কলকাতায় বৃষ্টি
ইরাবতীর ডায়েরিতে এরপর আছে গ্রুপের মহিলা সদস্যদের সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট। প্রথমেই তৃধার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। শাক্য দেখল লেখা আছে—তৃধা। বয়স—৩৩ বছর। দক্ষিণ কলকাতার নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। বছর সাতেক বিবাহ হয়েছে। স্বামী মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। যোধপুর পার্কে পেল্লায় সাইজের ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন। জীবনযাত্রা, বোহেমিয়ান টাইপ। এমনিতে স্বামীকে নিয়ে সুখী সংসার। কিন্তু স্বামী যেহেতু কর্মসূত্রে বছরের বড় একটা সময় বাইরে থাকেন, ফলে নানা পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলতে অসুবিধা হয় না। অরণ্যের সঙ্গে সম্পর্কটি ভালোবাসার নয়, জৈবিক তাগিদের। স্বামী অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ। দু’জনে কলকাতায় থাকলে উভয়ের মধ্যে প্রায়শই ঝগড়া হয় বলে প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন। মাঝে ডিভোর্সের জন্য কয়েকজন উকিলের পরামর্শ নেন তৃধা। তবে শেষপর্যন্ত মনমালিন্য ভুলে একসঙ্গেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। পরশ্রীকাতর। উন্মেষাকে চেনেন কলেজ থেকে। একই কলেজে একই বিষয় নিয়ে পড়তেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয় একই হওয়ায় বন্ধুত্ব গাঢ় হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কলেজ জীবন থেকেই তাঁরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কোন একটি বিষয় নিয়ে একবার তুমুল ঝগড়া হয় দুজনের মধ্যে। ঝগড়া এতটাই সিরিয়াস ছিল যে, কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বেশ কয়েকবছর।

