্লীতে থাকে। বারকয়েক যেতে-যেতে তার সঙ্গে একটা আসনাই গড়ে উঠেছে তার। ফার্ম কিনতে পারলে সুমতি ওখান থেকে চলে আসবে তার ফার্মে। সেখানে স্বামী-স্ত্রী হিসাবে থাকবে তারা। বেশি বড় ফার্ম নয় যদিও। চাষের জমি, অনেকগুলি গরু, তার মাঝখানে একখানি ছবির মতো রিসর্ট, যেখানে সপ্তাহান্তে বাবু-বিবিরা এসে ফূর্তিফার্তা করবেন, ফার্মহাউসে নিজের হাতে শাক-সব্জি তুলে, গরুর দুধ দোয়ানো দেখে তারপর চিকেন উইংস, কাবাব আর হার্ড ড্রিংকস্‌ নিয়ে মৌজমস্তি করবেন। মঙ্গল মাঝেমধ্যে যাবে সেখানে। সুমতিই তার হয়ে দেখাশোনা করবে। সেই ফার্মের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। দেখা যাক। এবারের ডিলটা বড়। চার পেটির অর্ডার আছে। সেইসঙ্গেই খানদশেক স্যুইস মিনি গান, সাইজে খুবই ছোট, মাত্র দু’ইঞ্চির সামান্য একটু বেশি, খোলা বাজারেই লাখ পাঁচেকের মতো দাম, এদেশে ওই রিভলবার বাইরে বিক্রি করা নিষিদ্ধ বলেই ন’ দশ লাখ টাকা অবধি দাম ওঠে; তা সেইরকম গান দশটা এসেছে। নব্বই লাখ থেকে এক কোটি টাকার ডিল। বিক্রি করতে পারলে সে কমিশন পায় শতকরা আট টাকা। প্রায় আট লাখ টাকা মতো সে পাবে। অন্যগুলি অবশ্য মুঙ্গের ইত্যাদি অঞ্চলে তৈরি দেশি পিস্তল, কার্তুজ। নির্বাচনের আগে-আগে এগুলির চাহিদা বেড়ে যায়। আবার যারা বিশেষ কারণে এক-দু’বার কোন খুনখারাপি করতে চান, তারাও এ-জাতীয় দেশি পিস্তল পছন্দ করে। এতে পিস্তলটির বিক্রিবাটার তথ্য পাওয়া যায় না বলে, সেই সূত্র ধরে অপরাধীর কাছে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব, কখন-কখন কষ্টকর হয়ে পড়ে। আর উঠতি মাস্তান, চমকানো রাজনৈতিক দাদারাও অনেকে এ-জাতীয় জিনিস সঙ্গে নিয়ে ঘোরে। অস্ত্রব্যবসায় এত লাভ জানলে কোন মূর্খ এই পুরুতগিরি করতে আসতো?
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪২: কাদম্বরীর পিতামহ ছিলেন ঠাকুরবাড়ির পাহারাদার, পিতা ছিলেন বাজারসরকার

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৫: ছবিমুড়ার ভাস্কর্য ত্রিপুরার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন সম্পদ

দুটি স্যুইস গান নির্দিষ্ট গাছের গুঁড়ির কোটরে রেখে আসার কথা ছিল। বসের তেমনই নির্দেশ পেয়েছিল সে। যে-লোকটি গভীর রাতে এই নির্দেশ নিয়ে তার ডেরায় আসত, এই তো দিন কয়েক আগে সে এসেছিল। পেটি অন্যত্র পাচার করে ফেলতে হবে, এটাই নাকি বসের হুকুম। তবে গুদাম খালি থাকবে না। এবার নেপাল বর্ডার হয়ে এদিকে ঢোকা সোনার বাঁট স্মাগলিং-এ নামবেন বস। তারও আংশিক স্টোররুম হবে এখানেই। তার অর্থ মঙ্গল ওঝার দায়িত্ব এবং গুরুত্ব—দুই-ই বাড়বে। এখন দেখা যাক। না-আঁচালে এ-লাইনে বিশ্বাস নেই।

