বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

কাদম্বরী দেবী।

ঠাকুরবাড়িতে আনন্দের অভাব ছিল না। হাসিতে খুশিতে সকলেই মুখরিত। জীবনকে উপভোগ করতে জানতেন তাঁরা। একান্নবর্তী পরিবার, মিলেমিশে থাকা, এই থাকার মধ্যে যে কত আনন্দ, তা ধরা আছে বিভিন্ন স্মৃতিচারণমূলক রচনায়।ওই বাড়িতে যাঁরা বধূ হয়ে আসতেন, অল্প সময়ের মধ্যে তাঁরাও মানানসই হয়ে উঠতেন। শামিল হতেন আনন্দযজ্ঞে। নিজের জগতে হয়তো ব্যস্ততা তুঙ্গে, সব ব্যস্ততা দূরে সরিয়ে ঠাকুরবাড়ির তেমন কোনও সদস্যও সময় দিতেন। অংশ নিতেন আনন্দময় পারিবারিক সমাবেশে।

ঘরে আনন্দ, বাইরে আনন্দ। বাড়িতে আয়োজিত নাট্যাভিনয়ের মধ্য দিয়ে কখনও আনন্দ-লাভ, কখনও বা কাছে দূরে কোথাও। এমনকি পিকনিকেও। দৈনন্দিন জীবনে ছোটোখাটো ঘটনা মধ্যে দিয়েও আনন্দলাভ হত।
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমার বাল্যকথা’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। সে বইয়ের অংশবিশেষে ধরা আছে বনভোজনের আনন্দ। বাগানবাড়িতে বনভোজন, সেই বনভজনকে ঘিরে কত না আনন্দ হয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির মানুষজন মাঝেমধ্যেই বাগানবাড়িতে গিয়ে থাকতেন। পেনিটির বাগানবাড়ি, কোন্নগরের বাগানবাড়ি, পলতার বাগানবাড়ি। বাগানবাড়ির অভাব ছিল না। কাছে ছিল, দূরেও ছিল। সব বাগানবাড়ি যে ঠাকুরপরিবারের নিজস্ব সম্পত্তি ছিল, তা নয়। ভাড়াবাড়ি, চেনাজানা মানুষজনের বাড়ি —সর্বত্রই তাঁদের অবাধ যাতায়াত। ঠাকুরবাড়ির মানুষজন থাকবেন, তা তো গৌরবের, এমন ভেবে নিয়েও কেউ কেউ আদরে সাদরে গ্রহণ করতেন। থাকতে দিতেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

দ্বারকানাথ ঠাকুর।

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উল্লিখিত বই থেকে জানা যায়, ১১ মাঘ, মাঘোৎসবের দিনটি মহা ধুমধামের সঙ্গে পালিত হত। বিস্তর লোকজনের সমাগম হত। অবনীন্দ্রনাথের লেখায় আছে, পোলাও মিঠাই কত যে খাবারের ব্যবস্থা থাকত। মস্ত সাইজের মিঠাই, ঠিক যেন ‘এক-একটা কামানের গোলা’। মনের আনন্দে খাওয়ার পর অনেকেই পেল্লায় সাইজের মিঠাইয়ের কয়েকটা পকেটে করে বাড়িতেও নিয়ে যেত।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১০: চাঁদের ওপিঠে কালো

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৫: আকাশ এখনও মেঘলা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৬ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী?

সত্যিই সে এক ‘বৃহৎ বৈঠকী ভোজ’! বাড়ির ছোটরাও এই বৈঠকে যোগ দিত। অন্য সময় ছোটরা বড়দের কাছাকাছি সেভাবে ঘেঁষত না। সত্যেন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, ‘ছেলেবেলায় আমরা বাবামহাশয়ের কাছে বড় ঘেঁসতাম না।’ মাঘোৎসবের দিন কোনও বিধি-নিষেধ থাকত না। ছোটরা বড়দের কাছাকাছি পৌঁছতে কোনও দ্বিধা করত না। এই আনন্দদিবসে একবার বাড়ির সবাই মিলে তাঁরা গিয়েছিলেন পলতার বাগানবাড়িতে। আমোদে-আহ্লাদে দিনটি ভরে উঠবে, এটাই ছিল প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা থেকেই দল-বেঁধে যাওয়া হয়েছিল। বৃথা যায়নি তা। খুব আনন্দ হয়েছিল। সেই আনন্দ-স্মৃতি সত্যেন্দ্রনাথের পরিণত-বয়সেও মনের কোণে জেগেছিল। মনে পড়েছে ভোজের এলাহি আয়োজনের কথা। জিভে জল আনা রকমারি ব্যঞ্জন। সবাইকে খাওয়ানোর দায়িত্ব যিনি নিয়েছিলেন, তিনি জগন্মোহন গঙ্গোপাধ্যায়।
কলকাতায় বৃষ্টি

