
আজকেও গৌরী হাডুডু খেলছে। বুক ভরে পেল্লাই দম টেনে নিয়ে দৌড়োচ্ছে। হা-আ-আ-ডু-ডু-ডু-ডু। জেলে বস্তির ছেলেমেয়েরা এখন ওর বন্ধু। তবে প্রাণের বন্ধু নয়। রোজই মারদাঙ্গা লেগে থাকে। দলাদলি, ভাব-আড়ি। বেশিরভাগ সময়েই মারামারির কেন্দ্রে সুধা। ওকে নিয়েই যত গন্ডগোল। কারণ, সকলেই জানে সুধা খেলাধুলোয় অষ্টরম্ভা। কিচ্ছু পারে না। ফুলদির হাত ধরে দূরে দূরে উড়ে বেড়াতেই ওর যত মজা।
মরা খালের ধার ঘেঁষে মাঝে মাঝেই তাই দু’জনে মিলে ছুট লাগায় লাল পোলের দিকে। নড়বড়ে ভাঙা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে তৎতড়িয়ে উঠে যায় মধ্যিখানের চূড়ায়। দেখে বিশ্বপ্রকৃতি দশদিকে আঁচল বিছিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। মেঘ রোদ্দুর জোয়ার ভাটা, রোজদিন। সেই একইভাবে বসে আছে। যেন ওদেরই অপেক্ষায়। পথ চেয়ে। বিক্রমপুরে, মামাবাড়িতে ওদের ফোকলা দিদিমার মতো।
মরা খালের ধার ঘেঁষে মাঝে মাঝেই তাই দু’জনে মিলে ছুট লাগায় লাল পোলের দিকে। নড়বড়ে ভাঙা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে তৎতড়িয়ে উঠে যায় মধ্যিখানের চূড়ায়। দেখে বিশ্বপ্রকৃতি দশদিকে আঁচল বিছিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। মেঘ রোদ্দুর জোয়ার ভাটা, রোজদিন। সেই একইভাবে বসে আছে। যেন ওদেরই অপেক্ষায়। পথ চেয়ে। বিক্রমপুরে, মামাবাড়িতে ওদের ফোকলা দিদিমার মতো।
যখনই দিদিমার কাছে যেত দেখত দিদিমা তাকিয়া বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে। সাদা ধবধবে শাড়ি আর শনের নুড়ি চুল নিয়ে এক গাল হাসছে। তাকে কখনও কোনও কাজ করতে দেখেনি সুধা। আর কি সুন্দর গন্ধ বেরোতো গা দিয়ে। উঁ উঁ করে ওরা গন্ধ শুঁকত। গায়ের রংটা ছিল দুধে আলতা। তুলতুলে শরীর। ওরা গিয়ে নেড়েচেড়ে দিদিমাকে দেখতো। বলতো গল্প বলো। আর বললেই শুরু হয়ে যেত সেই পুরনো দুটো গল্প। লাল টুকটুকি আর লাউ ডগার গল্প।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৮ : বিনা বিচারে আটকদের নিয়ে রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যকে চিঠি লিখেন নেহরু

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০০ : প্রাচীন ভারতের ‘স্টিং অপারেশন’-এরও নজির মেলে পঞ্চতন্ত্রের কূটনীতিতে!

