কুটিরের মধ্যে ভরত দেখলেন, ঘাসে ঢাকা এক বেদীর উপর জটা-বল্কলধারী রাম, লক্ষ্মণ ও সীতার সঙ্গে বসে আছেন। ‘আর্য’ এই বলে শিশুর মতো উচ্ছ্বাসে আকুল হয়ে রামের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলেন ভরত।
কুটিরের মধ্যে ভরত দেখলেন, ঘাসে ঢাকা এক বেদীর উপর জটা-বল্কলধারী রাম, লক্ষ্মণ ও সীতার সঙ্গে বসে আছেন। ‘আর্য’ এই বলে শিশুর মতো উচ্ছ্বাসে আকুল হয়ে রামের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলেন ভরত।
মুনিবর তাঁদের পরামর্শ দিলেন, সেখান থেকে দশ ক্রোশ দূরে চিত্রকূট পর্বতের পাদদেশে এক রম্য বনভূমিতে বসবাস করার জন্য। সেই মতো তাঁরা যমুনা নদী অতিক্রম করে পৌঁছলেন চিত্রকূট সংলগ্ন সমতলভূমিতে।
রাজা দশরথের মৃত্যুর পরে অযোধ্যা অরাজক অবস্থায় রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। রাজসিংহাসন শূন্য পড়ে রয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে রাজ্যের।
ভরতের আর্তক্রন্দন পৌঁছল সুমিত্রানন্দন শত্রুঘ্নের কানে। ছুটে এলেন তিনি। এসে শুনলেন সব বৃত্তান্ত। ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল তাঁর মনেও। ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল কুব্জা মন্থরা।
দশরথ কিংবা রামের মুখে তাঁর সম্বন্ধে এ সব বিশেষণ শোনা গিয়েছে অনেকবার। কিন্তু মায়ের অপরিণামদর্শিতা, গর্বোন্মাদনা ভরতের অজ্ঞাতসারেই তাঁর জীবনে এঁকে দিয়েছে চিরস্থায়ী অযশের কালিমা।
অতীতে মল্লযুদ্ধের অনৈতিক বিষয় হল, ক্লান্ত প্রতিপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা। যে কোনও যুদ্ধে নৈতিকতার বিধিবদ্ধ মানদণ্ড অতিক্রম করে যান যুদ্ধরত দুই পক্ষই। ভুলে যান মানবিকতা, মমত্ববোধ প্রভৃতি কোমলবৃত্তি। প্রকট হয়ে ওঠে হত্যা, মৃত্যু, জিঘাংসা এবং প্রতিশোধস্পৃহা। জয় হয়, আত্মঘাতী নৈতিক অবক্ষয়ের।এই চিত্রের পরিবর্তন হয়নি।
রাক্ষসদের সামনে রাক্ষস খর, খরতর ভাষায় বলে উঠল, যেমন লবণাক্ত সাগর তার নিজের জলোচ্ছ্বাস সহ্য করতে পারে না ঠিক তেমন শূর্পনখা তাকে যে অবমাননা করছে, সেই অসম্মান সে সহ্য করতে পারছে না। খর আশ্বস্ত করল, শৌর্যের মাপকাঠিতে, ক্ষীণপ্রাণ রামকে সে গ্রাহ্য করে না। রাম তার দুষ্কর্মের জন্যে,আজই খরের হাতে প্রাণ হারাবে। খর, ভগিনীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,সে যেন ব্যাকুলতা দূর করে, অশ্রু সংবরণ করে। খর, ভাই-সহ রামকে যমের বাড়ি পাঠাবে।
রাজা জরাসন্ধের রাজধানী গিরিব্রজনগরে পৌঁছুলেন কৃষ্ণ,ভীম ও অর্জুন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নৃশংস মগধরাজের কবল হতে কারারুদ্ধ রাজাদের মুক্তি ও অত্যাচারী একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী জরাসন্ধের দুর্দমনীয় প্রভাব ক্ষুণ্ণ করে তাঁকে দমন। মগধরাজ জরাসন্ধের প্রখরদৃষ্টিতে তাঁদের ছদ্ম আবরণ খসে পড়ল। জরাসন্ধ ব্রহ্মচারী স্নাতক ব্রাহ্মণের বেশধারী তিনজনের প্রতি সন্দিহান হলেন।শুরু হল দুই ধুরন্ধর রাজনীতিবিদের বাদানুবাদ যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির অবতারণা। রাজার সন্দেহের মূলে রয়েছে যুক্তি —কৃষ্ণ ও অন্য দু’জন সকলেই ক্ষত্রিয়। কারণ, ব্রাহ্মণোচিত...
