
নতুনের সন্ধানে।
বৈশাখের এক সন্ধ্যায় নিকষ কালো মেঘের পিছনে একঝলক আলোর ঝলকানিতে রুমির বহু পুরনো একটা ঘটনা মনে পড়ে যায়। কত বছর রুমির মনে পড়ে না, কর গুনতে থাকে। হ্যাঁ, তা প্রায় ৪২ বছর আগের এরকমই এক সন্ধ্যায় সে পাশের গ্রাম থেকে মেলা দেখে ফিরছিল বাবার হাত ধরে। বাড়ির কাছে প্রায় পৌঁছে গিয়েছে, এমনসময় প্রবল ঝড়ে হুড়মুড়িয়ে তাদের সামনে একটা আস্ত গাছ ভেঙে পড়ল। সঙ্গে নামল প্রবল বৃষ্টি। অগত্যা কোনওরকমে নিজেদের বাঁচাতে তারা সামনের পুরোনো হাসপাতাল বিল্ডিংয়ের এক পরিত্যক্ত বাড়ির দালানে আশ্রয় নেয়।
অনেকক্ষণ ধরে চলল ঝড়-বৃষ্টির তাণ্ডব। বৃষ্টি থামার পর তারা বাইরে বেরিয়ে দেখে এক লন্ডভন্ড পৃথিবী। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কত গাছ, ইলেকট্রিকের ছেঁড়াতার, ভাঙা কাচ, ব্যানার, পোস্টার, বোতল, টিনের ভাঙা ছাউনি, এরকম নানা প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বস্তু। কোনোক্রমে ওরা রক্ষা পেয়েছে। চতুর্দিক থেকে মানুষের আর্ত চিৎকার ভেসে আসছে। বাবা রুমিকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে বাড়ির কারো ক্ষতি হয়নি জেনে আবার ছুটলেন বাইরে, যদি কাউকে সাহায্য করা যায় এই ভেবে। সেদিনের সেই ট্রমাটা রুমির বুকের গভীরে কোথাও একটা রয়েই গেল।
মেয়েবেলাটা নানা আদরে-অনাদরে কখন যে কেটে গিয়েছে হিসেব রাখেনি কেউ। স্কুলের রি-ইউনিয়নের পর একটা গ্রুপ তৈরি করে রুমিরা ফিরে দেখে তাদের সেই মেয়েবেলাকে। পড়াশোনার জন্যে কোনো চাপ ছিল না, ভালোবেসেই তারা পড়ত। তার সাথে ছিল খেলাধুলা, দুষ্টুমি, আড্ডা, সংসারের টুকিটাকি কাজ, ফাঁকে ফাঁকে গল্পের বই পড়া এবং পাড়ার বন্ধুদের সাথে সাঁতরে পুকুরের এপার-ওপার করা। একবার পুকুরে নামলে উঠতেই চাইত না। অনেক পরে পাড়ে উঠলেই বাঁশের কঞ্চি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের কঠিন মূর্তি দেখে তারা আবার উল্টোদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ত। দিনগুলো সুন্দর কেটে যাচ্ছিল।
অনেকক্ষণ ধরে চলল ঝড়-বৃষ্টির তাণ্ডব। বৃষ্টি থামার পর তারা বাইরে বেরিয়ে দেখে এক লন্ডভন্ড পৃথিবী। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কত গাছ, ইলেকট্রিকের ছেঁড়াতার, ভাঙা কাচ, ব্যানার, পোস্টার, বোতল, টিনের ভাঙা ছাউনি, এরকম নানা প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বস্তু। কোনোক্রমে ওরা রক্ষা পেয়েছে। চতুর্দিক থেকে মানুষের আর্ত চিৎকার ভেসে আসছে। বাবা রুমিকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে বাড়ির কারো ক্ষতি হয়নি জেনে আবার ছুটলেন বাইরে, যদি কাউকে সাহায্য করা যায় এই ভেবে। সেদিনের সেই ট্রমাটা রুমির বুকের গভীরে কোথাও একটা রয়েই গেল।