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার
গৌরীর অনেক সময়ই ভালো লাগত না সেই একঘেয়ে গপ্প। সে দৌড়ে চলে যেত মামাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলতে। কিন্তু সুধা বসে থাকতো ঠায়। শুয়ে পড়ত কোলে। সাদা নুড়ি চুলগুলো ইচ্ছে খুশি আঁচড়ে পাকাত একটা লকলকে বিনুনি। আর দিদিমার গল্প বয়ে চলত অবিরাম। একই গল্পের পুরনো খোসা টুপ করে ছাড়িয়ে যেত অজান্তে। জন্ম নিত এক একটা আস্ত নতুন খোলা। তার ভিতরে পুরনো কথামালারা ছাড়ানো টাটকা বাদামের মতন মচমচ করে উঠতো।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১২৬: অমিতাভ হত্যারহস্য / ৭

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৯ : ভোরের রক্তাক্ত কবিতা
লালপোলে যে সব সময় ওদের আসা হয় তা নয়। সুযোগ পেলেই আসে। যখন দেখে চারপাশে কেউ নেই অথবা বাড়ির সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত তখনই দু’ বোনে পা টিপে পালিয়ে আসে এখানে। নির্জন পোলের মাথায় হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে ছোট্ট দুটো মোমের পুতুলের মতো। লালচে ঘোর লাগা দু’জোড়া চোখে অবাক বিস্ময়। এ ও কে বলে, দেখ দেখ ফুলদি…ও একে বলে, দেখ দেখ মনা। দেখতে দেখতেই একসময় শুরু হয় দেখার লড়াই। কে কোনটা আগে দেখতে পেয়েছে। এবার কিন্তু গৌরী হারবে। দেখবার প্রতিযোগিতায় সবসময় সুধা এগিয়ে। একটা ফড়িংও ওর ছোট্ট গভীর দুচোখের আওতার বাইরে গলতে পারবে না। গৌরী শুরুতে মানতে চায় না। তারপর একসময় বোনের কাছে হার মানে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৩: জরাসন্ধ ও কৃষ্ণের কথোপকথন সূত্রে নিহিত আছে রাজনীতির পাঠ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৫ : য-এ যুদ্ধ
পোলের দক্ষিণে সমুদ্র। নীল নীল, সবুজ সবুজ আর ছাইগোলা জলের পাহাড় ঝাঁপিয়ে পড়ছে সারাদিন সারারাত। গর্জন করছে গুম গুম গুম গুম। দু ‘চারটে স্টিমার দূরে দূরে ভেসে যায়। সমুদ্রের কিনার ঘেঁষা ভাঙাচোরা বন্দরে একআধটা জাহাজ নিঝুম দাঁড়িয়ে থাকে। জাহাজের মনমরা মুখ। ওদের দেখলে সুধার রাম দাদাকে মনে পড়ে। কতদিন ধরে জ্বরে ভুগছে ওর দাদা। সারাদিন কোণের ঘরে একলা শুয়ে থাকে। আর নিজের মনে মায়ের গান গায়। সুধা বলেছিল—
—ওই শুনো মা, রাম দাদা আবারো তোমারে ডাইক্যা গান গায়।
মা বলেছিল, আমাকে নিয়ে নয় রে, ও মা কালীরে নিয়ে গান বান্ধে। ও যে বড় কবি। ওই সকল গান ওর নিজের রচনা।
তাই বুঝি মা?
অবাক হয়ে যায় সুধা। অথৈ ভালোবাসা টলটল করে বুকে। আর কষ্টে ভরে যায় মন।
ভাবে কেন দাদার অসুখ সারছে না। আগে তো এত অসুস্থ ছিল না? কলকাতায় আসার পরেই ওর অসুখ। ওর ব্যাধি সারাতে আর হাওয়া বদলাতেই তো কলকাতার বাড়ি ছেড়ে এই ডায়মন্ড হারবারে এসে উঠেছে ওরা। কিন্তু রাম দাদার জ্বর সারে না। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা জ্বর আসে ঘুরে ঘুরে। যেমন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজের ওপরে আর নিচে ঘুরঘুর করে কর্মহীন মাঝি খালাসী তেমনি করে আসে। ওরা সুধাদের দেখতে পায় না। বহু দূর তো। কিন্তু উঁচু থেকে ওদের কার্যকলাপ দেখে দুই বোন।
—ওই শুনো মা, রাম দাদা আবারো তোমারে ডাইক্যা গান গায়।
মা বলেছিল, আমাকে নিয়ে নয় রে, ও মা কালীরে নিয়ে গান বান্ধে। ও যে বড় কবি। ওই সকল গান ওর নিজের রচনা।
তাই বুঝি মা?
অবাক হয়ে যায় সুধা। অথৈ ভালোবাসা টলটল করে বুকে। আর কষ্টে ভরে যায় মন।
ভাবে কেন দাদার অসুখ সারছে না। আগে তো এত অসুস্থ ছিল না? কলকাতায় আসার পরেই ওর অসুখ। ওর ব্যাধি সারাতে আর হাওয়া বদলাতেই তো কলকাতার বাড়ি ছেড়ে এই ডায়মন্ড হারবারে এসে উঠেছে ওরা। কিন্তু রাম দাদার জ্বর সারে না। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা জ্বর আসে ঘুরে ঘুরে। যেমন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজের ওপরে আর নিচে ঘুরঘুর করে কর্মহীন মাঝি খালাসী তেমনি করে আসে। ওরা সুধাদের দেখতে পায় না। বহু দূর তো। কিন্তু উঁচু থেকে ওদের কার্যকলাপ দেখে দুই বোন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গঙ্গার শুশুক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
সুধা কখনও আনমনে প্রশ্ন করে—
আচ্ছা ফুলদি, আমরা কি এখানে রাম দাদার অসুখের লিগা আইছি?
