
কেউটের ফণার নিচের দিক। ছবি : সংগৃহীত।
সাপ! নামটা শুনলেই বেশিরভাগ মানুষের গা শিউরে ওঠে, আর রাতের বেলা সাপের কথা উঠলে তো কথাই নেই! বেশিরভাগ মানুষের শিরদাঁড়া দিয়ে আতঙ্কের ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। অনেকে তো ‘সাপ’ শব্দটাই রাত্রিবেলা উচ্চারণ করতে চায় না। সুন্দরবন অঞ্চলে এই কথাটা আরও বেশি করে প্রযোজ্য। কারণ, সুন্দরবনের নায়ক যদি হয় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার তবে সুন্দরবনবাসীর চোখে ভিলেন হল সাপ। সুন্দরবন অঞ্চলে সাপ নিয়ে যত গুজব আর কুসংস্কার আছে অন্য কোনও প্রাণীকে নিয়ে নেই। এই সব গুজবের স্রষ্টা যদি হয় ওঝা ও গুনিনরা তবে সুন্দরবন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ হল তার প্রধান প্রচারক। আর এর ফলশ্রুতি হল প্রতি বছর সুন্দরবন অঞ্চলে অসংখ্য মানুষ সর্পদংশনে প্রাণ হারায়। কিন্তু সত্যিই কি সুন্দরবন অঞ্চলে সাপ মানেই ভয়ানক বিপদ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সুন্দরবন অঞ্চলের সাপদের নিয়ে আগে তথ্যনিষ্ঠ আলোচনা করতে হবে। জানতে হবে সুন্দরবন অঞ্চলে কত ধরনের সাপ পাওয়া যায় এবং তাদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী। সুন্দরবনের সরকারি জীববৈচিত্র্য নথি অনুযায়ী সুন্দরবনের সাপের প্রজাতির সংখ্যা ৪১টি হলেও আমি অবশ্য সাকুল্যে ২৩-২৪টি প্রজাতির সাপ চিনি।
সুন্দরবনের সাপকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়— এক, তীব্র বিষসম্পন্ন সাপ, দুই: ক্ষীণ বিষসম্পন্ন সাপ এবং তিন: বিষহীন সাপ। আবার প্রত্যেকটি শ্রেণিকে তাদের বাসস্থান অনুসারে স্থলের সাপ ও জলের সাপ হিসেবে ভাগ করা যায়। স্থলের সাপ আবার গর্তবাসী ও বৃক্ষবাসী হতে পারে। একইভাবে জলের সাপও স্বাদু জলের ও নোনা জলের হতে পারে। সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষ মূলত স্থলভাগের সাপ নিয়েই বেশি চর্চা করে কারণ তারা এই সাপগুলির সঙ্গেই অধিকাংশ সময় মুখোমুখি হয়। সুন্দরবন অঞ্চলের স্থলভাগে বহুল পরিচিত সাপগুলির মধ্যে বিষধর সাপ হল কেউটে, গোখরো, কালাচ, শঙ্খচূড়, শাঁখামুটি, চন্দ্রবোড়া ও গেছোবোড়া। ক্ষীণ বিষসম্পন্ন সাপগুলির মধ্যে সুন্দরবন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য হল মেটেলি, লাউডগা, কাঁড়, কালনাগিনী। আর বিষহীন সাপদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দাঁড়াশ, ঘরচিতি, হেলে, তুতুর, পুঁয়ে, বেত আছড়া, অজগর, জলঢোঁড়া ইত্যাদি।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬২: ছুঁচো

উপন্যাস, পর্ব-৮8 : আকাশ এখনও মেঘলা

মানুষকে দেখি গণদেবতার বেশে…

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮১: সীমান্ত-সংঘাত
তবে এত প্রকার সাপের মধ্যে সুন্দরবনে সাপের রাজা হল কেউটে। সুন্দরবন অঞ্চলে এলাকাভেদে একই সাপ একাধিক নামে পরিচিত। এমনকি একটি এলাকাতেও একই সাপকে মানুষ বিভিন্ন নামে চেনে। এর ফলে সুন্দরবন অঞ্চলে সাপ নিয়ে চর্চা করতে গিয়ে অনেকেই প্রাথমিকভাবে ধাক্কা খান। সুন্দরবন অঞ্চলে কেউটে সাপও বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন কোথাও কেবল কেউটে, কোথাও কালকেউটে, কোথাও পদ্মকেউটে, কোথাও গেঁড়াভাঙা কেউটে, আবার কোথাও আল কেউটে। কেউটের ভয়ংকর বিষের জন্য এবং আক্রমণের সময় দৃশ্যত ভয়াবহতার জন্য অনেকের মুখে তা কালকেউটে। আবার ফণায় চক্রের মতো চিহ্নটিকে কল্পনার রঙে মিশিয়ে মানুষ পদ্মফুলের সাথে তুলনা করে নাম দিয়েছে পদ্মকেউটে। সুন্দরবনের শামুকের আঞ্চলিক নাম হল গেঁড়া। আর কেউটে সাপ শামুক খেতে খুবই পছন্দ করে। তাই অনেকের কাছে গেঁড়া কেউটে নামেও পরিচিত। জমির আলে ইঁদুরের গর্তের মধ্যে এদের বাসা। রাত্রিবেলায় খাবারের খোঁজে এরা প্রায়শই আলে ঘাসবনের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে। তাই মানুষের মুখে এরা আল কেউটে নামেও পরিচিতি পেয়েছে।
