
মেঠো ইঁদুর। ছবি : সংগৃহীত।
কেউ বলে মেঠো, কেউ বলে ছুটকে ইঁদুর। সুন্দরবন অঞ্চলের জনবসতি এলাকায় ছোটখাটো আকারের এই মেঠো ইঁদুরও খুব বিরক্তিকর প্রাণী। ছোট আকারের এই ইঁদুরগুলো ধান, গম, ডাল ইত্যাদি শস্য খেয়ে চাষির প্রভূত ক্ষতি করে। ইংরেজিতে এদের বলে, ‘Little Indian field mouse’। আর তাই এদের ছোট মেঠো ইঁদুর বলাই যুক্তিযুক্ত হবে। তবে আমি ছোট করে কেবল মেঠো ইঁদুরই বলছি। এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Mus booduga’। এই ইঁদুরকে চেনে না এমন মানুষ সুন্দরবন অঞ্চলে খুব কমই আছে। শুধু জনবসতি অঞ্চল নয়, জঙ্গল এলাকাতেও এদের যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায়।
ছোট আকারের এই মেঠো ইঁদুর লম্বায় হয় মোটামুটি ৭ সেন্টিমিটার, আর লেজটা হয় প্রায় ৬ সেন্টিমিটার। এদের ওজন হয় ৯.৩ গ্রাম থেকে ১০.১ গ্রাম। এদের পিঠের দিকের রং হালকা বাদামি কিন্তু বেশ চকচকে লোম। পেটের দিকে রং ক্রমশ ফিকে হয়ে যায়। কখনও কখনও বুকের কাছে দেখা যায় হালকা বাদামি রঙের একটা ডোরা। লেজের রঙও বেশ অদ্ভুত। লেজের উপরের দিকের রং গাঢ় বাদামি কিন্তু নিচের দিকে রং দেহের মতোই ক্রমশ ফিকে হয়ে যায়। এদের মুখের সামনের দিকটা অন্যান্য ইঁদুরদের তুলনায় বেশি সূচালো। আর মাথার তুলনায় কান দুটো দেখে মনে হয় অপেক্ষাকৃত বড়। দুটো কানের কর্ণছত্রের আকার গোল। অন্যান্য ইঁদুরের থেকে এই মেঠো ইঁদুরকে পৃথকভাবে চিনে নেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল উপরের চোয়ালের সামনের দিকে অবস্থিত দুটি কৃন্তক দাঁত। দাঁত দুটো ভেতরের দিকে বেঁকে ঢুকে গিয়েছে যা অন্য ইঁদুরদের ক্ষেত্রে হয় না।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৮: কালো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৫ : শেষের খুব কাছে

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৫ : নিশীথে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৪ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৩
ভারতীয় মেঠো ইঁদুররা যে জনবসতি অঞ্চল ছাড়াও সুন্দরবনের জঙ্গলে থাকে তা আগে বলেছি। তবে গভীর জঙ্গল নয়, জনবসতি লাগোয়া জঙ্গল এলাকা। সুন্দরবনের অগভীর জলাশয় বা নোনা জলের জলাভূমির ধারে সাধারণত গর্ত খুঁড়ে তৈরি করা বাসায় থাকে। বাসার গর্ত খুব গভীর হয় না। আবার জলাভূমির তীরে যদি ঘন আগাছা পূর্ণ জঙ্গল থাকে তার মধ্যেও এরা বাসা বানায়। বিশেষ করে হোগলা গাছ আর নলখাগড়া গাছের জঙ্গল এদের বেশি পছন্দ। অনেক সময় ম্যানগ্রোভ গাছের ঘনভাবে বিন্যস্ত মূলের জালের ভিতরেও বাসা বাঁধে। যদি ভরা কটালে জোয়ারের জল বেড়ে গিয়ে গর্তে ঢুকে যায় তখন এরা উঁচু জায়গায় এইরকম মূলের জালের ভিতর আশ্রয় নেয়।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৯ : জলসাঘর—অস্তশিখর

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৭: আকাশ এখনও মেঘলা
এদের বাসায় থাকে দুটো কক্ষ—একটি কক্ষ বাচ্চা লালন-পালনের জন্য, আর একটি খাবার-দাবার সঞ্চয় করে রাখার জন্য। আর হ্যাঁ, অনেক সময় গর্তের মুখে নরম কাদা দিয়ে অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয় কারণ জোয়ারের জল যাতে গর্তে ঢুকে যেতে না পারে। জল নেমে গেলে আবার গর্তের মুখ খুলে দেয়।

ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে মেঠো ইঁদুর। ছবি : সংগৃহীত।
ভারতীয় মেঠো ইঁদুরদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে তেমন কোনও বাছ-বিচার নেই। তবে এদের খাবারের ৫০ শতাংশের বেশি হল উদ্ভিজ্জ খাদ্য। বাকি প্রায় ১৩ শতাংশ খাদ্য আসে মূলত চাল থেকে। আর ৪ শতাংশ খাদ্য আসে পোকামাকড় বা বিভিন্ন পতঙ্গের লার্ভা এবং জীবজন্তুর মৃতদেহ থেকে। জঙ্গল বা জনবসতি সংলগ্ন জঙ্গল এলাকায় অবশ্য ওদের খাদ্যের কিছু পরিবর্তন ঘটে। হোগলা, উলুখাগড়া আর নলখাগড়ার জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করে। কাকদ্বীপে আমার বাড়ির কাছাকাছি অনেক জায়গাতে এখনও নলখাগড়া ও হোগলার ঝোপ আছে। রাতে রাস্তা পেরিয়ে একদিকের ঝোপ থেকে অন্যদিকের ঝোপে দৌড়ে যেতে এদের প্রায়শই দেখি। অনেক সময় রাস্তার কুকুররাও দেখতে পেলে ওদের তাড়া করে দেখেছি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৭: রাজসূয়যজ্ঞ কী শুধু একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রদর্শনী? না স্বতঃস্ফূর্ত গণসমর্থনলাভের উদ্যোগ?

সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৩৮: নন্দিতা কৃপালনি— বিশ শতকের বিদুষী
মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস হল মেঠো ইঁদুরদের প্রজননের সময়। তবে চূড়ান্ত প্রজনন হয় জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে। অর্থাৎ বর্ষার সময়। একটি স্ত্রী মেঠো ইঁদুর একবারে ৫ থেকে ৬ টি বাচ্চার জন্ম দেয়। এদের গর্ভাবস্থায় স্থায়ী হয় প্রায় তিন সপ্তাহ অর্থাৎ এক বছরেই এরা অনেকবার বাচ্চার জন্ম দিতে পারে। আর তাই এদের সংখ্যাবৃদ্ধির হার অত্যন্ত বেশি। বাচ্চা মেঠো ইঁদুর কয়েক মাসের মধ্যেই যৌন ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা
এই মেঠো ইঁদুররা যথেষ্ট বুদ্ধিমান প্রাণী। অভিযোজন ক্ষমতাও দারুণ। দিনের বেলায় বাজপাখি, চিল, বিড়াল, দাঁড়াশ সাপ ইত্যাদি প্রাণীর শিকার হওয়ার খুব সম্ভাবনা থাকে, তাই এদের দিনের বেলা দেখাই যায় না। সন্ধের পরই এদের বাসা থেকে বাইরে বেরিয়ে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। ঋতু পরিবর্তনের এবং বাসস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে এরা খাদ্য তালিকায়ও রদবদল ঘটিয়ে দেয়। এদের বৃক্ক খুব ঘন মূত্র তৈরি করতে পারে। যেহেতু এরা লবণাক্ত এলাকায় থাকে এবং জল ও খাবারের মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ শরীরে আসে তাই তা বৃক্কের মাধ্যমে মূত্রের সাথে বার করে দিতে হয়। অতিরিক্ত লবণের উপস্থিতির কারণে এদের মূত্র হয় গাঢ়।

ধান সংগ্রহ করতে ব্যস্ত মেঠো ইঁদুর। ছবি : সংগৃহীত।
সুন্দরবন অঞ্চলে মেঠো ইঁদুরদের উপস্থিতি এতটাই বেশি যে এদের বিপন্নতার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে আছে বলে মনে হয় না। তাই আইইউসিএন এদের বিপন্নতার তালিকা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। কিন্তু তবুও সুন্দরবন অঞ্চলে এদের গুরুত্ব কম নয়। কারণ সুন্দরবন অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে বহু নিশাচর প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য হল এই মেঠো ইঁদুর। সুতরাং মেঠো ইঁদুর যতই চাষির কাছে অনাকাঙ্খিত প্রাণী হোক না কেন পরিবেশবিদদের কাছে এরা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















