
ছবি : প্রতীকী।
রাজা যুধিষ্ঠিরের প্রেরিত যুদ্ধজয়ী, পাণ্ডবানুজ নকুল, হস্তিনাপুরে পৌঁছে ভীষ্ম ও ধৃতরাষ্ট্রকে রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানালেন। যোগ্য সম্মানের সঙ্গে আমন্ত্রিত মুখ্য আচার্যগণ এবং অন্যান্য অগ্রবর্তী ব্রাহ্মণরা নিমন্ত্রণরক্ষার্থে সানন্দে যজ্ঞানুষ্ঠানের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। যজ্ঞের বার্তা শুনে, সন্তুষ্টমনে যজ্ঞবিৎ শত শত মানুষ সভা (ময়দানবের শ্রেষ্ঠ নির্মাণ) ও ধর্মরাজ পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠিরকে দেখবার ইচ্ছায় এবং নানা দিক হতে ক্ষত্রিয়রা বিবিধ শ্রেষ্ঠ রত্নসমূহ নিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে এলেন, ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, মহামতি বিদুর, পুরোভাগে দুর্যোধন-সহ সকল কৌরব ভাইয়েরা, গান্ধাররাজ সুবল, মহাবল শকুনি, অচল, বৃষক, রথিশ্রেষ্ঠ কর্ণ, বলশালী শল্য, মহাবল বাহ্লিক, কুরুকুলজাত সোমদত্ত,ভূরি, ভূরিশ্রবা এবং শল। অশ্বত্থামা, আচার্য কৃপ, দ্রোণাচার্য, সিন্ধুদেশীয় রাজা জয়দ্রথ সপুত্র (ধৃষ্টদ্যুম্ন-সহ) যজ্ঞসেন (দ্রুপদরাজ), ভূপতি শাল্ব, সমুদ্রের নিকটবর্তী জলপ্রায়দেশের ম্লেচ্ছগণ-সহ প্রাগ্জ্যোতিষপুরের রাজা মহারথ ভগদত্ত, পার্বত্যপ্রদেশের রাজারা, বৃহদ্বল রাজা, পৌণ্ড্রদেশের অধিপতি বাসুদেব, বঙ্গ ও কলিঙ্গরাজ, আকর্ষ, কুন্তল, মালব, অন্ধ্র, দ্রাবিড়, সিংহল এবং কাশ্মীরের রাজা, কুন্তিভোজবংশীয় মহাতেজস্বী রাজা গৌরবাহন, বাহ্লীকদেশীয় বীর অন্যান্য রাজারা, সপুত্র বিরাট রাজা, মহাবল মাবেল্ল রাজা, নানা জনপদের রাজারা ও রাজপুত্ররা, দুর্জয় মহাশৌর্যবান রাজা শিশুপাল সপুত্র, পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের আয়োজিত যজ্ঞে এসে উপস্থিত হলেন।
সেই মহাযজ্ঞে এসে পৌঁছলেন বলরাম, অনিরুদ্ধ, কঙ্ক, সারণ, গদ, প্রদ্যুম্ন, শাম্ব, শৌর্যবান চারুদেষ্ণ, উল্মুক, নিশঠ, বীর অঙ্গাবহ এবং অন্য যত মহারথ বৃষ্ণিবংশীয়রা। এনারা ছাড়াও মধ্যদেশের (হিমালয় ও বিন্ধপর্বতের মধ্যবর্তী দেশগুলি) অন্যান্য বহু রাজারা, পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠিরের আয়োজিত রাজসূয়যজ্ঞে এলেন। ধর্মরাজের আদেশানুসারে তাঁদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হল। সেখানে বহুরকম খাদ্য তো ছিলই, আরও ছিল দীঘি ও সুন্দর গাছগুলির শোভা। সেখানে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির অতিথিদের সম্মানিত করলেন। সমাদৃত রাজারা যথানির্দিষ্ট আবাসে চলে গেলেন।
