বুধবার ১০ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তের রাজত্বকালে বোধিসত্ত্ব পায়রা হয়ে জন্মেছিলেন। তিনি বাস করতেন এক ধনাঢ্য বণিকের পাকশালার ঝুড়িতে। একটি কাক মত্স্য-মাংসের লোভে পায়রাটির সঙ্গে মিত্রতাস্থাপন করল।

একদিন পাকশালায় মত্স্য-মাংসের ব্যঞ্জন প্রস্তুত হচ্ছে। কাকটি মনে মনে ভাবল, এইসব খাদ্য তার চাই। এইসময় পায়রা তাকে এসে বলল “চল যাই, ঘুরে এসে খানিক।”
কাক বলল “ভাই, আজ অজীর্ণ হয়েছে বড়। তুমি যাও, ঘুরে এসো।”
পায়রা চলে গেলে কাক ভাবল, “এখন আমার পথ নিষ্কণ্টক। আমি শত্রুমুক্ত। এখন আমি ইচ্ছেমতোই স্বাদু মত্স্য-মাংস খাব।”
পাচক রন্ধনশালার বাইরে গিয়ে তখন ঘাম জুড়োচ্ছিল। পাকশালায় মত্স্য-মাংসের নানা লোভনীয় পদ প্রস্তুত হয়েছে। কাকটি ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে ঝোলের কড়ার ভিতর লুকিয়ে থাকতে গেল, পাত্রটিতে মৃদু শব্দ হতে পাচক দৌড়ে পাকশালায় প্রবেশ করে কাকটিকে দেখতে পেল।

তারপর কাকটির দুরবস্থার শেষ রইল না। পাচক কাকটির শরীর থেকে পালক তুলে ফেলল, সেখানে কাঁচা আদা ও শ্বেত সরিষার মিশ্রণ লাগিয়ে দিল। মাথায় ঢেলে দিল পচা ঘোল। নিষ্কণ্টক হতে গিয়ে তার শরীর পালকশূন্য হল।
তাকে একটি মাটির ঢেলা দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে সেই ঢেলাটি সুতোয় বেঁধে কাকটির গলায় ঝুলিয়ে তাকে পায়রার বাসা ঝুড়িটিতে ফেলে রেখে গেল।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৫: সমাপ্তি: শেষ হয়ে হইল না শেষ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না

পায়রা যথাসময়ে ফিরে এল। কাকটিকে দেখে পারাবতরূপী বোধিসত্ত্ব পরিহাসের সুরে বললেন, “এ কোন বলাকা আমার বন্ধুর ঝুড়িতে? বন্ধু দেখলে কিন্তু ক্রুদ্ধ হয়ে মেরে ফেলবে!”

কাকটি তার দুর্দশার বিবরণ দিয়ে বলে “এমন দুর্দশায় কি পরিহাস করতে আছে ভাই!”

বোধিসত্ত্ব বললেন, “স্নান করে সিক্ত দেহে চন্দন মেখেছো বুঝি। ভালো ভালো। অন্নপানে তৃপ্ত হয়েছো বুঝি খুব! গলায় তো দেখি বৈদুর্যমণি শোভা পাচ্ছে, বলি বারাণসীধামে গিয়েছিলে বুঝি?”
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২২: য পলায়তি, স জীবতি

কাক বিষণ্নবদনে বলে, “শত্রু-মিত্র কাউকেই যেন কখনও এমন বারাণসীতে যেতে না হয়, আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল!”

পায়রা সেই বাসায় আর থাকল না, উড়ে চলে গেল অন্যত্র। যাওয়ার আগে কাকটিকে সে বলেছিল “তুমি ভাই আবারও এমন বিপদে পড়বে, কারণ তোমার প্রকৃতিই এইরকম। মানুষের খাদ্য পাখিদের জন্য সুখকর নয় যে।”

কাকটি ওই ঝুড়িতেই প্রাণত্যাগ করল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২১: পরিবেশ শুধু প্রাকৃতিক বাতাবরণ নয়, এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পৃক্ত

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৭: আমুর বাজ

এই গল্পের মূল ভাবটি কী? পায়রা ধীমান মানুষের, কাক চতুর, লুব্ধ, অবিবেচক মানুষের প্রতিনিধি। সাধ্য ও নিজের সীমাকে না জেনে কাজ করলে তার পরিণতি দুঃখজনক হয়। কাকটির ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। মানুষ অনন্ত শক্তির আধার, আত্মস্বরূপের নব নব উদ্ঘাটন, আবিষ্কার তার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ঘটে চলে। কিন্তু হঠকারী মনোভাব সকল সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি

কাকটির এমন আচরণে দেখা যায়, আশ্রয়দাতা পায়রাটির প্রতি তার কোনও কৃতজ্ঞতা ছিল না। উপরন্তু তাকেই সে শত্রু ভেবেছিল। শত্রু-মিত্র চিনতে না পারার এই অক্ষমতা ও অহংবোধের নাগপাশ, সাধ্য ও সাধের বৈষম্য তাকে ধ্বংস করল। পাশাপাশি, পায়রা বুঝি মনে মনে কাককে চিনেছিল। কিন্তু ঔদার্য তার প্রকৃতিকে মহত্ করেছে, জ্ঞান করেছে মুক্ত। তাই কাকের মতো ছদ্মমিত্রের সঙ্গেও সে বাস করেছে অসংশয়ে, কিন্তু এমন মিত্রের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হলে সজ্জন ও বিদগ্ধ ব্যক্তি নিজেকে সেই সঙ্গমুক্ত করেন। জাতকমালার এই কাহিনীটি মানবপ্রকৃতির সেই চিরপরিচিত রূপকেই রূপকের আবরণে পরিবেশন করেছে, যা আজ-ও সমান প্রাসঙ্গিক।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content