
ছবি : সংগৃহীত।
১৮৯১ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ফটোগ্রাফিক ইন্টারন্যাশনাল এগ্জিবিশানে মহারাজ বীরচন্দ্রের ছবি প্রদর্শিত এবং উচ্চ প্রশংসিত হয়েছিল। ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার জার্ণালে বীরচন্দ্রের ফটোগ্রাফি চর্চা নিয়ে প্রকাশিত লেখা সূত্রে জানা যায় যে,মৃত্যুর কিছুদিন আগে রাজা এক্স-রে ছবি তোলার যন্ত্রপাতি কিনেছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি এসে পৌঁছবার আগেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।বীরচন্দ্রের রাজত্বকালে অ্যাপোলোনিয়াস নামে এক ফরাসি ফটোগ্রাফার কিছুদিন আগরতলায় ছিলেন।
কলকাতায় তাঁর শেষ সফরকালে রাজা হাফটোন ব্লক তৈরির পদ্ধতি শিখেছিলেন বলে জানা যায়।এমনকি অনেকের মতে সেলফি তোলার প্রথম কৃতিত্বও ত্রিপুরার এই রাজার। রানি মনমোহিনী দেবীর সঙ্গে রাজার বহুল প্রচারিত একটি ছবিকে সে যুগের এক অভিনব সেলফি বলে উল্লেখ করেছেন অনেকে। ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত একটি লম্বা তারের একদিকে শাটার লাগানো ছিল। অপরদিকে একটি লাঠিতে লাগানো লিভারের সাহায্যে রাজা নিজেই শাটার টেনে বিখ্যাত সেই ছবিটি তুলেছিলেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১০ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৩

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৪৮: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৮

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৬ : ঘটজাতক/১ : নিয়তিঃ কেন বাধ্যতে?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮১: সীমান্ত-সংঘাত
এবার আসা যাক রাজার চিত্রাঙ্কনের কথায়। রাজভবনের বাগান বাড়ির কক্ষে ছিল রাজার চিত্রাঙ্কন সহ শিল্প চর্চার স্টুডিয়ো। এই ঘরে রাজার অনুমতি ব্যতীত রাজপরিবারেরও কারও প্রবেশাধিকার ছিল না। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ঘরটির নামকরণ হয়েছিল ‘মানাঘর’। রাজার এডিসি কর্ণেল মহিম ঠাকুরের ‘দেশীয় রাজ্য’ গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, বীরচন্দ্র বিবসনা রমণীর ছবি আঁকতেন। সে সময়ে ‘মানাঘরে’ কারও প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকতো। বীরচন্দ্রের দরবারে তখন চাকরি করতেন শ্রীনিবাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৩: কেউটে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
শ্রীনিবাস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন: ”…কোন বিবসনা রমণীর চিত্র অঙ্কিত করিতে বসিলে দুচারিটী বিশিষ্ট লোক ভিন্ন অন্য লোকের গৃহে প্রবেশ নিষেধ হইত। দরবারের ভাষায় বলা হইত ‘সাক্ষাৎ মানার ছবিতে’ আছেন অর্থাৎ নিষিদ্ধ ছবি লইয়া আছেন।”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৩: চেদিরাজ শিশুপালের কৃষ্ণবিদ্বেষ কি কৃষ্ণেরই কোন পরিকল্পিত ইচ্ছার প্রকাশ?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা
রাজার জীবন কথায় শ্রীনিবাসবাবু আরও লিখেছেন, “তাঁহার সর্ব্বোৎকৃষ্ট চিত্রগুলি সাধারণ লোকের রুচির হিসাবে অশ্লীলতাপূর্ণ।…উদার আকাশের ক্রোড়ে শুভ্র সূর্যালোকে রূপ-যৌবন-স্বাস্হ্য-শোভনা রমণীর নগ্ন সৌন্দর্য শিল্প হিসাবে কি রূপ মনোহর ও মহামূল্য, তাহা এ দেশের লোকের এখনও শিখিবার বিষয়।”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?
বীরচন্দ্রের বহুমুখী প্রতিভা যেমন আমাদের মুগ্ধ করে,তেমনই তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। বৈষ্ণব ভক্ত কবি রাজা বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন করেন, পরিচারিকা মহিলাদের ফটো তোলেন, আবার তন্ময় হয়ে যান ঝুলন গীতিতে। তিনি রাজনীতিক, কূটনীতিকও। কিন্তু রাজার কঠোর সমালোচক ঐতিহাসিক কৈলাসচন্দ্রের মতে বীরচন্দ্র ছিলেন ‘পানাদি দোষে বর্জ্জিত’! সুরাপান, বাইজি নাচ-এ সব রাজাদের সহজাত প্রবৃত্তি হলেও বীরচন্দ্র ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি সুরা পান করতেন না,পছন্দ করতেন না বাইজি নাচ। সব মিলিয়ে নানা বৈপরীত্যের মাঝেও উজ্জ্বল ঊনবিংশ শতাব্দীর এই রাজা একবিংশ শতাব্দীতেও যেন আমাদের জন্য আগ্রহ সৃষ্টি করেন।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