শেষে আর্যর উদ্যোগে হালে আবার সম্পর্ক অনেকটা সহজ হয়েছে। যদিও ভিতরের খবর, তৃধা এখনও পুরানো তিক্ততা ভুলতে পারেননি। জেলাস ফিল করেন। বিশেষ করে অঞ্জনের সঙ্গে উন্মেষার সম্পর্কটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। উন্মেষার বদলে তিনি যদি পেতেন অঞ্জনকে, তাহলে হয়তো স্বামীকে ডিভোর্স দিতে এবার আর দ্বিধা করতেন না। জনান্তিকে বলে বেড়ান, উন্মেষার জীবনে অঞ্জনের আগমন অনেকটা বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার মতোই ঘটনা। পিশাচ পাহাড়ে আসার ব্যাপারে তৃধা প্রাথমিক উদ্যোগ না নিলেও পরে তাঁর উৎসাহই ছিল বেশি। আর্যকে একেবারেই পছন্দ করেন না তৃধা। আর্য তাঁদের গ্রুপে খানিকটা অড্‌ ম্যান আউটের মতো বলেই মনে করেন তিনি। আর্যর সঙ্গে কোন একটা ব্যাপারে তাঁর রাগ বা ক্ষোভ আছে। এবং সেটা অতীতের কোন ঘটনা নিয়ে। খরুচে মহিলা। স্বামীর ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স ভালোই। দু’-হাতে টাকা ওড়ান। বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। কিছুটা স্বার্থপর এবং পরশ্রীকাতর। গসিপ করতে খুব ভালবাসেন এবং ছেলেদের মাথা চিবিয়ে খেতে।
শাক্য ভাবছিল। তৃধা চরিত্রটি কেমন ইরাবতী অতি চমৎকার ভাবে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। স্বামীকে তৃধা ভয় পান, সম্ভবত স্বামী তাঁর রঙিন জীবনের অন্তরায় বলেই, আবার ছাড়তেও পারছেন না, কারণটা সম্ভবত আর্থিক। এই রিপোর্টে অবশ্য তৃধার বাপের বাড়ির কোন পরিচয় নেই। তাঁর বাপের বাড়ির অবস্থা কী স্বচ্ছল? তাঁরা কোথায় থাকেন? কলকাতাতেই? মেয়ের উচ্ছৃঙ্খল জীবন সম্পর্কে তাঁরা কি ওয়াকিবহাল? তৃধার স্বামী কি কিছুই জানেন না? স্বামীর সঙ্গেও উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ আছে কি-না তা রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট নয়। প্রেমজ বিবাহ নাকি সম্বন্ধ করে তাও উল্লেখ নেই রিপোর্টে। তাছাড়া বিবাহের আগে থেকেই তৃধা এইরকম উচ্ছৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত কিনা তা জানা যাচ্ছে না। সম্ভবত নয়। কারণ, এ-জাতীয় সন্দেহপ্রবণ মানুষেরা সচরাচর সম্বন্ধ করেই বিবাহ করে থাকে এবং বিবাহের পূর্বে হবু বউয়ের ইতিহাস জানার জন্য অনেকখেত্রে ভুঁইফোড় বেসরকারি গোয়েন্দাসংস্থাগুলির শরণাপন্ন হয়। তৃধার স্বামীও নিশ্চয়ই তেমন করে থাকবেন। আবার সন্দেহ করলেও, স্ত্রী যে দু’হাতে টাকা ওড়াচ্ছেন, সে-ব্যাপারে কোন আপত্তি করেন বলে মনে হচ্ছে না। করলে তৃধা এমনভাবে বেহিসেবী খরচ করতে পারতেন না। তবে এই রিপোর্টে এর চেয়েও ভাইটাল পয়েন্ট হল, কলেজ জীবন থেকে একই বিষয় নিয়ে একই জায়গায় পড়া সত্ত্বেও এবং একই বন্ধুগ্রুপে থাকা সত্ত্বেও উন্মেষার সঙ্গে ত্যৃধার শীতল সম্পর্ক। এর পিছনে কি কোন কারণ আছে? নাকি সাধারণ নারীসুলভ জেলাসি? আর্যকে না পছন্দ করারই বা কারণ কী? সে-কি কেবল আর্যর সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের ভিন্নত্ব? আর্যকে পছন্দ না করলেও কীভাবে আর্যর মধ্যস্থতাতে তৃধা এবং উন্মেষার সম্পর্কের বরফ গলেছিল? অনিলের সঙ্গে তৃধার সম্পর্ক কেমন ছিল বোঝা যাচ্ছে না। অনিলের হত্যাকাণ্ডের পিছনে আপাতভাবে তাঁর কোনও ভূমিকা বা স্বার্থ লুকিয়ে আছে, তা দেখতে পাচ্ছে না শাক্য। কিন্তু অরণ্যের ক্ষেত্রেও কি তেমনটাই? অরণ্যকে সরিয়ে দিলে তাঁর আর অরণ্যের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে, তার কথা চিরকালের জন্য বিস্মৃতির অন্ধকারে রলিয়ে যাবে। কিন্তু রিপোর্টে যা লেখা আছে, তাতে স্পষ্ট যে, তৃধার জীবনে অরণ্য বহুর মধ্যে একজন। কতজনকেই বা মুখ বন্ধ করার জন্য তৃধা জীবন থেকে সরিয়ে দেবেন এভাবে? তাছাড়া এক্ষেত্রে একা একজন মহিলার পক্ষে একইদিনে দু’-দুখানি খুন করা কি সম্ভব? মনে রাখতে হবে, কেবল অনিল নয়, একইদিনে প্রায় একই সময়ে হোটেলের এক কর্মচারীও খুন হয়েছেন। তার দায়ভার চেপেছে কালাদেওর হাতে। তৃধা কালাদেও হলে, তার নিশ্চয়ই একজন সহযোগী থাকবে! সেই সহযোগীটি কে? জানতে হবে, অনেক কিছু জানতে হবে। এদিকে হাতে সময় বড় কম। বোঝা যাচ্ছে না যে, কালাদেওর মুখোশ পরা আততায়ীর পরের টার্গেট কে? আগাথা ক্রিস্টির ‘অ্যাণ্ড দেয়ার ওয়াজ নান্‌’ উপন্যাসটির কথা মনে পড়ল তার। সেইরকম কিছু কি ঘটছে এখানেও? কেউ সেই নভেল পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে এমন নাটকীয় আঘাত-প্রত্যাঘাত হানছে কি?