মেয়েবেলাটা নানা আদরে-অনাদরে কখন যে কেটে গিয়েছে হিসেব রাখেনি কেউ। স্কুলের রি-ইউনিয়নের পর একটা গ্রুপ তৈরি করে রুমিরা ফিরে দেখে তাদের সেই মেয়েবেলাকে। পড়াশোনার জন্যে কোনো চাপ ছিল না, ভালোবেসেই তারা পড়ত। তার সাথে ছিল খেলাধুলা, দুষ্টুমি, আড্ডা, সংসারের টুকিটাকি কাজ, ফাঁকে ফাঁকে গল্পের বই পড়া এবং পাড়ার বন্ধুদের সাথে সাঁতরে পুকুরের এপার-ওপার করা। একবার পুকুরে নামলে উঠতেই চাইত না। অনেক পরে পাড়ে উঠলেই বাঁশের কঞ্চি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের কঠিন মূর্তি দেখে তারা আবার উল্টোদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ত। দিনগুলো সুন্দর কেটে যাচ্ছিল।
এরকমই সাদামাটা একটা মেয়ে ছিল রুমি, ভবিষ্যৎ নিয়ে যার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। শুধু জানত লেখাপড়া শিখে একটা সাধারণ চাকরি জোগাড় করতে হবে। ব্যাস, এটুকু পেলেই সে তৃপ্ত। হেলাফেলায় বেড়ে উঠছিল ওরা যৌথ পরিবারে। না, ঠিক হেলাফেলা নয়। মা চাইতেন মেয়ে ভালো রেজাল্ট করুক। কিন্তু বড়ো পরিবারে সবার মন জয় করতে সারাদিন মাকে নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হত। বাবার সামান্য বেতনে মেয়ের জন্য বিশেষ ভাবনার অবকাশ ছিল না। যদিও পরিবারের সমবয়সী ছেলেরা সব ক্ষেত্রেই বিশেষ সুযোগ পেত। মায়ের একটা চাপা ক্ষোভ ছিল। তার মেয়ে মেধাবী অথচ তার জন্য কিছুই করতে পারছেন না, এই যন্ত্রণা মায়ের চোখে প্রকাশ হতে সবসময়ই দেখেছে রুমি, মেয়ের জন্য মায়ের চোখে গর্ব দেখেছে সে। অভাবের সংসারেও মা জ্ঞানের আলো জ্বালতে চাইতেন। কুপির আলোতে বাড়ির ছোটদের পড়াতেন আর নিজে অনেক রাত জেগে বাবার অফিস লাইব্রেরি থেকে আনা নানান বই গোগ্রাসে পড়তেন। সংসারের কূটকচালি থেকে নিজে দূরে থাকতেন এবং রুমিকেও সেই শিক্ষাই দিতেন।
রুমির স্কুলের শিক্ষিকারা তাকে পড়াশোনায় নানাভাবে সাহায্য করতেন। শিক্ষিকাদের সাহায্য, মায়ের ইচ্ছা আর নিজের মেধায় রুমি মাধ্যমিকে স্টার মার্কস নিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করে। সে আমলে প্রথম বিভাগ পাওয়াটাই যথেষ্ট কঠিন ছিল, তার ওপর রুমি পেয়েছিল স্টার মার্কস। তাই সকলেরই প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এভাবেই একে একে সে সব পরীক্ষায় ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করে। মাস্টার্সেও ভালো ফল করে। বাবা অনেক ছোটবেলাতেই রুমির বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব পালনের কথা ভাবতেন কিন্তু মা তা হতে দেননি।
রুমির ব্যাচেলর বড়ো জ্যাঠাই তাদের পরিবারের প্রধান অভিভাবক ছিলেন। ভদ্রলোকের নানাবিধ গুণ থাকলেও তিনিও পুরুষ শাসিত সমাজেরই ধারক এবং পরিবারের প্রধান। তাঁর অন্যায় জেদ বাড়ির ছোটদের কাছে জুলুম মনে হলেও অনেক সময় সেই ত্রুটি ঢেকে যেত ভদ্রলোকের নিঃস্বার্থ মানবিক আচরণে। এই জেঠুই যখন রুমির বিয়ের সম্বন্ধ আনেন, তখন আর রুমির মায়ের কোনো ওজর-আপত্তি টেকেনি। বিয়ের সম্বন্ধে রুমির মতামত জানাটাও তাদের পরিবারের ক্ষেত্রে বাতুলতা ছিল। পণের বিনিময়ে রুমির বিয়ে হয়ে গেল। কেউ তার মনের ইচ্ছা, আপত্তি, জানতে চাইল না। এক পরিবার ছেড়ে আর এক পরিবারে এসে পড়ল রুমি।
