
জাপানের জাদুঘরে সংরক্ষিত মা ও বাচ্চা ছুঁচোদের সারি। ছবি : সংগৃহীত।
ইন্দ্রের রাজসভায় সঙ্গীতের জমজমাট আসর বসেছে। দেবদেবীদের সঙ্গে বিখ্যাত বিখ্যাত মুনি-ঋষিরা দর্শক-শ্রোতার আসনে। তখন সঙ্গীতের সাথে নাচতে নাচতে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিলেন ইন্দ্রের রাজসভার নামী গন্ধর্ব বাদ্যকর ক্রৌঞ্চ। নাচতে নাচতে তিনি এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে একসময় বেসামাল হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। আর পড়বি তো পড় বদরাগী ঋষি বামদেবের পায়ে। বিধি বাম! ঋষি বামদেব ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। ঋষির গায়ে ধাক্কা! এত বড় অপমান! ঋষি বামদেব অভিশাপ দিলেন ক্রৌঞ্চকে — যা তুই এক্ষুনি এক ভয়ঙ্কর ছুঁচো হয়ে পৃথিবীতে গিয়ে পড়। ঋষির অভিশাপ কি ব্যর্থ হয়? সঙ্গে সঙ্গে ক্রৌঞ্চ বিশালাকার একটা ছুঁচো হয়ে পৃথিবীতে গিয়ে পড়ল। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে ভয়ঙ্কর উৎপাত শুরু করল মুনি-ঋষিদের আশ্রমে। মুনি-ঋষিরা ছুঁচোরূপী ক্রৌঞ্চের জ্বালায় রীতিমতো নাকাল হয়ে দেবতা গণেশের শরণাপন্ন হলেন। তাঁদের অনুরোধে গণেশ বিশালাকার একটি ফাঁস দিয়ে সেই ছুঁচোকে পাকড়াও করলেন এবং তার ওপর লাফ দিয়ে চেপে বসলেন। গণেশের শরীরের ভারে বেচারা ছুঁচোর তখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা! তখন সে গণেশের কাছে প্রার্থনা করল — আমাকে রক্ষা করুন, আমি চিরকাল আপনার দাস হয়ে সেবা করব। এই কথা শুনে গণেশ নিজের ওজন অনেকটা কমিয়ে ফেললেন যাতে ছুঁচোরূপী ক্রৌঞ্চ তাঁর ভার বহন করতে পারে। তখন থেকেই গণেশের বাহন হল ছুঁচো। এই কাহিনি শুনে অনেকের মনে হতে পারে গণেশের বাহন তো ইঁদুর, ছুঁচো এল কোথা থেকে? মুদগল পুরাণ অনুসারে কিন্তু গণেশের বাহন ছুঁচো। দক্ষিণ ভারতে অনেক জায়গায় গণেশের বাহন হিসেবে ছুঁচোকে দেখা যায়। অনেক প্রাচীন মূর্তিতেও তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।
এ তো গেল পৌরাণিক গল্পের কথা। কিন্তু আমাদের জীবনে ছুঁচোর গুরুত্ব কতখানি? সুন্দরবন অঞ্চলে তো বটেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে ছুঁচো প্রায় সর্বত্র দেখা যায় ইংরেজিতে তার নাম হল ‘Asian House Shrew’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Suncus murinus’। শহরাঞ্চলে সবাই না হলেও গ্রামাঞ্চলে প্রায় সবাই ছুঁচো চেনে। আশৈশব এদের দেখে আসছি। ছুঁচো পছন্দ করে এমন মানুষ সম্ভবতঃ একটিও নেই। এর প্রধান কারণ ছুঁচোর গায়ের দুর্গন্ধ। বাংলা প্রবাদ রয়েছে ‘ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে নেই’! গন্ধ মানে বিকট দুর্গন্ধ। ওদের কাঁধের পিছনে রয়েছে দুর্গন্ধ ছড়ানোর গ্রন্থি। বিপদে পড়লে এই গ্রন্থি থেকে দুর্গন্ধযুক্ত রাসায়নিক বেশি পরিমাণে নিঃসৃত হয়। তখন ঘরের মধ্যে টেকা দায়। এই কারণে এদের কেউ আঘাত করতে বা মারতে চায় না। অন্য কোনও প্রাণীও এদের এই দুর্গন্ধের জন্য শিকার করে না কিংবা ভুলবশত মেরে ফেললেও খায় না। শুধু শরীর থেকে নয়, এদের মলমূত্রেও রয়েছে বিচ্ছিরি দুর্গন্ধ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৮২ : আকাশ এখনও মেঘলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭১: কৃষ্ণের প্রতি ভীষ্মের শ্রদ্ধার্ঘ্য, শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে মানুষ ও দেবতার সমন্বয়

