বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

০৫: পিঁপড়ে আর সাপের কাহিনি

ঘন অরণ্যের গভীরে, এক উঁইয়ের ঢিবির ভিতরে বাস করতো এক ভয়ঙ্কর কেউটে সাপ—নাম তার অতিদর্প। নামের মতোই সে ছিল অহংকারী, শক্তিশালী আর উদ্ধত। সাধারণত সে ঢিবির প্রশস্ত মুখ দিয়েই আসা-যাওয়া করতো। কিন্তু একদিন কেবল খেয়ালখুশিতে সে সরু এক ফাঁক গলে বেরোতে চাইল। বিপদ হল সেখানেই। তার মোটা ও বিশাল শরীর সেই সরু পথের জন্য ছিল একেবারেই বেমানান। জোর করে বেরোতে গিয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত হল তার; গা থেকে রক্ত ঝরতে লাগল।

কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষতস্থান ফুলে ঘা হয়ে উঠল আর সেই ঘা থেকে বেরোনো দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তেই চারদিক থেকে অসংখ্য পিঁপড়ে এসে হাজির হল। ছোট্ট শরীর, কিন্তু অগণিত সৈন্যের মতো দল বেঁধে তারা সাপটিকে ঘিরে ধরল।
অতিদর্প ক্রোধে ফুঁসতে লাগল। এক-আধটা পিঁপড়ে হয়তো সে মেরে ফেলতে পারলো, কিন্তু হাজার হাজার পিঁপড়ের সঙ্গে এই আহত শরীর নিয়ে সে পেরে উঠবে কি করে! একসঙ্গে কামড়ে, দংশন করে তারা তাকে অসহায় করে তুলল। তার শক্তিশালী দেহ, তীক্ষ্ণ দাত, ভয়ংকর ফোঁসফোঁস—সবই নিরর্থক হয়ে গেলো সেই একঝাঁক ক্ষুদ্র প্রাণীদের দলের সামনে।
দিন যত গেল, ক্ষত আরও গভীর হলো, পিঁপড়ের আক্রমণও হল আরও তীব্র। শেষ পর্যন্ত দম্ভভরে বেঁচে থাকা সেই সাপটি ধীরে ধীরে জীর্ণ হয়ে একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।

৫ম কাহিনি সমাপ্ত

কাহিনি শেষ করে স্থিরজীবী গম্ভীর গলায় বললেন— “এই কারণেই বলেছিলাম, শত্রুরা সংখ্যায় অনেক হলে তাদের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে এ বিষয়ে আমার আরও কিছু কথা আছে—সেগুলো যদি মন দিয়ে বুঝে সেই মতো কাজে লাগাও, তবে আমরা অবশ্যই সফল হবো।”
বায়সরাজ মেঘবর্ণ অতি ব্যগ্র হয়ে হাত জোড় করে বললেন— “আপনি শুধু আদেশ করুন, প্রভু। আপনার কোনও নির্দেশ আমরা কখনো অমান্য করবো না।”
স্থিরজীবী হালকা হেসে বললেন—“ওহে বৎস! রাজনীতিবিদরা যেসব উপায়ের কথা বলেছেন—সাম, দান, ভেদ, দণ্ড—তাদের বাইরে আরেকটি উপায় আছে, পঞ্চম কৌশল, সেটি হল ছলনা। আজ আমাদের এই সংকটে ছলনার আশ্রয় নেওয়াই একমাত্র সমাধান।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৯: ক্ষুদ্র শক্তি সংগঠিত হলে বড় শত্রুও হার মানে

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৯: পথিমধ্যে অতর্কিতে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৮: স্ত্রী সীতার ব্যক্তিত্বের প্রভায় রামচন্দ্রের আলোকিত উত্তরণ সম্ভব হয়েছে কি?

বায়সরাজ নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। স্থিরজীবী ধীরস্বরে কিন্তু দৃঢ় ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন— “এবার তুমি যেমন যেমন বলছি তেমনই করবে। প্রথমে আমাকে তোমার শত্রু ভেবে কঠিন ভাষায় ভর্ত্সনা করতে থাকবে, যাতে শত্রুদের গুপ্তচরদের মনে এই ধারণা জন্মায় যে আমি রাজ্য থেকে নির্বাসিত হয়েছি। তারপর কোনো জায়গা থেকে থেকে সামান্য রক্ত সংগ্রহ করে আমার শরীরে মাখিয়ে দেবে, যেন মনে হয় আমি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছি। সেই অবস্থায় আমাকে এই বটগাছের নিচে ফেলে রেখে তুমি পরিবার-পরিজন নিয়ে ঋষ্যমূক পর্বতে চলে যাবে। সেখানে অপেক্ষা করবে যতদিন না আমি আমার রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে শত্রুকে সম্পূর্ণ বশে আনি। যেদিন শত্রুরা আমার উপর ভরসা করবে, সেদিন আমার পরিকল্পনা সম্পূর্ণ হবে।

