
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
জ্যেষ্ঠপাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের লক্ষ্য রাজসূয়যজ্ঞসম্পাদন। তাঁর উদ্দেশ্য— সম্রাটপদপ্রাপ্তি। ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব চার ভাই যুধিষ্ঠিরের একচ্ছত্র ক্ষমতাপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেরিয়ে পড়লেন দিগ্বিজয়ে। তৃতীয় পাণ্ডব বীর অর্জুন উত্তরদিকের যত রাজ্য জয় করে সেই রাজ্যগুলিকে করদ রাজ্যে পরিণত করবেন। তাঁর লক্ষ্য, রাজকোষবৃদ্ধি।উত্তরের বহু রাজ্য জয় করে, কৈলাশপর্বত অতিক্রম করে, বীর, শৌর্যবান অর্জুনের বিজয়রথ অপ্রতিহতগতিতে এগিয়ে চলল।সেখানে ক্ষত্রিয়দের যমতুল্য অর্জুনের সঙ্গে অন্য রাজাদের মহাসংঘর্ষ শুরু হল। পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ অর্জুন, দ্রুমপুত্র যে দেশের রক্ষক সেই কিম্পুরুষদের আবাস (কিন্নরদেশ), জয় করলেন এবং বশে আনলেন। সসৈন্যে অবিচলিত, ইন্দ্রপুত্র অর্জুন, যক্ষের রক্ষিত হাটক নামের দেশে উপস্থিত হলেন। সেই দেশবাসীদের সন্ধিবার্তার মাধ্যমে আনুগত্য আদায় করে উত্তর মানসসরোবর এবং ঋষিদের সৃষ্ট কৃত্রিম নদীগুলি পরিদর্শন করলেন। অর্জুন, মানসসরোবর অতিক্রম করে, হাটকদেশের নিকটবর্তী গন্ধর্বদের রক্ষিত দেশটি জয় করলেন। গন্ধর্বদের নগর থেকে তিনি তিত্তিরপাখির (টিয়াপাখির) মতো বর্ণবিশিষ্ট ও কল্মাষবর্ণের (সাদাকালোয় চিত্রিত) এবং ভেক অর্থাৎ ব্যাঙের তুল্য চক্ষু যাদের এমন শ্রেষ্ঠ ঘোড়া কররূপে লাভ করলেন। এরপর আরও উত্তরে হরিবর্ষে পৌঁছে ইন্দ্রপুত্র অর্জুনের সেই দেশ জয় করতে ইচ্ছা হল। সেখানে মহাবীর্যশালী, বিশালাকার, মহাবলী দ্বাররক্ষীরা এসে সন্তুষ্ট মনে তাঁকে বললেন,ওহে পার্থ, কোনও উপায়েই এই নগর জয় করা তোমার অসাধ্য। হে শুভ, তুমি ফিরে যাও। ওহে অচ্যুত,এটাই যথেষ্ট হয়েছে। পার্থ! নেদং ত্বয়া শক্যং পুরং জেতুং কথঞ্চন। উপাবর্ত্তস্ব কল্যাণ! পর্যাপ্তমিদমচ্যুত!।।
তারা আরও জানাল, এই নগরে যিনি প্রবেশ করেন তিনি নিশ্চিতভাবে মানুষ নন। বীর অর্জুনের প্রতি তাঁরা সন্তুষ্ট হয়েছেন। অর্জুনের এই বিজয় যথেষ্ট হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এখানে অর্জুনের জয় করবার কিছুই নেই। এই উত্তরপ্রদেশে যুদ্ধ বলে কিছু নেই। অর্জুন যদি বা নগরে প্রবেশ করেন তবু তিনি কিছুই দেখতে পাবেন না। কোনও দেহধারী মানুষ এখানে দেখতে পায় না। পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুন অন্য কিছু করতে চাইছেন কি?তবে তা বললে, তাঁর কথা অনুযায়ী কাজ হবে। অর্জুন হাসতে হাসতে বললেন, পার্থিবত্বং চিকীর্ষামি ধর্ম্মরাজস্য ধীমতঃ।