পঞ্চবটীবনে রাক্ষসী শূর্পনখার সম্মুখীন হলেন রাম। রামের রূপ দেখে শূর্পনখা, কামমুগ্ধা হল। দর্শনমাত্র শুধু প্রণয় নয়, সোজাসুজি বিবাহপ্রস্তাব নিবেদন করল, সে। রাক্ষসী সদম্ভে তার আত্মপরিচয় দিল। রাক্ষসভাই রাবণ, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ, খর ও দূষণের বোন, এই শূর্পনখা। রাক্ষসী, সীতা ও লক্ষ্মণের ভবিতব্য কী হবে সেটাও নির্ধারণ করল। সে পথের কাঁটা এই দু’ জনকে খেয়ে ফেলবে। রামের প্রস্তাবানুযায়ী লক্ষ্মণের কাছে বিবাহপ্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাতা রাক্ষসী, হিতাহিতজ্ঞানশূন্যা হয়ে সীতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হল।
জরাসন্ধের শাণিত যুক্তির ধারে, কৃষ্ণ ও তাঁর সঙ্গীদের ছদ্মবেশ ছিন্ন হয়েছে, তাঁরা ধরা পড়েছেন। নগ্নতা কি ঢেকে রাখা যায়? তাই শুরু হল দুই নিপুণ রাজনীতিবিদের কূটনৈতিক চাল, কথার লড়াই, যার লক্ষ্য অবিলম্বে একটি রাজশক্তিকে নির্মূল করা এবং সেই সঙ্গে শুরু হল প্রতিপক্ষের প্রতিরোধের প্রস্তুতি। রাজনীতিতে এমন বাগবিতণ্ডা চলতেই থাকে, ঐতিহাসিক জয়পরাজয়ের নিরিখে, উত্থানপতনের নতুন কোন সূচনার সন্ধিক্ষণে সেটি শেষ হয়। মহাভারতে জরাসন্ধের কাহিনিটি তেমনই কোনও এক আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায় কী?
চোখের এক পলকে আহত সাপটি ফণা উঁচিয়ে হিংস্র গর্জনে ছোবল মারল ছেলেটির পায়ে। বিষ ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না—ছেলেটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, নিঃশ্বাস থেমে গেল, তার শরীর নিস্তেজ হয়ে গেল অরণ্যের মাটিতে। চারিদিকে স্তব্ধতা নেমে এল—শুধু দুধের পাত্রটি উল্টে গিয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছিল, আর ধীরে ধীরে সেই সাদা দুধের ধারা ঢিবির মাটির ভিতর মিশে যেতে থাকল।
কোনও এক শান্ত, সবুজে ঘেরা গ্রামে বাস করতেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ—নাম তাঁর হরিদত্ত। জন্মে ব্রাহ্মণ হলেও জীবিকা ছিল কৃষিকাজ। প্রতিদিন ভোরে তিনি নিজের ক্ষেতে যেতেন, রোদে-জলে খেটে মরতেন, তবু ফসল হত না তেমন কিছুই। বছরের পর বছর তাঁর জীবনে যেন অভাবই যেন ছিল একমাত্র ধ্রুব সত্য।
ঘন অরণ্যের গভীরে, এক উঁইয়ের ঢিবির ভিতরে বাস করতো এক ভয়ঙ্কর কেউটে সাপ—নাম তার অতিদর্প। নামের মতোই সে ছিল অহংকারী, শক্তিশালী আর উদ্ধত। সাধারণত সে ঢিবির প্রশস্ত মুখ দিয়েই আসা-যাওয়া করতো। কিন্তু একদিন কেবল খেয়ালখুশিতে সে সরু এক ফাঁক গলে বেরোতে চাইল। বিপদ হল সেখানেই। তার মোটা ও বিশাল শরীর সেই সরু পথের জন্য ছিল একেবারেই বেমানান। জোর করে বেরোতে গিয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত হল তার; গা থেকে রক্ত ঝরতে লাগল।
দ্বিতীয় ধূর্ত ব্যক্তিটি তৈরিই ছিল। মিত্রশর্মা ছাগলটিকে নিয়ে কিছু দূর এগোতেই দ্বিতীয় ধূর্তটি এসে উপস্থিত হল তাঁর সামনে। সে যদিও আগের ধূর্তটির মতো তীব্রভাবে বলল না, বরং একটু বিনয়ের সঙ্গেই বলল, “হে ব্রহ্মন্! বুঝতে পারছি এই মৃত বাছুরটি আপনার অত্যন্ত প্রিয়, তথাপি একে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়াটা একেবারেই অনুচিত। স্মৃতিশাস্ত্রে বলে, মৃত পশুপক্ষী বা মৃত মানুষকেও যদি কেউ স্পর্শ করে তাহলে সে পঞ্চগব্য অর্থাৎ দই, দুধ, ঘি, গোবর এবং গোমুত্র খেয়ে কিংবা চান্দ্রায়ণ ব্রত পালন করে শুদ্ধ হয়। আপনি ব্রাহ্মণ মানুষ। আপনাকে এ সব বলা যদিও ধৃষ্টতা।”