শ্রদ্ধাঞ্জলি : বাইশে শ্রাবণ
ছোট থেকে দেখেছি ঘরের মধ্যে ছুঁচো দরজার নিচে ছোট্ট ফাঁক দিয়ে ঢুকে যেত। তারপর রান্নাঘরে যেখানে থালা-বাসন থাকে সেখানে ঘুরে বেড়াত। বিচ্ছিরি ধরনের একরকম কিচকিচ আওয়াজ করে এরা। শুনে মনে হবে কোনও লোহার টুকরো দিয়ে স্টিলের বাসনের উপর ঘসার বা মসৃণ ব্ল্যাকবোর্ডে পাথুরে চক দিয়ে লেখার সময় তৈরি হওয়া শব্দ। এই শব্দ শুনেই বোঝা যায় ছুঁচো ঘরে ঢুকেছে। ওদের শরীরের আঘাতে থালা-বাসনেও অনেক সময় টুংটাং আওয়াজ হয়। আর তখন ঘরে আলো জ্বালালে দেখা যায় দেয়াল বরাবর দৌড়ে পালাচ্ছে। ওদেরকে কখনও মেঝের মাঝখান দিয়ে দৌড়াতে দেখিনি। বেরোনোর পথ যত দূরেই হোক না কেন দেয়ালের ধার দিয়েই এরা দৌড়োবে। এটাই এদের স্বভাব।

(বাঁদিকে) জঙ্গলে শুকনো পাতার মাঝে ছুঁচো। (ডানদিকে) ছুঁচোর বাচ্চা। ছবি : সংগৃহীত।
ছোটবেলায় ভাবতাম এরা ঘরের মধ্যে ঢোকে রান্নাঘর থেকে এঁটো-কাঁটা খাওয়ার জন্য। কিন্তু পরে জানলাম, না, এরা আসলে পতঙ্গভুক প্রাণী। আরশোলা, বিছে, ফড়িং, উচ্চিংড়ে, গুবরে পোকা ইত্যাদি হল এদের প্রিয় খাবার। তবে মাছের কাঁটা, মাংসের হাড় ইত্যাদি এরা খায়। মুখে করে টেনে নিয়ে যেতে দেখেছি। এরা রান্নাঘর ছাড়াও শৌচাগারে নিয়মিত ঢুকে যেত। নিশ্চিতভাবে পোকামাকড়ের খোঁজে। একবার শৌচাগারে প্যানের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। তারপর সে কী দুর্গন্ধ!
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৮ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ১

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
গন্ধ ছাড়াও আকৃতিগতভাবে ইঁদুরের সঙ্গে ছুঁচোর অনেক পার্থক্য রয়েছে। চোখে দেখেই বোঝা যায় কোনটা ইঁদুর আর কোনটা ছুঁচো। ছুঁচোর মুখ ইঁদুরের থেকে অনেক লম্বা ও সূচালো। চোখগুলো ছোট ছোট আর কুতকুতে। গোলাকার কানদুটো সামনের দিকে একটু বাঁকা। এদের পাগুলো খুব ছোট, আর প্রতি পায়ে আছে পাঁচটা করে নখরযুক্ত আঙুল। লেজটা ইঁদুরের থেকে অনেকটাই ছোট এবং গোড়ার দিকে বেশ মোটা, কিন্তু আগার দিক খুব সরু। লেজের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে খোঁচা খোঁচা লোম। গায়ে লোমের রঙ হালকা ধূসর বা বাদামি ধূসর। এরা লম্বায় হয় ১০ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার আর ওজন পুরুষদের ক্ষেত্রে ৩৩ থেকে ১৪৭ গ্রাম ও স্ত্রীদের ক্ষেত্রে ২৩.৫ থেকে ৮২ গ্রাম। এদের মাথার খুলি লম্বা এবং বেশ শক্তপোক্ত। এদের দাঁতের আগার দিকের রঙ হালকা লাল। আগেই বলেছি, এদের কাঁধের পেছনে ত্বকে রয়েছে দুর্গন্ধযুক্ত পদার্থ নিঃসরণকারী গ্রন্থি। আত্মরক্ষার বা বিপদে পড়ার সময় ছাড়াও প্রজনন ঋতুতে পুরুষরা এই গ্রন্থি থেকে গন্ধ ছড়ায়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৯ : নুনিয়ার টান