ততদিনে আমি এদের দুর্গের প্রতিটি গোপন তথ্য জেনে নেবো। আর দিনের বেলায়, যখন এই পেঁচার দল কিছুই দেখতে পাবে না, ঠিক তখনই আমি তোমাদেরকে দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করাবো, আর আমরা শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করবো। আমি অনেক চিন্তাভাবনা করেই এই পরিকল্পনা করেছি। এর বাইরে আমাদের সাফল্যের কোনো পথ দেখতে পাচ্ছি না। মনে রেখো, এই দুর্গের থেকে পালানোর কোনো দ্বিতীয় রাস্তা নেই, এই দুর্গ একদ্বার বিশিষ্ট। পালাবার পথ ছাড়া দুর্গ মানেই মৃত্যুকূপ। শাস্ত্রে বলা আছে—নীতিশাস্ত্রজ্ঞরা যে দুর্গকে শ্রেষ্ঠ বলেছেন, তা হলো সেই দুর্গ যেখানে অন্তত একটি গোপন নির্গমনের পথ থাকে। আর নিষ্ক্রমণের পথ বিহীন দুর্গ আসলে নামেই দুর্গ, প্রকৃতপক্ষে সেটা এক বিশাল কারাগার ছাড়া আর কিছু নয়।”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৪: তালবাতাসি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক

কিছুক্ষণ নীরব থেকে স্থিরজীবী আবার বলতে শুরু করলেন। তাঁর চোখে তখন অদ্ভুত এক দীপ্তি, কণ্ঠে এক আশ্চর্য রকমের দৃঢ়তা ও কৌশলের ছাপ। তিনি বললেন, “বৎস! এই সময়ে আমাকে নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা কোরো না। শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতরা স্পষ্ট বলেছেন। যুদ্ধের ঘোর মুহূর্তে ভৃত্যকে প্রাণাধিক প্রিয় ভাবলেও, তাকে শুষ্ক কাঠের মতো বিবেচনা করতে হবেভ ‘পশ্যেচ্ছুষ্কমিবেন্ধনম্‌’। যতদিন শান্তি বিরাজমান, ততদিন রাজার কর্তব্য ভৃত্যকে নিজের প্রাণের মতো রক্ষা করা, আপন শরীরের মতো লালন-পালন করা—যাতে সে একদিন শত্রুর মোকাবিলা করার শক্তি অর্জন করতে পারে। মনে রেখো, ভৃত্যকে রাজা কেবল সেবা করার জন্যই ভরণ-পোষণা করেন না, সে যাতে যুদ্ধের সময় রাজার শত্রুদেরকে প্রতিরোধ করার শক্তি অর্জন করতে পারে সে জন্যেও রাজা ভৃত্যদেরকে পালন করেন আর সেই সম্ভাবনাকেই কাজে লাগানোই হলো প্রকৃত রাজনীতি। তাই আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সে বিষয়ে তুমি আর তাতে আপত্তি করো না—তত্ত্বযা অহং ন অত্র বিষযে প্রতিষেধনীযম্‌।”

স্থিরজীবী শেষ নির্দেশ দেওয়ার পরই, হঠাৎ যেন রাগে ফেটে পড়ে বায়সরাজ মেঘবর্ণের সঙ্গে উচ্চস্বরে বিবাদ শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিলো বিদ্রুপ আর বাক্যে ছিলো উচ্ছৃঙ্খলতার ঝাঁঝ। চারপাশে থাকা অন্যান্য ভৃত্যরা এত বড়ো মন্ত্রীর এহেন আচরণ দেখে আর সহ্য করতে পারলো না। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো। কিন্তু মেঘবর্ণ তাঁদের থামালেন। হাত তুলে বললেন— “অহো! নিবর্ত্তধ্বং যূযম্‌! শান্ত হোন সকলে। শত্রুর পক্ষপাতী যে দুষ্ট, তাকে দণ্ড দেওয়া হবে, তাতে কোনো দেরি নেই।”
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩০: ঠাকুরবাড়ির জামাই রমণীমোহনকে মন্ত্রী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৭: গ্রিন টি /৫