কৈলাসপর্বতের শিখরের মতো উন্নত, মনোহর, সুন্দরভাবে সজ্জিত, সুগঠিত শুভ্র সবদিকে অনুচ্চ প্রাচীরে ঘেরা, সোনার জালে ঢাকা, রত্নখচিত পীঠগুলি ছিল এগুলির শোভা— এমনই ছিল সেই বাসগৃহগুলি। এদের সিঁড়িগুলি ছিল স্বচ্ছন্দে আরোহণযোগ্য। বড় বড় আসন ও পোশাকসামগ্রী মজুদ ছিল সেখানে। ফুলমালায় আবৃত, শ্রেষ্ঠ অগরুর সৌরভে পরিপূর্ণ ভবনগুলির রং ছিল হাঁস ও চাঁদের বর্ণের মতো। এক যোজন দূর থেকেও সুস্পষ্টভাবে দর্শনীয় ছিল ভবনগুলি। আবাসভবনগুলি পরস্পর পৃথক পরিসরযুক্ত, সবগুলির প্রবেশদ্বার সমান, সেগুলি চিত্রপট প্রভৃতি গুণানুষঙ্গে বিভূষিত ছিল। হিমালয়ের শৃঙ্গের মতো বিভিন্ন ধাতুসংযোগে (গৈরিক বর্ণ প্রভৃতি) সেগুলি ছিল বিচিত্র। বিশ্রামান্তে রাজারা বহু সদস্য-সহ, প্রচুর দক্ষিণা দানকারী ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দেখা করলেন। সমবেত রাজা, ব্রাহ্মণ, মহর্ষিগণে পরিপূর্ণ সেই সভা দেবগণ পরিবৃত সুরলোকের শোভা ধারণ করল।
কৈলাসপর্বতের শিখরের মতো উন্নত, মনোহর, সুন্দরভাবে সজ্জিত, সুগঠিত শুভ্র সবদিকে অনুচ্চ প্রাচীরে ঘেরা, সোনার জালে ঢাকা, রত্নখচিত পীঠগুলি ছিল এগুলির শোভা— এমনই ছিল সেই বাসগৃহগুলি। এদের সিঁড়িগুলি ছিল স্বচ্ছন্দে আরোহণযোগ্য। বড় বড় আসন ও পোশাকসামগ্রী মজুদ ছিল সেখানে। ফুলমালায় আবৃত, শ্রেষ্ঠ অগরুর সৌরভে পরিপূর্ণ ভবনগুলির রং ছিল হাঁস ও চাঁদের বর্ণের মতো। এক যোজন দূর থেকেও সুস্পষ্টভাবে দর্শনীয় ছিল ভবনগুলি। আবাসভবনগুলি পরস্পর পৃথক পরিসরযুক্ত, সবগুলির প্রবেশদ্বার সমান, সেগুলি চিত্রপট প্রভৃতি গুণানুষঙ্গে বিভূষিত ছিল। হিমালয়ের শৃঙ্গের মতো বিভিন্ন ধাতুসংযোগে (গৈরিক বর্ণ প্রভৃতি) সেগুলি ছিল বিচিত্র। বিশ্রামান্তে রাজারা বহু সদস্য-সহ, প্রচুর দক্ষিণা দানকারী ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দেখা করলেন। সমবেত রাজা, ব্রাহ্মণ, মহর্ষিগণে পরিপূর্ণ সেই সভা দেবগণ পরিবৃত সুরলোকের শোভা ধারণ করল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৬: রাক্ষস খরের নিধনের নিরিখে রামচন্দ্রের মূল্যায়ন

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৪ :কালাদেও নয়?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৫ : নিশীথে
যুধিষ্ঠির, পিতামহ ভীষ্ম ও গুরু ও গুরুপ্রতিমদের (দ্রোণাচার্য, কপাচার্য, ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি) ঘনিষ্ঠদের অভিবাদন জানালেন। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, দুর্যোধনদের অনুনয়সহকারে বললেন, অস্মিন্ যজ্ঞে ভবন্তো মামনুগৃহ্ণন্তু সর্ব্বশঃ। এই যজ্ঞে আপনারা আমায় অনুগ্রহ করুন। তিনি জানালেন এই যজ্ঞে আমার যে বিপুল সম্পদ আছে সেই সবই আপনাদের। ইদং বঃ সুমহচ্চৈব যদিহাস্তি ধনং মম। যুধিষ্ঠিরের প্রার্থনা— তাঁরা যেন স্বেচ্ছায় যুধিষ্ঠিরকে পরিচালিত করেন। এই বলে, যজ্ঞে দীক্ষিত জ্যেষ্ঠ পাণ্ডধ যুধিষ্ঠির তাঁদের যথাযোগ্য কাজে নিযুক্ত করলেন। তিনি দুঃশাসনকে ভোজ্য খাদ্য ও পানীয় (রক্ষণাবেক্ষণ প্রভৃতি) বিষয়ে নিযুক্ত করলেন। ব্রাহ্মণদের সাদর অভ্যর্থনার কাজে, অশ্বত্থামাকে যুক্ত করলেন। রাজাদের সসম্মানে আদরযত্নের জন্য সঞ্জয়কে নিযুক্ত করলেন। কর্তব্য ও অকর্তব্য নির্দ্ধারণের দায়িত্ব মহাবুদ্ধিমান ভীষ্ম ও দ্রোণর। রূপা, সোনা, রত্ন প্রভৃতির রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষিণাদান বিষয়ে কৃপাচার্যকে নিযুক্ত করলেন রাজা যুধিষ্ঠির। এ ছাড়া অন্যান্য পুরুষশ্রেষ্ঠদের (কর্ণ প্রভৃতিদের) তাঁদের উপযুক্ত কাজে নিযুক্ত করলেন। নকুল যাঁদের এনেছিলেন, সেই বাহ্লীক, ধৃতরাষ্ট্র, সোমদত্ত, জয়দ্রথ, তাঁরা সকলে প্রভুর মতো (নিয়োগ ও আদেশদান প্রভৃতি কাজ যাঁর) বিচরণ করতে লাগলেন। সর্বধর্মজ্ঞ বিদুর ব্যয়সংক্রান্ত (যজ্ঞের ও আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদির মূল্যদান প্রভৃতি বিষয়) দায়িত্বে নিযুক্ত হলেন। দুর্যোধনের কাজ হল সকলের আনীত উপহারাদিগ্রহণ। আনন্দিতমনে পুণ্যফললাভের আশায় স্বয়ং কৃষ্ণ স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে, মাননীয় ব্রাহ্মণদের চরণ ধুয়ে দিতে প্রবৃত্ত হলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এবং তাঁর সভার দর্শনার্থীরা যে সব উপহার এনেছিলেন সেগুলির কোনটার মূল্য হাজার মুদ্রার কম নয়। বহু ধনরত্নে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের শ্রীবৃদ্ধি হল। (সমাগত) রাজাদের মধ্যে ধনদানের প্রতিযোগিতা শুরু হল, প্রত্যেকের (মনোগত) ইচ্ছা—কী করে কুরুরাজ যুধিষ্ঠির আমার প্রদত্ত রত্নদানের মাধ্যমে যজ্ঞ সম্পন্ন করেন কথন্তু মম কৌরব্যো রত্নদানৈঃ সমাপ্নুয়াৎ। ভবনগুলির ব্যোমযানযুক্ত (শূন্যে চলাচলের উপযোগী যান) উপরিভাগ, জল আছে সেখানে, সেগুলি সৈন্যদল পরিবেষ্টিত। সেই ভবনগুলিতে আছে লোকরাজের (একাধারে বৈশ্য, বণিক ও ধনীদের রাজা) ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত ব্যোমযান। ব্রাহ্মণদের আবাসগুলি ছিল এগুলির সংলগ্ন। সেগুলি স্বর্গীয়বিমানতুল্য, বিচিত্র রত্নাদিবিশিষ্ট ও পরম সমৃদ্ধ। পরম শ্রীমান ও প্রাচুর্য-সহ রাজারা সমবেত হলেন।যুধিষ্ঠিরের সভা, শোভা বিস্তার করল।যুধিষ্ঠির সমৃদ্ধিতে যেন বরুণদেবের প্রতিযোগী ছিলেন। ষড়গ্নিবিশিষ্ট এবং প্রভূত দক্ষিণাদাতা যুধিষ্ঠির যজ্ঞ করলেন। তিনি সমস্ত মানুষের সব কামনা পূরণ করে, সন্তুষ্ট করলেন। সেই জনসমাগমে প্রচুর অন্ন ও খাদ্যের ব্যবস্থা ছিল। সেগুলির অনেক উপভোগকারীও ছিল। রত্নোপহারে (বিনিময়ে) পরিপূর্ণ ছিল সেই জনসমাগম। মন্ত্রশিক্ষাবিশারদ মহর্ষিরা, মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে, ঘিসহ আহুতি প্রদান করে, বিস্তারিত সেই যজ্ঞ সমাপ্ত করলেন, দেবতারা তৃপ্ত হলেন। সেই যজ্ঞে যেমন দেবতা তেমনই ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য বর্ণের সমস্ত মানুষ, যথাযোগ্য দক্ষিণা ও অন্নপানীয় প্রভৃতি (দাক্ষিণ্যরূপে) লাভ করে পরম আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত হলেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৯ : জলসাঘর—অস্তশিখর

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৮: কালো ইঁদুর
রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞের আয়োজনে সমগ্র আর্যাবর্তের অন্তর্গত রাষ্ট্রশক্তিগুলি আমন্ত্রিত হয়েছিল। যুধিষ্ঠিরের শক্তির উৎসটি ধরে রেখেছিলেন চারজন দৃঢ় স্তম্ভ, তাঁর চার ভাই, যাঁরা এই যজ্ঞভূমির মাটি প্রস্তুত করেছিলোন। সেই যজ্ঞোপলক্ষ্যে সমবেত হয়েছিলেন সমগ্র অধীনস্থ বশীভূত অনুগত রাজবৃন্দ।শুধু অভিজাত রাজাদের উপস্থিতি এই যজ্ঞভূমিকে মহিমান্বিত করেছে, তা নয়। যজ্ঞোপলক্ষ্যে একটি সামাজিক ঐক্যবন্ধনের সার্বিক রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। অভিজাত রাজারা ছাড়াও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন সাধারণ ক্ষত্রিয় এবং যুধিষ্ঠিরের স্বনামধন্য আত্মীয়স্বজন, যাঁদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য,তাঁরা হলেন—পিতৃতুল্য জ্যেষ্ঠ পিতা ধৃতরাষ্ট্র, পিতামহ ভীষ্ম, শুভাকাঙ্খী মহামতি বিদুর, শত ভাই-সহ দুর্যোধন, দুর্যোধনের মাতুল শকুনি ও দুর্যোধনের বন্ধু রথিশ্রেষ্ঠ কর্ণ প্রভৃতি ব্যক্তিত্ব। গুরু দ্রোণাচার্য, কপাচার্য, গুরুপুত্র অশ্বত্থামার উপস্থিতিও যুধিষ্ঠিরকে গৌরবান্বিত করছিল। বিজিত উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ,পশ্চিমের কোনও রাজাই বাদ পড়েননি। যুধিষ্ঠিরের মহত্ত্ব তাঁর বিনয়াবনত ভাবমূর্তি। একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী, সম্রাটপদে অধিষ্ঠিত যুধিষ্ঠির,অপরাপর কুরুমুখ্য এবং গুরুদের অনুগ্রহ প্রার্থনা করেছেন, প্রণয়ন্তু ভবন্তো মাং যথেষ্টমভিমন্ত্রিতাঃ আপনাদের স্বাভিমতানুসারে আমাকে চালিত করুন (কাজে প্রাণিত করুন)। ক্ষমতার উচ্চ শিখরে অবস্থান করেও যাঁর নিজের আচরণে পরিমিতিবোধ আছে, যিনি ঔদ্ধত্যে নয় শিষ্টাচারে বিশ্বাসী তিনিই সর্বোচ্চ ক্ষমতার যোগ্য, যুধিষ্ঠির সেটা প্রমাণ করেছেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৩ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /২

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
