
একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। শরৎকালের বৃষ্টি, এই রোদ, এই মেঘ, মাঝে মাঝে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। দূরের কোনো মণ্ডপ থেকে ভেসে আসছে গান— “তোলো ছিন্ন বীণা বাঁধো নতুন তারে”…
শরতের সোনার আলোয় মাখা সামনের রাস্তাটা বেঁকে গিয়েছে পুজো প্যাণ্ডেলের দিকে। ঢাকের বাদ্যি ভেসে আসছে। আজ দশমী। বিজয়া দশমী। পাশের প্যাণ্ডেলের ঢাকের বোলের তালে তালে যেন বুকের ভিতরের একটা লুকোনো ক্ষত খুঁড়ে খুঁড়ে কী যেন উঠে আসতে চায়। কী থাকে এই বাজনাটায়? প্রথম আর মাঝের দিনগুলোতে এমনটা হয় না। শেষদিনেই দ্রিম দ্রিম টিক টিক করে করে বেজে ওঠা ঢাকের তাল যেন অন্য জগতের। দিনের বেলা ছড়িয়ে পড়া সব আলোর সুতো যেন হাতের টানে টানে তুলে নিয়ে দিনান্তে ফিরে যাচ্ছেন সূর্যদেব।
শরতের সোনার আলোয় মাখা সামনের রাস্তাটা বেঁকে গিয়েছে পুজো প্যাণ্ডেলের দিকে। ঢাকের বাদ্যি ভেসে আসছে। আজ দশমী। বিজয়া দশমী। পাশের প্যাণ্ডেলের ঢাকের বোলের তালে তালে যেন বুকের ভিতরের একটা লুকোনো ক্ষত খুঁড়ে খুঁড়ে কী যেন উঠে আসতে চায়। কী থাকে এই বাজনাটায়? প্রথম আর মাঝের দিনগুলোতে এমনটা হয় না। শেষদিনেই দ্রিম দ্রিম টিক টিক করে করে বেজে ওঠা ঢাকের তাল যেন অন্য জগতের। দিনের বেলা ছড়িয়ে পড়া সব আলোর সুতো যেন হাতের টানে টানে তুলে নিয়ে দিনান্তে ফিরে যাচ্ছেন সূর্যদেব।
এখন সকাল দশটা। বরণ শুরু হবে বেলা বারোটা থেকে। সেই ঘোষণাই চলছে মাঝে মাঝে। তার ফাঁকে ফাঁকেই বেজে উঠছে বিষণ্ণ ঢাকটা। তাঁর ফিরে যাওয়ার পালা যে। রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টে বাঁধা মাইকের চোঙা থেকে গান ভেসে আসছে একটা। সেদিকে কান পাতে বর্ষা। “ভুবন বলে ‘তোমার তরে আছে বরণমালা’/ গগন বলে ‘তোমার তরে লক্ষ প্রদীপ জ্বালা’// প্রেম বলে যে ‘যুগে যুগে তোমার লাগি আছি জেগে’/ মরণ বলে ‘আমি তোমার জীবনতরী বাই’।।”
এখন আকাশে ভেসে যাচ্ছে ছেঁড়া তুলোর মতো মেঘের সারি। কে বলবে খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে খুব জোরে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল বর্ষা। অনেকবার এমন আকাশ আঁকতে চেয়েছে। হয়নি। গাঢ় নীল, ওপরে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের মিছিল। ব্রাশের টানে, ওয়াশের কাজে কতবার চেষ্টা করেছে আকাশটাকে খাতায় নামিয়ে আনতে। না, হয়নি। সে সব যেন গতজন্মের কথা বলে মনে হয়।
আগের গানটা শেষ হয়ে নতুন একটা গান ভেসে আসে।
“গোপনের প্রেম গোপনে গিয়েছে ঝরে আমরা দুজনে কখন গিয়েছি সরে/…তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয় আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়।।”
এখন আকাশে ভেসে যাচ্ছে ছেঁড়া তুলোর মতো মেঘের সারি। কে বলবে খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে খুব জোরে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল বর্ষা। অনেকবার এমন আকাশ আঁকতে চেয়েছে। হয়নি। গাঢ় নীল, ওপরে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের মিছিল। ব্রাশের টানে, ওয়াশের কাজে কতবার চেষ্টা করেছে আকাশটাকে খাতায় নামিয়ে আনতে। না, হয়নি। সে সব যেন গতজন্মের কথা বলে মনে হয়।
আগের গানটা শেষ হয়ে নতুন একটা গান ভেসে আসে।
“গোপনের প্রেম গোপনে গিয়েছে ঝরে আমরা দুজনে কখন গিয়েছি সরে/…তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয় আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়।।”
আরও পড়ুন:

শারদীয়ার গল্প/১ : ষষ্ঠীর সন্ধ্যা

