
ছবি: প্রতীকী।
কাকোলূকীযম্
খরগোশটির বক্তব্য হল, এতো সহজে হার মেনে এই পিতৃপিতামহের ভূমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না। সেই হাতির দলকে এমন কিছুর ভয় দেখাতে হবে যাতে তারা আর এই জায়গায় ফিরে না আসে। রাজনীতি শাস্ত্রে বলা হয়েছে, নির্বিষ সাপেরও ফণা তুলে ভয় দেখানো উচিত। কারণ বিষ আছে কি নেই—সেই চিন্তা লোকে করে না। সকলেই সাপের ফণাকেই ভয় পায়। অর্থাৎ আমাদের ক্ষমতা কতটা সেটা ভেবে লাভ নেই। কীভাবে আমরা তাদেরকে ভয় দেখাতে পারবো সেই উপায় ভাবতে হবে।
অন্যান্য খরগোশেরা সেকথা শুনে বললে, তাই যদি হয় তাহলে একজন চালাক-চতুর দূতই একমাত্র আমাদের বার্তা বাহক হয়ে তাদেরকে ভয় দেখাতে পারবে। এছাড়া কোনও দ্বিতীয় উপায় নেই। আমরা একজন চতুর খরগোশকে মিথ্যাদূত বানিয়ে হাতিদের দলের রাজার কাছে পাঠাবো। সে তাঁর কাছে গিয়ে বানিয়ে বানিয়ে বলবে যে আমাদের রাজা খরগোশ বিজয়দণ্ড চন্দ্রলোকে থাকেন, তিনিই আমাকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। চন্দ্রলোকে কলঙ্ক চিহ্নটা শশকের মতো দেখায় বলে কেউ সেটা নিয়ে সন্দেহও করবে না। তখন সেই মিথ্যাদূত তাদেরকে বানিয়ে বানিয়ে বলবে যে চন্দ্রমা স্বয়ং আপনাদের এই সরোবরে আসতে নিষেধ করেছেন। কারণ তাঁর আত্মীয়কুটুম্বরা সকলেই এই সরোবরের চারিদিকে বসবাস করেন। এভাবে যদি চন্দ্রমা’র মতন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নাম করে যদি বলা হয় তাহলে তার নিশ্চিত আর ফিরে আসবে না।
সকলের প্রস্তাবটি বেশ ভালো লাগলো। তখন এক খরগোশ বলল, তাই যদি হয় তাহলে আমাদের মধ্যেই লম্বকর্ণ নামে এক চালক-চতুর খরগোশ আছে। সে কথা-বার্তায় যেমন পটু তেমনই দূতের কাজও ভালোভাবেই জানে—“বচনরচনাচতুরো দূতকর্মজ্ঞঃ”। তাকেই বরং চন্দ্রমা’র দূত বানিয়ে পাঠানো হোক। শাস্ত্রে বলে—
সাকারো নিঃস্পৃহো বাগ্মী নানাশাস্ত্রবিচক্ষণঃ।
পরচিত্তাবগন্তা চ রাজ্ঞো দূতঃ স ইষ্যতে।। (কাকোলূকীযম্ ৮৭)
এরপর খরগোশেরা সকলে মিলে সেই লম্বকর্ণকেই হাতিদের দলপতির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলো। হাতিদের দল যে রাস্তা দিয়ে সেই সরোবরের পথে আসতো সে পথের ধারে, হাতিদের নাগালের বাইরে একটা উঁচু সুরক্ষিত একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে সেই লম্বকর্ণ হাতিদের দলকে বলতে লাগলো, ওরে দুষ্ট হাতির দল! এই চন্দ্রদেবতার জলাশয়ে এমন নিঃসঙ্কোচে আর নির্ভয়ে কি করে তোমরা আসছো? এখনই এখান থেকে ফিরে যাও।
এই খরগোশের কথায় বিস্মিত হয়ে এক হাতি বলল—“ভোঃ কস্ত্বম্”। ওহে তুমি কে হে?
সে বলল, আমি শশক লম্বকর্ণ। চন্দ্রমণ্ডলে আমার নিবাস। চন্দ্রদেব স্বয়ং আমাকে দূত হিসেবে এখানে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছে। যথার্থবাদী দূতের কোনও রকম হানি পৌঁছনো যে উচিত নয় সেটা নিশ্চয় আপনি জানেন। কারণ শাস্ত্রে বলে “দূতমুখাঃ হি রাজানঃ সর্ব এব”। রাজারা নিজে আসেন না, তাঁরা সব সময় দূতের মুখ দিয়েই কথা বলেন। রাজনীতিশাস্ত্র বলে, দূত যদি ক্রোধবশতঃ কখনও কোনো অস্ত্র হাতেই তুলে নেয় বা রাজাকে যদি কখনও কঠোর কথাও বলেন তাহলেও দূতকে হত্যা করা উচিত নয়—দূত অবধ্য।

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৩: দুর্জনের সম্মান, সাধুর জন্য ফাঁদ