একদিন—মাঘ মাসের কনকনে শীতের ভোরে, যখন হালকা বাতাস বইছে আর ঝিরঝির করে বৃষ্টিও পড়ছে—মিত্রশর্মা গৃহকার্যের পর গ্রামান্তরে যাত্রা করলেন। উদ্দেশ্য, আসন্ন যজ্ঞের জন্য যজমানের কাছ থেকে পশুদানের আবেদন করা। গ্রামান্তরে এক যজমানের বাড়িতে গিয়ে মিত্রশর্মা বললেন, “ওহে যজমান! আগামী অমাবস্যায় একটি যজ্ঞ করব স্থির করেছি। তাই আমাকে একটি পশুদিন—তত্ দেহি মে পশুম্ একম্।”
মুনি যুধিষ্ঠিরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘হে মহারাজ, এই হল সেই মহাসমুদ্র, যা থেকে দেবতারাও উত্পরন্ন হয়েছেন।’ জলের অধিপতি বরুণদেবকে স্মরণ করে যুধিষ্ঠির সেই মহাসমুদ্রেও অবগাহন করলেন।
বিভাণ্ডকমুনি কোন একসময় তপস্যা করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে তপস্থলীর পাশের এক সরোবরে স্নান করতে নামেন। সেই পথে স্বর্গের অপ্সরাশ্রেষ্ঠা উর্বশীকে যেতে দেখে তাঁর তপঃক্লান্ত মন উচাটন হয়।
ইক্ষ্বাকুবংশের রাজা ছিলেন সগর। তিনি অপুত্রক ছিলেন। পুত্রকামনায় পত্নীদের সঙ্গে করে তিনি মহাদেবের তপস্যায় ব্রতী হন। তাঁর কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট মহাদেব তাঁকে বর দেন।
দেবতারা অগস্ত্যমুনির দ্বারস্থ হলেন। আর্জি জানালেন দুর্দান্ত কালেয়দানবদের কীভাবে বধ করা যায়, তার উপায় যদি অগস্ত্য বলে দেন।
সত্যযুগে কালেয় নামের বহু দানব ছিল। তারা কশ্যপমুনির স্ত্রী কালার সন্তান ছিল। বৃত্রাসুরকে তারা নিজেদের নেতা হিসেবে নির্বাচন করে দেবতাদের পর্যুদস্ত করবার জন্য তৈরি হয়েছিল।
ঠাকুরবাড়িতে দুর্গাপুজো বন্ধ হলেও ছুঁয়ে যেত পুজোর আনন্দ। অনেকের স্মৃতিচর্চাতেই ধরা রয়েছে পুজো-আনন্দের খণ্ডচিত্র। নতুন পোশাকআশাক তখনও হত, মিলত পার্বণী। বিজয়ার দিন শুভেচ্ছা-বিনিময় আশীর্বাদ-বিতরণ তো ছিলই, সব থেকে বড় আকর্ষণ ছিল বিজয়াসম্মিলনীর।
রবীন্দ্রনাথের ঔদার্যে সত্যিই চমকিত হতে হয়। নগেন্দ্রনাথকে ভিতর থেকে তিনি স্নেহ করতেন। তাঁর সাহিত্যপ্রীতি, সাহিত্যিকসত্তার জন্যই এই স্নেহ। তাই ভর্ৎসিত হয়েও জামাইবাবাজীবনকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতেই দেখেছিলেন।
জীবনের প্রান্ত সীমায় পৌঁছে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ আবার জোড়াসাঁকোয় ফিরে এসেছিলেন। পার্ক স্ট্রিটে থাকার সময় তাঁর মধ্যে মৃত্যুচেতনা প্রবল হয়ে উঠেছিল। ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদক উমেশচন্দ্র দত্তকে বলেছিলেন, ‘এখন পুঁটুলি বাঁধা ঠিক হইয়া আছে, ডাক হইলেই চলিয়া যাইব।’
রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথের সত্যি তুলনা হয় না। কত দিকে তাঁর আগ্রহ ছিল, প্রতিভার বিচ্ছুরণ আমাদের অভিভূত করে। সাহিত্যে, দর্শনে, সংগীতে, গণিতশাস্ত্রে — নানাদিকে সাফল্য। গল্পের মতো তাঁর দৈনন্দিন জীবন, সারল্যে ভরপুর। দ্বিজেন্দ্রনাথের দুই কন্যা বধূ হয়ে গিয়েছিলেন রামমোহন রায়ের পরিবারে। প্রিন্স দ্বারকানাথের সঙ্গে রামমোহনের বন্ধুত্ব ছিল। দ্বিজেন্দ্রনাথ রামমোহন-পরিবারে তাঁর দুই কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন, ওই পরিবার থেকে বধূমাতাও এনেছিলেন।
উমাচরণ ছিল ‘পুরাতন ভৃত্য’। রবীন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে কখনও শান্তিনিকেতন গিয়েছেন, আবার কখনো বা শিলাইদহে। উমাচরণকে রবীন্দ্রনাথ খুবই পছন্দ করতেন। সবসময়ই হাসিখুশি, সরসতায় ভরপুর। তার হাঁটায়, চলায়, কথা বলায়, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে হাস্যরসের অভাব হয়নি। এমন সব কাণ্ড করত, নিতান্ত বেরসিকও হেসে ফেলত। কবিও হাসতেন, খুব ভালোওবাসতেন তাকে।