মন্দিরের চাবি বন্ধ করে ফুরফুরে মেজাজে মঙ্গল হাঁটা দিয়েছিল সবে। অর্ধচন্দ্রাকার টিলাটি ঘুরে ওদিকে সবে গিয়েছে, এমনসময় একজন যেন মাটি ফুঁড়ে তার সামনে উদয় হল। চমকে উঠল সে। “আপনি? আপনি আর-কাউকে না-পাঠিয়ে নিজেই এসেছেন?”
“এর আগে আসিনি এমন তো নয়। যাক্ক, ও-সব ছেঁদো কথা ছাড়ো। আসল কথায় এসো। তোমাকে নির্দিষ্ট জায়গায় যা রাখতে বলা হয়েছিল, রেখেছিলে?”
“হ্যাঁ। সঙ্গে-সঙ্গেই। মন্দিরে ঢোকার আগে আমি ওটা রেখে তারপর মন্দিরে পা দিয়েছি!”
“কিন্তু তুমি কি কোটর চিনতে ভুল করেছ না-কি? এক জায়গায় রাখতে গিয়ে অন্য জায়গায় রেখে দিলে?”
“কী বলছেন স্যার! এই তো প্রথম রাখছি না, এত বছর ধরে যোগ্যতার সঙ্গে কাজটি করার পরেও আমি ভুলে যাব কোথায় রাখতে বলা হয়েছে? তা কী হয়?”
“অত পোয়েট্রি করে কথা বলো না। অত শোনার সময়ও নেই আমার। সাদা বাংলায় বলছি, আমি নির্দিষ্ট জায়গায় বিদেশী পাখিদুটির সন্ধান করেছি। তারপর যথাস্থানে না-পেয়ে আশেপাশের কয়েকটি গাছের গুঁড়িতেও সন্ধান করেছি। কোথাও কিচ্ছু নেই!”
“এ হতেই পারে না স্যার। আপনি চলুন, আমি আপনাকে দিচ্ছি। থাকবে না কেন, নিশ্চয়ই আছে। চলুন !” তার গলার স্বরে আত্মপ্রত্যয় একেবারে ঝরে-ঝরে পড়ছে।

আধ ঘন্টা পরে কিন্তু সেই আত্মপ্রত্যয়ের ছিটেফোঁটাও ছিল না। দরদর করে ঘামছিল সে। এখানেই তো একটু আগে রেখেছিল সে। তাহলে কোথায় গেল? সে পাগলের মতো খুঁজতে লাগল। মাটির উপর জমে থাকা শুকনো পাতার স্তুপ ঘাঁটতে লাগল উবু হয়ে। কিন্তু নাহ্‌। কোত্থাও নেই। অথচ একটু আগে সে নিজের হাতে রেখে গিয়েছিল। তাহলে? কে নিল? আর নিয়েছে মানে, সে জেনে গেছে ওখানে পিস্তল রাখা ছিল। তাকে কি রাখতে দেখেছিল কেউ? কিন্তু সে তো একাই আসছিল। আর কাউকে তো সে দেখেনি আশেপাশে। তাহলে > রাইভাল কোন গ্রুপের কারসাজি নয় তো? ওদের নেটওয়ার্ক অনেক বেশি স্ট্রং।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৫ : অবাক পৃথিবী

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৬ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী?

