প্রাককথন: আমাদের আশেপাশে কত মানুষ, কত তাঁদের গুণ, কত তাঁদের অধ্যাবসায়, মনের মধ্যে কত জমে থাকা কথা। সে মানুষকে জানা হয় না, চেনা হয় না। কারণ আমরা সাফল্যের পোস্টার দেখে মানুষের গুণের বিচার করি। অসংখ্য প্রতিভা নানা কারণে যাঁদের জীবন সেভাবে আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি। মুখ্য আলোকবৃত্তের বাইরে গৌণ থেকে গিয়েছে যাঁদের অধ্যাবসায়, গুণ, কৃতিত্ব আমার খুব ঘনিষ্ঠ তেমন দু’জন অত্যন্ত গুণীজনের সঙ্গে আমার এবারের পুজোর আড্ডা। দু’জনেই কলকাতার বাসিন্দা। একজন মধ্য কলকাতার সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যার, অন্যজন দক্ষিণে বেহালার আর্কেডিয়া এলাকার। মোবাইল ফোনের আবিষ্কর্তা মোটোরোলা কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার মার্টিন কুপারের দৌলতে কলকাতা থেকে মহারাষ্ট্র এই প্রায় এক হাজার ৯০০ কিলোমিটারের দূরত্ব ঘুচিয়ে দুরন্ত আড্ডা দিলাম এঁদের সঙ্গে সেই কথোপকথনের বিবরণ নিয়ে এবারের পুজোয় নতুন প্রতিবেদন। এবারের অন্তরালের তারায় কলকাতার অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র পরিচালক অঞ্জন মুখোপাধ্যায়।
আমার সঙ্গে অঞ্জনদার পরিচিতি টালিগঞ্জের স্টুডিয়োপাড়ায়। প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক প্রভাত রায়ের সহকারি চিত্রনাট্যকার আমি আর অঞ্জনদা, প্রভাতদার প্রধান সহকারী পরিচালক। সেই পরিচয় থেকেই কি যেন এক অজানা কারণে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে।
● জিৎ: এবার আপনার নিজের পরিচালনার ছবির কথা শুনবো সন্ধ্যাপ্রদীপ, ছন্নছাড়া, ন্যায়অধিকার, মানসী
●● অঞ্জন: মনে পড়লে এখন কষ্ট হয়। নতুন করে ভাবতে আর ইচ্ছে করে না। তবে আপনার সঙ্গে সম্পর্কটা অন্যরকম, তাই এসব নিয়ে আবার স্মৃতি হাতড়ানো….প্রযোজকের টাকার যোগান ঠিক থাকলে একেবারে মেশিনের মতো কাজ করতে পারি মানে করতে পারতাম। সন্ধ্যাপ্রদীপের ক্ষেত্রে ঠিক তেমনই হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে শুরু করে অক্টোবরে রিলিজ। পুজোর সময় তনুবাবুর (তরুণ মজুমদার) ভালোবাসা ভালোবাসা, আর শক্তি সামন্তের অন্যায় অবিচারের সঙ্গে রিলিজ করেছিল। এই ছবির শুটিংয়ের একটা গল্প মনে পড়ছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ভীষণভাবে পেশাদার একজন শিল্পী। সকলেই সেটা জানেন। সেদিন সৌমিত্রদার সিডিউল শেষ। শুটিং চলবে, কিন্তু সৌমিত্রদার কাজ শেষ। আমি খুব চাপের মধ্যে কাজ করছি। ইউনিটের অন্য সবাই লাঞ্চব্রেক চাইছে। আমি কন্টিনিউ করতে চাইছি, কারণ সেদিনের মধ্যে আমাকে সৌমিত্রদার পোর্শন শেষ করতেই হবে। সৌমিত্রদার ডেট বেড়ে গেলে প্রডিউসারের খরচা বাড়বে। আমাদের মধ্যে একটু যে চাপা মনোমালিন্য চলছে সেটা সৌমিত্রদার নজর এড়ায়নি। উনি বললেন ‘অঞ্জন কী হয়েছে ‘ বললাম ‘না মানে ওরা এখন ব্রেক চাইছে, অথচ ব্রেক দিলে আপনার কাজ লেফট ওভার থেকে যাবে, শেষ করা যাবে না! কিন্তু আপনার ডেট তো ফিক্সড !’ উনি হাসলেন। বললেন, ‘না ফ্লেক্সেবল! তুমি ব্রেক দিয়ে দাও! আমি কাল এসে অ্যাডজাস্ট করবো, প্রডিউসারের অসুবিধা হবে না।’ ‘পরাজিত পরাশর’ ছবিতে অনুপকুমার অতিথি শিল্পী। শুটিং শেষে আমি পারিশ্রমিক দিতে গেলাম। বললেন, ” না মাস্টারমশাই, তোমার তো এ ছবিতে টাকা দেবার কথা নয়!” নিলেন না! এই ছবির সময় আমায় মজা করে ‘মাস্টারমশাই’ বলতেন। ছন্নছাড়া ছবিটা প্রযোজকদের অকারণ তাড়াহুড়োর জন্য মনের মতো করতে পারিনি। তাঁরা আমার সঙ্গে না কথা বলেই রিলিজ ডেট ঠিক করে ফেললেন। কিছু শুটিং বাকি, কী আর করবো! নিজের ভাবনার সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে হলো। মানসী ছবিটা খুব মনের মত করে বানিয়েছি। এখনও মানুষজন বলেন ইন্টারনেটে নাকি ভিউস খুব ভালো। মানসীর একটা মজার স্মৃতি আছে। বম্বেতে গান রেকর্ডিং হচ্ছে কিশোরকুমার গাইছেন। ওই পাহাড়ি রাস্তায় জিপের উপরে তাপস পালের গানটা। মুকুল দত্তের লেখা গান। মুকুলবাবু আসেননি। একটা জায়গায় গানের কথায় ছিল ‘আকাশের পানে চেয়ে’ আমি রেকর্ডিং কনসোল থেকে মাইকে মিউজিক ডায়রেক্টর অসিত গঙ্গোপাধ্যায় মানে ঢন্টুদার হেডফোনে বললাম, “ওটা ‘আকাশ পানে’ গাইতে বলুন।” অসিত গঙ্গোপাধ্যায় কিশোর কুমারকে বলেছেন, তিনি বললেন, ‘না, তোমার কথায় মুকুলের লিরিক চেঞ্জ করবো না। একমাত্র পরিচালকমশাই যদি বলেন তখন করব’। আমি গিয়ে বলতে উনি ‘আকাশ পানে’ করে গানটা গাইলেন। মানসী নিয়ে আরও একটা ইন্টারেস্টিং গল্প আছে। পুজোর সময় আমরা বম্বেতে। মিউজিক ডায়রেকটর অসিত গঙ্গোপাধ্যায়ের দাদার আন্ধেরির চারবাঙলা’র ফ্ল্যাটে আমরা থাকতাম। পুজোয় দাদারা সপরিবারে কোলকাতায়- আমরা ওখানে। সখ করে ঢন্টুদা রান্না করতেন। গৌরীদা মানে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের সঙ্গে বম্বেতে দেখা। ঢন্টুদা বললেন, “গৌরীদা চলে আসুন লাঞ্চে আজ মাংস খাওয়াবো।” গৌরীদা এলেন, কিন্তু বললেন ‘দেখো বাপু, আমি বিনা পয়সায় খাব না। কাগজ দাও আমি বরং তোমাদের একটা গান লিখে দি’। কাগজ দেওয়া হল, গৌরীদার পকেটে সবসময় নানান রঙের পেন থাকতো – খসখস করে লিখে দিলেন ” কাটে কি না কাটে প্রহর / হায় রে কী করি / দু চোখে প্রদীপ জ্বেলে / মনে হয় এই তো এলে, কাটে কি না কাটে প্রহর ” গান গাইলেন আশা ভোঁসলে। এ গানটা রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের লিপে ছিল। এ ছবিতে কিশোরকুমার আশা ভোঁসলে ছাড়া লতা মঙ্গেশকরেরও গান করেছিলেন। গৌরীদা এই ছবিতে এই একটাই গান লিখেছিলেন। তাপস পাল মহুয়া রায়চৌধুরী আমার ছবিগুলোতে কি যে ভালো অভিনয় করেছিলেন, ছন্নছাড়া, তারপর মানসীতে, তাপস মহুয়া বোধহয় নিজেরাই জানতেন না যে এরা সব কতো ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী!