জীবনের সুখ-দুঃখ উভয়কে শান্তভাবে নিজের ভালো-মন্দ কাজের ফল বলে মনে করে। ও নিজে যতটা সম্ভব ভালোভাবে জীবনযাপন করার চেষ্টা করে। অপর কেউ কেউ, সব ঈশ্বরের দান মনে করে যথাসম্ভব অনাসক্ত এবং সন্তুষ্ট থাকতে চেষ্টা করে। অন্য কেউ কেউ সুখ-দুঃখকে সংসারের অবিচ্ছেদ কর্মফল অনুযায়ী পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করে।
ঠাকুর বলতেন, “ঈশ্বরীকর্তা আমি অকর্তা” জেনে কাজ করা। “ভক্তি তার কিরূপ প্রিয়। খোল দিয়ে যাব যেমন গরুর প্রিয়, গপ গপ করে খায়।” ভক্ত রাগভক্তি, শুদ্ধা ভক্তি, অহেতুক ভক্তি চায় কেবল। কিছুই চায় না। কোনও কামনা নাই, তাঁকে ভালোবাসা আর, মত্ত হয়ে যাওয়া।
সত্য এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে হতে পারে। নাম ও রূপের পার্থক্য মাত্র। এক সেই চৈতন্য। এক সমুদ্রের জল ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে ঢালার পর যেমন বালতির জল, কলসির জল, ঘটির জল নামে ডাকা হয়।
চৈতন্যের না আছে জাত বিচার, না আছে উচ্চ নিচ। পশু-কীট-পতঙ্গ সবাই সমানভাবে তাতে সমাহিত হয়ে রয়েছে। আধ্যাত্মিক জীবন যাপনে মানে ঈশ্বর ও জগৎ সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এমনকি নিজের শরীরের প্রতি যেমন অত্যাধিক যত্নের প্রয়োজন নেই, তেমন আবার অযত্ন করাও উচিত নয়।
স্বামীজি বলতেন, যে জ্ঞানে গুরু উড়ে যায়, সে জ্ঞান জ্ঞান নয়, অজ্ঞান। বিচার করে কূলকিনারা পাওয়া যায় না। তত্ত্ব জ্ঞান যে জগতে প্রতিটি জীবের উপর এমনভাবে প্রয়োগ করা যায়, মাকে না দেখলে বোঝা যায় না। সবার উপর সমান মাতৃত্ববোধ এমনকি, শ্রীরামকৃষ্ণের উপর…
আপনার অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনার অনুসন্ধান পরিমার্জিত করার চেষ্টা করুন অথবা ওয়েবসাইট মেনু থেকে পোস্টটি সনাক্ত করুন।
আপনার অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনার অনুসন্ধান পরিমার্জিত করার চেষ্টা করুন অথবা ওয়েবসাইট মেনু থেকে পোস্টটি সনাক্ত করুন।
সরলাবালা যখন বোসপাড়া লেনে সিস্টার নিবেদিতার স্কুলে পড়তেন, তখন একদিন স্কুল ছুটির পর সুধীরাদিদি তাঁদের চার-পাঁচজনকে নিয়ে শ্রীমার বাড়িতে গেলেন। প্রসঙ্গত, সুধীরাদি নিবেদিতার সহকারিণী ছিলেন। তাঁর পাশে সবসময় থাকতেন। সুধীরাদি সরলাদের নিয়ে এলেন যখন, তখন সারদা মা ঠাকুরঘরে আসনে বসেছিলেন। আর কুসুমদি তাঁকে একটি বই পড়ে শোনাচ্ছেন। মেয়েরা তাঁকে প্রণাম করলে শ্রীমা তাদের বসতে বললেন।
শ্রীমার বাড়িতে সন্ধ্যের সময় ‘কাশীখণ্ড’ পাঠ হত। একবার পাঠের পর স্বামী অরূপানন্দ মা সারদার কাছে জানতে চান যে, কাশীতে মৃত্যু হলে সবারই কি মুক্তি হয়? শ্রীমা বলেন যে, শাস্ত্রে বলে ‘হয়’। অরূপানন্দ বলেন যে, ঠাকুর তো কাশীতে দেখেছিলেন, শিব তারকব্রহ্ম মন্ত্র দেন। তা শ্রীমা সেখানে কি দেখলেন। শুনে শ্রীমা বলেন, ‘কি জানি বাপু, আমি তো কিছু দেখিনি’।
বড়দিনের ছুটিতে মা সারদার কাছে থাকবেন বলে সুধীরাদি সরলাবালাদের নিয়ে কাশী যান। শ্রীমা তখন কাশীতে রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি যোগেনমা আসতে পারল না বলে আক্ষেপ করতে লাগলেন। যোগেনমার অসুখ হয়েছিল, তাই সরলাদেবীর বড় ভাবনা হয়েছিল। সুধীরাদি কিছুক্ষণ কথা বলে যে ভাড়াবাড়ি তাদের থাকার জন্য ঠিক করা হয়েছে, তা দেখতে গেলেন।