রুমির স্কুলের শিক্ষিকারা তাকে পড়াশোনায় নানাভাবে সাহায্য করতেন। শিক্ষিকাদের সাহায্য, মায়ের ইচ্ছা আর নিজের মেধায় রুমি মাধ্যমিকে স্টার মার্কস নিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করে। সে আমলে প্রথম বিভাগ পাওয়াটাই যথেষ্ট কঠিন ছিল, তার ওপর রুমি পেয়েছিল স্টার মার্কস। তাই সকলেরই প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এভাবেই একে একে সে সব পরীক্ষায় ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করে। মাস্টার্সেও ভালো ফল করে। বাবা অনেক ছোটবেলাতেই রুমির বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব পালনের কথা ভাবতেন কিন্তু মা তা হতে দেননি।
রুমির ব্যাচেলর বড়ো জ্যাঠাই তাদের পরিবারের প্রধান অভিভাবক ছিলেন। ভদ্রলোকের নানাবিধ গুণ থাকলেও তিনিও পুরুষ শাসিত সমাজেরই ধারক এবং পরিবারের প্রধান। তাঁর অন্যায় জেদ বাড়ির ছোটদের কাছে জুলুম মনে হলেও অনেক সময় সেই ত্রুটি ঢেকে যেত ভদ্রলোকের নিঃস্বার্থ মানবিক আচরণে। এই জেঠুই যখন রুমির বিয়ের সম্বন্ধ আনেন, তখন আর রুমির মায়ের কোনো ওজর-আপত্তি টেকেনি। বিয়ের সম্বন্ধে রুমির মতামত জানাটাও তাদের পরিবারের ক্ষেত্রে বাতুলতা ছিল। পণের বিনিময়ে রুমির বিয়ে হয়ে গেল। কেউ তার মনের ইচ্ছা, আপত্তি, জানতে চাইল না। এক পরিবার ছেড়ে আর এক পরিবারে এসে পড়ল রুমি।
আরও পড়ুন:

অন্য পুজো: ভি বালসারা আমাকে প্রথম হিন্দুস্থান রেকর্ডসে নিয়ে গিয়েছিলেন : সরোজ বড়ুয়া

দশভুজা : আমার দুর্গা—বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩২: কবিকন্যা মীরার স্বামী রবীন্দ্রনাথকে ভর্ৎসনা করেছিলেন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৮: ছোট বাবুইবাটান
রুমির স্বামী মানুষটা মন্দ না হলেও অসম্ভব জেদি, আর নিজের মতামতের বাইরে কারও কথার প্রাধান্য নেই তাঁর কাছে। শাশুড়ি মা প্রথম থেকেই রুমিকে অপছন্দ করেছেন। তাঁর ক্রমাগত ভর্ৎসনায় স্বামী মানুষটি বিব্রত ছিলেন। ঠিক-ভুল বিচার না করেই তিনি রুমিকে কাঠগড়ায় তুলতেন। সংসারে মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেওয়া তাঁর চিন্তাভাবনায় অর্বাচীনের কাজ। আসলে নারী তো পুরুষের সম্পত্তি, পুরুষ কেন তার যুক্তিকে বিশ্বাস করবে অথবা তার ভুলের দায় স্বীকার করবে! এরকমই চিন্তা ভাবনা ছিল রুমির স্বামীর। সবাই ছোটোখাটো ত্রুটিতেও রুমির দিকেই তর্জনী তোলে। যত দোষ নন্দ ঘোষ। ট্রমাটা রয়েই গেল।
ইতিমধ্যে শাশুড়ি মা’র মৃত্যু হয়েছে এবং শ্বশুরমশায়ের ছেলেরা ভিন্ন হয়েছে। রুমির স্বামী তাকে নিয়ে হাওড়ার জগাছায় থাকেন। বাড়ি করেছেন, ওদের একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও রুমি একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি জোগাড় করে। তার এত লড়াই কোথাও গিয়ে খানিকটা স্বস্তি পায়।
স্বামীর মেজাজ, তার উপর হওয়া মানসিক অত্যাচারকে মনে মনে সে উপেক্ষা করে। চাকরির প্রাক্কালে তার স্বামী জানিয়েছিলেন সংসারের কোনো কাজেই তিনি স্ত্রীকে সাহায্য করতে পারবেন না, তাকে সংসারের সব কাজ যথাযথ ভাবে পালন করেই স্কুলে যেতে হবে এবং প্রাপ্ত বেতনের একটা বড় অংশ সংসারের জন্য ব্যয় করতে হবে। সে মনে মনে কষ্ট পেলেও বাইরের জগতে পা ফেলার আনন্দে সব শর্তই মেনে নেয়। স্কুল থেকে ফিরতে সামান্য দেরি হলেই রুমির স্বামী কথার বাণ ডাকাতেন।