● জিৎ: এবার আপনাকে আমি একটা খুব অপ্রিয় প্রশ্ন করতে চাই অঞ্জন দা! আপনি প্রথমে অ্যাসিস্ট করেছেন তারপর সফলভাবে নিজে ছবি পরিচালনা করেছেন। তারপরে আবার প্রভাত রায়কে আসিস্ট করতে এলেন কেন? অসুবিধে হয়নি?
●● অঞ্জন: আপনি ডিরেক্টর’স ইগোর কথা বলছেন তো? না ওটা আমার কোন অসুবিধে করেনি! তার তিনটে কারণ, এক নম্বর আমি এই কাজটাই পারি, তাই আমাকে এই কাজটাই করতে হবে। দুই, ডিরেক্টর হিসেবে আমি যে কাজটা করতাম। ডিরেক্টরের চাপটুকু ছাড়া আমি সেই কাজটাই করছি। তিন আমি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরদের কখনও কম গুরুত্ব দিইনি আর আমি মনে করি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে ক্রিয়েটিভ কাজের ছোট বড় হয় না! ‘তুমি এলে তাই’ ছবিতে এসে আপনার সঙ্গে আলাপ হল। তারপর শেষ ঠিকানা আপনি চিত্রনাট্য সহকারী। প্রফুল্ল রায়ের উপন্যাসে ইটিভিতে একাকী অরণ্যে – সিরিয়ালের জগতে বিরাট কাস্ট। আপনি কো-রাইটার!
● জিৎ: তারপর আপনি দূরদর্শনেও অনেক কাজ করেছেন।
●● অঞ্জন: ‘৯৩ সালে শ্যামাকান্ত দাসের গুলশান করেছিলাম। এটা ভালো ছবি হতে পারতো। চ্যানেল এইট-এর জন্য রবীন্দ্রনাথের বশীকরণ করেছিলাম। দূরদর্শনের জন্যে করেছিলাম ঠাকুরবাড়ি। এতে রবীন্দ্রনাথের জন্মের অনেক আগের থেকে শুরু হয়েছিল কাহিনি মনামী (ঘোষ) কাদম্বরী বৌঠানের চরিত্রে খুব ভালো অভিনয় করেছিলেন। ‘ ৯৪ তে বম্বেতে গিয়ে ‘অভিনেতা’ বলে একটা হিন্দি সিরিয়ালের পাইলট করেছিলাম তাতে পবন মালহোত্রা আদিত্য শ্রীবাস্তব রাজু খের এঁরা অভিনয় করেছিলেন। স্টারপ্লাসের জন্য সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘বাজি’ বলে একটা গল্পে কাজ করেছিলাম। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অথৈ জলে’ নিয়ে কলকাতা দূরদর্শণের জন্য সিরিয়াল করেছিলাম ২০১৫-১৬। আর তারপর আপনি লেখেন আপনি জানেন ক্রিয়েটিভিটিতে সম্পূর্ণ কাজের মতো, অসম্পূর্ণ কাজের তালিকাটাও বড় হয়।
● জিৎ: ক্রিকেটারদের ইনকমপ্লিট ফিফটিস বা সেঞ্চুরির মতো ।
●● অঞ্জন: হ্যাঁ! সন্তু মুখোপাধ্যায়, মহুয়া রায়চৌধুরী প্রদীপ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে ‘আপন যে জন’ ছবির ১০-১২ দিন শুটিং হয়েছিল। তারপর সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে ‘পরাজিত পরাশর’ ছবির কাজ শুরু হয়েছিল। এতে অনুপকুমার, শুভেন্দুদা ছিলেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় ছিলেন। এসব ১৯৮১-৮২ সালের কথা। তখন থেকে নিজে ছবি করার