কলকাতায় বৃষ্টি

গোখরো সাপের ফণার নিচের দিক। ছবি : সংগৃহীত।

১৯৭৮ সালে এক ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল দক্ষিণবঙ্গে। সুন্দরবন অঞ্চলেও হয়েছিল। কোনও কোনও জায়গা অবশ্য অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল। তার মধ্যে ছিল আমাদের গ্রামের বেশ কিছুটা অংশ। গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে ছিল আমাদের বাড়ি। আর বাড়ির অদূরে বেশ গভীর ও নাব্য একটা খাল ছিল যা অতীতে ছিল সম্ভবত নদী। খালের ওপারেই ছিল অন্য গ্রাম। বন্যায় ওই গ্রাম ডুবে গিয়েছিল। বন্যার জল ওই গ্রাম ডুবিয়ে এসে পড়েছিল আমাদের বাড়ির সামনের ওই খালে। বলা যেতে পারে কোনওক্রমে রক্ষা পাই আমরা।
কয়েকদিন পর বন্যার জল নেমে যেতে এক প্রতিবেশী কাকু বাবাকে এসে বলল যে তাদের বাড়ি সংলগ্ন বাজবরণ গাছের ঝোপের কাছে প্রচন্ড জোরে ফোঁসফোঁস আওয়াজ শুনেছে। বাবাকে বলার কারণ, আমাদের পাড়ায় সর্পবিশারদ হিসেবে বাবার খ্যাতি ছিল। সুন্দরবন এলাকায় সমস্ত ধরনের বিষধর ও নির্বিষ সাপ বাবা চিনত। তাছাড়া বাবা ছিল অসমসাহসী। বিষধর সাপ তা যত বড়ই হোক না কেন তাকে মারা বাবার কাছে ছিল আক্ষরিক অর্থে ‘বাম হাতের খেল’! আমাদের বাড়িতে দরজার কোণে রাখা থাকত একটা লম্বা, সমব্যাসযুক্ত এবং সোজা হেতাল ডান্ডা। বিষধর সাপ মারার জন্য ওটাই ছিল বাবার অস্ত্র। যত বড় সাপ হোক না কেন এক ঘায়েতেই ঠান্ড! সাপ জলে নেমে গেলেও বাবার হাতে নিস্তার ছিল না। বাবার খপ্পর থেকে বিষধর সাপ পালিয়েছে এমন ঘটনা খুব কম ঘটেছে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৩: কেউটে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮২: ডাবল ধামাকা

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৪৮: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৮

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

একটা প্রচলিত কুসংস্কার তখনও ছিল, এখনও আছে, তা হল সাপকে আঘাত করলে সে মনে রাখে এবং ফিরে এসে কখনও না কখনও আঘাতকারীকে কামড়ায়। সাপের মস্তিষ্ক এত অনুন্নত ও ছোট যে আঘাতকারীকে মনে রাখা কখনওই সম্ভব নয়। সেই সত্তরের দশকেই বাবা এইসব কুসংস্কার বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ছিল। আর তাই সাপ নিয়ে বাবার অযৌক্তিক ভয়ডর কখনওই ছিল না। এই কারণে পাড়ার লোকজন বাবার কাছে এসে সাপের খবরাখবর দিত। খবর পেয়েই বাবা সেই হেতাল ডান্ডা নিয়ে হাজির হল বাজবরণ গাছের ঝোপের কাছে। ঝোপের ভিতরে ছিল অসংখ্য বড় বড় গর্ত। ইঁদুরের গর্তই হবে। বাবা গর্তের ভিতর হেতাল ডান্ডা কিছুটা ঢুকিয়ে দিল। কিন্তু ইঁদুর গর্ত তো আঁকাবাঁকা ফলে ডান্ডা বেশি দূর গেল না। এরপর বাবার পরামর্শে গর্তের মুখে জল ঢালা হল। কিন্তু তাতেও কোনও সাড়াশব্দ নেই।
কলকাতায় বৃষ্টি

