
মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য। ছবি : সংগৃহীত।
ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাদের ইতিহাসে নানা বৈপরীত্যের মাঝেও উজ্জ্বল হয়ে আছেন বীরচন্দ্র। রাজ্যাধিকার থেকে রাজ্য পরিচালনা সর্ব ক্ষেত্রেই যেন বিতর্ক তাড়া করেছে তাঁকে। তারপরও বলতে হবে তিনি ছিলেন এক আশ্চর্য গুণসম্পন্ন নৃপতি। একাধারে বীরচন্দ্র কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, চিত্রকর, ফটোগ্রাফার, প্রশাসক এবং নিশ্চিত ভাবে বিরাট কূটনীতিকও ছিলেন। ভাবতে অবাক লাগে, যিনি রাজপরিবারের পরিচারিকা মহিলাদের ফটো তোলা কিম্বা বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন অর্থাৎ ‘নিষিদ্ধ ছবি’ নিয়ে সময় ব্যয় করেন, তিনিই কি না সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ছিলেন মদিরা সেবনে! যে রাজা প্রথম রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ভুবনজয়ী প্রতিভার সম্ভাবনা লক্ষ্য করেছিলেন, সংবর্ধনা জানিয়েছিলেন বালক কবিকে, সেই রাজা বীরচন্দ্র কী করে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র নবদ্বীপচন্দ্রকে বন্দি করে অনাহারে রাখেন?
বীরচন্দ্রের রাজত্বকালেই (১৮৬২-৯৬ খ্রিঃ) আধুনিকতার পথে যাত্রা শুরু হয় পার্বত্য রাজ্য ত্রিপুরার। কিন্তু এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে তিনি রাজ্যভার গ্ৰহণ করেছিলেন। একদিকে ইংরেজদের রক্তচক্ষু এবং অপরদিকে সিংহাসনের একাধিক দাবিদার। রাজ্যে দারুণ আর্থিক সংকট, আবার সশস্ত্র প্রজা বিদ্রোহ। ঘরে বাইরে শত্রু। তবু এর মধ্যে এক আশ্চর্য দক্ষতায় দু’নৌকায় পা দিয়েই যেন নদী পেরিয়ে গেলেন বীরচন্দ্র! প্রায় ৩৪ বছর রাজত্ব করেছিলেন তিনি। তাঁর এই দীর্ঘ রাজত্বকালে ছিল ঘটনার ঘনঘটা। রাজ্যভার গ্রহণের প্রথম আট বছরে ডিফেক্টো রাজা হিসেবে এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শাসনকার্য পরিচালনা, রাজত্ব নিয়ে মামলা মোকদ্দমা, প্রজা বিদ্রোহের মোকাবিলা-সহ ইংরেজদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে চলতে হয়েছে তাঁকে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, পর্ব-১০৭ : পূর্বোত্তরে বাড়ছে শিশু নিখোঁজের ঘটনা

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৬: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৬

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭১: কৃষ্ণের প্রতি ভীষ্মের শ্রদ্ধার্ঘ্য, শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে মানুষ ও দেবতার সমন্বয়

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা
সিংহাসনে আনুষ্ঠানিক অভিষেকের পর বীরচন্দ্রকে সামাল দিতে হয়েছে কুকি বিদ্রোহ, ছাগলনাইয়ার কৃষক বিদ্রোহ ইত্যাদি, মোকাবিলা করতে হয়েছে কখনও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের, কখনও বা ইংরেজ আধিপত্য কায়েমের। এ সব সত্ত্বেও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি রাজার অপরিসীম অনুরাগ, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক, রাজদরবারে দেশ-বিদেশের গুণীজনদের সমাবেশ বীরচন্দ্রের রাজত্বকালকে ঔজ্জ্বল্য দান করেছে। কিন্তু সিংহাসন অধিকারে তাঁর কূটনীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কথাও হারিয়ে যায়নি!
আরও পড়ুন:

