
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর History of Freedom Movement in India গ্রন্থে বিলোনিয়া ও উদয়পুরে অনুশীলন সমিতির তৎপরতা সম্পর্কে লিখেছেন, For the purpose of training it’s members, the Anushilan Samiti had two farms at Belonia and Udaipur in Hill Tipperah. These were outwardly, and in part really agricultural farmers, but they served mainly as centers for training. During day time the members worked as labourers in the fields but at night they were given training in the use of different kinds of arms, and practiced shooting in the neighboring hills. They had to work hard and lived under strict military discipline.
পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ বাংলার বিপ্লবীরা অনেক সময় পালিয়ে এসে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিতেন। এ ভাবে ব্রিটিশ বিরোধী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল ত্রিপুরাও। বিপ্লবীদের গতিবিধি সম্পর্কে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ত্রিপুরার রাজ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়। স্বদেশীদের প্রতি রাজার প্রচ্ছন্ন সহানুভূতিরও আভাস পাওয়া যায় সেই আমলের বিভিন্ন ঘটনায়। স্বদেশী আন্দোলনটা ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, রাজার বিরুদ্ধে নয়। রাজা যেন তাই বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই এড়িয়ে যেতেন। এছাড়া ব্রিটিশ সরকারের নানা ধরনের নির্দেশাবলী, ইংরেজ আধিকারিকদের দাপট স্বাধীনচেতা রাজাগণ যে ভালো মনে মেনে নিতেন না তাই বলাই বাহুল্য।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬৬: সিপাহি বিদ্রোহের ছোঁয়া লেগেছিল ত্রিপুরাতেও

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না
বিপ্লবীদের প্রতি রাজার গোপন সহানুভূতি ছিল বলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রায়ই ত্রিপুরার রাজ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করত। বিপ্লবীদের প্রতি রাজ সরকারের গোপন নৈতিক সমর্থনও থাকত বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। একবার পিস্তল চুরির অভিযোগে দুজন বিপ্লবীকে ধরার জন্য কুমিল্লা পুলিশ পার্বত্য ত্রিপুরার সোনামুড়া অঞ্চলে প্রবেশ করলে রাজা আগে ভাগেই তাঁর লোকজন মারফৎ এই দুই বিপ্লবীকে পাহাড়ি এলাকার মাঝ দিয়ে রাজধানীতে নিরাপদে সরিয়ে আনেন। যাইহোক, কালক্রমে পার্বত্য ত্রিপুরার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে স্বদেশীদের তৎপরতা।প্রভাব পড়ে অসহযোগ আন্দোলনের।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২২: য পলায়তি, স জীবতি
এ বার আসা যাক চাঁদপুরে চা শ্রমিকদের উপর ব্রিটিশ বাহিনীর অকথ্য নির্যাতনের পর ত্রিপুরায় এর প্রতিক্রিয়ার কথায়। ১৯২১ সালের মে মাসে করিমগঞ্জের চরগোলা ও লঙ্গাই উপত্যকার বিভিন্ন চা বাগান থেকে হাজার হাজার নির্যাতিত চা শ্রমিক বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল তাদের মুলুকে অর্থাৎ ঘরে ফেরার জন্য। চা বাগান গুলোতে শ্রমিকদের উপর ব্রিটিশ বাগান মালিকদের সীমাহীন অত্যাচারের ফলশ্রুতিতে সেদিন চা শ্রমিকদের এই অভিনিষ্ক্রমণ ঘটেছিল। শ্রমিকদের এভাবে বাগান ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় চা শিল্পের উপর বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে এই আশঙ্কায় বাগান মালিকরা তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। প্রথমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, তারপর বল প্রয়োগ করে। সেদিন এই চা শ্রমিকরা যখন চাঁদপুর রেল স্টেশনে আশ্রয় নিয়েছিল তখন তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গোর্খা বাহিনী।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২১: পরিবেশ শুধু প্রাকৃতিক বাতাবরণ নয়, এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পৃক্ত

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৭: আমুর বাজ
এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আসাম ও বাংলায়। হয়েছিল রেল ও স্টীমার শ্রমিক ধর্মঘট। পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরাতেও সেদিন চাঁদপুরের ঘটনার বিরাট প্রভাব পড়েছিল। ধর্মঘট, বাজার বয়কট ইত্যাদি হয়েছিল। রাজতন্ত্রের শাসন হলেও ত্রিপুরায় তখন গণচেতনার উন্মেষ ঘটছে। পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ বাংলার ঘটনাপ্রবাহেরও প্রভাবমুক্ত ছিল না ত্রিপুরা। ব্যতিক্রম নয় চরগোলা-চাঁদপুরের ঘটনা প্রবাহ। ১৯২১ সালে দেশে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল ত্রিপুরাতে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি
চাঁদপুরে চা শ্রমিকদের উপর গোর্খা বাহিনীর হামলার প্রতিবাদে রেল ধর্মঘটের প্রভাব পড়ে আখাউড়ায়। দু’দিন ব্যাপী বাজারে হরতাল পালিত হয়। ইংরেজ কর্মচারীদের জন্য আগরতলা বাজার থেকে পণ্যাদি সরবরাহের প্রতিবাদে আগরতলা বাজার বয়কটের সিদ্ধান্ত হয় আখাউড়ার একটি সভায়। সন্নিহিত মোগরা অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা আগরতলা বাজার বয়কট করে। রাজ প্রশাসনের নায়েব মন্ত্রীরা সেখানে নানা প্রতিবন্ধকতারও সম্মুখীন হন। শুধু রাজধানী আগরতলা নয়, দূরবর্তী উত্তরাঞ্চলের কৈলাসহর, ধর্মনগর এবং দক্ষিণের বিলোনীয়া অঞ্চলেও অসহযোগ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