চেষ্টা করছি। ১৯৮৫ সালে এসে সন্ধ্যাপ্রদীপ হল। তারপর টিভির জন্যে আপনার চিত্রনাট্যে ত্রিশূল শুরু করেছিলাম। প্রথম চার পর্বে শ্রীলেখা মিত্র, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, দেবেশ রায়চৌধুরী কি অসাধারন অভিনয় করেছিলেন। তারপর প্রযোজকদের কী যে হল কাজটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। যাকগে এসব যত ভুলে থাকতে পারি ততই ভালো। সমরেশ বসুর প্রজাপতি নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিল, আপনিই চিত্রনাট্য করেছিলেন। সে কাজটা সম্পূর্ণ হয়নি। গুলশান নিয়ে তারপর বশীকরণ নিয়েও ফিচার ছবি করার কথা ভেবেছি বা আজকের সমাজের ওপর কমলাকান্তের দপ্তর নিয়ে “আজ কাল এবং” বলে ছবির কথা বারবার ভাবনায় এসেছে, আর হয়ে ওঠেনি।
● জিৎ: এখন খালি লাগে না?
●● অঞ্জন: লাগে! তবে মানিয়ে নিয়েছি। ক্রিয়েটিভ বিজনেসে শুধু ক্রিয়েটিভিটিটুকু জানলে টেকা যায় না, সেলসম্যানশিপ থাকাটা খুব জরুরি। সেটা না জানলে বিজনেস করা যায় না। শুধু আমি নই এরকম বহু মানুষ আছেন। যাঁরা শুধু কাজটুকুই ভালো করে জানেন কিন্তু আনুসাঙ্গিক গুণাগুণের অভাবে পিছনের সারিতে পড়ে গিয়েছেন। আপনাদের প্রতিবেদনের ভাষায় অন্তরালে। ঠাকুরের কৃপায় স্ত্রী পুত্রকন্যা পুত্রবধূদের নিয়ে আমার নাতনিকে নিয়ে আমি দিব্যি আছি। ক্রিকেট ফুটবলের উত্তেজনা, গল্পের বই, নাটক দেখে খাসা সময় কাটছে! এই তো সেদিন আপনার লেখা চেতনার নতুন নাটক “মেঘে ঢাকা ঘটক” দেখলাম। হাউসফুল শো। সুজন ও নিবেদিতার অসামান্য অভিনয় আর সুজনের পরিচালনা দেখে মন ভরে গেল। কিছুদিন বাদে আবার একবার দেখতে যাবো। এ নাটক একবার দেখে মন ভরে না। বড় ভালো প্রযোজনা । মাঝে মাঝে সুযোগ হলে কিছু পছন্দের পরিচালকের ছবিও দেখি। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নন্দিতা রায়ের ছবি ভালো লাগে। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ভালো।
● জিৎ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ অঞ্জনদা। দারুণ আড্ডা হল! আপনাকে ও পরিবারের সকলকে আমাদের তরফে শুভবিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা, ভালো থাকবেন।
●● অঞ্জন: আপনিও সকলকে নিয়ে ভালো থাকবেন।
www.samayupdates.in এর সমস্ত পাঠক-পাঠিকাকে আমার ও আমার পরিবারের তরফ থেকে শারদীয়া অভিনন্দন, বিজয়ার শুভেচ্ছা ও নমস্কার।
— শেষ
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ । এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com