তিনি শত্রুমিত্রনির্বিশেষে নিজস্ব পরিমণ্ডলের আমন্ত্রিত সকলকে তাঁদের যোগ্যতানুসারে কোনও না কোনও দায়িত্বপালনে নিযুক্ত করেছেন। দূরদর্শী ধর্মজ্ঞ যুধিষ্ঠির এক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নির্মাণ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। অতিথি-আপ্যায়নের এলাহি ব্যবস্থা তাঁর ঔদার্যের প্রকাশ। সকলের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতা ছাড়া যে কোন বড় উদ্যোগে সম্ভবপর নয়। রাজসূয় একটি বিশাল মিলনমেলা, যেখানে মিলিত হয় উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম একযোগে একেমনে একপ্রাণে। এক ছত্রছায়ায় নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও দুর্বিপাক থেকে নিজেদের অস্তিত্বরক্ষার প্রয়াস।অনেকটা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একই দলের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয়সরকারের সঙ্গে প্রাদেশিক সরকারের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মতো। রাজতন্ত্রে সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করে অন্য রাজ্যগুলি। নিয়মিত করদানের বিনিময়ে তারা নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি লাভ করে থাকে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৭: আকাশ এখনও মেঘলা
রাজসূয়যজ্ঞে যোগ দিয়েছেন সমাজের উচ্চবর্ণ থেকে নিম্নবর্গের মানুষজন। রাজকীয় সমারোহ মুছে দিয়েছে সামাজিক ভেদাভেদের অনতিক্রম্য ব্যবধান। এই যজ্ঞে যেমন দেবতুল্য ব্রাহ্মণরা সমাদৃত হয়েছেন তেমনই সমস্ত বর্ণের মানুষ কেউ ভোজন ও পানীয় গ্রহণ করে পরিতৃপ্ত হয়েছেন কেউবা দক্ষিণাগ্রহণ করে পরিতুষ্ট হয়েছেন। তাঁরা সকলেই আনন্দিত ও সন্তুষ্ট হয়েছেন। যথা দেবাস্তথা বিপ্রা দক্ষিণান্নমহাধনৈঃ। ততৃপুঃ সর্ব্ববর্ণাশ্চ তস্মিন্ যজ্ঞে মুদান্বিতাঃ।। আপামর জনতা এবং বিদ্বজ্জনের আশীর্বাদধন্য একজন সম্রাটের উদ্যোগে, এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বুদ্ধিজীবীদের এবং সাধারণের বিপুল গণসমর্থন ছাড়া কোন উদ্যোগ সফল হতে পারে না। রাজসূয় মহাযজ্ঞ যুধিষ্ঠিরের আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রদর্শনী, কিন্তু তার মধ্যে নেই অযথা ক্ষমতার ঔদ্ধত্যপ্রকাশ, নেই নির্লজ্জ দম্ভের অবকাশ, আছে শুধু বিনয়াবত হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত ঔদার্যের মহত্ব। সুশাসনের বীজ প্রোথিত হয় মহান হৃদয়ের বিস্তৃত ভূমিতে, উদারতার পলিমাটিতে তার বৃদ্ধি, পরিপূর্ণতা আসে গুণীজনের মন্ত্রণা ও পরামর্শের জলসিঞ্চনে এবং জীবনাভিজ্ঞতার আলোকে। যুধিষ্ঠিরের আয়োজিত রাজসূয় মহাযজ্ঞের আলোকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এমন পরিপূর্ণতা আশা করা যেতে পারে কী?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