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

জগন্মোহন কতখানি রন্ধন-পটু ছিলেন, সে বিবরণ আছে অবনীন্দ্রনাথের ‘ঘরোয়া’য়। রাঁধতে ভালোবাসতেন, খেতেও ভালোবাসতেন। ‘ঘরোয়া’ থেকে জানা যায়, ‘পাকা রাঁধিয়ে ছিলেন, কি বিলিতি, কি দেশী। গায়ে যেমন ছিল অগাধ শক্তি,খাইয়েও তেমনি।’ কতখানি শক্তিধর ছিলেন তিনি, কেমন ছিল তাঁর দাপট, তা বালক-বয়সে প্রত্যক্ষ করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেওছেন। তাঁর লেখায় আছে, ‘একবার একদল পুলিস ওয়ারেন্ট নিয়ে এসে বলপূর্ব্বক আমাদের একটা গাড়ি টেনে নিয়ে যাবার যোগাড় করছিল-তিনি একলা সেই গাড়ী ধরে রেখে তাদের হটিয়ে দিয়েছিলেন-এ আমার স্বচক্ষে দেখা। আমাদের জগমোহন সেকালের রামমূর্তি।’
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৩: আঁধারে আছে আততায়ী

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৭: জৌরালি

জগন্মোহন ছিলেন ‘হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ’। খাদ্যপ্রিয় ভোজনরসিক মানুষটির ছিল মস্ত ভুঁড়ি। সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছেন,’তার ভুঁড়িটিও অতুলনীয়।’ বাড়ির ছোটোদের কাছে এই ভুঁড়িটি ছিল ‘আদরের সামগ্রী’। খুব নাকও ডাকতেন তিনি। সেই নাক-ডাকানির আওয়াজ দিগ্বিদিকে ধ্বনিত হত। সত্যেন্দ্রনাথের লেখায় আছে, ‘এমন সৌখীন আমুদে অথচ কর্মিষ্ঠ মানুষ আমি কখনও দেখিনি! খাওয়া, পরা, ওঠা, বসা, প্রত্যেক কার্য্যে তাঁর কারিগিরি প্রকাশ পেত। রান্না বান্না ঘর কন্না-পোষাক সাজ সজ্জা, কারুকার্য্য, ছুতরের, কামারের কাজ-সকল কর্মেই তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন।’ সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর যে গুণাবলির কথা বলেছেন, তার বাইরেও রয়েছে আরও কিছু গুণ। যেমন, সংগীতপ্রীতি ছিল অসাধারণ। যথার্থই সংগীতের সমজদার। ঠাকুরবাড়ির ছোটোরা তাঁর খুব ‘নেওটা’ ছিল। সেই দলে সত্যেন্দ্রনাথও ছিলেন। ছোটোরা গিয়ে জগন্মোহনের কাছে ভিড় করত। গল্প শুনত। এটা-সেটা দেওয়ার আবদার করত।
কলকাতায় বৃষ্টি

জ্ঞানদানন্দিনী, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী।

মাঘোৎসবের অনুষ্ঠান মেটার পর সেবার অনেকে গিয়েছিলেন পলতার বাগানবাড়িতে,বনভোজন করতে। যেতে যেতে বেশ রাত হয়েছিল। গিয়েছিলেন জলপথে, নৌকোয়। আট-দশটি নৌকো-বোঝাই মানুষজন। এত লোকের রান্না কে করবে, কেন জগন্মোহন। এমন সুস্বাদু মাছের ঝোল করেছিলেন, সে স্মৃতি ভোলার নয়। খেতেও ভালবাসতেন তিনি। এদিক ওদিক থেকে অনেক খাবার, নানা রকমের ব্যঞ্জন জোগাড় করে ফেলতেন জগন্মোহন। অবনীন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, জগন্মোহনের অনেকগুলো বাটি ছিল। এবাড়ি ওবাড়ি ঘরে ঘরে একটা করে বাটি পাঠিয়ে দিতেন। যার ঘরে যা ভালো রান্না হত, তা বাটি করে দিয়ে জগন্মোহনের কাছে পাঠিয়ে দিত। কার বাড়িতে মাছের ঝোল, কার বাড়িতে হাঁসের ডিমের ডালনা—সেসব সংগ্রহ করে জমিয়ে তিনি বসতেন মধ্যাহ্নভোজনে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৭৩ : ‘খেলাঘর’