আরও পড়ুন:

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
কেউটে সাপকে ইংরেজিতে বলে ইন্ডিয়ান কোবরা। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Naja naja kaouthia’। সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলে যেমন কেউটে উপস্থিত তেমনই সুন্দরবনের জনবসতি অঞ্চলেও প্রচুর পরিমাণে কেউটে সাপের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই কেউটে সাপ চেনেন। এই সাপ চেনার প্রধান উপায় হল ফণার ওপরে বিশেষ ধরনের দাগ। গোখরো সাপের সঙ্গে কেউটের পার্থক্য বোঝা যায় ওই দাগ দেখেই। কেউটে সাপের ফণায় থাকে একটা গোলাকার বা বরফির মতো দাগ। গোলাকার বা বরফির মতো এই দাগটির ভিতরে থাকে একটা কালো গোলাকার বা ডিম্বাকার দাগ। তার বাইরে থাকে সাদা বা ধূসর রঙের দাগ। আর তারও বাইরে থাকে কালো রঙের সরু সীমানা নির্দেশক দাগ। অনেক সময় সাদা দাগের মধ্যে উপর-নিচে দুটি বা ডাইনে-বামে দুটি কিংবা বৃত্তাকারে বিন্যস্ত একাধিক কালো বিন্দু দেখা যায়। কখনও কখনও ফণা দাগবিহীনও হয়। তবে ফণার নিচের অংশে দুপাশে থাকে দুটো কালো দাগ। আর ওই দুটো দাগের বাইরের দিকের প্রান্তে থাকে সাদা রঙের রেখা। কালো দুটো দাগের নিচে গলার কাছে থাকে আড়াআড়ি এক বা একাধিক কালো পটি (band)।

কেউটে। ছবি : সংগৃহীত।
ইন্ডিয়ান কোবরার গায়ের রং হয় সাধারণত কালচে। তবে গাঢ় ছাই রঙের বা খয়রি রঙের বা হলদেটে ধূসর রঙেরও হতে পারে। কেউটের সারা গা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য সাদা-কালো চেক চেক অর্থাৎ মোজাইকের মতো ফুটকি দাগ। অবশ্য কখনও কখনও চেক দাগবিহীন কুচকুচে কালো রঙের কেউটে সাপ সুন্দরবন অঞ্চলে দেখা যায়। স্থানীয় লোক এদের কালকেউটে বলে। আমি নিজে ২-৩ বার এই ধরনের সাপ দেখেছি এবং তাদের আকার তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বড়ো। বয়স বেশি হলে রং বেশি কালচে হয়ে যায় কিনা আমার জানা নেই। অবশ্য শীতঘুমে থাকাকালীন কিংবা খোলস ত্যাগের পর এদের রঙের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে। কেউটে সাপের লেজ নলাকার কিন্তু লেজের আগার দিকটা হয় বেশ কিছুটা চাপা। কেউটে সাপ যেহেতু সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী তাই এদের ত্বকে রয়েছে শুকনো আঁশ। কেউটে সাপের দেহে আঁশগুলি ১৫ থেকে ২০টি সারিতে তির্যকভাবে বিন্যস্ত থাকে। তবে লেজের কাছে থাকে দুটি সারি। কেউটে সাপের ঠোঁটের তিন নম্বর আঁশ চোখ ও নাকের আঁশ স্পর্শ করে থাকে। তবে এটা শুধু কেউটে নয়, গোখরো, শঙ্খচূড় ইত্যাদি সাপের ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা যায়।
সুন্দরবনের সাপদের মধ্যে গোখরো আর কেউটে প্রচন্ড সতর্ক এবং রাগী সাপ। বিপদের সামান্যতম আঁচ পেলেই এরা ফোঁস ফোঁস করে এবং ফণা তুলে খাড়া হয়ে যায়। কখনও কখনও দেখা যায় যে কেউটে তার দেহের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত খাড়া করে ফেলেছে। অনেক সময় দেখা গেছে যে তার চলার পথে কোনও বাধা পেয়ে সেখানেই ছোবল বসিয়ে দিয়েছে।