আজ দুর্গাষ্টমী। শ্রীমায়ের চরণপুজোর জন্য তাঁর পায়ে ভক্তদের দেওয়া ফুলবেলপাতার স্তূপাকার হয়েছে। এমন সময়ে বহুদূর থেকে তাঁর কাছে তিনজন গরীব পুরুষ আর মহিলারা দর্শন করতে এসেছেন। তারা একবস্ত্রে ভিক্ষা করে টাকা জোগাড় করে পথের খরচ চালিয়ে এসেছেন। এদের মধ্যে একজন পুরুষভক্ত শ্রীমার সঙ্গে গোপনে কথা বলেই চলেছেন।
মা সারদা তাঁর ইহজীবনের শেষের দিকে প্রায়ই অসুস্থ হতেন। তবে তাঁর ঠাকুরের মতোই শরীরের অসুস্থতা মনের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ঠাকুরের স্নেহধন্য ভক্ত বলরাম বসুর পুত্র রামকৃষ্ণ বসু তাঁর দেহত্যাগের দু’চারদিন আগে একটি উইল করে যান। তখন শ্রীমা অসুস্থ হয়ে উদ্বোধনে ছিলেন। ওই উইল তৈরির পরদিন বিকেলেই শ্রীমার সেবিকা সরলাদেবী তাঁর কাছে উইলের কথা জানিয়ে বলেন যে, রামবাবু তাঁর উইলে ঠাকুরসেবা আর সাধুসেবার জন্য প্রচুর টাকার ব্যবস্থা করেছেন।
আপনার অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনার অনুসন্ধান পরিমার্জিত করার চেষ্টা করুন অথবা ওয়েবসাইট মেনু থেকে পোস্টটি সনাক্ত করুন।
সুবিনয় পায়চারি করছে ছাদে। ছাদের রেলিং ঘেঁষে বেশ কয়েকটি ফুলের টব। তাতে গাঁদা-চন্দ্রমল্লিকা-ডালিয়া ফুটে রয়েছে। ওরা বাপ-বেটি যে যখন সময় পায় পরিচর্যা করে ওদের। প্রিয়া ফুল খুব ভালোবাসে। বড় দুঃখী তার মেয়েটা। জন্মের মাত্র ছ’মাস পরেই মাকে হারাল। সুমিতা না থাকলে কী করে যে প্রিয়াকে মানুষ করত, ভাবতেও ভয় করে সুবিনয়ের।
সিদ্ধার্থের যখন বয়স বারো, তখন একদিন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর সময় অ্যাক্সিডেন্টে ভীষণভাবে আহত হয় বাবা। দিন তিনেক নার্সিংহোমে শুয়ে থাকার পর মারা যায়। একটুও কষ্ট তো সিদ্ধার্থের হয়ইনি, বরং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল এই ভেবে, যে মাকে আর রোজ রোজ অপমানিত হতে হবে না। কিন্তু সিদ্ধার্থের ভাবনায় একটু ভুল ছিল।
ভারি মিষ্টি মেয়ে প্রিয়া। সিদ্ধার্থের যখন এমএ ফাইনাল ইয়ার, তখন ওর এক বন্ধু প্রিয়াকে পড়াবার কথা বলেছিল ওকে। প্রিয়ার তখন বিএ ফার্স্ট ইয়ার। একদিন বিকেলে ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে সিদ্ধার্থ কবিতাকে বলেছিল, “মা, একটা টিউশনি পেয়েছি। মেয়েটি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে।
ডাক্তার চৌধুরীর অ্যাপার্টমেন্টের দরকার পড়েনি। ওষুধও আনাতে হয়নি। তবে ঘুমের ওষুধগুলো সব শেষ হয়ে গিয়েছে। লাবণ্য ঘুমের মধ্যেই চিরদিনের মতো চিরঞ্জীবের কাছে ফিরে গিয়েছে।
হঠাৎ একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়ায় ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। চাদরটা পায়ের কাছ থেকে নিতে গিয়েচমকে উঠল লাবণ্য টেবিলের পাশেচেয়ারে কে বসে? কে?
একেজি হাসলেন। শিশুসুলভ হাসি। বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, গতবার বলেছিলেন। আমারই খেয়াল থাকে না। মনে রাখার চেষ্টা করব এবার থেকে। এখন বসুন ইরাবতী।” ইরাবতী বসতে-বসতে বলল, “আর আপনি আজ্ঞেও ছাড়তে হবে স্যার। আপনার অন্যান্য অফিসারদের আপনি যেমন নাম ধরে ডাকেন এবং তুমি বলেন, আমাকেও তেমনই বলতে হবে। হতে পারে তাঁরা আপনার স্নেহের যোগ্য, কিন্তু আমিও সময় পেলে সেই যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত!”