মুভি রিভিউ: সত্যিই তো, সবার নিজের নিজের মতো করে সবটাই নর্মাল

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়
লম্বকর্ণ তখন সগর্বে বললে, ভগবান চন্দ্রদেব জানিয়েছেন গতদিনে হাতিদের দল যখন এই সরোবরে এসেছিলো তখন তারা বহু খরগোশকে হত্যা করেছিল। আপনারা কি জানেন না যে, তারা সকলেই ভগবান্ চন্দ্রদেবের কুটুম্ব! তাই যদি আপনারা প্রাণে বাঁচতে চান তবে কখনও এই সরোবরের দিকে আসবার প্রচেষ্টা করবেন না।
গজপতি জিজ্ঞাসা করলেন, “অথ ক্ব বর্ততে ভগবান্ স্বামী চন্দ্রঃ?” আপনার প্রভু চন্দ্রদেব এখন কোথায়? লম্বকর্ণ প্রত্যয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেন, তিনি এখন আপনাদের পায়ের চাপে আহত হয়ে কোনোক্রমে জীবিত খরগোশদের আশ্বাস দিতে সেই সরোবরে এসেছেন এবং আমাকে আপনাদের কাছে বার্তাবাহক হিসেবে পাঠিয়েছেন। গজরাজ বললেন, তাই যদি হয়, তবে আমাকে ভগবান চন্দ্রদেবের দর্শন করান। তাঁকে প্রণাম নিবেদন করে তবেই আমরা অন্যত্র যাই।
গজরাজের এই আবেদনটা সম্ভবত শশক-দূত লম্বকর্ণের মুখে শোনা ঘটনাটির মধ্যে সত্যতা কতোটা আছে সেটা পরীক্ষা করবার জন্যেই। লম্বকর্ণ সম্ভবত গজরাজের এই আবেদনটির জন্য প্রস্তুতই ছিল। সে বলল, বেশ আসুন তবে একাকী আমার সঙ্গে, প্রভুর দর্শন আমিই আপনাকে করাবো।
কথায় বলে একা-বোকা। খরগোশ লম্বকর্ণ সেই সুযোগটাই নিলো। দেবদর্শনের লোভ দেখিয়ে গজরাজকে একলা নিয়ে এল রাত্রির অন্ধকারে সেই সরোবরের তীরে। নিস্তরঙ্গ জলের মধ্যে তখন পূর্ণিমা চন্দ্রের উজ্জ্বল ছায়া পড়েছে। চারিদিকে নিস্তব্ধ এক মাধুর্য— পরিবেশও হয়ে আছে আনন্দময়। জলে চাঁদের ছায়া দেখিয়ে লম্বকর্ণ গজরাজকে বলল, “ভোঃ! এষো নঃ স্বামী জলমধ্যে সমাধিস্থঃ তিষ্ঠতি”। ওহে! ওই আমাদের স্বামী জলের মধ্যে সমাধিস্থ হয়ে আছেন নিশ্চলভাবে। এই সময়ে এঁনাকে বিরক্ত করা একদমই উচিত হবে না। তাই নিঃশব্দে এঁনাকে দূর থেকে প্রণাম করে দ্রুত এই স্থান ছেড়ে এখনই চলে যান। না হলে একবার যদি সমাধিভঙ্গ হয় তাহলে আপনাদের আর দুর্গতির শেষ থাকবে না।

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৭: আমুর বাজ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২২: য পলায়তি, স জীবতি
প্রথমত: এই গল্পে বলা হয়েছে—“নির্বিষ সাপেরও ফণা তুলতে হয়।” কারণ মানুষ বিষ আছে কিনা সেটা বোঝে না, ফণাটাকেই ভয় পায়। খরগোশেরা জানত তারা লড়তে পারবে না, তাই তারা একরকম ভয় সৃষ্টি করল এক কল্পিত শক্তিকে ঘিরে— চন্দ্রদেবের নাম নিয়ে। এ উদাহরণ আজকের দিনেও বিরল নয় – ছোট দেশ যেমন ভুটান বা সিঙ্গাপুর, শক্তিধর রাষ্ট্র না হয়েও কূটনৈতিক ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক সম্মান দিয়ে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করে। ঠিক তেমনই কর্পোরেট দুনিয়ায় ছোট স্টার্টআপ সংস্থা অনেক সময় “AI-powered”, “blockchain-secured”, “Google-backed” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে নিজের গুরুত্ব বাড়ায়, যদিও আসলে প্রযুক্তিগতভাবে তারা বড় কোম্পানির মতো শক্তিশালী নয়।

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২১: পরিবেশ শুধু প্রাকৃতিক বাতাবরণ নয়, এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পৃক্ত

