
ন্যায় অধিকার ছবির দৃশ্য গ্রহণের আগে পরিচালক অঞ্জন মুখোপাধ্যায়, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী।
শ্রদ্ধেয় অঞ্জনদা,
আপনাকে লেখা এটাই আমার প্রথম এবং শেষ চিঠি।
৭৫ বছর একটা যাবার বয়েস হল? ৮৩ বছরে দাপিয়ে অভিনয় করছেন শিল্পীরা! ৮২-তে সুরের জাদুতে প্রাণ ভরাচ্ছেন সংগীতজ্ঞ সুরকার। আর আপনি সেখানে আপনার প্রিয় ফুটবল ক্রিকেটের জমাজমাট টুর্নামেন্ট, প্রিয় শহর কলকাতা ছেড়ে হাওয়ায় নিজেকে ভাসিয়ে দিলেন? এই তো গত মাসেই কথা হল টেলিফোনে। প্রতিবারের মতো জানতে চাইলেন আমার লেখা আর কী কী নতুন নাটক আগামীতে মঞ্চস্থ হবে?
আপনাকে লেখা এটাই আমার প্রথম এবং শেষ চিঠি।
৭৫ বছর একটা যাবার বয়েস হল? ৮৩ বছরে দাপিয়ে অভিনয় করছেন শিল্পীরা! ৮২-তে সুরের জাদুতে প্রাণ ভরাচ্ছেন সংগীতজ্ঞ সুরকার। আর আপনি সেখানে আপনার প্রিয় ফুটবল ক্রিকেটের জমাজমাট টুর্নামেন্ট, প্রিয় শহর কলকাতা ছেড়ে হাওয়ায় নিজেকে ভাসিয়ে দিলেন? এই তো গত মাসেই কথা হল টেলিফোনে। প্রতিবারের মতো জানতে চাইলেন আমার লেখা আর কী কী নতুন নাটক আগামীতে মঞ্চস্থ হবে?
‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ দেখার পর অভিনয়ের রাতেই অনেকক্ষণ ধরে টেলিফোনে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। পরদিন লেখা পাঠালেন হোয়াটসঅ্যাপে। সুজনকে (মুখোপাধ্যায়) পাঠালাম! পুরনো দিনের কমার্শিয়াল বাংলা ছবির পরিচালক হিসেবে বিশেষ সম্মান দিয়ে খুব যত্ন করে আপনার লেখা ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন সুজন। এ নাটক আরও একবার দেখতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, কিছুদিন বাদে আরও একবার দেখতে হবে। আপনার দেখা হল না। আর মেঘে ঢাকা ঘটক দেখার পর থেকেই আপনার চেতনার আগামী প্রযোজনা সলিল চৌধুরীকে নিয়ে আমার লেখা নাটকটি দেখার সাংঘাতিক আগ্রহ। সে নাটকও আপনাদের দেখা হবে না।
আরও পড়ুন:

পর্ব-১: যাঁকে ছবিতে দেখা যায় না, অথচ সকলে তাঁর কথা বলে : অঞ্জন মুখোপাধ্যায়

পর্ব-২: বুবুদা মানে শমিত ভঞ্জ আমাকে তার সেক্রেটারি হিসেবে চেয়েছিলেন : অঞ্জন মুখোপাধ্যায়

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৮৮ : নেকলেস

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৪: শূর্পনখার কাহিনিতে, ষড়রিপুর প্রভাব, এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত নয় কী?
সাম্প্রতিককালে প্রতিভাশালী অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিদারুণ মৃত্যুর ধাক্কা আমরা কেউ সামলাতে পারিনি। ব্যক্তিগত পরিসরে পরিচয় ছিল না। সুজনের কাছেই শুনেছি রাহুলেরও ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে লেখা নাটক দেখার ভীষণ আগ্রহ ছিল। রাহুলকে নিয়ে তাঁর পরিচিত বিশিষ্টজনেরা নানান স্মৃতিচারণা লিখেছেন। আমার মনে হল, আপনাকে নিয়ে এই চিঠিটা আমার লেখা উচিত।
১৯৪৪ সালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আধ্যাত্মিক এবং আত্মিক মুক্তি বিষয়ক একেবারে ভিন্নধর্মী একটি উপন্যাস দেবযান-এ দেখিয়েছেন মৃত্যু মানেই জীবনের অবসান নয় বরং নতুন কোন স্তরের শুরু। উপন্যাস দেবযান হল আত্মার মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে লেখা। বাংলা সাহিত্যে এ ধরনের লেখা খুব কম আছে। সেখানে সম্পর্ক নিয়ে আশ্চর্য ক্ষমতাধর এই কথাশিল্পী লিখেছেন—
‘ মানুষের মনের মন্দিরে অনেক কক্ষ, এক এক কক্ষে এক এক প্রিয় অতিথির বাস। সে কক্ষ সেই অতিথির হাসি কান্নায় সৌরভে ভরা। আর কেউ সেখানে ঢুকতে পারে না। … সে যদি আর ফিরেও না আসে কখনও, চিরদিনের জন্যই চলে যায়, এবং জানিয়ে দিয়েও যায় যে সে ইহজীবনের মতই চলে যাচ্ছে, তখন তার সকল স্মৃতির সৌরভ সুদ্ধ সে ঘরের কবাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারই নাম লেখা থাকে সে দোরের বাইরে। ‘
১৯৪৪ সালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আধ্যাত্মিক এবং আত্মিক মুক্তি বিষয়ক একেবারে ভিন্নধর্মী একটি উপন্যাস দেবযান-এ দেখিয়েছেন মৃত্যু মানেই জীবনের অবসান নয় বরং নতুন কোন স্তরের শুরু। উপন্যাস দেবযান হল আত্মার মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে লেখা। বাংলা সাহিত্যে এ ধরনের লেখা খুব কম আছে। সেখানে সম্পর্ক নিয়ে আশ্চর্য ক্ষমতাধর এই কথাশিল্পী লিখেছেন—
‘ মানুষের মনের মন্দিরে অনেক কক্ষ, এক এক কক্ষে এক এক প্রিয় অতিথির বাস। সে কক্ষ সেই অতিথির হাসি কান্নায় সৌরভে ভরা। আর কেউ সেখানে ঢুকতে পারে না। … সে যদি আর ফিরেও না আসে কখনও, চিরদিনের জন্যই চলে যায়, এবং জানিয়ে দিয়েও যায় যে সে ইহজীবনের মতই চলে যাচ্ছে, তখন তার সকল স্মৃতির সৌরভ সুদ্ধ সে ঘরের কবাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারই নাম লেখা থাকে সে দোরের বাইরে। ‘
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬১ : গোবিন্দ সোরেন দ্য গ্রেট

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৭ : দুই সহোদরার সখি সংবাদ (২)
অঞ্জনদা আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক তেমনই। মাঝেমধ্যেই ফোনে কথা হতো। কখনও আপনি কখনও আমি। দেখা তো সেই কতবছর আগে কলকাতায় টালিগঞ্জ ষ্টুডিয়োতে হয়েছে। আপনি বলতেন, সকালটা আপনার খুব ব্যস্ততায় কাটে। তারা মার একনিষ্ঠ ভক্ত আপনি। নিজের হাতে যত্ন করে রোজ পুজো করতেন। তাই বলতেন, দুপুরের পর ফ্রি। প্রভাতদা (প্রভাত রায়, প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক) মাঝখানে অসুস্থ হলেন। আপনি আমার কাছে ফোন করে তাঁর শরীরের খবর জানতে চাইলেন। আমাদের দু’ জনের যোগাযোগের গিঁটটাতো প্রভাতদার ইউনিটে কাজ করার সুবাদে। সেখানে অবশ্য কতলোকই ছিলেন কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার কিভাবে যেন একটা মিলমিশ হয়ে গেল।

সন্ধ্যা প্রদীপ ছবিতে রঞ্জিত মল্লিক ও আলপনা গোস্বামী সঙ্গে পরিচালক অঞ্জন মুখোপাধ্যায়।
অনেক কথা মনে পড়ছে। আমার লেখা উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ হাতে পাওয়ার পর দু’ চার পাতা উল্টিয়ে গোটা রাত ধরে উপন্যাসটা শেষ করেছিলেন। আর প্রায় ভোরবেলায় আমাকে ফোন করে উপন্যাস কেমন লেগেছে জানাতে গিয়ে আবেগরুদ্ধ হয়ে কান্নায় আপনার গলা প্রায় বন্ধ। এই উপন্যাসের পরিসর ছিল টালিগঞ্জ স্টুডিওপাড়া। আপনার বড় চেনা জায়গা। তাই বোধহয় আপনাকে এত নাড়া দিয়েছিল। এই উপন্যাসের পরিণতি আপনাকে ভীষণভাবে ধাক্কা দিয়েছিল। ক্রমাগত লেখার চেষ্টা করি যাচ্ছি। এখনও শিখছি। কিন্তু আপনার মতো বিশিষ্ট পাঠকের এই প্রতিক্রিয়া আমাকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করেছিল।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫২: কূটবণিক্-জাতক — ভাণ্ডার তোর পণ্ড যে হয়