এই বলে তিনি নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন বৃদ্ধমন্ত্রী স্থিরজীবীর উপর। তাঁর ধারালো ঠোঁট ধীরে ধীরে আঘাত করতে লাগলো বারবার আর স্থিরজীবী যেমন পরিকল্পনা করেছিলেন, তেমনি রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। এরপর মেঘবর্ণ, সমস্ত নাটক নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে, পরিবার-পরিজনকে নিয়ে ঋষ্যমূক পর্বতের দিকে পাড়ি দিলেন।
এদিকে কাকেদের শিবিরে বসে থাকা শত্রুরাজা উলূকরাজ অরিমর্দনের গুপ্তচর, চতুর কৃকালিকা সবকিছু লক্ষ্য করল। স্থিরজীবী আর মেঘবর্ণের এই বিবাদ, রক্তাক্ত অবস্থা, আর পরিবারের প্রস্থান—সবটুকুই সে নিখুঁতভাবে জানাল অরিমর্দনকে। উল্লাস ভরে কৃকালিকা জানাল—“প্রভু! আপনার শত্রু এখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সপরিবারে দূরে পালিয়েছে।”

অরিমর্দনের মুখে তখন বিজয়ের হালকা হাসি। বিকেলের আলো-আঁধারিতে, সূর্য যখন ধীরে ধীরে দিগন্তে অস্ত যাচ্ছে, তখন সে সমস্ত মন্ত্রী ও ভৃত্যদের সমবেত করে বলল— “এটাই আমাদের সেরা সুযোগ! শত্রু যখন ভয়ে পালায়, কিংবা পুরোনো জায়গা ছেড়ে নতুন আস্তানায় যায়, এই দুই সময়ই রাজারা দুর্বল হয়। কারণ তখন তাদের ভৃত্যরা ব্যস্ত থাকে, সৈন্যরা ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। যুদ্ধশাস্ত্র স্পষ্ট বলে দিয়েছে, এই সময় আঘাত করলেই শত্রুকে দাসত্বে পরিণত করা যায়। তাই আর দেরি নয়, এখনই মেঘবর্ণকে আক্রমণ করতে হবে!”
অরিমর্দনের কণ্ঠে ছিলো তখন বিদ্যুতের মতো ঝঙ্কার। পেঁচাদের সৈন্যরা তখন উৎসাহে চিৎকার করে উঠলো আর রক্তলাল অস্তগগনের তলায় যুদ্ধের ছায়া যেন ক্রমে ঘনীভূত হতে লাগল। অনুচরদের এভাবে উত্সাহিত করে উলূকরাজ অরিমর্দন হঠাৎ ঝড়ের মতো নির্দেশ দিলেন আক্রমণের। মুহূর্তেই কাকসৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ল আর চারদিক থেকে বটবৃক্ষকে ঘিরে ফেললো। পুরো বনভূমি তখন যেন অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত হল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—একটিও কাকের দেখা পাওয়া গেল না!
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

রাজার সঙ্গে থাকা স্তাবকবৃন্দরা তখন উল্লাসে চিৎকার করে উঠল, রাজার জয়ধ্বনি আকাশে প্রতিধ্বনিত হল। অরিমর্দন উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে স্বয়ং বটশাখায় উড়ে বসলেন। চোখ দুটো রক্তাভ, কণ্ঠে বজ্রের মতো গর্জন—
“অহো! জ্ঞাযতাং তেষাং মার্গঃ!” -শত্রুরা কোন পথে পালিয়েছে, খুঁজে বার করো! ওরা অন্য কোনও দুর্গে আশ্রয় নেওয়ার আগেই হত্যা করতে হবে। কারণ একবার যদি শত্রু নতুন দুর্গে শিকড় গাড়ে, তবে সে পুনরায় রণসামগ্রী সঞ্চয় করবে, শক্তিশালী হবে, আর তখন তাকে আর জয় করা যাবে না।”

উলূকরাজের এ ঘোষণা শুনে স্থিরজীবীর চিন্তিত হলেন। মনে মনে ভাবলেন— “হায়! যদি এরা আমাদের কিছুই না জেনে যেমন এসেছিল সেভাবে ফিরে চলে যায়, তবে তো আমাদের সমগ্র পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে। কথায় বলে—
যে কাজ শুরুই করে না, সে-ই প্রকৃত বুদ্ধিমান আর যে শুরু করা কাজকে সঠিকভাবে সমাপ্ত করে, সে মহাবুদ্ধিমান।
অতএব যে ষড়যন্ত্র শুরু করা হয়েছে মাঝপথে থেমে যাওয়া চলবে না।”

এই সংকল্প করে স্থিরজীবী কৌশল আঁটলেন। তিনি জানতেন, শত্রু যদি কিছুটা আভাস না পায়, তবে তাদের ফাঁদ সফল হবে না। তাই ধীরে ধীরে তিনি কাতর আর্তনাদ করতে লাগলেন, যেন আহত হয়ে মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছেছেন। সেই শব্দ বনের স্তব্ধতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। মুহূর্তেই উলূকরাজের সেনারা সতর্ক হলো। শব্দ শোনামাত্র পেঁচার দল রক্তলোলুপ চোখে উড়ে এল—স্থিরজীবীকে শেষ করে দিতে!—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content