সে ভয়ে-ভয়ে বৃদ্ধ লোকটির দিকে তাকিয়ে হতভম্বের মতো গলায় বলল, “বিশ্বাস করুন, আমি মন্দিরে ঢোকার আগেই একটু আগে পিস্তলদুটি রেখেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি নেই। কে চুরি করতে পারে মাথায় আসছে না। অন্য দলের শয়তানি নয় তো?”
“সে তো আমার জানার কথা নয়। আমার চাই মাল। বসের কড়া হুকুম, মাল না-নিয়ে যেন আমি না-ফিরি ! দাও, মাল দাও।”
“কিন্তু আমি…”
“ওপরচালাকি করছো? আমার তো মনে হয়, দামি মাল দেখে তুমি মাথা ঠিক রাখতে পারনি। অন্যত্র বেচে দিয়েছ। তাতে প্রায় গোটা টাকাটাই তোমার কব্জায় এখন! কাউকে ভাগ দিতে হবে না।”
“না না, আপনি বিশ্বাস করুন, আমি সরাইনি, কাউকে বেচিওনি। এখানেই রেখেছিলাম…”
“রেখেছিলাম তো কোথায় গেলো ? হাওয়া হয়ে উড়ে গেলো না-কি হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে ইভনিং-ওয়াকে গেছে?”
“আজ্ঞে…”
“মঙ্গল, এতদিন সর্বাধিনায়ক তোমায় রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু আর করবেন না। তোমাকে কয়েককোটি টাকার এই ডিলিং-এ নেওয়া হয়েছে কারণ, স্টোর-রুম করার জন্য এই জায়গাটি হচ্ছে যাকে বলে, প্রাইম স্পট, আদর্শ স্থান। আর তুমি আপাতত এই প্রাকৃতিক-স্টোররুমের অছি। এমন নয় যে এর আগে কখন এই কাজে এই স্টোররুম ব্যবহার করিনি আমরা। আমি নিজেই করেছি। তখন একটা বিপ্লবী রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসাবে আমাদের যা-যা ওয়েপন্‌ আসত, আমরা সেগুলি এখানে রেখে যেতাম। কারণ, জানতাম, দেওর থানে সচরাচর কেউ আসবে না। আসতও না। লোকে এ-দিকটা এড়িয়েই চলত। তারপর সেখান থেকে তিলে-তিলে এই কাজকারবার বস গড়ে তুলেছেন। কিন্তু তোমরা যদি এভাবে গদ্দারি কর, তাহলে তিনি বাধ্য হবেন আঙুল বাঁকাতে!”
“আমি বলছি তো, আমি জানি না। ওখানেই ছিল। আমি যে রেখেছি, তা জোর গলায় বারবার বলব!”
“তোমার গলাবাজি শুনব বলে এত কষ্ট করে এখানে বস আমাকে পাঠায়নি মঙ্গল। মাল বার করো!”
“আমি স্টোররুম থেকে অন্য মাল এনে দিচ্ছি। দাঁড়ান, আবার তালা খুলতে হবে! এদিকে অন্ধকার নেমে আসতে আর দেরি নেই!”
“স্টোররুমের মাল আমার হাতে দিয়ে এখন না-হয় বেঁচে গেলে, কিন্তু আমি যদি কাল এসে স্টোররুমের মালপত্তরের হিসেব কষতে বসি, তাহলে কোন হিসেব দেখাবে?”
“আমি জানি না, আমি বুঝতে পারছি না! কীভাবে এমন হল… আমি তো…”
বৃদ্ধ লোকটির হাতে পিস্তল উঠে এল একটা। এটা আরও প্রাণঘাতী, আরও দামি, আর সেটা হাতে নিয়ে লোকটিকে অ্যাকশন-প্যাকড্‌ ফিল্মের হিরোদের মতো লাগছে। লোকটির হাতে পিস্তল দেখে মঙ্গল ভয় পেয়ে গেল। সে পায়ে পড়তে গেল। এবারকার মতো তাকে যেন মাফ করে দেওয়া হয়। পরের বার থেকে সে আরও সতর্ক থাকবে।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১১১: ডেসডিমোনার রুমাল/১০

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৮: সোনালি বাটান

কিন্তু লোকটির পিস্তল তাকে সেই সুযোগ দিল না।
সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছিল। লোকটি পায়ের জুতো দিয়ে মঙ্গলের প্রাণহীণ দেহটাকে ঠেলতে-ঠেলতে জঙ্গুলে খাদের দিকে মধ্যে ফেলে দিল। খাক্‌, আজকের রাতের জন্য জঙ্গলের সন্তানেরা ফিস্টি করুক। তাকে এখন অনেক জরুরি কাজ সারতে হবে। বাইকটাকে ঠেলতে ঠেলতে মন্দিরে ঢুকল সে। এই স্টোররুমের একটা ড্যুপ্লিকেট চাবি তার কাছে আছে। মঙ্গল ওঝার লাশ পাওয়া গেলে পুলিশ হইইচৈ করবে। কাল সকালেই স্থানীয়রা কেউ এদিকে এলে তারাও মন্দির বন্ধ দেখে খোঁজখবর করতে পারে। আর তাহলেই পুলিশের অবধারিত আবির্ভাব ঘটবে। তার আগেই কিছু একটা করতে হবে। যদিও স্টোর-রুমের জন্য চিন্তা নেই। ওখানে কেউ যাওয়ার সাহস পর্যন্ত করব না। কিন্তু সাবধানের মার নেই। অতএব দেখে নিতে হবে, মন্দির, চাতাল এবং স্টোর-রুমে সব ঠিকঠাক আছে কি-না। তার উপর দু’-দুটি পিস্তল। মঙ্গল মন্দিরেই কোথাও লুকিয়ে রাখেনি তো?

মন্দিরের মেন গেটের তালা খুলে লোকটি বাইক নিয়ে ভিতরে ঢুকে আবার গেট আটকে দিল। যতই দেরি হোক, আজ রাতের মধ্যেই খুঁজে দেখতে হবে, মঙ্গল পিস্তলদুটি এখানেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছিল কি-না। উফ্‌, কোন কাজ যদি সহজে হয় তার! —চলবে।

* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content