
ছবি: প্রতীকী।
০৫: পিঁপড়ে আর সাপের কাহিনি
ঘন অরণ্যের গভীরে, এক উঁইয়ের ঢিবির ভিতরে বাস করতো এক ভয়ঙ্কর কেউটে সাপ—নাম তার অতিদর্প। নামের মতোই সে ছিল অহংকারী, শক্তিশালী আর উদ্ধত। সাধারণত সে ঢিবির প্রশস্ত মুখ দিয়েই আসা-যাওয়া করতো। কিন্তু একদিন কেবল খেয়ালখুশিতে সে সরু এক ফাঁক গলে বেরোতে চাইল। বিপদ হল সেখানেই। তার মোটা ও বিশাল শরীর সেই সরু পথের জন্য ছিল একেবারেই বেমানান। জোর করে বেরোতে গিয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত হল তার; গা থেকে রক্ত ঝরতে লাগল।
কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষতস্থান ফুলে ঘা হয়ে উঠল আর সেই ঘা থেকে বেরোনো দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তেই চারদিক থেকে অসংখ্য পিঁপড়ে এসে হাজির হল। ছোট্ট শরীর, কিন্তু অগণিত সৈন্যের মতো দল বেঁধে তারা সাপটিকে ঘিরে ধরল।
অতিদর্প ক্রোধে ফুঁসতে লাগল। এক-আধটা পিঁপড়ে হয়তো সে মেরে ফেলতে পারলো, কিন্তু হাজার হাজার পিঁপড়ের সঙ্গে এই আহত শরীর নিয়ে সে পেরে উঠবে কি করে! একসঙ্গে কামড়ে, দংশন করে তারা তাকে অসহায় করে তুলল। তার শক্তিশালী দেহ, তীক্ষ্ণ দাত, ভয়ংকর ফোঁসফোঁস—সবই নিরর্থক হয়ে গেলো সেই একঝাঁক ক্ষুদ্র প্রাণীদের দলের সামনে।
দিন যত গেল, ক্ষত আরও গভীর হলো, পিঁপড়ের আক্রমণও হল আরও তীব্র। শেষ পর্যন্ত দম্ভভরে বেঁচে থাকা সেই সাপটি ধীরে ধীরে জীর্ণ হয়ে একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
৫ম কাহিনি সমাপ্ত
বায়সরাজ মেঘবর্ণ অতি ব্যগ্র হয়ে হাত জোড় করে বললেন— “আপনি শুধু আদেশ করুন, প্রভু। আপনার কোনও নির্দেশ আমরা কখনো অমান্য করবো না।”
স্থিরজীবী হালকা হেসে বললেন—“ওহে বৎস! রাজনীতিবিদরা যেসব উপায়ের কথা বলেছেন—সাম, দান, ভেদ, দণ্ড—তাদের বাইরে আরেকটি উপায় আছে, পঞ্চম কৌশল, সেটি হল ছলনা। আজ আমাদের এই সংকটে ছলনার আশ্রয় নেওয়াই একমাত্র সমাধান।”

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৯: ক্ষুদ্র শক্তি সংগঠিত হলে বড় শত্রুও হার মানে

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৯: পথিমধ্যে অতর্কিতে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৮: স্ত্রী সীতার ব্যক্তিত্বের প্রভায় রামচন্দ্রের আলোকিত উত্তরণ সম্ভব হয়েছে কি?
ততদিনে আমি এদের দুর্গের প্রতিটি গোপন তথ্য জেনে নেবো। আর দিনের বেলায়, যখন এই পেঁচার দল কিছুই দেখতে পাবে না, ঠিক তখনই আমি তোমাদেরকে দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করাবো, আর আমরা শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করবো। আমি অনেক চিন্তাভাবনা করেই এই পরিকল্পনা করেছি। এর বাইরে আমাদের সাফল্যের কোনো পথ দেখতে পাচ্ছি না। মনে রেখো, এই দুর্গের থেকে পালানোর কোনো দ্বিতীয় রাস্তা নেই, এই দুর্গ একদ্বার বিশিষ্ট। পালাবার পথ ছাড়া দুর্গ মানেই মৃত্যুকূপ। শাস্ত্রে বলা আছে—নীতিশাস্ত্রজ্ঞরা যে দুর্গকে শ্রেষ্ঠ বলেছেন, তা হলো সেই দুর্গ যেখানে অন্তত একটি গোপন নির্গমনের পথ থাকে। আর নিষ্ক্রমণের পথ বিহীন দুর্গ আসলে নামেই দুর্গ, প্রকৃতপক্ষে সেটা এক বিশাল কারাগার ছাড়া আর কিছু নয়।”