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৫: সমাপ্তি: শেষ হয়ে হইল না শেষ
তৃতীয়ত সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো ধর্ম-বিশ্বাসের রাজনৈতিক ব্যবহার। লম্বকর্ণ চতুরতার সঙ্গে বলে—এই সরোবর চন্দ্রদেবের আত্মীয়দের আবাসস্থল, এখানে হাতিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। জলে চাঁদের ছায়া দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়—যেন ভগবান রেগে আছেন। ধর্মকে ব্যবহার করে কৃত্রিম এক কর্তৃত্ব তৈরি করা হয়, যা বাস্তবের থেকেও বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। এইখানেই এসে দাঁড়ায় কৌটিল্যের সেই রহস্যময় অথচ নির্মম বাস্তব উচ্চারণ— “সংবরণমাত্রং হি ত্রয়ী লোকযাত্রাবিদিতি” – অর্থাৎ, ত্রয়ী মানে ঋক্, যজুঃ এবং সামবেদ, যাকে আমরা ধর্মগ্রন্থ বলে মাথায় তুলে রাখি, সেটি রাজনীতিবিদ্ কৌটিল্যের মতে, লোকচালনার, সমাজ-নিয়ন্ত্রণের এবং উদ্দেশ্যসিদ্ধির একটি মাত্র আবরণ। এখানে “ত্রয়ী” মানে শুধু ধর্ম নয় আবার ‘আবরণ’ মানে শুধু ছায়া নয়, এই ধর্মীয় আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখা হয় অন্য একটি শক্তিকে —কৌশল, অভিসন্ধি, ও লক্ষ্যনিষ্ঠ বুদ্ধিকে এবং যাঁরা লোকযাত্রাবিদ্—অর্থাৎ যারা জানেন কিভাবে মানুষ চলে, সমাজ কিভাবে গড়ে ওঠে, জনমত কিভাবে বাঁক নেয়—তাঁরা জানেন, এই ধর্ম কবে হাতিয়ার হবে, কবে আবরণ হবে, আর কবে কেবল একটা ছায়া মাত্র হয়ে সমাজে অবস্থান করবে। আমরা আগেই দেখেছি যে পঞ্চতন্ত্রকার কেবল রাজার সন্তানদের রাজনীতি শেখানোর জন্য এই গল্প লেখেননি। তিনি রাজাকেও সতর্ক করছিলেন— “দেবতার নামের আড়ালে কে, কীভাবে, কবে তোমার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবে, তা বোঝার জন্য তোমার সন্তানদের কেবল অস্ত্র চালানো নয়, ছলনা, নীতিকৌশল ও বিশ্বাসের রাজনীতিও শেখা দরকার।” খরগোশেরা তো চাঁদের নাম ব্যবহার করেই হাতিদের সরিয়ে দিল।

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা
আজকের দিনেও রাজনৈতিক প্রচারে বহু সময় দেখা যায় কোনো নেতার প্রতি “ঈশ্বরের আশীর্বাদ”, “ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উত্তরাধিকার” ইত্যাদি দাবি তোলা হয় জনসমর্থন আদায়ের জন্য। বিজ্ঞাপনের দুনিয়াতেও কিছু ব্র্যান্ড, যেমন আয়ুর্বেদ সংস্থা বা গহনার দোকান নিজেদের পণ্যে “শুভ”, “পবিত্র”, “ঐশ্বরিক” ইত্যাদি ধর্মীয় একটা আবরণ জুড়ে দেয়, যেন ক্রেতা মানসিকভাবে প্রভাবিত হন।
সবশেষে যেটা বলার সেটা হলো ক্ষমতা মানে সব সময় বাহুবল প্রদর্শন করা নয়, বরং বুদ্ধির যথাযথ ব্যবহার করা। গল্পটি একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে—“পরিশীলিত বুদ্ধি ও কথার কৌশল অনেক সময় পেশি-শক্তির চেয়ে বেশি কার্যকর।”
হাতিরা সংখ্যায় ও শক্তিতে প্রবল, কিন্তু খরগোশেরা মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে জয়ী হয়। এই প্রসঙ্গে উদাহরণ দিতে গিয়ে আমরা মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনকে স্মরণ করতে পারি, শারীরিক শক্তির বদলে নৈতিক কর্তৃত্ব ও জনগণের মন জয় করে কেমন করে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়েছেন এবং তার ভিতকে নড়িয়ে দিয়েছিলেন। পাঠকদের গ্রেটা থুনবার্গ নামক সেই কিশোরীটিকে স্মরণ করতে বলবো, যার পরিবেশ আন্দোলন আজ বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকদের চাপে ফেলেছে, কেবল বাক্শক্তি ও যুক্তির উপর ভর করে। তাই পঞ্চতন্ত্রের এই গল্পটি কেবল শিশুসাহিত্য নয়—এটি এক চিরন্তন রাজনীতির কৌশলপাঠ। এটি শেখায়— “যখন শক্তি কম, তখন কৌশলই শক্তি। বিশ্বাস, ভাষা আর ভাবমূর্তির সঠিক ব্যবহারে দুর্বলও বিজয়ী হতে পারে।” আজকের তথ্য-রাজনীতি, সোশ্যাল মিডিয়া, কূটনীতি, কর্পোরেট যুদ্ধ—সব জায়গায় এই শিক্ষা কার্যকর। পঞ্চতন্ত্র তাই শুধু গল্প নয়—এ এক চিরন্তন রাষ্ট্রনীতি ও মানবমনের দর্পণ।—চলবে।


















