কলকাতায় বৃষ্টি
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। শ্রাবণের দিন, আগস্ট মাস। বঙ্গাব্দের হিসেবে বাইশে শ্রাবণ, খ্রিস্টাব্দের হিসেবে আগস্টের সাত তারিখ। এত সাল-তারিখের হিসেব সেদিন মিটেছিল। সীমার গণ্ডী পেরিয়ে অসীম হয়েছিলেন তিনি।

অনেক অনেক দিন আগে, সালটা ১৮৮৯ হবে বোধহয় তখন, তিনি লিখেছেন—
“শ্রাবণবরিষণে একদা গৃহকোণে/ দু কথা বলি যদি কাছে তার/ তাহাতে আসে যাবে কিবা কার// ব্যাকুল বেগে আজি বহে যায়,/ বিজুলি থেকে থেকে চমকায়/ যে কথা এ জীবনে রহিয়া গেল মনে/ সে কথা আজি যেন বলা যায়—/ এমন ঘনঘোর বরিষায়॥”
সেই মনোভার নেমেছিল নাকি মিশেছিল অনন্তে, সে কথা বলা হয়েছিল নাকি ফুরিয়েছিল একেবারে কে জানে! তেমন আরেক শ্রাবণে তাঁর “পরাণসখা বন্ধু”র ধীর পদপাত জেগে উঠছে ক্রমে ক্রমে… তার খানিক আগে চিরনূতনের শেষ পঁচিশে বৈশাখ কেটেছে, মাঝে আর কেবল জ্যৈষ্ঠ আর আষাঢ়ের ব্যবধানটুকু… তারপর… শ্যামসমান মরণের অমিতবিত্ত চিরচঞ্চল পদসঞ্চার। সেও অনেক আগের কথা, জীবনের প্রভাত তখন। সাল ১৮৮১, রক্তকমলকর, রক্ত-অধরপুট সেই মৃত্যু-অমৃত মূর্ত হয়েছিল তাঁর লেখায়। তার-ও বছর আটেক পরে লিখছেন “ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন জনম দাও”… আকাঙ্ক্ষিত নতুন সেই জন্ম দীনতা থেকে অক্ষয়ধনে, সংশয় থেকে সত্যসদনে, জড়তা থেকে নবীনজীবনে। মাঝে কেটে যাচ্ছে ঘটনাবহুল প্রতিদিন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৯ : নুনিয়ার টান

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৮ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ১

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭১: কৃষ্ণের প্রতি ভীষ্মের শ্রদ্ধার্ঘ্য, শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে মানুষ ও দেবতার সমন্বয়

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা

সাল ১৯০১। রবীন্দ্রনাথের জীবনতরণী তখন ঠিক মাঝদরিয়ায়। আশি বছরের জীবনে চল্লিশ তখন তাঁর। উপলব্ধি করলেন—
“মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় হে দুঃখের কূপ/ তোমা হতে যবে স্বতন্ত্র হয়ে আপনার পানে চাই// হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে যাহা-কিছু সব আছে আছে আছে–নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই/ নিশিদিন কাঁদি তাই/ অন্তরগ্লানি সংসারভার পলক ফেলিতে কোথা একাকার/ জীবনের মাঝে স্বরূপ তোমার রাখিবারে যদি পাই।।”

পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে! —“সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে”
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৬: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৬

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

সাল ১৯০৩, রবীন্দ্রনাথ তখন চল্লিশ পেরিয়ে গেছেন। বিয়াল্লিশ বছর বয়স। আশি বছরের জীবনের আট আনা অতিক্রান্ত। লিখলেন —
“তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা, বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে”
যাকে ক্ষয় মনে হয়, তা ক্ষয় নয়। যা ছিল আঘাত, তা আগুন হয়ে জ্বলে। ফুরিয়েছে যা, তা কেবল জীবনের ঝরা ফুল। সেই জীবন অন্ধকার পার হয়ে আলোয় মিশে অমৃত হয়। আর সেই ফুল মরণের কূল পার হলে ফল হয়ে ওঠে। বিরহ, শোকসন্তাপ, দুঃখ, মৃত্যুর পালা শেষ হয়। দু’বছর আগেই তিনি জেনেছেন “কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই”। জীবনের মাঝে সেই অসীমের স্বরূপকে চিনতে চাইবেন এবার। দু’বছরের মধ্যেই তা গভীরতর হয়ে ভারতীয় পরম্পরার তিনটি গভীর তাত্পর্যমণ্ডিত শব্দে অভিজ্ঞাত হবে। তবুও জেগে থাকে পরম শান্তি, অসীম অনন্ত, গভীর আনন্দ।