আমি প্রজ্ঞাবান ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চাই। অর্জুন ঘোষণা করলেন, যদি মানুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়, তবে তাদের দেশে অর্জুন প্রবেশ করবেন না। তাঁর অনুরোধ – যুধিষ্ঠিরের করযোগ্য যা কিছু বিনিময়দ্রব্য, দান করুন। যুধিষ্ঠিরায় যৎ কিঞ্চিৎ করপণ্যং প্রদীয়তাম্। তখন তারা উৎকৃষ্ট বসন, দিব্য অলঙ্কার, দিব্য রেশমবস্ত্র, দিব্য চামড়া কররূপে দান করল। এইভাবে ক্রমান্বয়ে ক্ষত্রিয় ও দস্যুদের সঙ্গে বহুযুদ্ধ করে, পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুন উত্তরদিক জয় করলেন। সেই রাজাদের নিঃশেষে জয় করে, করগ্রহণবিষয়ে তাদের যোগ্যতা আদায় করে, ধনসমূহ, বিবিধ রত্নসম্ভার এবং শুকপাখির সমান বর্ণের, সাদাকালোয় চিত্রিত কর্বুরবর্ণের, সেগুলির কোনটি একাধারে শুকপাখির পাখার তুল্য বর্ণের, কোনটি আবার ময়ূরবর্ণ, যেগুলির গতি বায়ুর সমান এমন ঘোড়াগুলি সঙ্গে নিয়ে, বিশাল চতুরঙ্গ সেনা পরিবৃত, বীর অর্জুন, নগরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন। পার্থ অর্জুন, বাহন-সহ সব ধনরাশি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে নিবেদন করলেন।তাঁর অনুমতি নিয়ে ঘরে ফিরলেন অর্জুন।
আমি প্রজ্ঞাবান ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চাই। অর্জুন ঘোষণা করলেন, যদি মানুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়, তবে তাদের দেশে অর্জুন প্রবেশ করবেন না। তাঁর অনুরোধ – যুধিষ্ঠিরের করযোগ্য যা কিছু বিনিময়দ্রব্য, দান করুন। যুধিষ্ঠিরায় যৎ কিঞ্চিৎ করপণ্যং প্রদীয়তাম্। তখন তারা উৎকৃষ্ট বসন, দিব্য অলঙ্কার, দিব্য রেশমবস্ত্র, দিব্য চামড়া কররূপে দান করল। এইভাবে ক্রমান্বয়ে ক্ষত্রিয় ও দস্যুদের সঙ্গে বহুযুদ্ধ করে, পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুন উত্তরদিক জয় করলেন। সেই রাজাদের নিঃশেষে জয় করে, করগ্রহণবিষয়ে তাদের যোগ্যতা আদায় করে, ধনসমূহ, বিবিধ রত্নসম্ভার এবং শুকপাখির সমান বর্ণের, সাদাকালোয় চিত্রিত কর্বুরবর্ণের, সেগুলির কোনটি একাধারে শুকপাখির পাখার তুল্য বর্ণের, কোনটি আবার ময়ূরবর্ণ, যেগুলির গতি বায়ুর সমান এমন ঘোড়াগুলি সঙ্গে নিয়ে, বিশাল চতুরঙ্গ সেনা পরিবৃত, বীর অর্জুন, নগরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন। পার্থ অর্জুন, বাহন-সহ সব ধনরাশি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে নিবেদন করলেন।তাঁর অনুমতি নিয়ে ঘরে ফিরলেন অর্জুন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬০: ঋষিকবির বিনির্মাণ—অবতার নন, মানুষ রাম এক নিঃসঙ্গ যোদ্ধা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৭ : হাঙরের পেটে মুক্তো

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭০: আকাশ এখনও মেঘলা
