
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
লোকটা প্রাণপণে দৌড়াচ্ছিল। হাতটা তার জখম হয়েছে, রক্ত পড়ছে দরদর করে। একটু দাঁড়িয়ে কোনও কিছু দিয়ে বেঁধে রক্তপাত যে বন্ধ করবে সে সময় নেই। পিস্তলটাও ছিটকে পড়েছে গুলি লাগার সময়। তুলতে গেলেই লোকটা দ্বিতীয়বার গুলি চালাত। আর তাহলে এতক্ষণে এই দৌড়ানোর মতো অবস্থাতেও সে থাকত না। সিধে ওপরে চলে যেত। খেল খতম। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ দৌড়াবে তা সে নিজেই জানে না। একটাই আশার কথা, লোকটা বাইরের বলে এই জঙ্গলের ঘাত-ঘোঁৎ তার জানা নেই। অতএব যেভাবেই হোক, আর একটু গভীরে গিয়ে নিজেকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে ফেলতে পারবে বলেই সে আশা রাখে। কিন্তু সেখানেও বেশিক্ষণ সে থাকতে পারবে না। রক্তপাত বন্ধ করে ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ বাঁধতেই হবে তাকে। ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে হাতে। গুলিটা সিধে হাতে এসে লাগবে তা সে অনুমান করতে পারেনি। লোকটি যে দক্ষ শুটার, তাতে সন্দেহ নেই। এত ভালো স্কিল নিয়ে লোকটি তাদের দলে যোগ দিলে মালামাল হয়ে যেত। মনে-মনে লোকটিকে নোংরা একটা খিস্তি দিল সে।
দৌড়ানোর সময় টের পেল মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। অ্যাকশনে নামার আগে সবসময় মোবাইল ভাইব্রেশন মোডে রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে তাদের। যে-ই থাকুক, তাকে এই নির্দেশ মেনে চলতে হয়। সম্ভবত বস ফোন করছে। কিন্তু এখন সে ফোন ধরবে কী করে? আর ধরে বলবেই বা কী? বস যখন জানতে পারবেন, সমস্ত কারবারের হদিশ ওরা পেয়ে গিয়েছে, তখন যে কী করবেন! বেশ কিছুদিন ধরেই বস দুর্ভাবনায় ছিল, অস্ত্রভাণ্ডারের হদিশ পুলিশ পেয়ে যেতে পারে ভেবে। বারকয়েক বলেছেন, “আপাতত ওখান থেকে মালগুলি অন্যত্র সরিয়ে ফেললে হয় না!”
দৌড়ানোর সময় টের পেল মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। অ্যাকশনে নামার আগে সবসময় মোবাইল ভাইব্রেশন মোডে রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে তাদের। যে-ই থাকুক, তাকে এই নির্দেশ মেনে চলতে হয়। সম্ভবত বস ফোন করছে। কিন্তু এখন সে ফোন ধরবে কী করে? আর ধরে বলবেই বা কী? বস যখন জানতে পারবেন, সমস্ত কারবারের হদিশ ওরা পেয়ে গিয়েছে, তখন যে কী করবেন! বেশ কিছুদিন ধরেই বস দুর্ভাবনায় ছিল, অস্ত্রভাণ্ডারের হদিশ পুলিশ পেয়ে যেতে পারে ভেবে। বারকয়েক বলেছেন, “আপাতত ওখান থেকে মালগুলি অন্যত্র সরিয়ে ফেললে হয় না!”
