কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : সংগৃহীত।

একবার অনেক পায়রা জালে ধরা পড়ল দানা খেতে গিয়ে। অসতর্ক অবস্থায় ফাঁদে আটকা পড়ে তারা প্রথমে ভয় পেয়ে ডানা ঝাপটাল খানিক, তারপর একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর সকলে মিলে আলোচনায় বসল। নেতার পরামর্শে তারা একটা পরিকল্পনা করল। ঠিক হল, জাল কেটে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় এখন নেই যখন, তখন জাল নিয়েই উড়ে যেতে হবে। এবার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে তারা উদ্যোগী হল। প্রথমে কিছু পায়রা ওড়ার জন্য চেষ্টা করল, কিন্তু এতো ভারি জাল নিয়ে আকাশে ওড়া এত অনায়াসে হয় নাকি? নেতা নির্দেশ দিল, “সকলে একসঙ্গে ওড়ার চেষ্টা কর।” এবার জাল নিয়েই তারা উড়তে পারলো, তবে বিপদ কাটল না। একটু উড়েই জালে জড়িয়ে পড়ে গেল। তারপর আবার চেষ্টা করল। আবারো। শেষে সকলে মিলে জাল নিয়ে উড়ে গেল আকাশে। তারপর জাল কেটে বেরিয়ে গেল। ব্যাধ ছুটে এল হায় হায় করতে করতে। কিন্তু তখন মুক্ত পায়রার ঝাঁক নীল আকাশের বুকে উড়াল দিয়েছে।
আজ ভারতবর্ষের আশিতম স্বাধীনতা দিবস। আটটি দশক ধরে স্বাধীন দেশ নিজের ভাবনায় চলছে। এই স্বাধীনতা কিংবা স্বাতন্ত্র্য নানারূপে কখনও ‘ফ্রিডম’, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’, ‘লিবার্টি’ কিংবা ‘লিবারেশন’, ‘ইম্যানসিপেশন” অথবা আরও কিছু। সব কিছুর মূলেই বন্ধন-মুক্তির প্রসঙ্গ আছে। এই বাঁধা-পড়া কখনও স্বেচ্ছায় কখনও অনিচ্ছায়। তাই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাতেও ইচ্ছা বা অনিচ্ছার প্রসঙ্গ থাকে। ওই পায়রাগুলো কায়মনোবাক্যে উড়তে চেয়েছিল।

রবার্ট ব্রুস আর মাকড়সার সেই গল্পটাও এরকম-ই। গুহার মসৃণ দেয়াল বেয়ে সফলভাবে উঠতে অনেক সময় লেগেছিল, কিন্তু চেষ্টা করে করে মাকড়সাটা শেষ পর্যন্ত গুহার ছাদে পৌঁছল। এই সাফল্য-ও এক স্বাধীনতার উদযাপন ও প্রেরণা। কিংবা সেই গল্পটা, যেখানে গৃহপালিত কুকুর আর বনের বাঘের দেখা হয়েছিল। পেটে খিদে নিয়ে বনে ফিরে গিয়েছিল, কুকুরের চকচকে আভিজাত্যের নীচে সযত্নে লুকিয়ে রাখা বকলসের গভীর দগদগে দাগটা দেখে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৯ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ২

উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৭: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৭

শ্রদ্ধাঞ্জলি : বাইশে শ্রাবণ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬২: ছুঁচো

স্বাধীনতা কেবল ভূমিকেন্দ্রিক একটি অধিকার বা দাবি নয়। কথায়, কাজে, মনে, মুখে, হৃদয়ে, মস্তিষ্কে, চলায়, যাপনে অর্জন করা, রক্ষা করে চলা একটি কর্তব্য। এই কর্তব্যের বোধ অন্তর থেকে জেগে না উঠলে স্বাধীনতা কেবল একটি আভিধানিক শব্দ, তত্ত্বমাত্র। যোগক্ষেমের পথে অলব্ধের লাভ যেমন কষ্টার্জিত বটে, তবে যাকে পাওয়া গেল, তাকে রক্ষা করা, ধরে রাখা অনেক বেশি কঠিন। তারপরেও অনেক পথ চলা বাকি থাকে, থাকে অর্জিতের সার্বিক পুষ্টি কিংবা যোগ্য নেতৃত্বে পথচলায় ভাবী সুরক্ষার কথা।

একবার বনের পশুপাখিরা কী একটা শব্দ শুনে ভেবেছিল যে পৃথিবী ধ্বংস হতে চলেছে। তারা হুড়মুড়িয়ে ছুটেছিল উদ্ভ্রান্ত হয়ে। তাদের পথ রোধ করে দাঁড়াল বনের রাজা সিংহ। পৃথিবী ধ্বংস হতে চললে পালিয়ে বাঁচার পথ থাকে? তাহলে যে মুক্তির জন্য ছুটেছে তারা, তা তো অলীক!
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭২: কামোদ্দীপক প্ররোচনা ও রাবণের পরস্ত্রী-অপহরণের লোলুপতা আজও অব্যাহত