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা
রাত্রিবেলায় এদের ঘরের মধ্যে ঢুকতে দেখলেও এদের বাসা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘরের বাইরে বর্জ্য বা আবর্জনার স্তুপের ভিতরে, পরিত্যক্ত বাড়ি বা কক্ষের ভেতরে, কিংবা বাড়ির ফাটলের মধ্যে যেখানে সরাসরি দিনের আলো পৌঁছোয় না। অন্ধকার এদের খুব প্রিয়। তাই এরা খাবারের খোঁজে বেরোয় রাতে আর দিনের বেলায় বাসায় বিশ্রাম নেয়। সুন্দরবন অঞ্চলে এদের জঙ্গল এলাকায় পাওয়া যায় না। দেখা যায় কেবল জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে কারণ ভেজা কাদামাটি এদের একেবারেই না-পসন্দ। তবে জনবসতি এলাকায় যদি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ কাছাকাছি থাকে তবে তাদের মূলের ঘন জালের ভেতর ছুঁচোর আস্তানা থাকতে পারে।

স্ত্রী ও পুরুষ ছুঁচোর জুটি। ছবি : সংগৃহীত।
আগেই বলেছি, এদের প্রিয় খাবার হল পোকামাকড়। তবে কখনও কখনও উদ্ভিজ্জ খাবারও খায়। উদ্ভিজ্জ খাবারের মধ্যে রয়েছে ফল, বীজ বা শস্যদানা। অবশ্য পোকামাকড়ের অভাব হলে তখনই এরা উদ্ভিজ্জ খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। যেহেতু এরা নিশাচর এবং এদের মৌল বিপাক হার (BMR) অনেকটাই বেশি তাই এদের রাতের মধ্যেই অনেকটা খাবার সংগ্রহ করতে হয়। এরা ক্ষিদে একদম সহ্য করতে পারে না। দেখা গিয়েছে একটা ছুঁচো তার দেহের ওজনের দেড় থেকে দ্বিগুণ খাবার এক রাতে খায়। এই জন্যই খাবারের জন্য এরা এত ছুক ছুক করে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে
সুন্দরবন অঞ্চলে এদের প্রজননের প্রকৃষ্ট সময় হল গরম ও বর্ষার সময়। এই সময় পুরুষ ও স্ত্রী ছুঁচো মিলে বাসা বানায়। অনেকটা বলের মতো দেখতে গোলাকার বাসার উপকরণ হল কাগজ, কাপড়, দড়ি, প্লাস্টিক ইত্যাদির টুকরো। অনেক সময় শুকনো ঘাস, পাতা ও গাছের শেকড়ও ব্যবহার করে। স্ত্রী ছুঁচোর গর্ভাবস্থা প্রায় এক মাস স্থায়ী হয়। একবারে গড়ে ৩টি বাচ্চার জন্ম দেয়, তবে ১ থেকে ৮টি বাচ্চাও জন্ম দিতে সক্ষম। সাধারণত বছরে এরা দু’বার বাচ্চা দেয়। ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে বাচ্চারা দুধ ছেড়ে মায়ের পিছু নেয়। এই সময় দেখা যায় মায়ের লেজ ধরে বাচ্চাদের সারি। প্রথম বাচ্চাটি মা ছুঁচোর লেজ ধরে, বাকি বাচ্চারা পরস্পরের লেজ ধরে থাকে। ছুঁচো আমাদের কাছে ঘেন্নার প্রাণী হলেও দৃশ্যটি কিন্তু নয়নাভিরাম। এক বছর বয়স হলে ছুঁচো প্রজননে সক্ষম হয়। আর এরা বাঁচে সাধারণত: দু’বছর। এই কারণে এদের বংশবিস্তার হার ইঁদুরের থেকে অনেক অনেক গুণ কম। ছুঁচোর সংখ্যাও তাই কম।

মুদগল পুরাণের কাহিনি অনুসারে গনেশের বাহন ছুঁচো। ছবি : সংগৃহীত।
সুন্দরবন অঞ্চলে জনবসতি এলাকায় ছুঁচোর সংখ্যা কম হলেও এরা বিপন্ন নয়। যেহেতু এরা নানা ধরনের পোকামাকড় প্রচুর পরিমাণে শিকার করে তাই ফসলের ও শস্য গুদামের পোকামাকড়ের সংখ্যা কম রাখতে এরা ভীষণভাবে সাহায্য করে। সম্ভবতঃ এই কারণেই ভারতের কিছু প্রাচীন জনজাতি ছুঁচোকে ক্ষুদে দেবীর মর্যাদা দিয়েছে। তাদের কাছে ছুঁচো হল বাড়ির ভেতরের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখার জন্য মাতৃসম প্রাণী। তাছাড়া দক্ষিণ ভারতে গণেশের বাহন হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে পূজিত হওয়ায় ছুঁচোকে হত্যা করা হয় না। এইসব কারণেই ছুঁচো বিপন্ন প্রাণী নয়। ছুঁচো উপকারী প্রাণী। তাই এদের রক্ষা করাও আমাদের কর্তব্য।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