তাদের আপত্তি ছিল না। রিস্ক নিয়ে তারাই তো মালপত্তর রেখে আসে, দরকার হলে নিয়েও আসে। যদিও একসঙ্গে অনেক মাল প্রয়োজন হলেই তাদের বলা হত। একটা-দুটো মাল লাগলে, কিংবা ছোটা পাপ্পুর দরকার পড়লে, মঙ্গল ওঝাই সামলে নিত। কে যে তাকে মারল! বস নিজেও ব্যাপারটায় বেকুব বনে গেছেন সে বুঝতে পারছিল। জানতও না কিছু। নাহলে খবরটা শুনেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠত না। খবরটা সে-ই দিয়েছিল। সাইকেল তো শুনেছে, ধরা পড়েছে পুলিশের জালে। খুশিই হয়েছে সে। শালা মাতব্বরি করত তাদের সক্কলের ওপর। প্রাপ্য টাকা থেকে তিন পারসেন্ট কমিশন নিত। না দিলে বসের কান ভাঙাত, কাজের বরাত পেত না। বসের অন্ধ বিশ্বাস ছিল সাইকেলের প্রতি। সব কাজেই আগে তার সঙ্গে পরামর্শ করত। লোকটি অবশ্য এলাকা যেমন নিজের তালুর মতো চেনে, তেমনই অনেক মহলে যোগাযোগ ভালোই। ফলে একবার বেঁকে বসলে তখন হাত কামড়ানো ছাড়া কোনও গতি ছিল না তখন। মান ভাঙাতে দরবার করতে বেশি খরচ করতে হত বলে, সচরাচর কেউ চটাত না সাইকেলকে। এখন সে ধরা পড়ায় দলের অনেকেই খুশি হয়েছে। সাইকেল ধরা পড়ার পরে বস আরও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সাইকেল যদি সব বলে দেয়! কেবল তো এখানে নয়, আশেপাশের অনেকগুলি জঙ্গলেই তাদের নানা কিছুর ভাণ্ডার রাখা আছে বলে শুনেছে সে। দলের সকলে অবশ্য জানে না, কোথায় কী আছে। সে নিজেও জানে না।
তবে কানাঘুঁষো শুনেছে, ব্রাউনসুগার থেকে ইমপোর্টেড সাপের বিষ সব নেপাল চলে যায়। সেখান থেকে অন্যত্র পাঠানোর জন্য আলাদা লোকজনের ব্যবস্থা আছে। বিশাল বড় নেটওয়ার্ক। তারা যাকে বস বলে জানে, তিনি হয়ত এখানকার মাথা, কিন্তু আসল মাথা যে কে, আর তিনি কোথায় থাকেন, তা কেউ জানে না। বসও না। তারা যেমন লেবার, বসও আসলে কেরিয়ার, মিডলম্যান। আর কিছু না। এই শব্দগুলি বছর পাঁচ-ছয় আগেও সে জানত না। আস্তে-আস্তে এই দলে থেকে শিখেছে। এর অর্থ যে সে সঠিক জানে তা নয়, তবে শুনেছে, মাঝামাঝি থাকা শক্তিশালী কোন বাহল, যে একজনের কাছ থেকে জিনিস নিয়ে অন্যজনের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। অর্থটি সঠিক কি-না জানে না সে, তবে মোটামুটি বুঝতে পারে বসের ভূমিকা কী। এই অঞ্চলের সবকিছু অপারেশনের মূল দায়িত্ব বসের। সেই কারণে তাঁর মাথাব্যথা বেশি। তা তিনি যখন বলছিলেন, মালগুলি সরিয়ে ফেলার কথা, তা ফেললেই হত। ওরা গুহার মধ্যে ঢুকেও কিছু পেত না। বেকুব বনে যেত। কিন্তু খচ্চর সাইকেল যদি শোনে কোনও ভালো কথা! আগ বাড়িয়ে বলেছিল, “কী দরকার? উদের সাধ্য লাই, কালাদেওর থানে ঢুইন্কবে। সে-চেষ্টা করলে পাবলিককে এমন ক্ষেপিয়ে তুলব লা যে পিটিয়ে লাশ বানিয়ে দেবে!”
বস তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “বলছিস্?”
“হ্যাঁ বুলছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন না ক্যানে! সাইকেল হ্যায় না!” ভরসা জোগায় সাইকেল।
“তুই আছিস সেটাই ভরসা। বাকিরা আমার শক্তি, তুই আমার মাথা। তোর বুদ্ধি না পেলে সাইকেল, এ-অঞ্চলে এত বড় কাজকারবার গড়ে তুলতে পারতাম না আমরা। তুই আমাদের আশা-ভরসা!”