একই সময়ে বীর্যবান ভীমসেন, ধর্মরাজের অনুমতি নিয়ে পূর্বদিকে যাত্রা করলেন। প্রতাপশালী শত্রুর শোকোদ্রেককারী ভীমসেন পররাষ্ট্রকে পিষে দেওয়ার মতো হাতিঘোড়ারথে পরিপূর্ণ, যুদ্ধে আক্রমণাত্মক, বিশাল সৈন্যবলে পরিবৃত ছিলেন। পাঞ্চালদেশের শ্রেষ্ঠ নগরে মূর্তিমান বাঘের মতো উপস্থিত ভীম, পাঞ্চালদের বিবিধ উপায়ে সান্ত্বনা দিয়ে বশে আনলেন।অল্পপ্রচেষ্টায় তিনি গণ্ডকী ও বিদেহদেশ জয় করে দশার্ণদেশ জয় করলেন। দশার্ণরাজ দৃঢ়শস্ত্রধারী সুধর্মা ভীমের সঙ্গে রোমহর্ষক যুদ্ধ করেছিলেন। ভীমসেন তাঁর বীরত্ব দেখে মহাবলী সুধর্মাকে সেনাপতি করলেন। প্রবলশৌর্যবান ভীম মহাসৈন্যদল সঙ্গে নিয়ে মাটি কাঁপিয়ে পূবদিকে অগ্রসর হলেন। বলিশ্রেষ্ঠ ভীম, অনুচর-সহ অশ্বমেধদেশের রাজা রোচমানকে জয় করলেন। মহাশৌর্যবান কুন্তীপুত্র ভীম,অতি ভয়ানক যুদ্ধ না করেই তাঁকে জয় করে, পূর্বদেশ জয় করলেন। তার পরে বিরাট দক্ষিণপুলিন্দ নগরে এসে, সুকুমার ও সুমিত্র রাজাকে বশীভূত করলেন। তারপরে, যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে ভীম, মহাবীর্যশালী শিশুপালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তৃতীয়পাণ্ডবের ভাবি উদ্দেশ্য জেনে চেদিরাজ শিশুপালও, নগর হতে বেরিয়ে এসে তাঁদের সাদরে গ্রহণ করলেন।কুরু ও চেদি উভয়পক্ষের দুই শ্রেষ্ঠ মিলিত হয়ে, উভয়বংশের কুশল প্রশ্ন করলেন। চেদিরাজ শিশুপাল নিজের সেই রাজ্য নিবেদন করতে উদ্যত হয়ে, হেসে বললেন, কিমিদং কুরুষেঽনঘ!।
হে নিষ্পাপ, এটা কি করছ? ভীম, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের উদ্দিষ্ট সম্পর্কে অবহিত করলেন।চেদিরাজ তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করে সহমত (করদানে সম্মত) হলেন। সেখানে ভীমসেন তের দিন বাস করে, চেদিরাজের সসম্মান আতিথ্য গ্রহণ করে বাহন-সহ সসৈন্যে প্রস্থান করলেন।এর পরে, তিনি ক্রমান্বয়ে কুমারদেশের শ্রেণিমাণ নামে রাজাকে, কোশলরাজ বৃহদ্বলকে এবং সামান্য চেষ্টা করে ধর্মজ্ঞ মহাবলী অযোধ্যারাজ দীর্ঘপ্রজ্ঞকে জয় করলেন। প্রভাবশালী ভীম গোপালকচ্ছ, উত্তরসোমক-সহ মল্লদেশের রাজাকে জয় করলেন। বলবান ভীম, হিমালয়ের পার্শ্ববর্তী জলোদ্ভব নামে রাজ্যে উপস্থিত হয়ে অল্পসময়ে সেই দেশটিকে স্ববশে আনলেন। এইভাবে তিনি বহু দেশ জয় করলেন। রাজ্যজয়ের ঐতিহ্য বজায় রেখে, বলিশ্রেষ্ঠ, মহাশৌর্যবান তৃতীয় পাণ্ডব ভল্লাটদেশ ও তার নিকটবর্তী শুক্তিমান পর্বত জয় করলেন। ক্রমে ক্রমে মহাবীর পরাক্রমশালী ভীম, যুদ্ধে সুশক্তিমান অনমনীয় কাশিরাজ সুবাহুর আনুগত্য লাভ করলেন। অতঃপর তিনি যুদ্ধে সুপার্শ্বদেশের নিকটবর্তী যুদ্ধরত রাজেন্দ্র ক্রথকে, বলপ্রয়োগ করে জয় করলেন। তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ — তিনি মৎস্য ও দরদদেশীয় মহাবলশালীদের জয় করে, অনন্য ঘোড়া ও পশুভূমি সার্বিকভাবে দখল করলেন। মহাবাহু ভীম,শুধু উপদেশ দিয়েই মহাবীর মহীধররাজাকে জয় করে উত্তরাভিমুখে যাত্রা করলেন। বলবান কুন্তীপুত্র বলপ্রয়োগ করে বৎসভূমি জয় করলেন। তাঁর জয়যাত্রা অব্যাহতগতিতে এগিয়ে চলল। তিনি ক্রমান্বয়ে ভর্গদেশের রাজা, নিষাদাধিপতি এবং মণিমৎ প্রভৃতি বহু রাজাকে পরাজিত করলেন। পরবর্তীপর্যায়ে ভীম, ভয়াবহ যুদ্ধে নয়, অল্প চেষ্টায় দ্রুত জয় করলেন দক্ষিণ মল্লদেশ, ও ভোগবান পর্বত। সান্ত্বনা দান করে শর্মক ও ধর্মকদেশীয়দের আয়ত্তে আনলেন। অনায়াসে বিদেহরাজ জনককে জয় করলেন তিনি।
