কলকাতায় বৃষ্টি
চুনারাম মাহাত থাকে বুরুমডিহাতে। বুরুমডিহা পিশাচপাহাড়ের পাশের গ্রাম। মাঝখানে একটা জঙ্গল থাকায় ঘুরে সড়কপথে আসতে হয় তাকে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অবশ্য ছোট একটা পায়ে চলা পথ আছে। সেই পথ দিয়ে বাইক, সাইকেল দিব্যি চলে আসে। আসেও অনেকেই। বেলা দশটা-এগারোটার সময় অনেকেই ওই পথে কাজে আসে পিশাচপাহাড় কিংবা অন্যত্র যাওয়ার জন্য। শর্টকার্ট হয়। মেইন রোড দিয়ে ঘুরে আসতে গেলে আধা ঘণ্টা অতিরিক্ত লেগে যায়। রোডটা ঘুরে ফিরে আসছে। কাছেই কুসুমডিহা আছে, সেটা আর-একটা ছোট গ্রাম, পিশাচপাহাড়ের মতো গঞ্জ নয়, কিন্তু সড়কপথটা বুরুমডিহা থেকে কুসুমডিহা গ্রাম ছুঁয়ে তারপর পিশাচপাহাড় হয়ে চেকপোস্টের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। আগে আলো ফুটলে ওই জঙ্গলের পথেই আসত অনেকেই। কিন্তু কালাদেও জেগে ওঠার পর থেকেই সকলে ভয় পায়। একা জঙ্গলের পথে কেউ আসতে চায় না। কে জানে কখন তেনার রাগ হয়, আর কোপ এসে পড়ে একলা মানুষের ঘাড়ে!

কালাদেও জেগে ওঠার আগে, বছর দু’য়েক আগেও অনেকেই ভোরবেলা ওই পথে যাতায়াত করত। আসানমুড়ায় একখানা সিমেন্টের কারখানা হয়েছে বছর পাঁচ-সাত, সেখানে এদিককার অনেকেই কাজ করে। তারা দল বেঁধে, কখন একা সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু তাদের একজন ফেরার পথে কালাদেওর বলি হয়, সেই থেকে সকলে এত ভয় পেয়ে গিয়েছে যে, যাদের ইভনিং শিফট থাকে, তারা আর ফেরে না। নাইট শিফটে এক্সট্রা ডিউটি নিয়ে পরের দিন সকালে ফেরে। আজকাল পিশাচপাহাড়ে অনেকগুলি রিসর্ট-হোটেল তৈরি হয়েছে। জায়গাটার শ্রী ফিরে গেছে হালে। তার আগে কে চিনত পিশাচপাহাড়কে? নেহাত কালাদেওর থান পিশাচপাহাড়েই আছে, ফলে এদিককার লোকজনকে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে যেতেই হত। বাৎসরিক পুজোর সময় তো যেতই অনেকে। কিন্তু হঠাৎ করে একদিল বাবু পিশাচপাহাড়কে একেবারে জাতে তুলে দিলেন। এই নিয়ে তাদের গ্রামে ক্ষোভ কম নেই মানুষের মধ্যে। কেন, জঙ্গল কি বুরুমডিহায় নেই? ঝরনা? পলাশের আগুন দেখতে গেলে কি কেবল পিশাচপাহাড়েই যেতে হবে? তাদের গ্রামের পশ্চিমদিকটা যখন বসন্তকালে লাল-হলুদ আগুনে ঝলসে যায়, তখন কেউ আসে ফোটো তুলতে? সব যেন ওই পিশাচপাহাড়ে! এখন রিসর্ট হয়েছে, আগে ছিল? থানা ছিল, আর চার্চের হাসপাতাল ছিল। ওই একটা কারণে এখনও তাদের পিশাচপাহাড়ে হামেশাই আসতে হয়। তাদের গ্রামে যে হেলথ সেন্টার সেখানে তো এক হাত ঘাস গজিয়ে গিয়েছে। না আসেন ডাক্তার, না থাকেন নার্স। পঞ্চায়েতকে বলে বলে হয়রান হয়ে গিয়েছে তারা। ডাক্তারবাবু নাকি খাস কলকাতার লোক, এখানে এসে বুরুমডিহার অবস্থা দেখে সেই যে ছুটিতে গিয়েছেন, সে ছুটি আর তাঁর ফুরায়নি।
হেলথ সেন্টারে নার্স আর একজন কম্পাউন্ডার ছিল বটে, কিন্তু অবস্থা দেখে তারাও কবেই ভাগলবা। চার্চ-হাসপাতাল তাদের কাছে মরুভূমিতে মরুদ্যানের মতো। সেখানে গরীবগুর্বোর সাধারণ চিকিৎসা বিনামূল্যে, আর ভর্তি হতে হলেও পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কুপন কেটে প্রতিদিন একশো করে টাকা দিলেই হয়। এত সস্তায় চিকিৎসা সদরের হাসপাতালে গেলেও হয় না। সেখানে সব ফ্রি হলেও যেতে-আসতেই তাদের এর চেয়ে বেশি বেরিয়ে যায়। ওই চার্চ হাসপাতাল থাকার জন্য পিশাচপাহাড় আগে থেকে একটু-আধটু জনপদ নিয়ে রমরম করতে শুরু করেছিল। তারপর এখন তো হোটেল আর রিসর্ট হয়ে গিয়ে তার পোয়াবারো। আশেপাশের সবক’টি গ্রামের অনেক ছেলেপিলেই সে-সব হোটেল-রিসর্টে কাজ করে। আজকাল মেয়েরাও ক’জন রান্নার কাজ, হেল্পারের কাজ কিংবা বাসনকোসন ধোয়া কি হোটেলের রুম-পরিষ্কার করার কাজ করতে আসে। কিন্তু এই প্রথম ভোরে, যখন ভালো করে আলো ফোটে নি, তখন তারাও কেউ চুনারামের মতোই সাহস করে না ওই জঙ্গলের পথে আসার।