তবে কানাঘুঁষো শুনেছে, ব্রাউনসুগার থেকে ইমপোর্টেড সাপের বিষ সব নেপাল চলে যায়। সেখান থেকে অন্যত্র পাঠানোর জন্য আলাদা লোকজনের ব্যবস্থা আছে। বিশাল বড় নেটওয়ার্ক। তারা যাকে বস বলে জানে, তিনি হয়ত এখানকার মাথা, কিন্তু আসল মাথা যে কে, আর তিনি কোথায় থাকেন, তা কেউ জানে না। বসও না। তারা যেমন লেবার, বসও আসলে কেরিয়ার, মিডলম্যান। আর কিছু না। এই শব্দগুলি বছর পাঁচ-ছয় আগেও সে জানত না। আস্তে-আস্তে এই দলে থেকে শিখেছে। এর অর্থ যে সে সঠিক জানে তা নয়, তবে শুনেছে, মাঝামাঝি থাকা শক্তিশালী কোন বাহল, যে একজনের কাছ থেকে জিনিস নিয়ে অন্যজনের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। অর্থটি সঠিক কি-না জানে না সে, তবে মোটামুটি বুঝতে পারে বসের ভূমিকা কী। এই অঞ্চলের সবকিছু অপারেশনের মূল দায়িত্ব বসের। সেই কারণে তাঁর মাথাব্যথা বেশি। তা তিনি যখন বলছিলেন, মালগুলি সরিয়ে ফেলার কথা, তা ফেললেই হত। ওরা গুহার মধ্যে ঢুকেও কিছু পেত না। বেকুব বনে যেত। কিন্তু খচ্চর সাইকেল যদি শোনে কোনও ভালো কথা! আগ বাড়িয়ে বলেছিল, “কী দরকার? উদের সাধ্য লাই, কালাদেওর থানে ঢুইন্কবে। সে-চেষ্টা করলে পাবলিককে এমন ক্ষেপিয়ে তুলব লা যে পিটিয়ে লাশ বানিয়ে দেবে!”
বস তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “বলছিস্?”
“হ্যাঁ বুলছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন না ক্যানে! সাইকেল হ্যায় না!” ভরসা জোগায় সাইকেল।
“তুই আছিস সেটাই ভরসা। বাকিরা আমার শক্তি, তুই আমার মাথা। তোর বুদ্ধি না পেলে সাইকেল, এ-অঞ্চলে এত বড় কাজকারবার গড়ে তুলতে পারতাম না আমরা। তুই আমাদের আশা-ভরসা!”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭০ : চার্চ হাসপাতালের সেই সকাল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৩: রাজসূয় মহাযজ্ঞের প্রস্তুতিপর্বে পাণ্ডবদের দিগ্বিজয় যেন রাজনীতির আনুগত্য-আদায়ের পাঠ

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯২ : শিউলি বাড়ি
বস যখন উদমা প্রশংসা করছে, শুনে উপস্থিত তাদের গা জ্বলছিল। সলিল পাশে দাঁড়িয়ে দাঁতে-দাঁত চেপে মৃদু স্বরে বলল, “যেদিন এই সাইকেল মাহাতো তোমার গাঁড় মারবে, সেদিন বুঝবে শা…” বলেতে গিয়েও থেমে গেল।
সাইকেল বলল, “সেবার জঙ্গলের মধ্যে যখন ঢুকেছিল লালবাজারের টিকটিকিটা, কেমন ছাঁট জ্বালাইনছি বলুন!” বলে সে নিজেই হাসতে লাগল, আত্মপ্রসাদের হাসি, “করতে তো লারল কিছু। ধরতে পারল আমাকে?”
“একবার পারেনি বলে বারবার পারবে না এটা ভাবিস না সাইকেল!” বস বলে, “অত রিস্ক নিস না। তুই না থাকলে চোখে অন্ধকার দেখব!”
