রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

জওহরলাল নেহরু ও রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য।

ব্রিটিশ শাসন উৎখাতে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার অবসানের পর ত্রিপুরার সংশ্লিষ্ট নানা গুপ্ত সমিতির শাখা সংগঠনের সদস্যরা রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করেন। এই ভাবে ত্রিপুরায় স্বদেশী তৎপরতার প্রভাবের পাশাপাশি কালক্রমে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধেও গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ ঘটতে থাকে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের লক্ষ্যে গঠিত রাজনৈতিক সংগঠনের শাখা ত্রিপুরাতে না হলেও ত্রিপুরা সেই আদর্শে প্রভাবিত হয়েছিল।
গান্ধীজির লবণ সত্যাগ্রহ ত্রিপুরার গণমানসকে প্রভাবিত করেছিল। ত্রিপুরাতে গঠিত হয়েছিল ত্রিপুরা রাজ্য গণপরিষদ। কেউ কেউ বলেছেন, ১৯৩৫ সালে শচীন্দ্রলাল সিংহের সভাপতিত্বে এই সংগঠনটি হয়েছিল। সম্পাদক ছিলেন হরিগঙ্গা বসাক। অন্যান্য নেতৃ স্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সুখময় সেনগুপ্ত, ক্ষীরোদ সেন, আশু মুখোপাধ্যায়। আবার কেউ বলেছেন, ১৯৩৮-৩৯ সালে সংগঠনটি গঠিত হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আদর্শে ত্রিপুরা রাজ্য গণপরিষদ সেদিন ত্রিপুরা রাজ্যে গণ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৭: রাজতন্ত্রের শাসন হলেও ত্রিপুরায় তখন ধীরে ধীরে গণচেতনার উন্মেষ ঘটছে

হ্যালো বাবু! পর্ব-১২৬: অমিতাভ হত্যারহস্য / ৭

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০০ : প্রাচীন ভারতের ‘স্টিং অপারেশন’-এরও নজির মেলে পঞ্চতন্ত্রের কূটনীতিতে!

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

রাজনৈতিক তৎপরতার মাত্রা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে তখন রাজ সরকার থেকে এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ত্রিপুরার রাজনৈতিক কর্মীদের দ্বারা ত্রিপুরা জনমঙ্গল সমিতি নামে অপর একটি সংগঠনও গঠিত হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। গণপরিষদের কাজ কর্ম যেখানে শুধু শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে জনমঙ্গল সমিতির কাজকর্ম গ্রামাঞ্চলেও বিস্তৃত হয়েছিল। জনমঙ্গল সমিতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বীরেন দত্ত, বংশী ঠাকুর, প্রভাত রায়, কীর্তি সিংহ, সুকুমার ভৌমিক প্রমুখ। শিক্ষার প্রসার সহ গণচেতনা সঞ্চারই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল। এই সংগঠনের নেতৃবৃন্দ পরে ১৯৪৩ সালে গঠন করেন রাজ্য প্রজা মণ্ডল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৯ : ভোরের রক্তাক্ত কবিতা

যাইহোক, রাজ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩৯-৪০ সালে ত্রিপুরা রাজ্য গণপরিষদের নেতা শচীন্দ্রলাল সিংহ ও জনমঙ্গল সমিতির নেতা বীরেন দত্তকে বহিষ্কারের আদেশ দেয়া হয়। এ সম্পর্কিত আনন্দ বাজার পত্রিকার (১৩৪৬ বাংলা, ১৩ বৈশাখ) খবরটি হচ্ছে—”ত্রিপুরা রাজ্য হইতে বহিষ্কার। প্রজাগণকে উত্তেজিত করার অভিযোগ। ভূতপূর্ব রাজবন্দীর প্রতি আদেশ। আগরতলা, ২৪ এপ্রিল। অদ্য প্রাতঃ সাড়ে সাত ঘটিকার সময় ত্রিপুরা রাজ সরকারের আদেশে ভূতপূর্ব রাজবন্দী শ্রীযুত শচীন্দ্রলাল সিংহকে রাজ্য ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রজা সাধারণকে উত্তেজিত করার অভিযোগে এক বৎসরের জন্য ত্রিপুরা রাজ্য হইতে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হইয়াছে।শচীন্দ্রবাবুকে মোটরযোগে পুলিশ কর্মচারীগণ ত্রিপুরা রাজ্যের বাইরে আখাউড়ায় পৌঁছাইয়া দিয়ে আসেন।” আনন্দ বাজারের (১৩৪৬ বাংলা, ১ জৈষ্ঠ্য) অপর খবরটি ছিল জনমঙ্গল সমিতির নেতা ও ‘প্রজার কথা’ পত্রিকার সম্পাদক বীরেন দত্তকে এক বছরের জন্য রাজ্য থেকে বহিষ্কার সম্পর্কিত।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৩: জরাসন্ধ ও কৃষ্ণের কথোপকথন সূত্রে নিহিত আছে রাজনীতির পাঠ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৫ : য-এ যুদ্ধ

১৯৪২ সালের আগষ্ট মাসে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল ত্রিপুরায়। এই আন্দোলন বন্ধের জন্য ভারত সরকার যে আদেশ জারি করেছিল, ত্রিপুরাতেও রাজসরকার থেকে অনুরূপ আদেশ জারি করা হয়। রমা প্রসাদ দত্ত তাঁর ‘স্বাধীনতার পূর্বে ত্রিপুরার সমাজ ব্যবস্থা’ গ্রন্থে জানিয়েছেন, ৪২’র ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দলোনের সময় আগরতলার কামান চৌমুহনীতে জেনারেল পোস্ট অফিসে ইট-পাটকেল পড়েছিল। বনমালীপুর ও নরসিংগড়ে ক’টি ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ সহ বিক্ষিপ্ত ভাবে সামান্য কিছু হাঙ্গামা হয়েছিল। পরবর্তীকালে দমন পীড়ন মূলক নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয় ত্রিপুরার গণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গঙ্গার শুশুক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

১৯৪৫ সালের ৯ ডিসেম্বর পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ত্রিপুরার রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যকে এক পত্রে লেখেন যে, ত্রিপুরা রাজ্য গণপরিষদ এবং কংগ্রেসের অনেক সদস্য বিনা বিচারে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আটক রয়েছেন। তাদের প্রতি অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তাদের কয়েকজন মারাত্মক অসুখে ভুগছেন। তিনি এ ব্যাপারে রাজার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এর প্রতিকার চান। বীরবিক্রম অবশ্য নেহরুর কাছে প্রত্যুত্তরে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। নেহরু রাজার কাছে লিখেছিলেন—”I am informed that many members of Tripura Rajya Gana parishad and the Tripura state Congress have for a long time been in prison without trial.At the beginning of the War apparently a number of them were imprisoned without trial.Whether they are prisoners of the Bengal Government or Tripura state,I do not know.Further information has reached me that the treatment of these prisoners is exceedingly bad and some of them have been suffering from serious diseases….”

প্রত্যুত্তরে ১৪ ডিসেম্বর রাজা নেহরুকে লেখেন—”…As regards the allegation before you I regret to say that they are entirely gross misrepresentation of facts.Only six persons were in detention as security prisoners,some at the instance of the provincial Government, and they were in the British Indian prisons for most of the time,before being transferred to the state….” —চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content