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের ১লা আগস্ট মৃত্যু ঘটে ঈশানচন্দ্র মাণিক্যের (১৮৪৯-৬২ খ্রিঃ)। রাজা কিছুদিন ধরে পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। রাজার মৃত্যুর পর এক রোবকারী অর্থাৎ রাজাদেশ মূলে রাজ্যভার গ্রহণ করেন প্রয়াত রাজার ছোট ভাই বীরচন্দ্র। ঈশানচন্দ্র মাণিক্যের মৃত্যুর তিনদিন পর রাজ্যের জজ-ম্যাজিস্ট্রেট-সহ ইংরেজ আধিকারিকদের কাছে পৌঁছে যায় এক ‘রোবকারী’ যাতে দেখা যায় বাতব্যাধিতে পীড়িত রাজা তাঁর ভাই বীরচন্দ্রকে যুবরাজ এবং প্রথম পুত্র ব্রজেন্দ্র চন্দ্রকে বড়ো ঠাকুর ও দ্বিতীয় পুত্র নবদ্বীপচন্দ্রকে কর্তা পদে নিয়োগ করে গিয়েছেন। কিন্তু প্রয়াত রাজার অপর দুই ভাই নীলকৃষ্ণ ও চক্রধ্বজ এই ‘রোবকারী’ অস্বীকার করলেন। এ নিয়ে রাজপরিবার-সহ রাজধানী শহরে শুরু হয়ে গেল তুমুল বিতর্ক।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…
কেউ বললেন, মৃত্যুর আগের দিন রাজা ঈশানচন্দ্র এইসব নিয়োগ করে ‘রোবকারী’-তে স্বাক্ষর করে গিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বললেন, এই ‘রোবকারী’ জাল,এটি এক চক্রান্তের ফসল। উল্লেখ করা যায় যে, রাজার অবর্তমানে ‘যুবরাজ’ হলেন সিংহাসনের প্রথম দাবিদার এবং ‘বড় ঠাকুর’ দ্বিতীয় দাবিদার। তাই ঈশানচন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজ্যভার গ্রহণ করে নিলেন বীরচন্দ্র। কিন্তু ‘রোবকারী’ অস্বীকার করে সিংহাসনের দাবিতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানালেন প্রয়াত রাজার অপর দুই ভাই নীলকৃষ্ণ ও চক্রধ্বজ।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৮ : পথে এবার নাম সাথী
চট্টগ্রামের ইংরেজ কমিশনার তখন বাংলা সরকারকে জানালেন যে, ঈশানচন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজত্বের অনেক দাবিদার হাজির হয়েছে। এর মধ্যে দখলদার আছেন রাজা বীরচন্দ্র। কমিশনার এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, গভর্নমেন্টের একজনকে দখলদার রাজা স্বীকার করে অন্যদের দেওয়ানী আদালতে গিয়ে জমিদারী স্বত্ব সাব্যস্ত করার উপদেশ দিলেই চলবে। চট্টগ্রামের কমিশনারের সুপারিশ মেনে নেন বাংলার গভর্নর। বীরচন্দ্রকে ত্রিপুরার ডিফেক্টো রাজা হিসেবে স্বীকার করে অন্যান্য দাবিদারদের আদালতে যাবার পরামর্শ দেয়া হয়। তারপর নীলকৃষ্ণ ও চক্রধ্বজ বীরচন্দ্রের বিরুদ্ধে দেওয়ানী আদালতে মামলা করেন। দীর্ঘকাল ব্যাপী চলে তা। দেওয়ানী আদালত থেকে হাইকোর্ট হয়ে প্রিভি কাউন্সিল। অবশেষে ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ প্রিভি কাউন্সিল রায় দেয় বীরচন্দ্রের পক্ষে। তারপর ইংরেজ সরকারের অনুমতি ক্রমে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ৯ মার্চ আনুষ্ঠানিক ভাবে সিংহাসনে বীরচন্দ্রের অভিষেক ঘটে।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