“আরে বস, অত চিন্তা করছেন ক্যানে? আমি নিজেকে বাঁচাতে জানি!” সাইকেল আশ্বস্ত করল।
“না রে, চারদিকে যা সব ঘটছে। লক্ষণ ভালো ঠেকছে না। ওই লালবাজারের টিকটিকিটা না এলেই ভালো ছিল রে। আর একটা লেজুড় এসেছিল, তাকে তুই এক ধাক্কায় মাত করে দিয়েছিস, খুশি হয়েছিলাম। এই মালটাকেও যদি পারতিস্…”
“চেষ্টায় তো আছি বস্। পেলে এক্কেবারে সাবাড় করে দেবো!” সাইকেলের দু-চোখে জিঘাংসা।
সলিল বলার চেষ্টা করল, “তাহলে অস্ত্রগুলি ওখানেই পড়ে থাকবে?”
সাইকেল দপ্ করে জ্বলে উঠল, “সে তুকে ও নিয়ে ভাবতে হবে না! শাল, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। উয়ার দেখভালের ভার আমার। আমি যা ভালো বুঝি করব। মাল ঠিক জায়গাতেই আছে। ও নিয়ে কুনো কিছু তুদের ভাবতে হবে না!”
শুনে আর-একবার তাদের পিত্তি জ্বলে উঠেছিল। মনে-মনে শাপশাপান্ত করেছিল, “মর মর, জলদি পুলিশের গুলিতেই তুই মর! এত যে বরাই করছিস, নুনিয়াকে পেরেছিস ধরতে? সে তো তোর চোখের সামনে থেকেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। শালা ফুটানি মারছে!” ভাগ্যিস মনের কথা কেউ শুনতে পায়নি। পেলে কী যে করত সাইকেল!
ছুটতে ছুটতে লোকটা এসব ভাবছিল। সাইকেল এত বড়াই করত, কদিন আগে সে পুলিশের জালে ধরা পড়েছে এই খবরটা যখন এল তাদের কাছে, ভিতরে-ভিতরে ভীষণ খুশি হয়েছিল বটে, কিন্তু পরমুহূর্তেই ভয় পেয়েছিল। সাইকেল ধরা পড়ে যদি সবকিছু জানিয়ে দেয়। পুলিশ তো কথা না বের করে ছাড়িবে না। যদি আড়ং ধোলাই দেয়? আর সাইকেল সহ্য করতে না পেরে সব বলে দেয়? তাহলে তো ব্যবসা চৌপাট। কেবল বসকে নয়, তাদেরকেও পালাতে হবে। তখন কে যে কোথায় পালাবে, কত দিনের জন্য পালাবে, তার কোন ঠিক থাকবে না। সংসার চলবে কী করে? বউ-বাচ্চার মুখ ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। একমুহূর্তেই জন্য আক্ষেপ হয়, “শালা, এ-লাইনে না এলেই হত। শহরে গিয়ে গতরে খেটে খেতাম!” কিন্তু পরমুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিল। এসব ভাবা মানেই এখন দৌড়ানোর গতি কমে যাওয়া। লোকটা নাছোড়বান্দার মতো পিছন-পিছন ছুটে আসছে। আশ্চর্য! লোকটির ক্লান্তি নেই?”
সাইকেল বলল, “সেবার জঙ্গলের মধ্যে যখন ঢুকেছিল লালবাজারের টিকটিকিটা, কেমন ছাঁট জ্বালাইনছি বলুন!” বলে সে নিজেই হাসতে লাগল, আত্মপ্রসাদের হাসি, “করতে তো লারল কিছু। ধরতে পারল আমাকে?”
“একবার পারেনি বলে বারবার পারবে না এটা ভাবিস না সাইকেল!” বস বলে, “অত রিস্ক নিস না। তুই না থাকলে চোখে অন্ধকার দেখব!”
“আরে বস, অত চিন্তা করছেন ক্যানে? আমি নিজেকে বাঁচাতে জানি!” সাইকেল আশ্বস্ত করল।
“না রে, চারদিকে যা সব ঘটছে। লক্ষণ ভালো ঠেকছে না। ওই লালবাজারের টিকটিকিটা না এলেই ভালো ছিল রে। আর একটা লেজুড় এসেছিল, তাকে তুই এক ধাক্কায় মাত করে দিয়েছিস, খুশি হয়েছিলাম। এই মালটাকেও যদি পারতিস্…”
“চেষ্টায় তো আছি বস্। পেলে এক্কেবারে সাবাড় করে দেবো!” সাইকেলের দু-চোখে জিঘাংসা।
সলিল বলার চেষ্টা করল, “তাহলে অস্ত্রগুলি ওখানেই পড়ে থাকবে?”