ফণা তুলে উদ্যত গোখরো। ছবি : সংগৃহীত।

এবার গর্তের মুখে খড় জ্বালিয়ে তাপ ও ধোঁয়া তৈরি করা হল। এইবার ভিতর থেকে শব্দ ভেসে এল। বেশ জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ার মতো শব্দ। বাবা বলল, ও এখন বাইরে আসবে না। একমাত্র খিদে পেলেই আসবে। নিশ্চিতভাবে বন্যায় ভেসে এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। যদি জঙ্গল থেকে এসে থাকে অজগর বা পাইথন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাবা বলল, ওকে টোপ দিয়ে ধরতে হবে। বাবার পরামর্শে সেদিন এলাকা থেকে খুঁজে পাড়ার কয়েকজন কয়েকটা সোনা ব্যাঙ ধরেছিল। তারপর সেই সব ব্যাঙের পিঠে শোল মাছ ধরার বড় বড় বঁড়শি মোটা সুতো বেঁধে গেঁথে দেওয়া হল আর তারপর সেই ব্যাঙকে গর্তের মুখে একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হল। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। রাত্রি ন’টা নাগাদ পাড়ার কয়েকজন দৌড়ে এসে বাবাকে বলল, দাদা বিশাল একখানা সাপ বঁড়শিতে আটকেছে। বাবা অমনি হেতাল ডান্ডা নিয়ে ছুটল। পিছন পিছন আমিও। তারপর সাপের কী পরিণতি হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সাপটা লম্বায় ছিল প্রায় ৫-৬ ফুট। বাবা বলেছিল এ হল বিশাল গোখরো বা তঁপ সাপ।
আরও পড়ুন:

সংস্কৃত দিবস

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

গোখরা সাপ চেনা যায় কী করে? ফণা দেখে। ফণার ওপরে থাকে গোরুর খুরের মতো বা চশমার মতো দাগ। তাই এই সাপের বাংলায় নাম হয়েছে গোখরো, আর ইংরেজিতে ‘Spectacled Cobra’ বা ‘Binocelate Cobra’। ইংরেজিতে অবশ্য ‘Common Cobr’ নামটাই বেশি প্রচলিত। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Naja naja’। এই বিজ্ঞানসম্মত নাম কেউটেরও। তবে কেউটে হল গোখরোর একটি অন্য উপপ্রজাতি। সুন্দরবন অঞ্চলে এলাকাভেদে মানুষ এই সাপকে তঁপ বা খরিশ বলেও চেনে। এদের গলা ও মাথা প্রায় সমব্যাসযুক্ত হয়। যখন ফণা তোলে না তখন মাথা ও গলা পৃথক করা মুশকিল। গলার দু’পাশের চামড়া প্রসারিত হয়ে ফণা তৈরি করে। ফণার নিচে দু’ধারে কেউটে সাপের মতো এদেরও দুটো গোলাকার কালো দাগ থাকে। এছাড়া অস্পষ্ট তিনটে কালো দাগও থাকে। তবে অঞ্চলভেদে এদের ফণার নিচের দাগ বা গায়ের রঙের ভিন্নতা দেখা যায়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৩: চেদিরাজ শিশুপালের কৃষ্ণবিদ্বেষ কি কৃষ্ণেরই কোন পরিকল্পিত ইচ্ছার প্রকাশ?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা

এদের ঘাড়ের নিচে একটা সাদা ব্যান্ড দেখা যায়। তবে সমস্ত গোখরোর গলার নিচে আড়াআড়ি তিনটে কালো দাগ একেবারে স্পষ্ট দেখা যায়। ফণা এবং গলার নিচের কালো দাগ দেখে গোখরা সাপকে সহজে শনাক্ত করা যায়। এদের গায়ের রঙ হয় বাদামি, কালচে বাদামি লালচে বাদামি বা হলুদাভ বাদামি। যখন এরা শীতঘুমে থাকে না তখন এদের গায়ের রঙ হয় কালচে বা লালচে বাদামি। কিন্তু শীতঘুমের সময় হয় হলুদাভ বাদামি। কখনও কখনও এদের সারা শরীর জুড়ে ফুটকির মতো দাগ থাকে, আবার কখনও থাকে চেক চেক দাগ। ঘাড়ের পর থেকে লেজ পর্যন্ত ইংরেজি ‘V’ আকৃতির দাগ থাকে। এদের পায়ুর ছিদ্রের পেছনে লেজের নিচের আঁশগুলো আড়াআড়ি দুটি সারিতে সজ্জিত থাকে। একটি পরিণত গোখরো লম্বায় ৩-৪ ফুট হয়। তবে ছ’ফুট পর্যন্ত লম্বা হতেও দেখা গেছে। পুরুষ গোখরো স্ত্রী গোখরোর থেকে আকারে লম্বা ও ভারী হয়। পুরুষের ফণাও হয় বেশি চওড়া। আবার পুরুষের বিষথলিতে বিষ থাকে স্ত্রী গোখরোর থেকে বেশি।
কলকাতায় বৃষ্টি