হে নিষ্পাপ, এটা কি করছ? ভীম, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের উদ্দিষ্ট সম্পর্কে অবহিত করলেন।চেদিরাজ তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করে সহমত (করদানে সম্মত) হলেন। সেখানে ভীমসেন তের দিন বাস করে, চেদিরাজের সসম্মান আতিথ্য গ্রহণ করে বাহন-সহ সসৈন্যে প্রস্থান করলেন।এর পরে, তিনি ক্রমান্বয়ে কুমারদেশের শ্রেণিমাণ নামে রাজাকে, কোশলরাজ বৃহদ্বলকে এবং সামান্য চেষ্টা করে ধর্মজ্ঞ মহাবলী অযোধ্যারাজ দীর্ঘপ্রজ্ঞকে জয় করলেন। প্রভাবশালী ভীম গোপালকচ্ছ, উত্তরসোমক-সহ মল্লদেশের রাজাকে জয় করলেন। বলবান ভীম, হিমালয়ের পার্শ্ববর্তী জলোদ্ভব নামে রাজ্যে উপস্থিত হয়ে অল্পসময়ে সেই দেশটিকে স্ববশে আনলেন। এইভাবে তিনি বহু দেশ জয় করলেন। রাজ্যজয়ের ঐতিহ্য বজায় রেখে, বলিশ্রেষ্ঠ, মহাশৌর্যবান তৃতীয় পাণ্ডব ভল্লাটদেশ ও তার নিকটবর্তী শুক্তিমান পর্বত জয় করলেন। ক্রমে ক্রমে মহাবীর পরাক্রমশালী ভীম, যুদ্ধে সুশক্তিমান অনমনীয় কাশিরাজ সুবাহুর আনুগত্য লাভ করলেন। অতঃপর তিনি যুদ্ধে সুপার্শ্বদেশের নিকটবর্তী যুদ্ধরত রাজেন্দ্র ক্রথকে, বলপ্রয়োগ করে জয় করলেন। তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ — তিনি মৎস্য ও দরদদেশীয় মহাবলশালীদের জয় করে, অনন্য ঘোড়া ও পশুভূমি সার্বিকভাবে দখল করলেন। মহাবাহু ভীম,শুধু উপদেশ দিয়েই মহাবীর মহীধররাজাকে জয় করে উত্তরাভিমুখে যাত্রা করলেন। বলবান কুন্তীপুত্র বলপ্রয়োগ করে বৎসভূমি জয় করলেন। তাঁর জয়যাত্রা অব্যাহতগতিতে এগিয়ে চলল। তিনি ক্রমান্বয়ে ভর্গদেশের রাজা, নিষাদাধিপতি এবং মণিমৎ প্রভৃতি বহু রাজাকে পরাজিত করলেন। পরবর্তীপর্যায়ে ভীম, ভয়াবহ যুদ্ধে নয়, অল্প চেষ্টায় দ্রুত জয় করলেন দক্ষিণ মল্লদেশ, ও ভোগবান পর্বত। সান্ত্বনা দান করে শর্মক ও ধর্মকদেশীয়দের আয়ত্তে আনলেন। অনায়াসে বিদেহরাজ জনককে জয় করলেন তিনি।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯০ : দুই ভাই

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫১: ইরাবতী ডলফিন
বিদেহদেশে অবস্থানকালীন কুন্তীপুত্র ভীম,নিকটবর্তী ইন্দ্রপর্বত এবং সাত জন কিরাতরাজাদের জয় করলেন। বীর্যবান ও বলশালী ভীম, নিজেদের সুসমর্থক রয়েছে এমন সুহ্ম ও প্রসুহ্মদের জয় করে,মগধদেশের উদ্দেশে ধেয়ে গেলেন। দণ্ড ও ভূপতি দণ্ডধারকে জয় করে,তাঁদের সঙ্গে নিয়ে সকলে গিরিব্রজনগরে দ্রুতগতিতে চললেন।এই সেই নগর যেখানে রয়েছে ভীমের হাতে নিহত জরাসন্ধের রাজ্যপাট।ভীম,জরাসন্ধপুত্রকে সান্ত্বনা দান করে এবং করদানবিষয়ে তাঁকে সম্মত করলেন। তাঁদের সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে, তিনি কর্ণের রাজ্যের দিকে ধেয়ে গেলেন। পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ ভীম ও তাঁর চতুরঙ্গ সেনা, ধরাতল কাঁপিয়ে তুলে,শত্রুহন্তা কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন। যুদ্ধে জয়ী হলেন ভীম।