সাইকেল দপ্ করে জ্বলে উঠল, “সে তুকে ও নিয়ে ভাবতে হবে না! শাল, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। উয়ার দেখভালের ভার আমার। আমি যা ভালো বুঝি করব। মাল ঠিক জায়গাতেই আছে। ও নিয়ে কুনো কিছু তুদের ভাবতে হবে না!”
শুনে আর-একবার তাদের পিত্তি জ্বলে উঠেছিল। মনে-মনে শাপশাপান্ত করেছিল, “মর মর, জলদি পুলিশের গুলিতেই তুই মর! এত যে বরাই করছিস, নুনিয়াকে পেরেছিস ধরতে? সে তো তোর চোখের সামনে থেকেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। শালা ফুটানি মারছে!” ভাগ্যিস মনের কথা কেউ শুনতে পায়নি। পেলে কী যে করত সাইকেল!
ছুটতে ছুটতে লোকটা এসব ভাবছিল। সাইকেল এত বড়াই করত, কদিন আগে সে পুলিশের জালে ধরা পড়েছে এই খবরটা যখন এল তাদের কাছে, ভিতরে-ভিতরে ভীষণ খুশি হয়েছিল বটে, কিন্তু পরমুহূর্তেই ভয় পেয়েছিল। সাইকেল ধরা পড়ে যদি সবকিছু জানিয়ে দেয়। পুলিশ তো কথা না বের করে ছাড়িবে না। যদি আড়ং ধোলাই দেয়? আর সাইকেল সহ্য করতে না পেরে সব বলে দেয়? তাহলে তো ব্যবসা চৌপাট। কেবল বসকে নয়, তাদেরকেও পালাতে হবে। তখন কে যে কোথায় পালাবে, কত দিনের জন্য পালাবে, তার কোন ঠিক থাকবে না। সংসার চলবে কী করে? বউ-বাচ্চার মুখ ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। একমুহূর্তেই জন্য আক্ষেপ হয়, “শালা, এ-লাইনে না এলেই হত। শহরে গিয়ে গতরে খেটে খেতাম!” কিন্তু পরমুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিল। এসব ভাবা মানেই এখন দৌড়ানোর গতি কমে যাওয়া। লোকটা নাছোড়বান্দার মতো পিছন-পিছন ছুটে আসছে। আশ্চর্য! লোকটির ক্লান্তি নেই?”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৩: স্মৃতিশাস্ত্রের রক্তচক্ষু বনাম এক স্নেহশীল পিতা: মূষিক-কন্যার বিবাহ-উপাখ্যান

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৫: চামচিকা
উফ্, হাতটা যেন খুলে পড়বে এবার। ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কেটে বাদ দিলেই বুঝি ভালো হতো। মাথা ঝিমঝিম করছে। শরীরের সমস্ত শক্ত যেন কমে আসছে। সে যদি লোকটির চোখের আড়ালও হয়, তাহলেও লোকটা এই রক্তের চিহ্ন দেখে দেখে ঠিক তার কাছে পৌঁছে যাবে। এখনই রক্ত পড়াটা বন্ধ করতে হবে, আর যেভাবেই হোক বসকে খবর দিতে হবে। ওরা পিছনের গুহামুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে যখন, তখন কোন কিছুই আর গোপন নেই! ইস্, মাত্র দিন পনেরো আগে তারা পাশের রাজ্য থেকে কীভাবে নকল দুধের ড্রামে করে অস্ত্রশস্ত্রগুলি নিয়ে এসেছে তারাই জানে। রাতের বেলা বেশি চেকিং থাকে বলে ভোরের বেলা এই অপারেশন চালানো হয়। বসের বুদ্ধি নির্ঘাৎ। জোরদার বুদ্ধি। এমনিতে সপ্তাহে প্রতিদিন দুধ আনা হয় পাশের রাজ্য থেকে। এখানের প্রয়োজনেই শুধু নয়, দুধ চলে