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৪: তালবাতাসি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক
স্থিরজীবী শেষ নির্দেশ দেওয়ার পরই, হঠাৎ যেন রাগে ফেটে পড়ে বায়সরাজ মেঘবর্ণের সঙ্গে উচ্চস্বরে বিবাদ শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিলো বিদ্রুপ আর বাক্যে ছিলো উচ্ছৃঙ্খলতার ঝাঁঝ। চারপাশে থাকা অন্যান্য ভৃত্যরা এত বড়ো মন্ত্রীর এহেন আচরণ দেখে আর সহ্য করতে পারলো না। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো। কিন্তু মেঘবর্ণ তাঁদের থামালেন। হাত তুলে বললেন— “অহো! নিবর্ত্তধ্বং যূযম্! শান্ত হোন সকলে। শত্রুর পক্ষপাতী যে দুষ্ট, তাকে দণ্ড দেওয়া হবে, তাতে কোনো দেরি নেই।”

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩০: ঠাকুরবাড়ির জামাই রমণীমোহনকে মন্ত্রী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৭: গ্রিন টি /৫
এদিকে কাকেদের শিবিরে বসে থাকা শত্রুরাজা উলূকরাজ অরিমর্দনের গুপ্তচর, চতুর কৃকালিকা সবকিছু লক্ষ্য করল। স্থিরজীবী আর মেঘবর্ণের এই বিবাদ, রক্তাক্ত অবস্থা, আর পরিবারের প্রস্থান—সবটুকুই সে নিখুঁতভাবে জানাল অরিমর্দনকে। উল্লাস ভরে কৃকালিকা জানাল—“প্রভু! আপনার শত্রু এখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সপরিবারে দূরে পালিয়েছে।”
অরিমর্দনের মুখে তখন বিজয়ের হালকা হাসি। বিকেলের আলো-আঁধারিতে, সূর্য যখন ধীরে ধীরে দিগন্তে অস্ত যাচ্ছে, তখন সে সমস্ত মন্ত্রী ও ভৃত্যদের সমবেত করে বলল— “এটাই আমাদের সেরা সুযোগ! শত্রু যখন ভয়ে পালায়, কিংবা পুরোনো জায়গা ছেড়ে নতুন আস্তানায় যায়, এই দুই সময়ই রাজারা দুর্বল হয়। কারণ তখন তাদের ভৃত্যরা ব্যস্ত থাকে, সৈন্যরা ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। যুদ্ধশাস্ত্র স্পষ্ট বলে দিয়েছে, এই সময় আঘাত করলেই শত্রুকে দাসত্বে পরিণত করা যায়। তাই আর দেরি নয়, এখনই মেঘবর্ণকে আক্রমণ করতে হবে!”
অরিমর্দনের কণ্ঠে ছিলো তখন বিদ্যুতের মতো ঝঙ্কার। পেঁচাদের সৈন্যরা তখন উৎসাহে চিৎকার করে উঠলো আর রক্তলাল অস্তগগনের তলায় যুদ্ধের ছায়া যেন ক্রমে ঘনীভূত হতে লাগল। অনুচরদের এভাবে উত্সাহিত করে উলূকরাজ অরিমর্দন হঠাৎ ঝড়ের মতো নির্দেশ দিলেন আক্রমণের। মুহূর্তেই কাকসৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ল আর চারদিক থেকে বটবৃক্ষকে ঘিরে ফেললো। পুরো বনভূমি তখন যেন অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত হল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—একটিও কাকের দেখা পাওয়া গেল না!

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
“অহো! জ্ঞাযতাং তেষাং মার্গঃ!” -শত্রুরা কোন পথে পালিয়েছে, খুঁজে বার করো! ওরা অন্য কোনও দুর্গে আশ্রয় নেওয়ার আগেই হত্যা করতে হবে। কারণ একবার যদি শত্রু নতুন দুর্গে শিকড় গাড়ে, তবে সে পুনরায় রণসামগ্রী সঞ্চয় করবে, শক্তিশালী হবে, আর তখন তাকে আর জয় করা যাবে না।”
উলূকরাজের এ ঘোষণা শুনে স্থিরজীবীর চিন্তিত হলেন। মনে মনে ভাবলেন— “হায়! যদি এরা আমাদের কিছুই না জেনে যেমন এসেছিল সেভাবে ফিরে চলে যায়, তবে তো আমাদের সমগ্র পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে। কথায় বলে—
যে কাজ শুরুই করে না, সে-ই প্রকৃত বুদ্ধিমান আর যে শুরু করা কাজকে সঠিকভাবে সমাপ্ত করে, সে মহাবুদ্ধিমান।
অতএব যে ষড়যন্ত্র শুরু করা হয়েছে মাঝপথে থেমে যাওয়া চলবে না।”
এই সংকল্প করে স্থিরজীবী কৌশল আঁটলেন। তিনি জানতেন, শত্রু যদি কিছুটা আভাস না পায়, তবে তাদের ফাঁদ সফল হবে না। তাই ধীরে ধীরে তিনি কাতর আর্তনাদ করতে লাগলেন, যেন আহত হয়ে মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছেছেন। সেই শব্দ বনের স্তব্ধতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। মুহূর্তেই উলূকরাজের সেনারা সতর্ক হলো। শব্দ শোনামাত্র পেঁচার দল রক্তলোলুপ চোখে উড়ে এল—স্থিরজীবীকে শেষ করে দিতে!—চলবে।


