শক্তিমান ভীম,অঙ্গরাজ কর্ণের আনুগত্য আদায় করে, পার্বত্যপ্রদেশের রাজাদের জয় করলেন। তিনি, মহাযুদ্ধে নিজের বাহুবলে মোদাগিরির অধিকতর বলশালী রাজাকে হত্যা করলেন। ভীমসেনের বিজয়পতাকা উড্ডীন হল আর কোথায়? দ্বিতীয় পাণ্ডব পুণ্ড্রাধিপতি বীর বাসুদেব এবং কৌশিকীনদীর জলপ্রায়প্রদেশের তীরবর্তী মহাতেজস্বী রাজা, এই দুই সৈন্যবলে বলী, উভয় মহাপরাক্রমশালী রাজাকে যুদ্ধে জয় করে, বঙ্গদেশের রাজার উদ্দেশে ধেয়ে গেলেন। সেখানে ভরতবংশীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভীম, রাজা সমুদ্রেসেন ও চন্দ্রসেনকে, তাম্রলিপ্তের রাজাকে, কর্বটরাজকে, সুহ্মরাজকে, এমন কি পূর্বসমুদ্রতীরবাসী ম্লেচ্ছদেরকে পর্যন্ত জয় করলেন। এইভাবে বহু দেশ জয় করে পবনপুত্র ভীম, তাঁদের থেকে কররূপে ধন আদায় করে লৌহিত্য অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্র নিকটবর্তী দেশে যাত্রা করলেন। তিনি সাগরের জলপ্রায়প্রদেশের তীরবর্তী সমস্ত ম্লেচ্ছরাজাদের থেকে বিবিধ রত্নসম্ভার, চন্দন, অগরু, বস্ত্র, মণি, মুক্তা, কম্বল, সোনা, রূপা, প্রবাল, প্রচুর ধনরাশি কররূপে আহরণ করলেন। তাঁরা, মহাত্মা ভীমসেনকে করগ্রহীতারূপে স্বীকৃতি দান করে, শতকোটি সংখ্যক ধন কররূপে প্রদান করলেন। ভীমসেনের দায়বদ্ধতা শেষ হল। পূর্বদিকের সামগ্রিক বিজয় সম্পন্ন হল। মহাপরাক্রমশালী ভীমসেন ইন্দ্রপ্রস্থে উপস্থিত হয়ে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে সেই সব ধন নিবেদন করলেন।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৮: শ্যালক-জাতক—অচিনপাখি

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানে সাফল্যলাভের প্রাথমিক লক্ষ্য হল যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে স্বাধিকারপ্রতিষ্ঠা।রাজা যুধিষ্ঠিরের একান্ত অনুগত চার ভাই সেই উদ্দেশ্যসাধনে তৎপর হয়ে উঠলেন। অর্জুন চললেন উত্তরদিকে, ভীমের লক্ষ্য পূর্বদিকের রাজ্যগুলি জয় করে,সেই রাজ্যগুলিকে করদ রাজ্যে পরিণত করা। কনিষ্ঠ দুই যমজ নকুল ও সহদেব, দু’জনের অন্য দিকে সেই লক্ষ্যপূরণে এগিয়ে চললেন।বিশাল রাজসূয়যজ্ঞ ব্যয়সাধ্য। সেই যজ্ঞের ব্যয়নির্বাহের জন্য অর্থের প্রয়োজন।এটি হয়তো গৌণ কারণ। যুদ্ধজয়ের প্রধান এবং মূল উদ্দেশ্য হল অন্যান্য রাজ্যে অধিকারপ্রতিষ্ঠা। তাদের থেকে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে নিজের রাজ্যের আর্থিক ঘাটতি পূরণ এবং প্রয়োজনে বশংবদ রাজ্যগুলির সুরক্ষাদান। নিজেকে অপ্রতিহত ক্ষমতার অধীশ্বর প্রমাণ করবার জন্যে প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা নির্মূল করাও প্রয়োজন। সেই কারণেই রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানে সাফল্যলাভের জন্য অপরাপর রাজাদের আনুগত্য প্রয়োজন। সম্রাটপদপ্রাপ্তি একচ্ছত্র আধিপত্যপ্রতিষ্ঠার শর্তাধীন।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!