আবার রিপোর্টে চোখ রাখে সে। পরের নামটি প্রত্যাশিতভাবেই উন্মেষার। এই গ্রুপের শেষ সদস্য। ইরাবতীর রিপোর্ট অনুযায়ী উন্মেষার বয়স—৩৩ বছর। কলকাতার মেয়ে নয়। হুগলীতে পৈতৃক বাড়ি। যদিও সেখানে এখন কেউ থাকে না। মায়ের সঙ্গে গড়িয়াতে একটি ছোট্ট দু-কামরার ফ্ল্যাটে থাকেন। বাবা নেই। উন্মেষার কলকাতায় আসা পড়াশুনার সূত্রে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৯: ইরাবতীর ডায়েরি থেকে/১

শারদীয়ার গল্প/১ : ষষ্ঠীর সন্ধ্যা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৯: হেলে

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৫৬: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

উন্মেষা নামী কলেজ থেকে ইতিহাস নিয়ে গ্র্যাজুয়েশনের শেষে দক্ষিণ কলকাতার নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স। লেখাপড়ায় ভালো হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজাল্ট কোন কারণে খারাপ হয়। মাঝে এক বছর গ্যাপ দিয়েছিলেন। পরের বছর মাস্টার্স শেষ করেন। এমনিতে চলনে-বলনে, কথায়-বার্তায় আধুনিক হলেও কিছুটা চাপা এবং রিজার্ভড। পার্টি অ্যানিমেল নয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পরেই বিবাহ করেন। স্বামী ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। প্রেমজ বিয়ে। শ্বশুরবাড়ি থেকে বিয়ে মেনে নেওয়া হয়নি, ফলে শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে কোন সম্পর্ক আগেও ছিল না, এখনও নেই। স্বামী গ্রুপেরই আগে বন্ধু-সদস্য ছিলেন। খুব বুদ্ধিমান এবং অল্পকথার মানুষ হিসাবে বন্ধুমহলে পরিচিতি ছিল। বিদেশে একটি দুর্ঘটনায় মারা যান। দেহ পাওয়া যায় নি। বিবাহের একটি আংটি দেখে দেহ সনাক্ত করে উন্মেষা। তারপর থেকেই নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেন। অঞ্জনের সঙ্গে চাকুরিসূত্রে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লেও দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। অঞ্জনের বেপরোয়া জীবন তাঁর হাতে পড়ে অনেকটা স্থিরতা পেয়েছে। বন্ধুদের কারুর সঙ্গে খুব একটা ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও আলগা যোগাযোগ ছিল। কেবল আর্যর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। বছর খানেক হল অনেকটা আর্যর চেষ্টাতেই আবার পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয়। তবে কোন কারণে আর্য বাদে বাকিদের সঙ্গে উন্মেষার যে দূরত্ব গড়ে উঠেছিল, তা থেকেই গিয়েছে। কলকাতায় অঞ্জনের সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরতে গেলেও কোথাও রাত কাটান নি। এই প্রথম এতটা দূরের কোন ট্যুরে এসেছেন অঞ্জনের সঙ্গে। উন্মেষার মা শয্যাশায়ী। খুব অসুস্থ। তবে মেয়ের জীবনে অঞ্জনের আবির্ভাবে খুব খুশি হয়েছেন। নিশ্চিন্ত হয়েছেন। ব্যাঙ্কব্যালেন্স নর্মাল। স্বামীর মৃত্যুর পর যে টাকাটা পেয়েছিল ইন্স্যুরেন্স থেকে, তা দিয়েই কলকাতায় ফিরে গড়িয়ার ছোট ফ্ল্যাটটি কিনেছে। বাকি টাকা ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রেখেছিল। চাকরি পাওয়াতে তার উপকারই হয়েছে। খুব খরুচে নয়। বুঝেশুনে দরকার মতো খরচ করে। তবে অঞ্জনের একটা সাপোর্ট এখন পায় বলেই হয়তো মায়ের চিকিৎসার জন্য আগে যে খরচ হতো তা এখন করতে হয় না তেমন। উন্মেষার সঙ্গে অজ্ঞাত কারণে তার সম্পর্ক আদায়-কাঁচকলায়। অরণ্য, অনিল এদের সঙ্গেও কথাবার্তা তেমন বলতে না পরের দিকে। ট্যুরে যেতে রাজি ছিল না। অঞ্জনের বারংবার অনুরোধেই রাজি হয়। অন্যদের সঙ্গে না এসে অঞ্জনের বাইকে আসার কারণ সম্ভবত অন্যদের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলার জন্য। নির্বিরোধী। খুব পরচর্চা পরনিন্দা করেন না। অফিসিয়াল কাজ মন দিয়ে করেন। ফলে অঞ্জনসহ আরও অনেকের গুডবুকে আছেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত

শাক্য থামল। এইটুকুই। উন্মেষার জীবনযাপন খুব সাদামাটা বোঝা যাচ্ছে। যদিও একটা আলগা চটক এবং নিজেকে জাহির করার চাপা প্রবণতা ইন্টারোগেশনের সময় লক্ষ্য করেছিল সে। নিজের উপর কনফিডেন্স প্রচণ্ড। সম্ভবত সেই কারণেই কর্পোরেট সেক্টরে উঁচুতে উঠতে অসুবিধা হিয়নি। রিজার্ভড্‌ প্রকৃতির। অঞ্জনের সঙ্গে একত্রবাস করলেও সম্ভবত একটা দূরত্বো আছে এবং অঞ্জন সেটিকে সমীহ করেন। কিন্তু এই রিপোর্ট থেকে একটা সাধারণ প্রশ্ন উঠে আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় এক বছর গ্যাপ পড়েছিল। কেন? অন্য বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলেও, আর্যর সঙ্গে রেখেছিলেন কেন? বিদেশে কীভাবে স্বামি মারা গিয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। অনিলের মৃত্যু কিংবা অরণ্যের উপর আক্রমণের ঘটনায় তাঁর প্রতিক্রিয়া শীতল। কেন? বন্ধু হিসাবে কিছু সহানুভূতি এঁদের জন্য কেন দেখাতে পারলেন না উন্মেষা? এতটা শৈত্যের কারণ কী? অথচ আর্যর প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থন খুব কম নয়। এই আচরণ কি তাঁর চরিত্রের বৈপরীত্যের দিকে নির্দেশ করে না ? এমনিতে উন্মেষাকে নিরীহ বলে মনে হচ্ছে। উচ্ছ্বল নয়, কিছুটা ঘরকুনোই বলা যায়। আচ্ছা, বিবাহের কত বছর পরে স্বামীকে হারান তিনি? ইরাবতী সেই কথাটি উল্লেখ করেননি কিংবা ভুলে গেছেন। এই তথ্যটি জানা থাকলে যে বিরাট কিছু যায় আসতো তা নয়, তবে রিপোর্ট সম্পূর্ণতা পেতো।
আরও পড়ুন:

দশমী

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট

ইরাবতীর রিপোর্ট কিন্তু এখানেই শেষ নয়। একেজির ভাগ্নি এবং ভাগ্নি-জামাই অর্থাৎ রিমিতা ও পূষণ সম্পর্কেও এখানে আলাদা-আলাদা এন্ট্রি আছে। সংক্ষিপ্ত হলেও আছে। এবার সেই দিকে চোখ রাখল শাক্য। রিমিতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বয়স—২৬ বছর। স্নাতক। বিউজনেস অ্যাডমিনেস্ট্রেশন নিয়ে আলাদা ডিগ্রি আছে। স্বাধীনচেতা। নিজের সেক্স লাইফ নিয়ে রাখঢাক করেন না। একাধিক সম্পর্কে ছিলেন। বর্তমানে পূষণের সঙ্গে আছেন এবং স্টেডি বয়ফ্রেন্ড হিসাবে তাকে প্রেজেন্ট করেছেন ঘনিষ্ঠ মহলে। অত্যুৎসাহী। কিন্তু এই অতি উৎসাহ থেকেই মাঝেমাঝেই ঝামেলা ডেকে আনেন। লালবাজারের প্রভাবশালী মামার পরিচয় সচরাচর দিতে চান না। কয়েকটি চাকরি ছেড়েছেন। তবে বর্তমান কর্মক্ষেত্র নিয়েও খুব সুখে নেই। ব্যাঙ্ক-ব্যাল্যান্স আহামরি ঙ্কিছু নয়। যত্রতত্র খরচ করেন। হিসেব করে চলা এঁর স্বভাবে নেই। পিশাচ পাহাড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন সশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন এবং ফিডব্যাক দেখে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