জগন্মোহন না জগমোহন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। বিভিন্ন স্মৃতিচর্চায় নামের এই তারতম্য রয়ে গেলেও দু-জনে একই ব্যক্তি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী, রবীন্দ্রনাথের ‘নতুন বৌঠান’ কাদম্বরী দেবীর তিনি পিতামহ। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্কে ছিল। দ্বারকানাথ ঠাকুরের মামা কেনারাম রায়চৌধুরির কন্যা শিরোমণি দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। নানাভাবে ঠাকুরবাড়ির আনুকূল্য ও অনুগ্রহ পেয়েছিলেন জগন্মোহন। দ্বারকানাথের পিতামহ নীলমণি ঠাকুরের ভ্রাতা গোবিন্দরামের নিঃসন্তান পত্নী রামপ্রিয়া কলকাতার হারকাটা গলিতে তাঁকে বাড়িও করে দিয়েছিলেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে রামপ্রিয়ার আগেই যোগাযোগ, সেই যোগাযোগের সূত্রেই ওই পরিবারে বিবাহের ব্যবস্থা। জগন্মোহন নানা গুণের অধিকারী হয়েও শেষ পর্যন্ত ঠাকুরবাড়ির তিনি ছিলেন কর্মচারীস্থানীয়। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘আমাদের বাড়ীর দ্বারপাল ছিলেন।’ সহজ করে বলা যায় পাহারাদার বা দারোয়ান। দরজা-আগলানো এই মানুষটি আসলে ঠাকুরবাড়ির পাহারাদার ছিলেন। শ্যামলালও ঠাকুরবাড়ির বেতনভুক কর্মচারী। ছিলেন বাজার সরকার। জোড়াসাঁকো ছেড়ে পরবর্তীকালে শ্যামলাল গাজীপুরে থাকতেন। ঠাকুরবাড়ি থেকে কুড়ি টাকা মাসোহারা পেতেন। তিনিও ভালো রান্না করতেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনীর সঙ্গে ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীও গিয়েছিলেন গাজিপুরে। সে সময় শ্যামলাল রান্না করে খাইয়ে ছিলেন। তাঁর উপাদেয় রান্নার কথা ইন্দিরা দেবীর মনে রয়ে গিয়েছিল। পরে এক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে গাজিপুরে বাসের সময়: ‘গাজিপুরে জ্যোতিকাকামশায়ের শ্বশুর শ্যামলাল গাঙ্গুলিও ছিলেন। মনে আছে তিনি বেগুন মুলো ও বড়ি দিয়ে গুড় অম্বল রেঁধে রান্নাঘরের তাকে তুলে রেখে কাশী বেড়াতে যেতেন এবং ফিরে এসে খেতেন। ততদিনে বেশ সুন্দরভাবে মজে থাকত। সত্যি কথা বলতে কী, সে রকম সুস্বাদু গুড় অম্বল তার পরে আর কখনো খাইনি।’
কলকাতায় বৃষ্টি

ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী।

পিতা ও পিতামহের সামাজিক অবস্থানের কথা ভেবেই সত্যেন্দ্রনাথ চাননি কাদম্বরী দেবী ঠাকুরবাড়িতে বধূ হয়ে আসুন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হোক। পত্নী জ্ঞানদানন্দিনীকে আহমদনগর থেকে লিখেছিলেন, ‘কোন্ হিসাবে যে এ কন্যা নতুনের উপযুক্ত হইয়াছে জানি না।’ আরেক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘শ্যামবাবুর মেয়ে মনে করিয়া আমার কখনই মনে হয় না যে ভাল মেয়ে হইবে-কোন অংশেই জ্যোতির উপযুক্ত তাহাকে মনে হয় না।’ কাদম্বরী বধূ হিসেবে ঠাকুরবাড়িতে এসে নিজেকে বদলেছিলেন, এই পরিবারের উপযুক্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর ভেতরে যে সাহিত্যপ্রীতি ও সংস্কৃতিমনস্কতা ছিল, তা বিকশিত, প্রস্ফুটিত হয়েছে। পিতা ও পিতামহের এই পেশা অকারণেই অনেকের বিবেচ্য হয়ে উঠেছিল। সে কারণে তাঁকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছিল, এই সত্যটি আমাদের বেদনার কারণ হয়ে ওঠে। জগন্মোহন তো যথেষ্টই গুণবান ছিলেন। পিতার মতো গুণের অধিকারী না হলেও শ্যামলালকেও নস্যাৎ করে দেওয়া যায় না। দুঃখের বিষয়, কাদম্বরীকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তাঁর পিতামহ ও পিতা যে ঠাকুর পরিবারের অতি সাধারণ কর্মচারী ছিলেন, নিতান্তই পাহারাদার ও বাজার সরকার, এই তথ্যটি আমরাও কাজে লাগাই।

* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content