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!
বলেছিলাম দুর্গাপুজোর সময় আপনাকে নিয়ে তিনদিন ধরে একটা ধারাবাহিক লেখা বের করব ‘সময় আপডেটস’-এ। আপনি প্রথমে কিছুতেই রাজি হননি। আমি বলেছিলাম, আপনার মতো গুণী মানুষ যাঁদের উপর সেভাবে প্রচারের আলো নেই তাঁদের কথা তো মানুষের জানা উচিত। সন্ধ্যাপ্রদীপ, ছন্নছাড়া, ন্যায়অধিকার, মানসী’র মতো সফল বাংলা কমার্শিয়াল ছবির পরিচালক, শত্রু ছবির সহকারী পরিচালকের কাছ থেকে সেই সময়ের ইতিহাস তো আজকের প্রজন্মের কাছে পৌঁছোনো দরকার। চিত্রপরিচালক অঞ্জন মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা তিন পর্বে প্রকাশিত ‘অন্তরালের তারারা’ শীর্ষক সে লেখা বহু মানুষ পড়েছেন। চেনা অচেনা অনেকে অঞ্জনদাকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। পরে আপনি খুব খুশি হয়েছিলেন। যে মানুষরা তাঁদের জীবনের অনেকটা সময় অন্যকে আনন্দ দিতে ব্যয় করেন, তাঁদের একটা অনেক বড় অংশ কোনও স্বীকৃতি পায় না। আসলে কাজ করতে জানাটাই সব নয়, তার বাইরেও একজন পরিচালকের, একজন লেখকের, একজন অভিনেতার একজন সংগীতশিল্পীর ভিড় কেটে মাথা তুলে আকাশে ওড়বার জন্য আরও অনেক কিছু জানতে হয়। অঞ্জনদার মতো আমার পরিচিত বহু মানুষ আছেন যাঁদের প্রতিভার কোন খামতি নেই কিন্তু ওই বাড়তি গুণটুকু নেই। তাই তাঁরা শেষমেশ এই বেচাকেনার জগতে নিজেদের ভালোদরে বিক্রি করে উঠতে পারেননি।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— বালিকাঠা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
আপনার কাছে অনেক কিছু শিখেছি! ওই সাক্ষাৎকারের আগেও আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ইন্ডাস্ট্রিতে আপনি এক সময় পরিচালক ছিলেন সেখানেই পরে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতে আপনার অসুবিধে হত না! প্রতিবারই একই উত্তর পেয়েছি।
—জিৎ কাজটা আমার কাছে ইম্পরট্যান্ট! স্ক্রলিংয়ে যাওয়া নামটা নয়। পরিচালক হিসেবে নতুন কাজ পাচ্ছিলাম না, আর এই কাজটা ছাড়া আর কোনও কাজই জানি না। পরিচালক হিসেবে যা যা করতাম চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে সেই কাজই মন দিয়ে করেছি। হ্যাঁ, শুধু পরিচালক নয় বলে ইউনিটে গুরুত্ব বদলেছে। আমার কাজের বদল হয়নি। আমার কোনওকালেই ইগোর অসুবিধে হয়নি!
—জিৎ কাজটা আমার কাছে ইম্পরট্যান্ট! স্ক্রলিংয়ে যাওয়া নামটা নয়। পরিচালক হিসেবে নতুন কাজ পাচ্ছিলাম না, আর এই কাজটা ছাড়া আর কোনও কাজই জানি না। পরিচালক হিসেবে যা যা করতাম চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে সেই কাজই মন দিয়ে করেছি। হ্যাঁ, শুধু পরিচালক নয় বলে ইউনিটে গুরুত্ব বদলেছে। আমার কাজের বদল হয়নি। আমার কোনওকালেই ইগোর অসুবিধে হয়নি!

আশা ভোঁসলে মানসী ছবির গান রেকর্ডিং এর সময় সঙ্গে পরিচালক অঞ্জন মুখোপাধ্যায়।
রবিবার, ৫ এপ্রিল আপনার বাড়ি থেকেই ফোন পেয়ে আচমকা এই দুঃসংবাদ পেলাম। ক’দিন শরীরটা ঠিক ছিল না। গতরাতে শরীরটা একটু টলমল করছিল। আজ বাড়ির লোকজন ভেবেছিলেন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। সকালে উঠেছিলেন। ওয়াশরুম থেকে ফিরে আবার শুয়ে পড়েন। আর সেটাই ছিল আপনার নিশ্চিন্তু চিরবিশ্রাম।
কোন ঠিকানায় পাঠাবো এ চিঠি ? পোস্ট পরলোক, জেলা দেবযান! আপনারা তো এখন সর্বত্রগামী সর্বংদ্রষ্টা। নিশ্চয়ই পৌঁছে যাবে আমার এই প্রণাম। আশীর্বাদ করবেন। ওখানে অনন্ত আলোয় এবার আপনারা ভালো থাকবেন অঞ্জনদা। এখানে বড় অন্ধকার, হিংসা রেষারেষি, লুকিয়ে রাখা চোরাগোপ্তা বিদ্বেষ।
কোন ঠিকানায় পাঠাবো এ চিঠি ? পোস্ট পরলোক, জেলা দেবযান! আপনারা তো এখন সর্বত্রগামী সর্বংদ্রষ্টা। নিশ্চয়ই পৌঁছে যাবে আমার এই প্রণাম। আশীর্বাদ করবেন। ওখানে অনন্ত আলোয় এবার আপনারা ভালো থাকবেন অঞ্জনদা। এখানে বড় অন্ধকার, হিংসা রেষারেষি, লুকিয়ে রাখা চোরাগোপ্তা বিদ্বেষ।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘দুটি নভেলা’ ,‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।


