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

সঙ্কটের কল্পনাতে হয়ো না ম্রিয়মাণ! প্রভু বিশ্ববিপদহন্তা! তুমি দাঁড়াও রুধিয়া পন্থা! মুক্তির ধারণাটি ভারতীয় আস্তিক্যবাদী দর্শনে সুপ্রাচীন। এই মর-দেহ, মর্ত্য জগত্, অহংবোধক্লিষ্ট অজ্ঞান, জীবন—মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়ে স্ব-ভাবে, সংকীর্ণ আমিত্ব থেকে বৃহৎ ‘আমি’তে, ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে উত্তীর্ণ হওয়ার তত্ত্ব ও প্রয়োগটি যুগে যুগে কালে কালে তার সুর ও তাল-কে অবিচ্ছিন্ন রেখেছে।

যে পশুরাজ সিংহটি একদিন পথরোধ করে বিভ্রান্ত সমাজকে নিয়ন্ত্রিত করেছিল, তারই বিশ্রামের অবসরে একদিন বিঘ্ন ঘটাল এক নেংটি ইঁদুর। মুক্ত যাপনের আনন্দে ঢুকে পড়েছিল সিংহের নাকের গুহায়। তার এমন কাজ অনিচ্ছাকৃত ছিল বলেই সিংহ তার প্রাণভিক্ষা দিল। এরপর কী হয়েছিল তা সুবিদিত। একদিন সিংহটি যখন ফাঁদে পড়ল, পরাধীন হল, সেদিন ওই নেংটি ইঁদুর তার ক্ষুরধার দাঁতে অনায়াসে জাল কেটে মুক্তি দিয়েছিল সিংহকে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৯ : নুনিয়ার টান

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা

জাতীয়তাবোধ, উত্তরাধুনিক বিশ্বের সম্ভাবনা ও সঙ্কটের মাঝে ব্যক্তি থেকে সমাজ অথবা রাষ্ট্র—স্বাতন্ত্র্য রক্ষার স্বাধীনচেতনায় উদ্ভাসিত হয়েছে। “স্বাধীনতা”র ধারণা ব্যক্তির অধিকার-অন্ধকারের ক্ষেত্র থেকে সামাজিক দর্শন, রাষ্ট্রজীবন—সর্বত্রই নিয়মনিষ্ঠ অথচ মুক্ত পরিসরের ব্যঞ্জনা বহন করে। আজকের ‘স্বাধীনতার’ দর্শনে স্বাধীনচেতা মানুষ সামাজিক পরিসরে কথা বলার, চিন্তা করার, তাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার, সার্বিকভাবে যেকোনো নেতি-র বিপরীতে ইতিবাচক ভাবধারার প্রতি অনুগত থাকতে চায়। বাকস্বাধীনতা থেকে নারীস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে মানবমুক্তি—আজকের স্বাধীনতা ব্যক্তি-দেশ-বিশ্বকে ঐক্যের বন্ধনে বাঁধার প্রেরণা দেয়। তবে স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচার নয়, স্বৈরাচার নয়, আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থনিষ্ঠ নয়। তাই স্বাধীনতা ও দেশের প্রেক্ষাপটে ‘ব্যক্তি’ নাগরিক হয়ে একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা, আদর্শ, পতাকাকে ঘিরে তার স্বপ্নকে লালন করে, সাকার করতে চায়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

তবুও “মহামানবের সাগরতীর” যে “বিবিধের মাঝে মহান মিলনের” মহতী চেতনায় আলোড়িত হয়েছে কালে কালে, যে সার্বিক স্বাধীনতা ও অধিকারের ভাবনায় জারিত হয়েছে, সেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কিংবা বোধের উন্মেষ থেকে সাফল্য বোধহয় একান্তই মানুষের, নাগরিকের ইচ্ছাধীন। সেই জালে পড়া পায়রাগুলি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল তখন-ই যখন তারা সংগচ্ছধ্বম্ – একসাথে চলার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল। সেই চেতনা এসেছিল আত্মজাগরণের পথে। “উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত” এই মহাবাণীর প্রেরণা তাই ব্যাপক, সর্বজনীন। মানসিক দৈন্যমুক্ত সেই উদার ও মহৎ স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য-ই আজকের দেশ ও নাগরিকের অভিজ্ঞান হয়ে উঠুক, স্বাধীনতাদিবসের পুণ্যলগ্নে এটিই আশা করা যায়।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content