এর উপর আবার কালাদেও এত রেগে উঠেছেন যে, তার নিজের পুরোহিতকেই মেরে ফেলেছেন বলে শুনেছে তারা। তারপর পুলিশে-পুলিশে ছয়লাপ নাকি মন্দিরচত্বর। তারা শুনেছে, পুলিশ নাকি তদন্তের জন্য কালাদেওর মন্দিরে ঢুকবে। হাজার হাজার বছর ধরে কালাদেও যে গুহায় থাকেন, সেখানেও হানা দেবে। মনে-মনে ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে তারা। আজ পর্যন্ত গ্রামের কোন লোক তো দূর, পুরোহিতেরই সাহস হয়নি সেই গুহায় পা রাখার, আর পুলিশ কিনা সেখানেই পা রাখতে যাচ্ছে। জুতো-ফুতো পরে পা রাখবে কিনা কে জানে! তারপর কালাদেও জেগে উঠলে যে কী করবেন ওদের! তারা মনে-মনে ধরেই নিয়েছে যে, এরপর লাশের পাহাড় জমে যাবে। সদর থেকে বড় বড় অফিসাররাও এসেছেন শুনেছে তারা। লোকের মুখে-মুখে সব খবর রটে যায়। সেভাবেই কানে এসেছে তাদের। কালাদেও কি তাঁদেরও ছাড়বে? চিনে রাখবে, তারপর একে-একে মারবে। অবশ্য নিজের গুহায় পেয়ে একসঙ্গেই সবকটাকে নিকেশ করে দেয় কিনা কে জানে? হায় রে! বুরবক্‌ লোকগুলির ঘরের আপনজনরা যে কোন দুঃখজনক খবর পাবে? এরা যে কোন সাহসে এ-সব কাজ করতে যায় বোঝে না সে। পিঁপড়ের পাখা উঠেছে, নিজের থেকে আগুনে থুড়ি কালাদেওর মুখের গ্রাস হতে এগিয়ে গিয়েছে সেজন্য। কপালে যে ভারি দুর্ভোগ আছে সন্দেহ নেই। তারা বলে এই কালাদেওর ভয়ে সাত-সকালেও জঙ্গলের পথ এড়িয়ে চলে, আর এরা কিনা কালাদেওর গুহাতেই মাথা গলাতে যাচ্ছে? কী জানি, কী ঘটছে সেখানে! আজ তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে। কালাদেও রেগে গিয়ে একবার যদি বেরিয়ে আসেন, তাহলে কাউকে আর আস্ত রাখবেন না। পিশাচপাহাড় গ্রামের মানুষজনকেও না। তারাও তো অপরাধী। কেন তারা মানুষগুলিকে বাধা দেয়নি? পিশাচপাহাড়ের থানকে বাইরের লোকে অপবিত্র করছে, আর তোরা মুখ বুজে তাই দেখছিস? ছি ছি! সাইকেল চালাতে চালাতে চুনারাম মাথা নাড়ে। উচিৎ কাজ হয়নি, মোটেও উচিৎ কাজ হয়নি!
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৪ :কালাদেও নয়?