ভরতবংশীয়রা আর রাজতন্ত্রের শাসনাধীন নন।অধুনা তাঁদের দেশের গণতন্ত্রের মধ্যেও কোথায় যেন একটা রাজসূয়যজ্ঞের প্রাথমিক আবহ লুকিয়ে আছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও ভোটযুদ্ধে জয়ের মধ্যে দিয়ে নির্বাচনে সাফল্যলাভ ও নিজের দলের একচ্ছত্র ক্ষমতাদখল এই দুয়ের ছায়া পড়ে যখন তখন এক যুদ্ধজয়ের সাজ সাজ রব লক্ষ্য করা যায়। পরাজিত অন্য দলগুলির প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকে না, নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের শাসনাধীন সরকারের প্রতি আনুগত্যস্বীকার আবশ্যিক হয়ে ওঠে। শুধু বিজয়ী ও পরাজিতদলের সদস্যদের মধ্যে মত, পথ, নীতির বৈষম্য থেকে যায়।
মধ্য থাকে আপামর সাধারণ মানুষের সমর্থন এবং আস্থাহীনতাপ্রকাশের এক বৃহৎ আয়োজন। এই আয়োজন ব্যয়সাধ্য ও আয়োজনের নৈপুণ্য রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন হতে কোনও অংশে কম নয়।যতসংখ্যক রাজ্যে একটি দল বিজয়ী হবে সেই দল তত ক্ষমতাশালী দল হিসেবে চিহ্নিত হবে। ক্রমে সমগ্র দেশে জনতা জনার্দনের রায় যখন তাদের অনুকূলে যাবে তখন দলটি বিরোধীহীন অপ্রতিহত একটি দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে সক্ষম হবে। সেটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অনুকূলে না প্রতিকূল সেটি বিচার করবে ঘটমান সময়, ভাবি কাল ও সাধারণ মানুষ। মহাভারতের রাজসূয়যজ্ঞের প্রেক্ষিতে আছে ক্ষমতাদখলের যুদ্ধ, গণতন্ত্রের ভোটযুদ্ধেও আছে দলের ক্ষমতাদখলের লড়াই। বর্তমান গণতন্ত্রে, রাজতন্ত্রের অস্তিত্ব নেই কিন্তু রাজসূয়যজ্ঞের আবহ রয়ে গিয়েছে, ভরতবংশীয়রা মনে মনে এই আবহের সাযুজ্য কিছুটা হলেও হয়তো খুঁজে পাবেন।—চলবে।
মধ্য থাকে আপামর সাধারণ মানুষের সমর্থন এবং আস্থাহীনতাপ্রকাশের এক বৃহৎ আয়োজন। এই আয়োজন ব্যয়সাধ্য ও আয়োজনের নৈপুণ্য রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন হতে কোনও অংশে কম নয়।যতসংখ্যক রাজ্যে একটি দল বিজয়ী হবে সেই দল তত ক্ষমতাশালী দল হিসেবে চিহ্নিত হবে। ক্রমে সমগ্র দেশে জনতা জনার্দনের রায় যখন তাদের অনুকূলে যাবে তখন দলটি বিরোধীহীন অপ্রতিহত একটি দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে সক্ষম হবে। সেটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অনুকূলে না প্রতিকূল সেটি বিচার করবে ঘটমান সময়, ভাবি কাল ও সাধারণ মানুষ। মহাভারতের রাজসূয়যজ্ঞের প্রেক্ষিতে আছে ক্ষমতাদখলের যুদ্ধ, গণতন্ত্রের ভোটযুদ্ধেও আছে দলের ক্ষমতাদখলের লড়াই। বর্তমান গণতন্ত্রে, রাজতন্ত্রের অস্তিত্ব নেই কিন্তু রাজসূয়যজ্ঞের আবহ রয়ে গিয়েছে, ভরতবংশীয়রা মনে মনে এই আবহের সাযুজ্য কিছুটা হলেও হয়তো খুঁজে পাবেন।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















