
ছবি : সংগৃহীত।
উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে সুদূর অতীত কাল থেকেই দুর্গাপুজো চলে আসছে। কোচবিহার, আসাম, ত্রিপুরা, কাছাড়, জয়ন্তিয়া-বাংলার এইসব প্রান্তীয় রাজ্যে দুর্গাপুজোর ইতিহাস অনেক পুরনো। একদা রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় এইসব রাজ্যে খুব ধূমধামের সঙ্গে দুর্গাপুজো হতো। এমনকি পুজোয় নরবলিরও প্রচলন ছিল।
আসামে শত শত বছর আগে থেকেই দুর্গা পূজা চলে আসছে। আসামের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ষোড়শ শতকে মূলত কোচদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রেই আসামে দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়। দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী প্রতিমা গড়ার প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আহোম রাজা তাঁর রাজ্যের শিল্পীদের কোচ রাজ্যে পাঠিয়েছিলেন বলে আসামের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। অষ্টাদশ শতকে আসামে দুর্গাপুজোর বর্ণনা রয়েছে ‘ত্রিপুরা দেশের কথা’য়। আহোম রাজা স্বর্গদেব রুদ্র সিংহ দূত পাঠিয়েছিলেন ত্রিপুরার রাজদরবারে। রত্নকন্দলী শর্মা ও অর্জুন দাস বৈরাগী নামে দুই আহোম দূত ১৭০৯-১৫ খিস্টাব্দের মধ্যে তিনবার ত্রিপুরা রাজ্য সফর করেছিলেন। ত্রিপুরার রাজাও তাতে সাড়া দিয়ে দূত পাঠিয়েছিলেন আহোম রাজদরবারে। আহোম দূতদ্বয় তাদের যে সফর বিবরণী লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন তাতে আসামের রংপুরে ত্রিপুরার দূতদের দুর্গোৎসব দর্শনের কথাও রয়েছে।দুর্গা পূজা উপলক্ষে দেশি-বিদেশি শিল্পীদের সঙ্গীতের আসর বসেছিল। হয়েছিল তর্কযুদ্ধ। আসামের রাজা পণ্ডিত-ব্রাক্ষ্মণদের নানা উপহার দিয়েছিলেন। আহোম রাজার দূতদের সফর বিবরণী নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত ‘ত্রিপুরা দেশের কথা’ গ্রন্থে রংপুরে ত্রিপুরার দূতের দুর্গোৎসব দর্শন সম্পর্কে রয়েছে— “…মহারাজের সামনে দেশি-বিদেশি গুণীরা সব গান গাইছিল। দেশ-বিদেশের অনেক পণ্ডিত ব্রাক্ষ্মণরা মহারাজের দেওয়া পোশাক পরে মহারাজকে আশীর্বাদ করে সভায় বসলেন।..”
সুদূর অতীতে কোচ রাজ্যেও ধূমধামের সঙ্গে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গাপূজা হতো। ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে দোর্দণ্ড প্রতাপ কোচ নৃপতি নরনারায়ণ সিংহাসনে বসেন। দুর্গা পূজার নবমী তিথিতে নরনারায়ণ নরবলি দিতেন বলে জানা যায়। বলির উদ্দেশ্যে নির্বাচিত মানুষটিকে কয়েক মাস আগেই নিয়ে আসা হতো রাজবাড়িতে। তাকে রাজা অবাধ ক্ষমতা দিতেন। বলির পূর্বে কয়েক মাস যে কোনো অপরাধ করলেও তার শাস্তি হতো না।