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৯ : জলসাঘর—অস্তশিখর

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৫ : নিশীথে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৪ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৩

চুনারাম নিজে পিশাচপাহাড়ের হোটেল-রিসর্টগুলিতে মাছ জোগান দেয়। তার দুখানি পুকুর আছে, ভেড়ি নয়, পুকুর। সেখানে সে মাছ চাষ করে। একেবারে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে। কোনরকম কৃত্রিম খাবার দিয়ে নয়, ওতে পুকুরের জল তো নষ্ট হয়ই, মাছের স্বাদও বদলে যায়। শহর থেকে যে বাবুরা ফূর্তিফার্তা করতে আসে, তারা চালানি-কৃত্রিম খাবার খাওয়া মাছ খাওয়া মুখে লোকাল পুকুরের মাছ খেয়ে সাধু-সাধু করে, আর হোটেল-রিসর্টগুলি এই সুযোগে দ্বিগুণ-তিনগুণ দাম বাড়িয়ে দেয় এক-একটা প্লেটের। তাতে অবশ্য চুনারামের কিছু যায় আসে না। তাতে বরং তার কপাল ফিরেছে। এ-অঞ্চলে নেই-নেই করে বেশ কয়েকটা পুকুর থাকলেও চুনারামের পুকুরের মতো মাছের স্বাদ অন্য কোন পুকুরের মাছে হয় না। তাছাড়া সে কৃত্রিম খাবার দিয়ে মাছ চাষ করে না বলে তার মাছের চাহিদা বেশি। ফলে অন্যরা যখন মাছের ঝুড়ি নিয়ে হোটেল-রিসর্টের দরজায় দরজায় ফেরে, তখন চুনারামের মাছ পড়তে পায় না। তাছাড়া চার্চ হাসপাতালের ফাদারও তার মাছ খুব পছন্দ করেন। ওখানে তার বাঁধা ব্যবসা। তবে একটাই অসুবিধে। চার্চের কাছ থেকে বেশি দাম চাওয়া যায় না, পাওয়াও যায় না। আশেপাশের গ্রামগুলির মানুষ ওঁদের দয়ায় বেঁচেবর্তে আছে, এভাবে চাওয়া যায় বেশি দাম? দিচ্ছেন এই না কত! তবে সেটা চুনারাম পুষিয়ে নেয় হোটেল রিসর্টে বেচে। সে বুঝে গেছে ওরা যতই তড়পাক্‌ না কেন, তার মাছ বেচে ওদের যতটা প্রফিট, অন্যদের মাছ বেচে নয়। তার মাছ একবার যে কাস্টমার খেয়েছে, সে পরের দিন অন্য মাছ মুখে তুলতেই পারবে না।