সুন্দরবনের সাপদের মধ্যে গোখরো আর কেউটে প্রচন্ড সতর্ক এবং রাগী সাপ। বিপদের সামান্যতম আঁচ পেলেই এরা ফোঁস ফোঁস করে এবং ফণা তুলে খাড়া হয়ে যায়। কখনও কখনও দেখা যায় যে কেউটে তার দেহের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত খাড়া করে ফেলেছে। অনেক সময় দেখা গেছে যে তার চলার পথে কোনও বাধা পেয়ে সেখানেই ছোবল বসিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১০ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৩

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা
এরা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় থাকতে পছন্দ করে। আর তাই সুন্দরবনের জনবসতি এলাকায় জলাশয়ের আশেপাশে বা ধানজমির আলে এদের উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করা যায়। এরা নির্জন এলাকায় ঝোপেঝাড়ে ও আলো-আঁধারিপূর্ণ জায়গা থাকার জন্য বেছে নেয়। মানুষের উপস্থিতি এরা একদম পছন্দ করে না। তাই যেসব এলাকায় মানুষের যাতায়াত বেশি সেই সব জায়গা এরা এড়িয়ে চলে। এরা গর্তে থাকে। সাধারণত সন্ধের পর এরা খাবারের খোঁজে বের হয়। আর তাই কেউটের দংশন সবথেকে বেশি হয় সন্ধ্যাবেলা। এদের প্রধান খাদ্য হল ইঁদুর, ব্যাঙ, মাছ, শামুক ও গুগলি। বর্ষাকালে সুন্দরবনের বসতি এলাকায় মাছ ধরার জন্য আলে বা বাঁধে নালা তৈরি করে সেখানে আটল বা মুগরি বা বাঁকি বসানো হয়। আমার কৈশোরকালে এ ছিল ভয়ঙ্কর নেশা।
অনেক সময় সেই আটল বা মুগরি বা বাঁকির মধ্যে মাছ খেতে ঢুকে কেউটে সাপ বন্দী হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে দু’বার এমন ঘটনা ঘটেছিল। অনেক সময় মাছ ধরার জন্য খালে বিলে ফুটজাল পাতা হয়। সেখানেও অনেক সময় কেউটে সাপ আটকে যায়। এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে সেই সাপ মেরে জাল কেটে বার করতে হয়। এরা সুন্দরভাবে দাঁত দিয়ে খোলাটিকে ভেঙে শামুক ও গুগলির ভিতর থেকে মাংসল অংশ বার করে নিতে পারে। এই কারণে অনেক জায়গায় গুগলি ও শামুকের ভাঙা খোল স্তূপাকারে জড়ো হয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক সময় এই স্তূপের উপর কেউটে সাপকে ইঁদুর শিকার করার প্রতীক্ষায় পাকিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।
অনেক সময় সেই আটল বা মুগরি বা বাঁকির মধ্যে মাছ খেতে ঢুকে কেউটে সাপ বন্দী হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে দু’বার এমন ঘটনা ঘটেছিল। অনেক সময় মাছ ধরার জন্য খালে বিলে ফুটজাল পাতা হয়। সেখানেও অনেক সময় কেউটে সাপ আটকে যায়। এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে সেই সাপ মেরে জাল কেটে বার করতে হয়। এরা সুন্দরভাবে দাঁত দিয়ে খোলাটিকে ভেঙে শামুক ও গুগলির ভিতর থেকে মাংসল অংশ বার করে নিতে পারে। এই কারণে অনেক জায়গায় গুগলি ও শামুকের ভাঙা খোল স্তূপাকারে জড়ো হয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক সময় এই স্তূপের উপর কেউটে সাপকে ইঁদুর শিকার করার প্রতীক্ষায় পাকিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭২: কামোদ্দীপক প্ররোচনা ও রাবণের পরস্ত্রী-অপহরণের লোলুপতা আজও অব্যাহত