তা নয় তো কি! বোকা মাইয়া।
কিন্তু এখানে চিকিৎসাটা কি হয় বল দেখি? বিধান রায় যে বড়দার বন্ধু, শুনছি তিনি বিরাট ডাক্তার। তারে দিয়া চিকিৎসা করালে ভালো হইতো না ফুলদি?
অতশত জানিনা মনা, আমরা তো ছোট-বড়রা বুঝে সব করে। বুঝছো?
চুপ করে যায় সুধা। কিন্তু এই ব্যবস্থায় কেন যেন পরিপূর্ণ বিশ্বাস নেই তার। ওই দূরের স্টিমারে উড়তে থাকা লাল পতাকার মতন ছোট্ট বুকের ভেতর অন্য কোনও সংকেতের নিশান ওড়ে। এক ভরা সন্ধ্যাবেলায়, কলকাতায়, বড়দার ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় অযাচিতভাবে শোনা কিছু শব্দ ওকে চিন্তিত করে। একটা নয় অনেক শব্দ দু’ তিনজনের মিলিত সংলাপ। ফিসফিস কথা। যেন কেউ না শুনতে পায়। ছোট্ট সুধা চুপ করে শুনছিল। কান খাড়া করে বুঝবার চেষ্টা করছিল বিষয়টা। ছোট বলেই ঘরের ভেতর বাকিরা তাকে আমল দেয়নি। কিন্তু চোখ পড়তেই ধমকে উঠেছিলেন রাঙা কাকা। খুব রাগী। ভারী বকেন। তিনি নাকি বাবার খুড়তুতো ভাই। দু’ চোখে দেখতে পারে না সুধা।
কাকা বলেছিলেন—এই ছেমড়ি, তুই এখানে খাড়া হয়্যা কি শুনছস?
বড়দা সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে কাছে ডেকে নিয়েছিল সুধা কে। আসলে তাকে যে বড্ড ভালোবাসে বড়দা। বলেছিল—
অমন করে বলো না রাঙা কাকা ও আমাদের ভারি আদরের সুধারানি। আমাদের ডল পুতুল।—চলবে।
আচ্ছা ফুলদি, আমরা কি এখানে রাম দাদার অসুখের লিগা আইছি?
তা নয় তো কি! বোকা মাইয়া।
কিন্তু এখানে চিকিৎসাটা কি হয় বল দেখি? বিধান রায় যে বড়দার বন্ধু, শুনছি তিনি বিরাট ডাক্তার। তারে দিয়া চিকিৎসা করালে ভালো হইতো না ফুলদি?
অতশত জানিনা মনা, আমরা তো ছোট-বড়রা বুঝে সব করে। বুঝছো?
চুপ করে যায় সুধা। কিন্তু এই ব্যবস্থায় কেন যেন পরিপূর্ণ বিশ্বাস নেই তার। ওই দূরের স্টিমারে উড়তে থাকা লাল পতাকার মতন ছোট্ট বুকের ভেতর অন্য কোনও সংকেতের নিশান ওড়ে। এক ভরা সন্ধ্যাবেলায়, কলকাতায়, বড়দার ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় অযাচিতভাবে শোনা কিছু শব্দ ওকে চিন্তিত করে। একটা নয় অনেক শব্দ দু’ তিনজনের মিলিত সংলাপ। ফিসফিস কথা। যেন কেউ না শুনতে পায়। ছোট্ট সুধা চুপ করে শুনছিল। কান খাড়া করে বুঝবার চেষ্টা করছিল বিষয়টা। ছোট বলেই ঘরের ভেতর বাকিরা তাকে আমল দেয়নি। কিন্তু চোখ পড়তেই ধমকে উঠেছিলেন রাঙা কাকা। খুব রাগী। ভারী বকেন। তিনি নাকি বাবার খুড়তুতো ভাই। দু’ চোখে দেখতে পারে না সুধা।
কাকা বলেছিলেন—এই ছেমড়ি, তুই এখানে খাড়া হয়্যা কি শুনছস?
বড়দা সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে কাছে ডেকে নিয়েছিল সুধা কে। আসলে তাকে যে বড্ড ভালোবাসে বড়দা। বলেছিল—
অমন করে বলো না রাঙা কাকা ও আমাদের ভারি আদরের সুধারানি। আমাদের ডল পুতুল।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।


