মাছের ব্যবসার কারণেই চুনারাম সূর্য ভালো করে ওঠার আগেই বেরিয়ে পড়ে। রাত থাকতে-থাকতে উঠে সে জাল ফেলে। যেদিন যা ওঠে, অর্ডারও থাকে, তার কোটা পূরণ হয়ে গেলেই সে আর অপেক্ষা করে না। বেশি মাছ ধরে পুকুর খালি করে তো লাভ নেই। পুকুরের মাছ তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না! তার বাচ্চাদুটি ছোট বলে বউ তাকে সাহায্য করে। রাত থাকতে-থাকতে উঠে স্বামী-স্ত্রীতে মিলে মাছ ধরে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। যে-সব মাছ কিছুক্ষণ বাঁচবে সেগুলিকে বড় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে করে সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে বেঁধে নেয়। আর বাকি মাছ কলাপাতায় মুড়ে ভিজানো ব্যাগে ঝুলিয়ে নেয় সামনের ক্যারিয়ারে। তারপর বেরিয়ে পড়ে। এখানে বরফ পাওয়া মুশকিল। তার উপর বরফ দিলে মাছের স্বাদ পাল্টে যায়। সূর্য ভালোমকরে উঠবার আগেই মাছ বিক্রি করে দিতে পারলে আর পচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। হাঁড়ির মাছগুলিও জ্যান্ত থাকে। তাতে দাম বেশি পাওয়া যায়। সেই কারণে সকাল সকাল চুনারাম বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু জঙ্গলের পথে এখন আসতে ভয় পায় বলে, তার উপর বউও দিব্যি দিয়ে রেখেছে, অতএব আধ ঘণ্টা বেশি লাগলেও জঙ্গলের পথ না ধরে, সড়কপথেই ঘুরে আসে সে।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু: পর্ব-১৪২: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২২

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৮: কালো ইঁদুর

আজকেও আসছিল। বেশ ফুরফুরে বাতাস বইছে। পাখি ডাকছে। অন্যদিন যেমন ভোর আসে, আজকেও তেমন এসেছে। সামনের শালজঙ্গল থেকে একঝাঁক টিয়া নীল আকাশে উড়ে গেল ট্যাঁ ট্যাঁ করতে করতে। মনে হল যেন সবুজ চাদর উড়ে গেল একটা। রাস্তার ধারের লাইটপোস্টে বসে একটা ফিঙে পাখি চারদিকে নজর রাখছে। কয়েকটা দোয়েল উড়ে গেল সামনের ঝোপঝাড়ের উপর থেকে। অনেকসময় খরগোশ দেখতে পায়। এই ভোরের বেলা কখন সারিবদ্ধভাবে রাস্তার একদিক থেকে আর-একদিকে যাতায়াত করে কাঁকড়াবিছের দল। মাটিতে কাঁপন টের পেলেই পিছনের হুল উঁচিয়ে অপেক্ষা করে থাকে আক্রমণের জন্য। অবশ্য খানিক পরে নিজেরাই চলে যায় যেদিকে যাবার। চুনারামের মনে হয়, একমাত্র মানুষই একে অপরকে মারে, কোন কারণ ছাড়াই। মানুষ পশুরও অধম।

সামনে একটা বাঁক আছে, সাইকেলের গতি মন্থর করল চুনারাম। এই বাঁকটুকু পেরোলেই আর একটুখানি রাস্তা। তারপরেই পিশাচপাহাড়ের মোড়। হঠাৎ দেখল একজন মহিলা, বেশ আধুনিক পোশাকআশাক পরা, আর একটি লোকের সঙ্গে, কেমন উস্কোখুস্কো চুল, গায়ের শার্টটাও যেমন-তেমন কথা বলতে-বলতে হাঁটছে রাস্তার এক সাইড ধরে। মহিলাটিকে চিনতে পারল না সে। তবে লোকটিকে যেন দেখেছে একদিন পিশাচপাহাড় রিসর্টে বা অন্য কোনও হোটেলে। ট্যুরিস্টপার্টি হবে। ওরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলায় এত মগ্ন যে চুনারামের দিকে ফিরেও দেখল না। অবশ্য আগেই তাকে লক্ষ্য করেছে হতে পারে। সামান্য গ্রাম্য মানুষ তারা, আলাদা করে কী-ই বা দেখার আছে, ভাবতেই পারে শহুরে বাবু-বিবিরা। তাদের পাশ দিয়ে আসবার সময় টুকরো-টাকরা কথাবার্তা কানে এল তার।