প্রায় প্রতি বছর সুন্দরবনে বর্ষাকালে যেমন অত্যধিক বর্ষায় মাঠঘাট ডুবে যায় তেমনই জলোচ্ছ্বাসে বা বন্যায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়। তখন কেউটের থাকার জায়গার অভাব হয়। ফলে তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও জনবসতির কাছাকাছি অর্থাৎ উঁচু জায়গায় চলে আসতে বাধ্য হয়। আর তখনই কেউটের দংশনে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৮ সালে বন্যার পর আমাদের এলাকায় কেউটে ও গোখরো সাপের উপদ্রব প্রচন্ড বেড়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিক বাসস্থান হারিয়ে তখন ওরা মানুষের বাড়ির দেওয়ালের ফাটলে, গোলা ঘরের নিচে, গোয়াল ঘরে বা হাঁস মুরগির ঘরে আশ্রয় নেয়। অনেক সময় ইঁদুরের খোঁজে গৃহস্থের রান্নাঘরে ঢাকনাবিহীন হাঁড়ি কলসির মধ্যেও আশ্রয় নেয়। আর গৃহস্থ বা বাড়ির সদস্যরা অজান্তে সেই হাঁড়ি কলসির মধ্যে হাত দিয়ে কেউটের দংশন খায়। সুন্দরবন অঞ্চলে এমন ঘটনা আকছার ঘটে। অনেক সময় এরা গাছের কোটরে বা খড়ের গাদার ভেতরেও আশ্রয় নেয়। শৈশব ও কৈশোরে দেখেছি গাদা থেকে গোরুর জন্য খড় আনতে গিয়ে কিংবা গাছের কোটর থেকে পাখির ডিম বা বাচ্চা বার করতে গিয়ে অনেককে কেউটের ছোবল খেতে।
কেউটের বিষ হল নিউরোটক্সিক অর্থাৎ এই বিষ স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। ফলে স্নায়ুতন্ত্র বিকল হয়ে দংশিত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। কেউটের ১২ মিলিগ্রাম বিষ একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম। অন্যান্য বিষধর সাপের মতো কেউটে সাপেরও দুটি বিষথলি থাকে। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের তুলনায় শীতকালে বিষের পরিমাণ থাকে কম। তাই শীতকালে কেউটের দংশনে মৃত্যুর হারও হয় কম। পরিমাণমতো বিষ ঢালতে না পারলে মৃত্যু ঘটে না।
কেউটের বিষ হল নিউরোটক্সিক অর্থাৎ এই বিষ স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। ফলে স্নায়ুতন্ত্র বিকল হয়ে দংশিত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। কেউটের ১২ মিলিগ্রাম বিষ একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম। অন্যান্য বিষধর সাপের মতো কেউটে সাপেরও দুটি বিষথলি থাকে। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের তুলনায় শীতকালে বিষের পরিমাণ থাকে কম। তাই শীতকালে কেউটের দংশনে মৃত্যুর হারও হয় কম। পরিমাণমতো বিষ ঢালতে না পারলে মৃত্যু ঘটে না।

কালকেউটে। ছবি : সংগৃহীত।
কেউটে সাপের বাচ্চা ডিম ফুটে বেরোনোর প্রায় এক বছর পর যৌনক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। স্ত্রী কেউটের ফণা পুরুষ কেউটের থেকে সামান্য ছোট হয়। আকৃতি দেখে তাই কেউটের স্ত্রী-পুরুষ নির্ণয় সম্ভব। জুন-জুলাই মাস হল এদের যৌন মিলনের জন্য আদর্শ সময়। পুরুষ কেউটে ঘ্রাণশক্তি দিয়ে স্ত্রী কেউটের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে কারণ প্রজনন ঋতুতে স্ত্রী কেউটে তার দেহ থেকে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ক্ষরণ করে তার আশেপাশে ছড়িয়ে রাখে যাতে পুরুষ কেউটে সেই গন্ধ অনুসরণ করতে পারে। অন্যান্য সাপের ক্ষেত্রেও এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। স্ত্রী কেউটে যৌন মিলনের পর পুরুষের শুক্রাণু বেশ কিছুদিন সঞ্চয় করে রাখতে পারে। ফলে একাধিকবার ডিম পাড়ার জন্য আর যৌন মিলনের প্রয়োজন হয় না। যৌন মিলনের ৬০-৭০ দিন পর স্ত্রী কেউটে ডিম পাড়ে। যে গর্তে সে থাকে তার মুখের কাছে সে একটি ছোট গর্ত বানিয়ে সেখানেই ডিম পাড়ে।