১৯০৯ সালের “আজি ঝড়ের রাতে”র শেষ চরণে “সুদূর কোন্ নদীর পারে, গহন কোন্ বনের ধারে গভীর কোন্ অন্ধকারে” পার হতে হতে ১৯১৯ সাল। লিখলেন—
“জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে, বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে// এ মোর হৃদয়ের বিজন আকাশে
তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে/ গভীর কী আশায় নিবিড় পুলকে/ তাহার পানে চাই দু বাহু বাড়ায়ে”।
এই ১৯১৯ সালে নাইট উপাধি ত্যাগ করছেন। ভারতবর্ষ তখন প্রবল বিপ্লবের অভিঘাতে আন্দোলিত।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…

জীবনের শেষ জন্মদিনের অভিভাষণে সুসভ্য জাতির বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যে বেজে চলা মরণের ডঙ্কা, মানবতার গ্লানি তাঁকে ক্ষুব্ধ, বিষণ্ণ করেছে। তিনি জানিয়েছেন—

“সিভিলিজেশন’,যাকে আমরা সভ্যতা নাম দিয়ে তর্জমা করেছি, তার যথার্থ প্রতিশব্দ আমাদের ভাষায় পাওয়া সহজ নয়। এই সভ্যতার যে রূপ আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল মনু তাকে বলেছেন সদাচার। অর্থাৎ, তা কতকগুলি সামাজিক নিয়মের বন্ধন। সেই নিয়মগুলির সম্বন্ধে প্রাচীনকালে যে ধারণা ছিল সেও একটি সংকীর্ণ ভূগোলখণ্ডের মধ্যে বদ্ধ। সরস্বতী ও দৃশদ্বতী নদীর মধ্যবর্তী যে দেশ ব্রহ্মাবর্ত নামে বিখ্যাত ছিল সেই দেশে যে আচার পারম্পর্যক্রমে চলে এসেছে তাকেই বলে সদাচার। অর্থাৎ, এই আচারের ভিত্তি প্রথার উপরেই প্রতিষ্ঠিত… তার মধ্যে যত নিষ্ঠুরতা, যত অবিচারই থাক্। এই কারণে প্রচলিত সংস্কার আমাদের আচার-ব্যবহারকেই প্রাধান্য দিয়ে চিত্তের স্বাধীনতা নির্বিচারে অপহরণ করেছিল।”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

সভ্যতার তথাকথিত ধারক-বাহকদের কল্যাণেই সঙ্কটকাল যে ঘনীভূত, তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামনে কম্পমান বিশ্বকে দেখে—
“যখন সভ্যজগতের মহিমা-ধ্যানে একান্তমনে নিবিষ্ট ছিলেম তখন কোনোদিন সভ্যনামধারী মানব-আদর্শের এতবড় নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ কল্পনা করতেই পারি নি; অবশেষে দেখছি, একদিন এই বিকারের ভিতর দিয়ে বহুকোটি জনসাধারণের প্রতি সভ্যজাতির অপরিসীম অবজ্ঞাপূর্ণ ঔদাসীন্য।… কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপমান মনে করি।”
সেই বৈশাখের মহাজন্মের লগ্নে মানবতার নতুন অভ্যুদয়ের আশাবাদ অমারাত্রির দুর্গতোরণ পার হয়ে নবজীবনের আশ্বাসে মহামানবের চরণধ্বনি শুনিয়েছিল তাঁকে।
তাঁর এই অনন্ত উপলব্ধির পথে ১৯৩৯ সালে তিনি লিখেছেন “পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে”, লিখবেন—
“যা না চাইবার তাই আজি চাই গো, যা না পাইবার তাই কোথা পাই গো/ পাব না, পাব না/
মরি অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে”

কোনটা অসম্ভব, কোনটা সত্য, কোনটাই বা অসম্ভব তার হিসেব বরং মহাকালের হাতে থাকুক। যুগে যুগে কালে কালে সুরে সুরে তালে তালে তাঁর মহানৃত্যের প্রাণবেদনায় জমিয়ে রাখা গোপন মনোভারে বিবশ বিশ্ব বারবার প্রাণচেতনায় জেগে উঠেছে। জেগেছে হয়তো কোনও বৈশাখের নিদাঘে, হয়তো বা ঘনঘোর বর্ষণের দিনে, স্মৃতিবেদনার মালাগাঁথা, দুখরজনীর সাথি কোনও বাইশে শ্রাবণের রাতে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content