মেয়েটি বলছে, “আমি আগেই জানতাম অরণ্য পার্ভাটেড। কিন্তু তা বলে এতটা নিচে নামতে পারে ভাবিনি। আমার গেহ্ননা হচ্ছিল তুমি যখন বললে। জেনে শাস্তি দিতে ইচ্ছে করছিল আমার, সত্যি বলছি…”
ছেলেটি বলল, “ওর কপালে ওটাই লেখা ছিল… সেই স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই এরকম। কতজনকে যে এইভাবে রেপ করেছে! দেখতে সুন্দর হওয়ার অ্যাডভান্টেজ নিয়েছে আর-কি! তুমিও তো…”
“রাবিশ। আমার স্বামী বছরের ছয়-সাত মাস জলে ভেসে বেড়ায়। আমি বলতে পারো একটা ফিজিক্যাল নিডস থেকে এই সিচ্যুয়েশনশিপে আছি। ওকে নাহলে আমি আরও অনেক অনেক ছেলেপিলের সঙ্গে করতে পারতাম এসব। কিন্তু আমি করি না। ফিক্সড একজন সেক্সপার্টনার থাকল। এ-দিক থেকে আমাকে সতীলক্ষ্মী বলতে পারো…”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৭: রাজসূয়যজ্ঞ কী শুধু একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রদর্শনী? না স্বতঃস্ফূর্ত গণসমর্থনলাভের উদ্যোগ?

সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৩৮: নন্দিতা কৃপালনি— বিশ শতকের বিদুষী

ওরা চলে যাচ্ছিল দূরে…। আর কিছু শুনতে পেল না চুনারাম। অনেকগুলি শব্দের অর্থই তো জানে না আসে। ‘পাভাইড’ না কী বলছিল ওরা? কিংবা সিচু না কী যেন? এসবের মানে কী? জানে না চুনারাম। তবে বুঝতে পারপছিল, একজন কেউ খারাপ কাজ করেছে। ‘রেপ’ শব্দটা এখন গাঁয়েগঞ্জে অনেকেই জানে, ব্যবহার করে, ফলে অর্থ বুঝতে অসুবিধা হল না চুনারামের। কিন্তু সে কে? মানুষ? কিন্তু মানুষ হলে ওরা জঙ্গলের কথা বলবে কেন ? অরণ্য মানে যে জঙ্গল তা সে জানে। ওরা সেই জঙ্গলের কথা বলছিল। জঙ্গল কি কাউকে রেপ করতে পারে ? শহুরে মানুষগুলির কী যে সব কথাবার্তা! মাথামুণ্ডু নেই। তবে দুজনে বেশ রেগে আছে। কাউকে শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবছে কিংবা শলাপরামর্শ করছে।