লোকলজ্জায় কুঁকড়ে থাকত রুমি, ঝগড়া করতে পারত না। তার মধ্যে একটা বিবমিশা তৈরি হয়। প্রতিনিয়ত সংসারের জোয়াল টানছে অথচ কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারছে না। তার স্বামীকে সে ভালো-মন্দ মিশিয়েই মেনে নিয়েছে, হয়তো ভালোওবাসে, কিন্তু সে কথা সে কখনও ভেবে দেখেনি। কোনও দায়িত্ব পালনেও সে পিছপা হয়নি। ভেবেছিল সন্তানকে নিজের ভাবনায়, আদর্শে বড় করবে কিন্তু তার স্বামী সে পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। সামান্য ঘরের কাজ শেখাতে গেলেও শুনতে হত, ‘ও ছেলে, অত কাজ শেখানোর দরকার নেই।’ আসলে রুমির স্বামী বোঝাতে চাইতেন, রুমি অলস বলেই নিজের কাজ সন্তানের উপর চাপাচ্ছে। কখনই সন্তান বাবার কাছ থেকে সুশিক্ষা পায়নি।
ইতিমধ্যে শাশুড়ি মা’র মৃত্যু হয়েছে এবং শ্বশুরমশায়ের ছেলেরা ভিন্ন হয়েছে। রুমির স্বামী তাকে নিয়ে হাওড়ার জগাছায় থাকেন। বাড়ি করেছেন, ওদের একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও রুমি একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি জোগাড় করে। তার এত লড়াই কোথাও গিয়ে খানিকটা স্বস্তি পায়।
স্বামীর মেজাজ, তার উপর হওয়া মানসিক অত্যাচারকে মনে মনে সে উপেক্ষা করে। চাকরির প্রাক্কালে তার স্বামী জানিয়েছিলেন সংসারের কোনো কাজেই তিনি স্ত্রীকে সাহায্য করতে পারবেন না, তাকে সংসারের সব কাজ যথাযথ ভাবে পালন করেই স্কুলে যেতে হবে এবং প্রাপ্ত বেতনের একটা বড় অংশ সংসারের জন্য ব্যয় করতে হবে। সে মনে মনে কষ্ট পেলেও বাইরের জগতে পা ফেলার আনন্দে সব শর্তই মেনে নেয়। স্কুল থেকে ফিরতে সামান্য দেরি হলেই রুমির স্বামী কথার বাণ ডাকাতেন।
লোকলজ্জায় কুঁকড়ে থাকত রুমি, ঝগড়া করতে পারত না। তার মধ্যে একটা বিবমিশা তৈরি হয়। প্রতিনিয়ত সংসারের জোয়াল টানছে অথচ কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারছে না। তার স্বামীকে সে ভালো-মন্দ মিশিয়েই মেনে নিয়েছে, হয়তো ভালোওবাসে, কিন্তু সে কথা সে কখনও ভেবে দেখেনি। কোনও দায়িত্ব পালনেও সে পিছপা হয়নি। ভেবেছিল সন্তানকে নিজের ভাবনায়, আদর্শে বড় করবে কিন্তু তার স্বামী সে পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। সামান্য ঘরের কাজ শেখাতে গেলেও শুনতে হত, ‘ও ছেলে, অত কাজ শেখানোর দরকার নেই।’ আসলে রুমির স্বামী বোঝাতে চাইতেন, রুমি অলস বলেই নিজের কাজ সন্তানের উপর চাপাচ্ছে। কখনই সন্তান বাবার কাছ থেকে সুশিক্ষা পায়নি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৪: অনুসরণ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে
রুমির প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করত কিন্তু ছেলেও যখন অম্লান বদনে মিথ্যা বলে, ধমক দেয়, তখন মেনে নিতে পারে না রুমি। ছেলে স্পষ্টই বুঝে গিয়েছিল, মাকে সম্মান না করলেও চলে, মাকে অমান্য করার শিক্ষাই তো সে এতকাল ধরে পেয়ে এসেছে। অথচ সেই ছেলের উচ্চশিক্ষার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করেছে রুমিই। কিন্তু মায়ের ইচ্ছে,ভালোলাগা নিয়ে ছেলে কখনো কোনো মাথাব্যথাই করেনি। তার গার্লফ্রেন্ড আছে। সে বুঝেছে এ বাড়িতে বাবাই সব, তাকে তুষ্ট রাখলেই সব পাবে সে।
রুমি মুক্তি চায় কিন্তু বুঝতে পারে না, কী করা উচিত। তার স্বামী তাকে সম্মান করেন না, বরং প্রভুত্ব কায়েম রাখেন, যেন মনিব-চাকর সম্পর্ক। মাঝেমাঝেই বিমর্ষ হয়ে পড়ে রুমি। সত্যি কি এত অবহেলা, অনাদর প্রাপ্য ছিল তার! এ যে অন্যের করুণা, দয়া ভিক্ষা করে বেঁচে থাকা ক্রীতদাসী তুল্য জীবন। বেতনবিহীন দিবারাতের কাজের লোক, অথচ সে কিন্তু রোজগার করে এবং তার অর্জিত অর্থ সংসারের কাজেই লাগে। সংসার থেকে বেরিয়ে যেতে চায় রুমি, পরক্ষণেই মনে হয়, ছি ছি, কী সব ভাবছে সে! এই বয়সে এসে মুখ পোড়াবে নাকি? দূরত্ব ছিলই, তা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
রুমির কলেজের বান্ধবী তিস্তা একটা এনজিও চালায়। তিস্তার বিশেষ আমন্ত্রণে রুমি একদিন ওদের এন.জি.ও.র কাজ দেখতে যায়। ইতিমধ্যে তিস্তা জানিয়েছে তারা এনজিওর মাধ্যমে কী কী কাজ করে, কীভাবে করে। রুমি খুব উৎসাহ বোধ করে, বেশ ভালো লাগে তাদের কাজ।
রুমি মুক্তি চায় কিন্তু বুঝতে পারে না, কী করা উচিত। তার স্বামী তাকে সম্মান করেন না, বরং প্রভুত্ব কায়েম রাখেন, যেন মনিব-চাকর সম্পর্ক। মাঝেমাঝেই বিমর্ষ হয়ে পড়ে রুমি। সত্যি কি এত অবহেলা, অনাদর প্রাপ্য ছিল তার! এ যে অন্যের করুণা, দয়া ভিক্ষা করে বেঁচে থাকা ক্রীতদাসী তুল্য জীবন। বেতনবিহীন দিবারাতের কাজের লোক, অথচ সে কিন্তু রোজগার করে এবং তার অর্জিত অর্থ সংসারের কাজেই লাগে। সংসার থেকে বেরিয়ে যেতে চায় রুমি, পরক্ষণেই মনে হয়, ছি ছি, কী সব ভাবছে সে! এই বয়সে এসে মুখ পোড়াবে নাকি? দূরত্ব ছিলই, তা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
রুমির কলেজের বান্ধবী তিস্তা একটা এনজিও চালায়। তিস্তার বিশেষ আমন্ত্রণে রুমি একদিন ওদের এন.জি.ও.র কাজ দেখতে যায়। ইতিমধ্যে তিস্তা জানিয়েছে তারা এনজিওর মাধ্যমে কী কী কাজ করে, কীভাবে করে। রুমি খুব উৎসাহ বোধ করে, বেশ ভালো লাগে তাদের কাজ।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ
তিস্তার এনজিও থেকে ফিরতে রুমির সেদিনএকটু বেশিই দেরি হয়। দেরি হওয়ায় খানিকটা আশঙ্কিত হয়েই বাড়ির পথ ধরে সে। ঘরে ঢুকতেই সব কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। রুমির স্বামী সদর দরজা থেকে তাকে টেনে এনে ঘরের মেঝেতে আছড়ে ফেলেন এবং সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে সপাটে এক চড় কষান। রাগে অন্ধ হয়ে তিনি যা নয় তাই বলতে থাকেন। ‘মেয়েছেলের বাড়ি ফিরতে এত রাত! বাইরে পরপুরুষের সঙ্গে ঢলাঢলি! এ সব ভদ্রবাড়িতে চলবে না।
