
শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদা।
স্বামী সারদেশানন্দ বলেছেন যে, শ্রীমার এক খুড়ি ছিলেন, ভাবি মাসির মা। তিনি সেসময় অচল, অন্ধ। শ্রীমা কলকাতা যাওয়ার আগে ভক্তকে পাঠালেন খুড়ির কাছে হাতে কিছু দিয়ে তাঁকে প্রণাম জানিয়ে আশীর্বাদ আনার জন্য। শরীর খারাপ থাকায় তিনি নিজে যেতে পারলেন না। তিনি ভক্তসন্তানকে বলে দিয়েছিলেন যে, তাঁর ভক্তিপূর্ণ দণ্ডবৎ প্রণাম জানিয়ে খুড়িকে বলতে, ‘দেহ অসুস্থ থাকায় আমি নিজে গিয়ে তাঁর পদধূলি ও আশীর্বাদ নিতে পারলুম না, যেন দুঃখিত না হন, অপরাধ ক্ষমা করে স্নেহাশীর্বাদ করেন’।
খুড়িকে ভক্ত শ্রীমার এই কথা জানাতেই তিনি প্রেমাশ্রু বর্ষণ করতে করতে বললেন, ‘সারদা আমাদের কুলের গৌরব। বেঁচে থাকুক দীর্ঘকাল সুস্থদেহে সুখে স্বচ্ছন্দে ভগবানের কৃপায়, তাকে আমার প্রাণের আশীর্বাদ ভাল করে বলবে’। এরপর খুড়ি হাতজোড় করে সজল নয়নে কাতরভাবে ভগবানের কাছে বারবার প্রার্থনা করতে লাগলেন, সারদাকে দীর্ঘকাল সুস্থদেহে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। ভক্তটি যখন এই কথা শ্রীমাকে এসে জানালেন, তখন শ্রীমার মনও আনন্দে ভরে গেল। ঠাকুরের দেহরাখার পর শ্রীমা কামারপুকুরে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে নিজের মনকে সদা ঊর্ধ্বলোকে রাখতেন। বাইরের অভাব, অনটন বা শারীরিক দুঃখকষ্ট কিছুই গ্রাহ্য করতেন না। সেই সময়ে কামারপুকুরে শ্রীমার ভাসুর রামেশ্বরের স্ত্রী, দুই ছেলে রামলাল ও শিবরামের বৌ, আর লক্ষ্মী প্রায়ই থাকতেন।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না
রামলাল কাজের জন্য দক্ষিণেশ্বরে থাকলেও মাঝে মাঝে কামারপুকুরে যাতায়াত করতেন। শ্রীমার ভিক্ষাপুত্র শিবরাম সর্বদা গৃহদেবতা রঘুবীরের পুজো ও ঘরবাড়ির দেখাশোনা করতেন। শ্রীমার মন তখন অতীন্দ্রিয় জগতে ঘুরে বেড়াত। তিনি সংসার থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ঠাকুর তাঁকে যে ঘরখানা দিয়েছিলেন, সেখানেই থাকতেন। পাকশালার একাংশে নিজেই রান্না করে ঠাকুরকে নিবেদন করে সেই প্রসাদী শাকান্নে কালাতিপাত করতেন। জমিদার লাহার মেয়ে বৃদ্ধা প্রসন্নময়ী আর ঠাকুরের ভিক্ষামা ধনী কামারনীর দেহত্যাগের পর তার ছোট বোন শঙ্করী শ্রীমাকে মেয়ের মতই আদরযত্ন করতেন।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৫: সমাপ্তি: শেষ হয়ে হইল না শেষ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২২: য পলায়তি, স জীবতি
আর একজন বালবিধবা বিলাসিনীও শ্রীমাকে স্নেহ করতেন। তিনি ছিলেন ঠাকুরের চিনু শাঁখারীর মেয়ে। তিনি কিছুটা সম্পন্নশালী হওয়ায় দেবসেবা ও ধর্মে তাঁর মতি ছিল। এই তিনজন সন্তানহীনা বিধবাদের ঠাকুর ও শ্রীমার প্রতি ছিল বাৎসল্যভক্তি। যতদিন শ্রীমা কামারপুকুরে ছিলেন, তাঁরা জীবিত থাকাকালীন শ্রীমার খোঁজখবর নিতেন। নানাবিষয়ে সাহায্য করতেন। এমনকি, রাতে শঙ্করী শ্রীমার সঙ্গেই থাকতেন। ঠাকুর কোন পারিশ্রমিক নিতেন না বলে দক্ষিণেশ্বর থেকে তাঁর মাসিক পারিশ্রমিক শ্রীমাকেই দেওয়া হত।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২১: পরিবেশ শুধু প্রাকৃতিক বাতাবরণ নয়, এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পৃক্ত

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৭: আমুর বাজ
তবে শ্রীমা দক্ষিণেশ্বর ত্যাগ করার পর সেই পারিশ্রমিক বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্বামীজী ও অন্যান্য শিষ্যরা এই নিয়ে চেষ্টা করেও কোন ফল পাননি। ঠাকুর শ্রীমার জন্য কিছু টাকার ব্যবস্থা করে যান। তিনি শিহড়ে জমি বিক্রি করিয়ে গৃহদেবতা রঘুবীরের নামে দেবোত্তর করে দেন। সেই জমির ধানের অংশ আর তাঁর শ্বশুর ক্ষুদিরামকে সুখলাল গোস্বামী লক্ষ্মীজলায় যে এক বিঘে দশ ছ’টাক জমি দিয়েছিলেন, তার একটা অংশ শ্রীমা পেতেন। যা পেতেন তাতেই নিজের হাতে ঢেঁকিতে কুটে চাল তৈরি করে যখন যেমন শাক, তরকারি জুটত তাই রান্না করে ঠাকুরকে ভোগ দিয়ে প্রসাদী খাবার খেয়ে থাকতেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়
ঠাকুর তাঁকে শ্বশুরভিটেতে থাকতে বলেছিলেন, তিনি সেই আজ্ঞা পালন করেছিলেন। শ্রীমার অন্তরঙ্গ সন্ন্যাসীভক্তদের তখন নিজেদেরই মাখা গোঁজার ঠাঁই নেই, অন্নের অভাব, তাঁরা কিভাবেই বা শ্রীমার সেবা করবেন, তাছাড়া কামারপুকুরে সেসময় শ্রীমার খাওয়াপরার কষ্টের কথা তাঁরা জানতেনও না। তাও শ্রীমার কষ্টের কথা ভেবে গৃহীভক্তদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁর থাকার সুব্যবস্থা করে কামারপুকুর থেকে মা সারদাকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। তখন থেকেই তিনি কলকাতা আর কামারপুকুর দুজায়গাতেই বাস করেন। পরে শ্বশুরঘরে থাকার অসুবিধা দেখে শ্রীমার জননী শ্যামাসুন্দরী তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন।—চলবে।
* আলোকের ঝর্ণাধারায় (sarada-devi): ড. মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় (Dr. Mousumi Chattopadhyay), অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, বেথুন কলেজ।


