শারদীয়া স্পেশাল : সুদূর অতীতে উঃপূর্বাঞ্চলে দুর্গাপুজো

শাক্য ভাবল, রিমিতার ব্যাপারে ইরাবতী কি কিছু রেখেঢেকে বলেছেন। রিমিতা নিজে তাঁর প্রভাবশালী মামা সম্পর্কে সচেতন না হলেও ইরাবতী তো সচেতন। সেই প্রভাব কি তিনি এড়িয়ে থাকতে পেরেছেন? তবে এখনও যতদূর যা জানা গেছে, তাতে মনে করাই যায়, রিমিতা একেবারেই বাইরের লোক। আকস্মিকভাবে এসে পড়েছে পিশাচ পাহাড় রিসর্টে। তার সাক্ষ্য অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রায় চোখের সামনে কালাদেওকে অ্যাতাক্‌ করতে দেখেছে সে। যদিও মাহাতোর কথা মাথায় আছে শাক্যর। যারা কালাদেওর বলি হয়েছে, তাদের সকলেই কোন-না-কোন ভাবে অবৈধ কাজকারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। রিমিতা একটু উদ্ধত প্রকৃতির, সেইসঙ্গেই হঠকারী। কিন্তু পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের মেয়ে একটু হঠকারী তো হবেই। একটা দীর্ঘিনঃশ্বাস পড়ল শাক্যর। বিশ্ববিদ্যালয় লাইফের কথা মনে পড়ে গেল। সকলেই কি হঠকারী হতে পারে। যদি পারত, তাহলে হয়তো শাক্যর জীবনটা আজ অন্য খাতে বইতো!

পূষণের বয়স ২৮ বছর। উত্তর কলকাতা শ্যামবাজারে বাড়ি। আগে বড় ম্যানসন ছিল বাপ-দাদাদের। হালে প্রোমোটারকে দিয়ে নতুন প্রজন্ম আলাদা-আলাদা ফ্ল্যাট বানিয়ে নিয়েছে। সেখানেই বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেন। কাজপাগল। নির্বিরোধী। পারায় সুনাম আছে। ক্লাবের নানা কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে থাকেন। বর্তমান কর্মক্ষেত্রে সুখী নয়। চাকরি বদলানোর চেষ্টা করছেন। প্রি-ম্যারেজ হানিমুনের পরিকল্পনা তাঁর। রিমিতারও সায় ছিল। সেক্স নিয়ে কোন ট্যাব্যু নেই। আগে দুজন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন। সেগুলি ব্রেক-আপ হয়ে যাওয়ার পরে রিমিতার সঙ্গে স্টেডি সম্পর্কে আসেন। পিশাচ পাহাড়কে প্রি-হনিমুনের স্পট হিসাবে খুঁজে পান সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে রিভিউ দেখে। ব্যাঙ্কব্যালেন্স মোটামুটি। বুঝেশুনে খরচ করেন, কিন্তু কিপটে নন। বাবা রিট্যায়ার্ড প্রফেসর। পেনসন আছে। ফলে সংসারে তেমন খরচ করতে হয় না। বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক। বউ হিসাবে রিমিতাকে মেনে নিয়েছেন বলে পূষণ চিন্তামুক্ত। বাবা-মা সেকেলে হলেও ছেলের প্রি-হানিমুনের পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়ান নি। ক্লিনচিট দেওয়াই যায়। এখানেই ইরাবতী থেমেছেন।

পূষণকে শাক্যর দরকার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসাবে। কারণ, পিশাচ পাহাড়ে আসবার দিন যারা-যারা স্বচক্ষে কালাদেওকে দেখেছিল, তাদের মধ্যে পূষণ অন্যতম। তাছাড়া হঠকারী বলেই রিমিতার প্রস্তাবে রাজি হয়ে সে লোকাল কাগজের অফিসে গিয়ে কিছু জরুরি তথ্য সংগ্রহ করেছিল, তা পরে তারা দু’জনেই পুলিশকে দিয়েছে। শাক্যর দৃঢ় বিশ্বাস, লোকাল নিউজ পেপারে ছদ্মনামে কালাদেওর ইতিহাস প্রকাশ করে কেউ জনগণের মনে কালাদেও-মিথটিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল, যাতে জনগণ একের পর এক ঘটে যাওয়া মৃত্যুগুলিকে কালাদেওর বলি বলেই ভাবে। অন্য কোন কন্সপিরেসি আছে, তা ভাবতেই না পারে। এই চাল কি আনাতোলের নাকি অন্য কারুর? আনাতোলের চাল থাকা বিচিত্র কিছু নয়। কিন্তু তাঁর মাথায় বুদ্ধিটা কে দিল? লোকাল মানুষের সেন্টমেন্টকে হঠাৎ এসে তো বোঝা সম্ভব নয়! তাহলে? —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content