গোখরো সাপ। ছবি : সংগৃহীত।

পুরো সুন্দরবন জুড়েই গোখরো সাপ যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়। জনবসতি এলাকাতে তো বটেই, অরণ্য এলাকাতেও এদের উপস্থিতি রয়েছে। সাধারণত সন্ধ্যা ও ভোরবেলা এরা খাবারের সন্ধানে বেরোয়। খাবার বলতে ইঁদুর, ব্যাঙ, টিকটিকি, পোকামাকড়, পাখির ডিম ও বাচ্চা ইত্যাদি। এরা ভীষণ রকম সজাগ ও সচেতন সাপ। সামান্য আওয়াজ হলেই এরা ফণা তুলে খাড়া হয়ে যায়। আর তীব্র শব্দে ফোঁসফোঁস করতে থাকে। এই সময় এদের দেহের অর্ধেকের বেশি দৈর্ঘ্য খাড়া অবস্থায় থাকতে পারে। তবে যখন গর্তে বা ঘাসের জঙ্গলে বিশ্রাম নেয়ে তখন এরা গোলাকার কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে। অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা, অন্ধকার বা ছায়াযুক্ত ও স্যাঁতসেঁতে জায়গা এদের বেশি পছন্দ। ঝোপঝাড় ও পুকুরপাড়ে ইঁদুরের গর্ত, ঘাসের জঙ্গল কিংবা গৃহস্থ বাড়িতে অব্যবহৃত কক্ষ, গোয়ালঘর, দেয়ালের ফাটল, ইটের পাঁজা ইত্যাদি হল এদের থাকার আদর্শ জায়গা।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

পুরুষ ও স্ত্রী গোখরোর মিলনকাল সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস। এই সময় পুরুষ ও স্ত্রী গোখরো সাপকে অনেক সময় পরস্পরকে পেঁচিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়। সুন্দরবনের জঙ্গলে, ঝোপে-ঝাড়ে এ দৃশ্য অনেকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যৌন মিলনের পর স্ত্রী গোখরো ডিম পাড়ার জন্য নিরাপদ ও নির্জন স্থান খোঁজে। সাধারণতঃ বড় গাছের ফাঁপা কোটর, উইঢিপি, ইটের পাঁজা, পরিত্যক্ত গর্ত ইত্যাদি জায়গা ওদের পছন্দ। সেখানে আগাছা মাটি ও শুকনো পাতা মিশিয়ে তৈরি করে বাসা। ৩-৫ মাস পর এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে স্ত্রী গোখরো ডিম পাড়ে। অনেক সময় ৯-১০ মাস পরেও ডিম পাড়তে দেখা যায়। একবারে সাধারণত ৫৫-৬০টি ডিম পাড়ে। যদিও পাখিদের মতো এরা ডিমে তা দেয় না কিন্তু ডিম ছেড়ে যায়ও না। আশেপাশেই থাকে। ডিম ফুটে বাচ্চা না বেরোনো পর্যন্ত ডিম রক্ষার দায় মায়ের। ৫০-৭০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরোয়। বাইরের উষ্ণতার ওপরে ডিম ফোটার সময় নির্ধারণ করে। সদ্য নির্গত গোখরো ছানার দৈর্ঘ্য হয় ৮-১০ ইঞ্চি। এই সময় বাচ্চারা কিন্তু সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়। জন্মের পর থেকেই বাচ্চারা বিষ উৎপাদন করতে শুরু করে এবং ফণা তুলতে পারে। আর যেহেতু বাচ্চার বিষদাঁত থাকে তাই বাচ্চা গোখরোর দংশন থেকে মৃত্যুও হতে পারে। তবে বিষ থাকে খুব কম।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) কুন্ডলী পাকানো অবস্থায় গোখরো। (বাঁদিকে) গোখরোর ফণা। ছবি : সংগৃহীত।

অপরদিকে পরিণত গোখরোর বিষথলিতে প্রায় ১৭০-২৫০ মিলিগ্রাম বিষ থাকতে পারে। আর মাত্র ১৪-১৫ মিলিগ্রাম বিষ যদি মানুষের শরীরে ঢালতে পারে তাহলে সময় মতো চিকিৎসা না হলে মৃত্যুর সম্ভাবনা নিশ্চিত। আর তাই গোখরো সাপ কামড়ালে যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। কেউটের মতো গোখরোর বিষও নিউরোটক্সিক, অর্থাৎ স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। ফলে রোগী চোখের পাতা খুলতে পারে না, মাথা ঝিমঝিম করে, শরীর চলতে থাকে, জিভ অসাড় হয়ে যায়, কথা জড়িয়ে যায়, মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা ওঠে ও সামনের দিকে মাথা ঝুঁকে পড়ে। সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষ এই অবস্থাকে বলে রোগীর ঘাড়ের ডুগি ভেঙে পড়া। রোগী শুয়ে পড়তে চায় তারপর শুরু হয় শ্বাসকষ্ট ও কাঁপুনি। অক্সিজেনের অভাবে শরীর ক্রমশ নীলাভ হয়ে যায়।
সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে কেউটের মতো গোখরো গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বিষাক্ত হওয়ায় এদের সম্বন্ধে আমাদের ভয় থাকা স্বাভাবিক কিন্তু আমরা যদি সতর্ক হয়ে চলাফেরা করি এবং দংশনের পর দ্রুত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারি তাহলে আমরা বাঁচবো, গোখরও বাঁচবে।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content