আসামে শত শত বছর আগে থেকেই দুর্গা পূজা চলে আসছে। আসামের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ষোড়শ শতকে মূলত কোচদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রেই আসামে দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়। দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী প্রতিমা গড়ার প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আহোম রাজা তাঁর রাজ্যের শিল্পীদের কোচ রাজ্যে পাঠিয়েছিলেন বলে আসামের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। অষ্টাদশ শতকে আসামে দুর্গাপুজোর বর্ণনা রয়েছে ‘ত্রিপুরা দেশের কথা’য়। আহোম রাজা স্বর্গদেব রুদ্র সিংহ দূত পাঠিয়েছিলেন ত্রিপুরার রাজদরবারে। রত্নকন্দলী শর্মা ও অর্জুন দাস বৈরাগী নামে দুই আহোম দূত ১৭০৯-১৫ খিস্টাব্দের মধ্যে তিনবার ত্রিপুরা রাজ্য সফর করেছিলেন। ত্রিপুরার রাজাও তাতে সাড়া দিয়ে দূত পাঠিয়েছিলেন আহোম রাজদরবারে। আহোম দূতদ্বয় তাদের যে সফর বিবরণী লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন তাতে আসামের রংপুরে ত্রিপুরার দূতদের দুর্গোৎসব দর্শনের কথাও রয়েছে।দুর্গা পূজা উপলক্ষে দেশি-বিদেশি শিল্পীদের সঙ্গীতের আসর বসেছিল। হয়েছিল তর্কযুদ্ধ। আসামের রাজা পণ্ডিত-ব্রাক্ষ্মণদের নানা উপহার দিয়েছিলেন। আহোম রাজার দূতদের সফর বিবরণী নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত ‘ত্রিপুরা দেশের কথা’ গ্রন্থে রংপুরে ত্রিপুরার দূতের দুর্গোৎসব দর্শন সম্পর্কে রয়েছে— “…মহারাজের সামনে দেশি-বিদেশি গুণীরা সব গান গাইছিল। দেশ-বিদেশের অনেক পণ্ডিত ব্রাক্ষ্মণরা মহারাজের দেওয়া পোশাক পরে মহারাজকে আশীর্বাদ করে সভায় বসলেন।..”
সুদূর অতীতে কোচ রাজ্যেও ধূমধামের সঙ্গে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গাপূজা হতো। ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে দোর্দণ্ড প্রতাপ কোচ নৃপতি নরনারায়ণ সিংহাসনে বসেন। দুর্গা পূজার নবমী তিথিতে নরনারায়ণ নরবলি দিতেন বলে জানা যায়। বলির উদ্দেশ্যে নির্বাচিত মানুষটিকে কয়েক মাস আগেই নিয়ে আসা হতো রাজবাড়িতে। তাকে রাজা অবাধ ক্ষমতা দিতেন। বলির পূর্বে কয়েক মাস যে কোনো অপরাধ করলেও তার শাস্তি হতো না।
ত্রিপুরায় পঞ্চদশ শতকে,মাণিক্য রাজবংশের সূচনা লগ্ন থেকেই দেবী দুর্গার রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ পাওয়া যায়।পঞ্চদশ শতকে ত্রিপুরার রাজা ছিলেন রত্ন মাণিক্য। তাঁর রাজত্বকাল ১৪৬৪-৮৮ খ্রিস্টাব্দ। এ যাবৎ আবিষ্কৃত মুদ্রা অনুসারে বলা যায় ত্রিপুরার রাজা রত্ন মাণিক্যই প্রথম মুদ্রা প্রস্তুত ও প্রচার করেছিলেন। সেই মুদ্রাতে শ্রীদুর্গার উল্লেখ ছিল। কোনও মুদ্রায় সিংহের নিচে ‘শ্রী দুর্গা’ লেখা, আবার কোনওটিতে ‘শ্রীদুর্গারাধনাপ্ত বিজয়ঃরত্নপুর শক১৩৮৬’ উল্লেখ পাওয়া যায়। পঞ্চদশ শতকের মুদ্রার সাক্ষ্য থেকে সঙ্গত ভাবেই ধারণা করা যায় যে, তদানীন্তন সময়ে দেবী দুর্গা ত্রিপুরার রাজাদের আরাধ্য দেবী ছিলেন এবং দুর্গার আরাধনা রাজার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল। ষোড়শ শতকে ত্রিপুরার এক দোর্দন্ড প্রতাপ রাজা ছিলেন বিজয় মাণিক্য(১৫৩২-৬৩ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক। কিন্তু তাঁর রাজত্বকালে শিব, শাক্ত ও বৈষ্ণব সব ধর্মই রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল। ‘রাজমালা’ সূত্রে জানা যায়, রাজা হর (শিব) এবং গৌরীর (দুর্গা) আরাধনা করতেন। ১৪৮২ শকাব্দের বিজয় মাণিক্যের মুদ্রায় শিব ও দুর্গার অর্দ্ধ নারীশ্বরের চিত্র বিস্ময়ের উদ্রেক করে। মুদ্রা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এই মুদ্রা চিত্রকে সিংহবাহিনী, কেউ মহিষাসুর মর্দ্দিনী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আরও পড়ুন:

শারদীয়ার গল্প/১ : ষষ্ঠীর সন্ধ্যা

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৮: ঘরচিতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৯: ইরাবতীর ডায়েরি থেকে
ত্রিপুরার মধ্যযুগের বীর নৃপতি বিজয় মাণিক্যের যুদ্ধ বিজয়ের স্মারক মুদ্রায় শিব দুর্গার ছবি যেন আমাদের সে সময়ে দুর্গার আরাধনার রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। ষোড়শ শতকে ত্রিপুরার অপর এক বীর নৃপতি হলেন অমর মাণিক্য। তাঁর রাজত্বকালে যে রাজপরিবারের উদ্যোগে সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব পালন করা হতো তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে ‘রাজমালা’র পৃষ্ঠায়। অমর মাণিক্য তাঁর রাজত্বকালের প্রায় পুরোটাই যুদ্ধ বিগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন। প্রথম দিকে তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে বিজয়ী হলেও শেষপর্যন্ত আরাকানের সঙ্গে যুদ্ধে তাঁর শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল। যাইহোক, আরাকানের মগদের সঙ্গে যুদ্ধ বিরতির সময়ে চট্টগ্রাম যুদ্ধ শিবিরে অবস্থানরত সেনাপতি পুত্র রাজধরকে রাজা লিখেছিলেন-দুর্গোৎসব এসে গিয়েছে। পুত্র যেন রাজধানীতে ফিরে আসেন। সপ্তদশ শতকে ত্রিপুরার রাজা ছিলেন কল্যাণ মাণিক্য। ১৬২৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ত্রিপুরার সিংহাসনে বসেছিলেন। তিনি মূলত শৈব ছিলেন। তবু অন্যান্য ধর্মীয় ভাবধারা তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল। তিনি বিষ্ণু,দুর্গা এবং কালী মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। কল্যাণ মাণিক্যের আমলে দুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠা থেকে স্পষ্টতই ধারণা হয় যে, তখনও দুর্গা পূজার রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। শৈব রাজা দেবী দুর্গার আরাধনার ব্যবস্থা করেছিলেন। ‘রাজমালা’য় রয়েছে—
” দোল মঞ্চ নির্ম্মাইল তার পূর্ব্ব দিকে
দুর্গা গৃহ নির্ম্মাইল সন্নিকটে ভাগে।।”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৭২ : ঘটজাতক/৭ : ধরি ধরি মনে করি
কল্যাণ মাণিক্য ত্রিপুরার প্রাচীন দুর্গ কৈলারগড়ে কৃষ্ণবর্ণ প্রস্তর নির্মিত সিংহবাহিনী মহিষাসুর মর্দ্দিনীর দশভূজা মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কথিত আছে রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়ে শ্রীহট্টের ধর্ম্মসর গ্রাম থেকে এই বিগ্রহ এনেছিলেন। ত্রিপুরার অতীত ইতিহাস এবং প্রত্ন সম্পদে দেবী দুর্গার আরাধনার নানা প্রমাণ ছড়িয়ে আছে। রাজা তাঁর স্মারক মুদ্রায় কখনও উল্লেখ করেছেন দেবীর নাম, কখনও দিয়েছেন দেবীর চিত্র।