যায় সদরে। কেবল মাঝেমধ্যে বিশেষ ভাবে তৈরি দুধের বড়-বড় কনটেনারের নিচে থাকে অন্য জিনিস। কনটেনারগুলি আয়তনে বেশ বড়। স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি। সেগুলি বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই। বড় বড় কনটেনারগুলির উপর নিচ আলাদা দু’ভাগে বিভক্ত। এবং কনটেনারের দুটি ভাগের উপরের অংশে ছোট একটি চেম্বারেই দুধ থাকে, নিচে আলাদা একটা চেম্বার আছে, বাইরে থেকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। সেই চেম্বারেই আলাদা-আলাদাভাবে পার্টস্ রাখা থাকে। সচরাচর দুধের কনটেনার এখন আর চেক করা হয় না ভালো করে। রোজ যাতায়াতের সূত্রে মুখচেনা হয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

সাগর উঠে তরঙ্গিয়া

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
প্রথম-প্রথম পুরো চেক হত, তারপর মাঝেমধ্যে। এখন রেয়ার চেক করা হয়। তাও ওরা ভিতরের দিকের কনটেনারগুলি চেক করে। কারণ, সাধারণ ধারণা বলে, যদি উল্টোসিধে কিছু নিয়ে আসা হয়, সেগুলি সামনে সাজিয়ে রাখে না কেউ। মালপত্রের পিছনের সারিতে রাখাই দস্তুর। এখানেই বসের বুদ্ধি। যেদিন-যেদিন পার্টস আনা হয়, সেদিন-সেদিন বিশেষ কনটেনারগুলি রাখা থাকে একেবারে প্রথম সারিতেই। সবগুলি তো নয়। চল্লিশটা কনটেনার থাকলে তার মধ্যে পাঁচটি কিংবা চারটি হয়তো ওইরকম বিশেষ কনটেনার। চেক্ করার সময় ওরা সামনের দিকের একটা এমনিহয়ত খুলে দেখে। পরে পিছনের দিকের কনটেনার দু-তিনটি এলোমেলোভাবে চেক করে। একটা লোহার বড় রুল আছে, সেটি ডুবিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে কিছু আছে কিনা। স্বাভাবিকভাবেই কিছু পায় না, ছেড়ে দেয়। যদি সামনের দিকের কনটেনারগুলি কখন ওভাবে দেখত, তাহলে বামাল ধরা পড়ে যেত। তবে পুরিয়া সে শুনেছে ওভাবে আসেনা। পুরিয়া জঙ্গলের পথে আসে কিংবা অন্যভাবে। তার জন্য আলাদা-আলাদা লোক ঠিক করা আছে। সে সঠিক জানে না, তবে তাদের মধ্যে কেউ শ্রমিক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ সামান্য পাতাকুড়ানির কাজ করে। তবে তারা আদার ব্যাপারি, নিজেদের কাজ ছাড়া অন্য কাজের ব্যাপারে তেমন নাক্ক গলায় না, উৎসাহ দেখায় না। বসের কড়া হুকুম, বেশি উৎসাহ দেখালে একেবারে খালাস করে দেওয়া হবে। আর বসকে তারা খুব ভয় পায়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৩: আকাশ এখনও মেঘলা