উল্লাস সেই সন্ধ্যার দিকে ফোন করেছিল। তার কিছু পরে মেসেজ। এখন ঘড়ির কাঁটায় তার সাড়ে তিনটে। ক্লান্তিতে ঘুম জাঁকিয়ে আসার কথা। কিন্তু ঘুমের কোনও তাড়নাই নেই তার মধ্যে। এই সময় উল্লাসকে ফোন করা অমানবিক হবে ভেবে শাক্য তাকে একটা মেসেজ করল, “খুব বিজি ছিলাম। কাল সকালে কথা বলবো” বলে। সে আশা করেছিল, কাল সকালে মেসেজ দেখে উল্লাস রিপ্লাই দিলে সে তাকে ফোন করে নেবে। নিশ্চয়ই কোন গুরুত্বপূর্ণ আপডেট আছে, না-হলে উল্লাস এতবার ফোন করত না। এই মুহূর্তে উল্লাস থাকলে ম্যাসাজ নেওয়া যেত। সারাদিনের হেকটিক শিডিউলসের পরে ম্যাসাজ জাস্ট চার্মিং রিফ্রেশমেন্ট। কিন্তু উপায় নেই। উল্লাস এখন আছে অনেক দূরে।
সুদীপ্তর মনে পড়ে গেল, শাক্য স্যারের সঙ্গে যেদিন এসেছিল, একজন বৃদ্ধ কিন্তু সতর্ক এবং ক্ষিপ্র স্বভাবের একজন বয়স্ক মানুষ তাদের সত্যব্রতর কাছে নিয়ে গিয়েছিল। এ-কি সেই? তাহলে তার অ্যাসেসমেন্ট ঠিক ছিল। তবে লোকটি কেবল সতর্ক এবং ক্ষিপ্রই নয়, চতুরও বটে। এই ভাবে দু’জন ক্রিমিন্যালকে বন্দি করা চাট্টিখানি কথা নয়।
উঠে পড়ল পূষণ। বিছানা থেকে নেমে পায়ে স্লিপার গলিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোল সে। রিমিতা নিশ্চয়ই শাওয়ার নিচ্ছে। শাওয়ার সেক্স তার খুব পছন্দের। হলে মন্দ হয় না। কিন্তু ওয়াশরুমের দিকে গিয়ে হতাশ হল সে। ওয়াশরুমের দরজা এদিক থেকেই বন্ধ। তার মানে এটাই বোঝায় যে, রিমিতা ওয়াশরুমেও নেই। নীচে গিয়েছে কি? ডাইনিং-এ? হতে পারে। হয়তো সে ঘুমাচ্ছে দেখে তাকে আর বিরক্ত করেনি। ফ্রেশ হয়ে মর্নিং-টি খাচ্ছে লনে বসে। এখনও রোদ তেমন চড়া নয়। কিছুক্ষণ পরে আর লনে বসে থাকা যাবে না। এসেছিল যখন তখন ভরা বসন্ত। আর এখন চড়া বসন্ত!
মুহূর্তের মধ্যে মাথার মধ্যে কীরকম একটা করে উঠল ভোলারামের। প্রাণঘাতী চিৎকার করে সে গ্রামের দিকে ছুটল। এখন আর তার পা টলছে না, মাথা ঝিমঝিম করছে না। ছুটেই চলেছে সে, আর চিৎকার করছে, “মরে গেছে! হায় কালাদেও! মরে গেছে! কালাদেওর সেবায়েত মঙ্গল ওঝা মরে গেছে!” তার সেই চিৎকারে কুকুর-শিয়ালগুলিও ঘাবড়ে গেল যেন। মুহূর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে সবাই ছিটকে গেল। এদিকে ভোর যে আবার নতুন এক পবিত্র, বিশুদ্ধ কবিতা লেখার আয়োজন করছিল, তাতে যেন রক্তের ছিটে এসে লাগল! একটা অনাঘ্রাত ভোর মুহূর্তেই কুশ্রী, বীভৎস হয়ে পড়ল!
যন্ত্রণার অতীত ধৃতিমানেরও আছে। বাবুর এই পোষ্যটি ছোট্টবেলার সঙ্গী। বুবু তাঁর আত্মার আত্মীয়। সেই রানাঘাটের বাড়ি থেকে তার সঙ্গে রয়েছে। তখন বাবা-মা সকলে ছিলেন। এখন কেউ বুবুর বয়েস জানতে চাইলে, ‘অত হিসেব করি না’ বলে এড়িয়ে যায়। আসলে তার ভয় হয়। বুবুকে হারিয়ে ফেলার ভয়। মাকে যেমন আচমকা হারিয়ে ফেলেছিল। মা যখন চলে গেলেন বাবু তখন ক্লাস নাইন। বাবু একা আর ভাই বোন নেই। কাছের বলতে ছিল বুবু।
এখন অনেক রাত। একা একা যখন ঘুম আসে না। তখন সারাদিনে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনা থেকে টুকরো টুকরো অংশগুলো মনের ব্ল্যাকবোর্ডে জিজ্ঞাসা চিহ্ন দিয়ে লেখা হতে থাকে। সে ভাবেই আজ হঠাৎ শ্রেয়ার ব্যাপারটা এলো! দ্রুত চলে এলো দৃশ্যগুলো। সিনেমাতে একে মন্তাজ বলে। পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কহীন কতকগুলো দৃশ্য জুড়ে অন্য একটা মানে তৈরি হয়। জাক্সটাপোজ অফ শটস!
সৎ বা অসৎ নারকেল গাছ হয় না। আমরা মুখে বলি বটে সাপের মতো হিংস্র। কিন্তু সাপ তো ভয় পেয়ে কামড়ায়। নিজের কর্তৃত্ব ফলাতে পশুপাখিরা কোনও কাজ করে না। সত্যবাদী বা মিথ্যেবাদী ধানগাছ হয় না। মানুষের মন এইসব ভয়ংকর বিষে টইটুম্বুর। তাই তাদের বিচার করতে গিয়ে সরাসরি পাটিগণিত বীজগণিত বা জ্যামিতির সম্পাদ্য উপপাদ্যতে কাজ হয় না। ফিজিক্স কেমিস্ট্রি বায়োলজি আর সাইকোলজিকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করতে হয়।
বুবু ঘুমিয়ে পড়েছে। তার খাঁচায় রোজকার মতই চাপা দেওয়া। ঘরের আলো নেভানো। বড়বড় গরাদওয়ালা লম্বালম্বা জানলা ছিল এ বাড়িতে। বুবুর জন্যে বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে আলাদা করে জাল লাগিয়ে নিয়েছে ধৃতিমান। চলকে আসা চাঁদের আলো সেই জাল বেয়ে মেঝেতে পড়েছে। স্টেজে ডিমারের মুখে জাল লাগিয়ে যেরকম একটা এফেক্ট দেওয়া হয়। মেঝেতে ঠিক তেমনি আলো-ছায়ার আঁকিবুকি।
শান্তিবাবু যেন ধৃতিমানকে বোঝান যে হাতের লক্ষ্মী এ ভাবে পায়ে ঠেলতে নেই। ধৃতিমানের সঙ্গে কথা বলে শান্তি সর্বজ্ঞ যেন অতি সত্বর ধৃতিমানের ব্যাংক ডিটেলস বিকাশ লাহিড়ির কাছে পাঠিয়ে দেন। ধৃতিমানের টাকা ব্যাংকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বিকাশ লাহিড়ীর সহকারি করিমুল নামের একটি ছেলে দলিল নিয়ে আসবে, সেখানে লাগানো নো অবজেকশনের চিঠি থাকবে। শুধু ধৃতিমানের একটা সই চাই।
মায়েরটা অন্যরকম। একটা মানুষকে ঘিরে এত বছরের যৌথজীবনে একটা ছেদ। হঠাৎ যেন একটা ভয়ঙ্কর শূণ্যতা। দিয়া বোঝার চেষ্টা করেও যেন মায়ের একাকীত্ব বুঝতে পারে না। অপরের মনকে বোঝা খুব কঠিন। স্বামী-স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে সকলেই হয়তো তাদের মতো চেষ্টা করে। কিন্তু বুঝতে পারে ? দিয়া তো চেষ্টা করেও পারে না।
মা ঠিক হয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন দিয়াই শবদাহের কাজ করবে। শববাহী গাড়িতে সামনের ড্রাইভারের সঙ্গে একজন আর পিছনে তিনজনের বসার জায়গা ছিল। দিয়া আর তার মা শান্তি পিছনে বসেছিল। সবটুকুই জীবনে প্রথমবার। মাকে নিয়ে এর আগে অ্যাম্বুল্যান্সে চেপে বাবাকে হাসপাতাল থেকে থেকে নিয়ে আসা বা আজ বাবার মৃতশরীর পিছনে নিয়ে এই শববাহী গাড়িতে শ্মশানে যাওয়া।
চিনিছাড়া চা! সেদিন বাবার ঘুম ভাঙছে না। দু’ চারবার স্বাভাবিকভাবে ডাকার পর দিয়া ভয় পেয়ে গেল। ডাকাডাকিতে মার ঘুম ভেঙে গেছে। আচমকা ঘুম থেকে উঠেই নিজের সব থেকে প্রিয় মানুষকে নিথর হয়ে থাকতে দেখে মায়ের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ মুখ থেকে একটা গোঁগোঁ শব্দ করতে করতে মা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছিলেন।
শুধু নম্বর নয়! দিয়া মনোবিজ্ঞানকে ভালোবেসে পড়েছে। তখনই জানতে পেরেছে ফ্রয়েডের মতে, বহুদিন ধরে জমে থাকা কোনও তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা জৈবিক চাহিদা যখন হঠাৎ পূরণ হয়, তখন আমরা সুখ অনুভব করি। অভাব থেকে প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে, তাই চাহিদা মেটানোর পর আর এই অনুভূতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।