ত্রিপুরার রাজবংশের কুলদেবতা চতুর্দ্দশ দেবতার মধ্যেও উমা অর্থাৎ দুর্গা রয়েছেন। ত্রিপুরার ঊনকোটি পাহাড়ের গায়ে খোদিত আছেন সিংহবাহিনী দেবী দুর্গা।দেবতামুড়ার পাহাড়ের গায়ে খোদিত আছেন মহিষাসুর মর্দ্দিনী। রাজ্যের নানা প্রান্তের প্রত্ন সম্পদও এই ধারণা দৃঢ় করে যে, অতি প্রাচীন কাল থেকেই ত্রিপুরায় দেবী দুর্গা পূজিতা হয়ে আসছেন। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে ত্রিপুরা সফরে আসা আহোম রাজদূতদের বর্ণনাতেও রাজধানী উদয়পুরে দশভূজা দুর্গা বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। দূতদ্বয় লিখেছেন—”…সেই মন্দিরের উত্তরে পাথরের মন্দির আছে, ১৮ হাত মতো উঁচু। সেখানে বৃষভ বাহন শিবের মূর্তি আছে। আর আছে পাথরের এক কুঁজিঘর। সেখানে পাথরে তৈরি দশভূজা দুর্গামূর্তি আছে।…”ত্রিপুরার অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের রাজাদের সময়েও সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব হয়েছে। আজও রাজধানী আগরতলার দুর্গাবাড়ি যেন মাণিক্য রাজবংশের দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য বহন করছে। এখানে পুজোয় দেবী দুর্গার দুটি হাত দৃশ্যমান। বাকি আট হাত থাকে বিগ্রহের পিছনের দিকে। কেন এরকম হল তা নিয়েও রয়েছে জনশ্রুতি। সিংহাসনে তখন কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য (১৮২৯-৪৯ খ্রিঃ)। রাজধানী বর্তমান পুরান আগরতলায় মহা ধূমধামের সঙ্গে রাজবাড়িতে দুর্গাপুজো হচ্ছে। রানি সুদক্ষিণা দেবী সন্ধ্যারতির সময় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিতা দেবীর দশভূজা মূর্তি দেখে হঠাৎ ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। পরের বছর প্রতিমা গড়ার সময় উঠল সেই প্রসঙ্গ। রানি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন দেবীর দশ হাত দেখে। কিন্তু দুর্গাতো দশভূজাই হবেন। পণ্ডিতগণ তখন বিধান দিলেন যে, রাজবাড়ির পুজোয় দেবী দুর্গার দুই হাত দৃশ্যমান হবে। অবশ্য সামনে দুটি হাত থাকলেও পিছনে বাকি আট হাত দিয়ে প্রতিমা গড়া হবে। তারপর থেকেই নাকি চলে আসছে এই নিয়ম।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

উপন্যাস, পর্ব-৯২ : আকাশ এখন
এবার আসা যাক ডিমাছা রাজ্য কাছাড়ের কথায়।প্রাচীন কাছাড়েও রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। পূজা উপলক্ষ্যে মহাষ্টমী তিথিতে নরবলি হতো। রাজা তখন সুরদর্প নারায়ণ(১৭০৮-২০খ্রিঃ)। একবার পূজার আগে বলি সংগ্রহ করতে না পেরে রাজার অনুচরেরা একজন অচেনা ব্রাহ্মণকে ধরে নিয়ে আসে। তারা ব্রাহ্মণের উপবীত ছিড়ে ফেলে দেয় এবং বলি হিসেবে রাজবাড়ির চণ্ডী মণ্ডপের পাশে একটি ঘরে তাকে বেঁধে রাখে। রাজা সুরদর্প প্রতিদিন পাত্র মিত্র সহ মেল মণ্ডপ ঘরে বসে ভাগবত পুরাণ পাঠ শুনতেন। একদিন এরকম ভাগবত পাঠ হচ্ছিল। রাজা তা শুনছিলেন। কিন্তু পাঠে উচ্চারণ অশুদ্ধ হলে বন্দি ব্রাহ্মণ হা-হা শব্দ এবং শুদ্ধ হলে হু হু শব্দ করছিলেন। এক সময় রাজার