বাঁকটা ঘুরে সামনে এগোচ্ছিল চুনারাম। বেল বাজাল সে কয়েকবার। বাঁকটা বেশ বিপজ্জনক। ওদিক থেকে কেউ আসছে কিনা বোঝার উপায় থাকে না। অনেক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে এই বাঁকে। কিন্তু বাঁক ঘুরেই হঠাৎ থমকে গেল চুনারাম! আরে ওটা কী পড়ল রাস্তার উপর। এক্ষুনিই তো পড়ল মনে হল! কাটা কলাগাছের মতো রাস্তার উপর যেন বসে পড়ল। আর কালোমত কী যেন ছুটে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল! কালাদেও কী? এর মধ্যেই অপারেশনে নেমে পড়েছে? সে জানত। কালাদেওর গুহায় বাইরের মানুষ পা রাখলে বিপদ হবেই একটা। মানুষটা নিশ্চয়ই মরে গিয়েছে। কালাদেও হয়ত খেয়েও নিত ধড়টা। আগে অনেকবার যেমন ধড় গায়েব করে দিয়েছে খেয়ে, আবার অনেকসময় মুণ্ডু চিবিয়ে খেয়েছে। ধড়ে হাত পর্যন্ত দেয়নি। ভাবলেই গা শিউরে ওঠে তার! এখানেও কি তেমন ব্যাপার হল নাকি? তাড়াতাড়ি সাইকেল চালাতে চাইল সে। কিন্তু ভয়ে তার পা সরছিল না। কোনরকমে সেখানে গিয়ে দেখল দিব্যি ফুটফুটে একটি লোক রাস্তার উপর পড়ে আছে। মাথার একপাশ দিয়ে দরদর করে রক্ত গড়িয়ে রাস্তা ভিজিয়ে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

কোনওরকমে সাইকেল থেকে নামল সে। চারপাশটা তাকিয়ে দেখে নিল। কালাদেও থাকলে আবার যদি বেরিয়ে আসে, তাকে আক্রমোন করে তারও একই অবস্থা করবে। কিন্তু কালাদেও তাকে দেখে অমন করে পালিয়ে গেল কেন? তাহলে কি কালাদেও জানে যে, চুনারাম কোন অন্যায় করতে পারে না, সে-কারণে চোখের আড়ালে চলে গেল। কালাদেও এমনিতে কোন কারণ ছাড়া কারুর সামনে আসতে চায় না।

চুনারাম দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে কোনরকমে সাইকেলটাকে দাঁড় করিয়ে উবু হয়ে বসল। লোকটির হাতটা নিয়ে নাড়ি পরীক্ষা করল। গাঁ-গঞ্জে ডাক্তার আর কোথায়? এইসব নাড়ি টেপা, পেটে জল ঢুকলে তা হাতের অল্প-অল্প চাপে বার করে দেওয়া ইত্যাদি ছোটখাট জ্ঞান সকলেরই আছে। চুনারামও সেই জ্ঞান প্রয়োগ করল। লোকটির ডান হাত তুলে নিল। নাহ্‌, এখনও ক্ষীণভাবে নাড়ি চলছে। নাকের সামনে হাত নিয়ে গিয়ে দেখল, নাক নয়, মুখ দিয়ে লোকটা আস্তে-আস্তে বাতাস ভরছে ফুসফুসে। জয় বাবা কালাদেও। তাহলে হয়ত এর অপরাধ তেমন গুরুতর নয়, সেজন্য কালাদেও একটি থাবা বসিয়ে মাথার খুলি ফাটিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু একেবারে প্রাণে মারেনি। তার মানে যদি চার্চ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে প্রাণে বেঁচে গেলেও যেতে পারে। কিন্তু একে নিয়ে যাবে কী করে সে। আশেপাশে হেল্প করার মতো কাউকে পেল না সে। সেই মহিলা এবং পুরুষটিকে যদি দেখতে পেত, তাহলে তাদের সাহায্য চাইত, কিন্তু এখন এখানে আহত অবস্থায় লোকটিকে ফেলে রেখে গেল অরক্ষিত দেখে কালাদেও যদি আবার ফিরে আসে, শেয়াল-কুকুরেরও তো সংখ্যা কম নয়! কী করবে সে? ভেবে পাচ্ছিল না!
ঠিক এইসময়েই মনে পড়ল, তার ফোনেই তো অনেক হোটেল, রিসর্টের ফোননাম্বার আছে। তাদের কাউকে ফোন করে সাহায্য চাওয়া যাক। কিন্তু যতটা সম্ভব দ্রুত। সে আর দেরি না করে ডায়াল করতে লাগল…। —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content