দিয়া একবছর বাদে পার্মানেন্ট হবে। ছুটিছাটা একটু বাড়বে। পিএফটা কাটবে। কিন্তু শেষমেশ সেও-তো ভাড়ারই কর্মী। বিদেশের কোম্পানিদের জন্য ভাড়ায় কাজ করে। ক্লায়েন্ট। তারা ডলারের হিসেবে ‘অ্যাথেনা ইনফোটেক’-এর সার্ভিস ভাড়া নেয়। ভাড়ায় এখন সবকিছু। বাড়ি-গাড়ি সাজপোশাক আসবাবপত্র ঠাটবাট লোকলস্কর। উকিল মোক্তার ডাক্তার। স্যাটেলাইট। এমনকি গোপনে, ভাড়ার বর ভাড়ার বৌ।
মনকে বোঝালাম আমি যেসব ভাবছি তা নয়। ফাঁকা সাবওয়েতে নেশাখোরেরা নানা রকমের নেশা করে। গাঁজা চরস হেরোইন হতে পারে এসব তারই গন্ধ।
গতরাতে যিনি টেলিফোনে এসেছিলেন। আমার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটির শরীরের ঘ্রাণ আমার নাকে। শ্মশানে আগুনে দাহ হতে থাকা চামড়া মাংস পোড়া গন্ধ।
সাঁতার কাটলে বেশ খিদে পায়। ডাক্তারবাবুর নির্দেশে আমি অবশ্য ঠিক সাঁতার কাটি না। জলের মধ্যে চলবার চেষ্টা করি। এটাও যথেষ্ট শ্রম সাপেক্ষ। অন্তত আমার মতো ওজনের লোকের কাছে।
হঠাৎ আমার ঘরের ফোনটা বেজে উঠলো। এত রাতে কার ফোন? মার শরীর খারাপ-টারাপ হল না তো? আমাদের বাড়িতে যিনি কাজ করেন তার নাম বা পদবি আমি জানি না।
রুমের টেলিফোনটা বাজছে। আমার সামনের বড় আয়নাটার পাশে দেওয়ালে লাগানো লাল টুকটুকে ছোট্ট ফোনটাও মৃদুস্বরে তার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।
অর্কপ্রভর সঙ্গে সানন্দার সম্পর্কটা বিষিয়ে গিয়েছে। প্রণয় আর বাবলির সম্পর্কটা থমকে আছে। বাবলির সঙ্গে কথা বলে আমার বারবার মনে হয়েছে। প্রণয়কান্তির এত দুর্ব্যবহার সত্ত্বেও বাবলি যেন অবচেতন মনে তাকে ক্ষমা করে দিচ্ছে। বারবার। প্রণয়ও কিন্তু নানা অন্যায় করলেও এখনও অন্যকোনও স্থায়ী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েনি।
শিবানীর মেয়ে ঈশানী এখন সবে ক্লাস এইট। ও কসবার হালতুর অনেকটা ভিতরে একটা এককামরার ফ্ল্যাট কিনতে পেরেছে। লেনিননগরেরবাড়ি বিক্রির যে টাকা, তার সঙ্গেই শিবানীর এতদিনের জমানো টাকা মিলিয়ে বাড়িটা কেনা সম্ভব হয়েছে। ছোটকা কে.কে চেয়েছিলেন শিবানীকে সাহায্য করতে।
অরুণাভ এবং বাবলির যোগাযোগ নিয়ে প্রণয়ের সন্দেহের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু অরুণাভ এখন টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। পয়সা দিয়ে চারটি গুন্ডা পাঠিয়ে তাকে ধমকধামক দিলে ফল হিতে-বিপরীত হতে পারে। আর গোপনে দু’জনের ছবি তুলে পরকীয়ার অপরাধে বাবলিকে যে প্রণয় ডিভোর্স দিয়ে দেবে তেমন কোনও সম্ভাবনাই নেই।
সানন্দা বসুন্ধরা ভিলার মেয়ে না হলে এত কিছু করা সম্ভব হয়তো হতো না। পিছনে বসুন্ধরা ভিলার প্রচ্ছন্ন সাহায্য থাকার কারণেই তার কোন ক্ষতি করার কথা অর্কপ্রভ ভাবতেও পারেনি।
দিদি শান্তিলতা চিরটাকাল ভীতু! কোনওদিন মুখফুটে নিজের জন্য কিছু চায়নি। কোনও কিছুর প্রতিবাদ জানায়নি। ওর যে মন্তেসরি নিয়ে পড়াশোনা করে বাচ্চাদের স্কুলে পড়াবার ইচ্ছে ছিল সেটাও বলেছে অনেক পরে।
আপনার অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনার অনুসন্ধান পরিমার্জিত করার চেষ্টা করুন অথবা ওয়েবসাইট মেনু থেকে পোস্টটি সনাক্ত করুন।