সুন্দরবন এলাকার মানুষজন এই ছোট গর্তকে বলে সাপের হাঁড়ি। এক এক বারে স্ত্রী কেউটে ১৬ থেকে ৪০টি ডিম পাড়ে। সাদা রঙের ডিমগুলির খোলা হয় খুব নরম। সদ্যনির্গত ডিমগুলিতে সামান্য চাপ দিলে চুপসে যায়। ডিমগুলি আবার একটার সঙ্গে আরেকটা হালকাভাবে জুড়ে থাকে। ডিমের বয়স বাড়লে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শুষে নিয়ে প্রতিটি ডিমের আয়তন কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সাপ ডিমে তা দেয় না। ৫৮ থেকে ৬০ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। সদ্যনির্গত কেউটের বাচ্চার দৈর্ঘ্য হয় ২ সেমির মতো। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সুন্দরবন অঞ্চলে তাই ছোট ছোট কেউটের বাচ্চার সংখ্যা খুব বেড়ে যায়। কোনও শিশু প্রচন্ড রাগী হলে তাকে সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষ অনেক সময় বলে “কেউটের বাচ্চার মতো তেজ”! কথাটা খুব ভুল নয়। কেউটের বাচ্চা বিষদাঁত ও বিষথলি নিয়েই জন্মায়। ফলে পূর্ণবয়স্ক কেউটের পাশাপাশি খুদে কেউটেও সমান বিপজ্জনক। তাই কেউটের দংশন এড়াতে হলে সন্ধ্যেবেলা মাঠে-ঘাটে যেমন যাওয়া উচিত নয় তেমনি হাতে টর্চ নিয়ে চলাফেরা করা উচিত। আর শেষ পর্যন্ত যদি কাউকে কেউটে দংশন করে তাহলে কাল বিলম্ব না করে যত শীঘ্র সম্ভব নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং প্রতিষেধক ইনজেকশন দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
বিষের উপস্থিতির জন্য কেউটে সাপ বিপজ্জনক হলেও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে এই সাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। তাই এই সাপকে হত্যা না করে এদের দংশন এড়ানোর প্রতি আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত।—চলবে।
সুন্দরবন এলাকার মানুষজন এই ছোট গর্তকে বলে সাপের হাঁড়ি। এক এক বারে স্ত্রী কেউটে ১৬ থেকে ৪০টি ডিম পাড়ে। সাদা রঙের ডিমগুলির খোলা হয় খুব নরম। সদ্যনির্গত ডিমগুলিতে সামান্য চাপ দিলে চুপসে যায়। ডিমগুলি আবার একটার সঙ্গে আরেকটা হালকাভাবে জুড়ে থাকে। ডিমের বয়স বাড়লে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শুষে নিয়ে প্রতিটি ডিমের আয়তন কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সাপ ডিমে তা দেয় না। ৫৮ থেকে ৬০ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। সদ্যনির্গত কেউটের বাচ্চার দৈর্ঘ্য হয় ২ সেমির মতো। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সুন্দরবন অঞ্চলে তাই ছোট ছোট কেউটের বাচ্চার সংখ্যা খুব বেড়ে যায়। কোনও শিশু প্রচন্ড রাগী হলে তাকে সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষ অনেক সময় বলে “কেউটের বাচ্চার মতো তেজ”! কথাটা খুব ভুল নয়। কেউটের বাচ্চা বিষদাঁত ও বিষথলি নিয়েই জন্মায়। ফলে পূর্ণবয়স্ক কেউটের পাশাপাশি খুদে কেউটেও সমান বিপজ্জনক। তাই কেউটের দংশন এড়াতে হলে সন্ধ্যেবেলা মাঠে-ঘাটে যেমন যাওয়া উচিত নয় তেমনি হাতে টর্চ নিয়ে চলাফেরা করা উচিত। আর শেষ পর্যন্ত যদি কাউকে কেউটে দংশন করে তাহলে কাল বিলম্ব না করে যত শীঘ্র সম্ভব নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং প্রতিষেধক ইনজেকশন দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
বিষের উপস্থিতির জন্য কেউটে সাপ বিপজ্জনক হলেও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে এই সাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। তাই এই সাপকে হত্যা না করে এদের দংশন এড়ানোর প্রতি আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