বসের কথা মাথায় আসতেই তার মনে হল, যেভাবেই হোক বসকে জানান দরকার। বর্ষাকাল কিংবা তার পরপর হলে এত অসুবিধা হত না, জঙ্গল তখন ঘন থাকে। কিন্তু এখন বসন্তের শুরু। শীতের পাতা ঝরা গাছগুলিতে সবেমাত্র নতুন পাতা গজিয়েছে, গোটা জঙ্গল এখনও ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে। সামনেই বে৬ দিকে তার চোখে পড়ল একটা কুসুম গাছে। গাছের গুঁড়িটা বেশ মোটা। ও আস্তে আস্তে সামনের দিকে দৌড়ে গিয়ে গাছের আড়াল দিয়ে আবার পিছনের দিকে এসে সেই কুসুমগাছের গুঁড়ির আড়ালে বসল। গায়ের জামাটা ঘামে ভিজে গেছে। নাহলে সেটা ছিঁড়ে আপাতত ক্ষতস্থান বাঁধতে পারত। কিন্তু ঠিক হবে না কাজটা। কী করবে সে? অনেকখানি রক্ত ইতিমধ্যেই বেরিয়ে যাওয়ায় তার আর শক্তি নেই। প্যান্টটা খুলে যেভাবেই হোক ছিঁড়ে সেটা দিয়েই ক্ষতস্থান বাঁধবে সে। তার আগে ফোন করে বসকে জানিয়ে দেওয়া দরকার। কোনরকমে ফোন বার করে সে ডায়াল করল। সস্তার ফোন, কেবল কথা বলা যায় আর মেসেজ পাঠানো যায়। সে ক্লাস ট্যুয়েলভ অবধি পড়েছিল। তারপর বাবা মারা গেল। তার উপর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল। ভাই-বোন-মা-ঠাকুমা সব মিলে নয় জন। এতা-ওটা করেই চলছিল। তারপর আচমকা একটা ঘটনাসূত্রে বসের নজরে পড়ে গেল। সেই থেকে এ-লাইনে সে আছে। আর যাই করে করুক, বসের সঙ্গে কখন বেইমানি করার কথা ভাবতে পারে না। বসের দয়াতেই এখন তার পাকা কোঠা। বোনেদের বিয়ে দিয়েছে। ভাইয়েরাও শহরে যে-যার মতো কাজ করে। নিজে বিয়ে করেছে। বাচ্চা আছে। মা গতবছর চলে গিয়েছেন, নাহলে মা-ও তার সঙ্গেই থাকত। সবই বসের দয়ায়। মানুষটি কাজ করলে একেবারে মুক্তহস্ত।
ভাগ্য ভালো, বস ফোন ধরলেন। মৃদু স্বরে যতটুকু জানানোর জানাল সে, একইসঙ্গে সে যে আহত হয়েছে, তাও। বস কোনরকমে বললেন, “তুই চার্চ-হাসপাতালে দেখিয়ে নে। আমি বলে রাখছি। কোন সমস্যা হবে না। যত তাড়াতাড়ি পারিস ওখান থেকে বেরিয়ে আয়। আবদুলকে বলছি, বাইক নিয়ে অপেক্ষা করবে জঙ্গলের বাইরে। এক্ষুনি পাঠাচ্ছি ওকে। তার আগে নিজে যাতে ধরা না পড়িস সেই চেষ্টা দেখ! রাখছি!” বলে ফোন রেখে দিল। ক্লান্তিতে সে চোখ বুজেছে একটু, এমনসময় তার রগের কাছে কেউ একটা নল চেপে ধরল, তারপর ঠান্ডা গলার আওয়াজ শুনল সে, “পালাবার বৃথা চেষ্টা কর না। তুমি এখন আমার কব্জায়। আমাকে চেনো? আমার নাম শাক্য সিংহ!” —চলবে।
ভাগ্য ভালো, বস ফোন ধরলেন। মৃদু স্বরে যতটুকু জানানোর জানাল সে, একইসঙ্গে সে যে আহত হয়েছে, তাও। বস কোনরকমে বললেন, “তুই চার্চ-হাসপাতালে দেখিয়ে নে। আমি বলে রাখছি। কোন সমস্যা হবে না। যত তাড়াতাড়ি পারিস ওখান থেকে বেরিয়ে আয়। আবদুলকে বলছি, বাইক নিয়ে অপেক্ষা করবে জঙ্গলের বাইরে। এক্ষুনি পাঠাচ্ছি ওকে। তার আগে নিজে যাতে ধরা না পড়িস সেই চেষ্টা দেখ! রাখছি!” বলে ফোন রেখে দিল। ক্লান্তিতে সে চোখ বুজেছে একটু, এমনসময় তার রগের কাছে কেউ একটা নল চেপে ধরল, তারপর ঠান্ডা গলার আওয়াজ শুনল সে, “পালাবার বৃথা চেষ্টা কর না। তুমি এখন আমার কব্জায়। আমাকে চেনো? আমার নাম শাক্য সিংহ!” —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