কর্ণগোচর হয় তা। রাজাকে জানানো হয় বলির বন্দির কথা। রাজার নির্দেশে সামনে আনা হয় বন্দিকে। বন্দি রাজাকে ইঙ্গিতে বোঝান যে,তাঁর উপবীত ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তিনি তাই কথা বলতে পারবেন না। সঙ্গে সঙ্গে রাজার আদেশে বন্দি ব্রাহ্মণকে মুক্ত করা হয় এবং তাঁকে উপবীত ফিরিয়ে দেয়া হয়। ব্রাহ্মণ তখন রাজাকে যথাবিহিত সম্মান নিবেদন পূর্বক একটি শ্লোক উচ্চারণ করেন। রাজা এই ব্রাহ্মণের পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সভাকবি নিযুক্ত করেন। এই ব্রাহ্মণই হলেন ভুবনেশ্বর বাচস্পতি, ডিমাছা রাজসভার শ্রেষ্ঠ কবি। রাজমাতা চন্দ্রপ্রভা দেবীর আদেশে তিনি বাংলাতে অনুবাদ করেছিলেন বৃহন্নারদীয় পুরাণ। ডিমাছা রাজসভার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কীর্তি হিসেবে তা চিহ্নিত হয়ে আছে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহালয়া
বিস্তীর্ণ সমতল এলাকা আর পাহাড় মিলিয়ে জয়ন্তিয়া নামে একদা এক স্বাধীন রাজ্য ছিল। বর্তমানে অবশ্য মানচিত্র থেকে অপসৃত এই রাজ্যটি। সেই প্রাচীন রাজ্যটির পার্বত্য এলাকা, জয়ন্তিয়া পাহাড় নামে যা পরিচিত, বর্তমানে ভারতের মেঘালয়ের অন্তর্ভুক্ত। আর বিস্তীর্ণ সমতল অঞ্চল রয়েছে বর্তমান বাংলাদেশে। অতীতের জয়ন্তিয়া রাজ্যে জয়ন্তেশ্বরীর মন্দিরে দুর্গাপূজার নবমীতে নরবলি হতো। কৌতুহলোদ্দীপক ঘটনা হলো,সেখানে স্বেচ্ছায় বলি এসে হাজির হতো। শ্রাবণের শেষ দিনে বলির নর স্বেচ্ছায় রাজার কাছে এসে বলতো,দেবতার কাছে উৎসর্গ হতে সে এসেছে। রাজা যদি এই বলিকে উপযুক্ত ও নিঁখুত মনে করতেনতবে স্বর্ণ নূপুর উপহার দিয়ে তাকে গ্ৰহণ করতেন। তবে স্বেচ্ছায় বলি হাজির না হলে যে নরবলি বন্ধ থাকতো এমনটা নয়। তখন রাজার চর গণ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গোপনে মানুষ ধরে নিয়ে এসে বলি দিত। এই বলি সংগ্রহের অভিযোগে ইংরেজরা রাজ্যচ্যুত করেছিল জয়ন্তিয়ার রাজা রাজেন্দ্র সিংহকে। সেই সূত্রে ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ অধিকারভুক্ত হয় জয়ন্তিয়া রাজ্য।
এই ভাবে সুদূর অতীতে বাংলার প্রান্তীয় রাজ্যগুলোতে দুর্গাপূজা নিয়ে নানা তথ্য ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক থেকেই এই অঞ্চলে দেবী দুর্গার রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার তথ্য পাওয়া যায়। কালক্রমে প্রজা সাধারণের মধ্যেও দুর্গাপুজোর প্রচলন হতে থাকে।রাজবাড়ির আঙিনা ছাড়িয়ে দেবী নেমে আসেন সাধারণ মানুষের মাঝে।—শেষ।
এই ভাবে সুদূর অতীতে বাংলার প্রান্তীয় রাজ্যগুলোতে দুর্গাপূজা নিয়ে নানা তথ্য ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক থেকেই এই অঞ্চলে দেবী দুর্গার রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার তথ্য পাওয়া যায়। কালক্রমে প্রজা সাধারণের মধ্যেও দুর্গাপুজোর প্রচলন হতে থাকে।রাজবাড়ির আঙিনা ছাড়িয়ে দেবী নেমে আসেন সাধারণ মানুষের মাঝে।—শেষ।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