অনেকদিন ধরে লক্ষ করছি আর মেনে নেওয়া যায় না।’ সন্দেহের বশে যা নয়, তাই বলতে থাকেন। রুমি হতভম্ব। চোখের সামনে সব অন্ধকার দেখে। অপ্রত্যাশিত এই আঘাত রুমি সামলাতে পারে না। মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। আবার টলতে টলতে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। পিছন থেকে স্বামী তাকে বাপবাপান্ত করেন। স্ত্রী তো নয়, যেন কেনা সম্পত্তি, মেয়ে বলে তার উপর সব ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া যায়। এই জেট এজেও মেয়েদের উপর এরকম অত্যাচার চলে যা লোকলজ্জায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকাশ পায় না।
অনেকদিন ধরে লক্ষ করছি আর মেনে নেওয়া যায় না।’ সন্দেহের বশে যা নয়, তাই বলতে থাকেন। রুমি হতভম্ব। চোখের সামনে সব অন্ধকার দেখে। অপ্রত্যাশিত এই আঘাত রুমি সামলাতে পারে না। মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। আবার টলতে টলতে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। পিছন থেকে স্বামী তাকে বাপবাপান্ত করেন। স্ত্রী তো নয়, যেন কেনা সম্পত্তি, মেয়ে বলে তার উপর সব ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া যায়। এই জেট এজেও মেয়েদের উপর এরকম অত্যাচার চলে যা লোকলজ্জায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকাশ পায় না।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
রুমির মনের সব অবরোধ মুহূর্তে ভেঙে যায়। সে কোনও কথা বলে না। এত অপমান, যন্ত্রণাতেও রুমির চোখে এক ফোঁটাও জল গড়ায় না। নিজের ভিতরে সে কঠিন ও শান্ত হয়ে যায়। স্থির ভাবে ঘরে ঢুকে তার একান্ত প্রয়োজনীয় কয়েকটি টুকিটাকি জিনিসপত্র ,আই কার্ড এবং নিজের ব্যাংকের পাসবই ছোট্ট একটা ব্যাগে ভরে সে স্বামীর সামনে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। স্বামী ধেয়ে আসেন, শাসাতে থাকেন। জানিয়ে দেন একবার বেরোলে বাড়ি ফেরার সব পথ বন্ধ।
কিন্তু রুমি আর পিছন ফিরে তাকায় না। বুক ভরে শ্বাস নেয়। অনুভব করতে চায় মুক্তির স্বাদ। এত বড় পৃথিবীতে নিশ্চয় তার কোথাও না কোথাও স্থান হবে। হয়তো কিছুটা হঠকারিতা, কিন্তু আজ তার সহ্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। আজও যদি সে এভাবে প্রতিবাদ না করত, তাহলে এরপর থেকে নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা হত। ক’টা দিন তিস্তার বাড়িতে থেকে সে অন্য পৃথিবী খুঁজে নেবে, যেখানে মেয়েরাও মানুষ, তারাও স্বাধীন মানুষের মতোই বাঁচে।
কিন্তু রুমি আর পিছন ফিরে তাকায় না। বুক ভরে শ্বাস নেয়। অনুভব করতে চায় মুক্তির স্বাদ। এত বড় পৃথিবীতে নিশ্চয় তার কোথাও না কোথাও স্থান হবে। হয়তো কিছুটা হঠকারিতা, কিন্তু আজ তার সহ্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। আজও যদি সে এভাবে প্রতিবাদ না করত, তাহলে এরপর থেকে নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা হত। ক’টা দিন তিস্তার বাড়িতে থেকে সে অন্য পৃথিবী খুঁজে নেবে, যেখানে মেয়েরাও মানুষ, তারাও স্বাধীন মানুষের মতোই বাঁচে।
* নেলী দাস (Neli das) প্রাক্তন শিক্ষিকা ও লেখক।
