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৮: ঘরচিতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৯: ইরাবতীর ডায়েরি থেকে
পাড়ার প্যাণ্ডেলটা দেখা যাচ্ছে। নীল আকাশের বুকে নানা রঙের আলোড়ন তোলা তার মাথাটা দেখা যাচ্ছে গাছের সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে। হাতের মোবাইলটায় একটা ছবি তুলে নেয় বর্ষা। তারপর পাঠিয়ে দেয় সৌপ্তিককে।
তার শ্রীনন্দিনী নামটার থেকেও বর্ষা নামেই বেশি চেনে তাকে সকলে। ভরা বসন্তে জন্ম তার। কিন্তু কীভাবে বর্ষা নামটা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল দিনে দিনে এ এক বিস্ময় বটে! বাবা বলেন, “তুই বৃষ্টি পড়লেই ময়ূরের মতো নাচতিস, তাই হয়তো কেউ প্রথম ডেকেছিল ওই নামে।”
তারপর কতো বর্ষা গেল, কতো বসন্ত… শ্রীনন্দিনী দত্ত পঁচিশে পা দিয়েছে। নাচটা সে নাকি ভালোই পারে। কয়েক বছর আগে কলেজ ফেস্টে তার “লীলাবালি” নাচটার পরে যে ছেলেটা কোথা থেকে এসে প্রশংসা করে গিয়েছিল, একটু বেশি বেশিই হয়তো, তাকে তার আগে ক’বার দেখেছিল? দু’বার? না তিনবার বোধহয়। লিফ্টে, সিঁড়িতে। আলাপ হতে, সেটা জমে উঠতে পাক্কা দু’বছর লেগেছিল। একটু বেশিই মনে হয় আজকের দিনের তুলনায়।
সৌপ্তিক বসুকে বেশ মনে ধরে বর্ষার। ভরা বসন্তরাতে জন্ম যার, প্রেম তার জন্য ডালি ভরে অপেক্ষা করছিল। ভিক্টোরিয়া, লেক, নন্দন কিংবা শহরের অলিগলিতে অনেক বর্ষা, বসন্ত পার হয়েছিল পায়ে পায়ে। তখন মনে হত এই পথ চলাতেই আনন্দ, জীবনের সফেন সমুদ্রের পাশে পাশে এই পথ চলা যদি শেষ না হয় তবে কেমন হবে? শরৎ, গ্রীষ্ম আর হেমন্ত পার করে আরেকটা বর্ষা এসে পড়েছিল সেবার। সৌপ্তিক নতুন চাকরিতে যোগ দিতে চলে গেল অন্য শহরে। এই শহরের বুকে নামা ঘোর বর্ষায় ঘোরতর সবুজ হয়ে ওঠা দিন-রাতগুলো ছবি হয়ে হোয়াটস্যাপে ভিড় করে। একটা টিক ক্রমে দুটো টিক হয়। তারপর নীল হয়।
তার শ্রীনন্দিনী নামটার থেকেও বর্ষা নামেই বেশি চেনে তাকে সকলে। ভরা বসন্তে জন্ম তার। কিন্তু কীভাবে বর্ষা নামটা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল দিনে দিনে এ এক বিস্ময় বটে! বাবা বলেন, “তুই বৃষ্টি পড়লেই ময়ূরের মতো নাচতিস, তাই হয়তো কেউ প্রথম ডেকেছিল ওই নামে।”
তারপর কতো বর্ষা গেল, কতো বসন্ত… শ্রীনন্দিনী দত্ত পঁচিশে পা দিয়েছে। নাচটা সে নাকি ভালোই পারে। কয়েক বছর আগে কলেজ ফেস্টে তার “লীলাবালি” নাচটার পরে যে ছেলেটা কোথা থেকে এসে প্রশংসা করে গিয়েছিল, একটু বেশি বেশিই হয়তো, তাকে তার আগে ক’বার দেখেছিল? দু’বার? না তিনবার বোধহয়। লিফ্টে, সিঁড়িতে। আলাপ হতে, সেটা জমে উঠতে পাক্কা দু’বছর লেগেছিল। একটু বেশিই মনে হয় আজকের দিনের তুলনায়।
সৌপ্তিক বসুকে বেশ মনে ধরে বর্ষার। ভরা বসন্তরাতে জন্ম যার, প্রেম তার জন্য ডালি ভরে অপেক্ষা করছিল। ভিক্টোরিয়া, লেক, নন্দন কিংবা শহরের অলিগলিতে অনেক বর্ষা, বসন্ত পার হয়েছিল পায়ে পায়ে। তখন মনে হত এই পথ চলাতেই আনন্দ, জীবনের সফেন সমুদ্রের পাশে পাশে এই পথ চলা যদি শেষ না হয় তবে কেমন হবে? শরৎ, গ্রীষ্ম আর হেমন্ত পার করে আরেকটা বর্ষা এসে পড়েছিল সেবার। সৌপ্তিক নতুন চাকরিতে যোগ দিতে চলে গেল অন্য শহরে। এই শহরের বুকে নামা ঘোর বর্ষায় ঘোরতর সবুজ হয়ে ওঠা দিন-রাতগুলো ছবি হয়ে হোয়াটস্যাপে ভিড় করে। একটা টিক ক্রমে দুটো টিক হয়। তারপর নীল হয়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত
বর্ষা অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে হোয়াটস্যাপে পাঠানো ছবিটার দিকে। নীল আকাশের বুকে রঙিন চূড়া নিয়ে প্যাণ্ডেলের মাথাটা নিষ্পলক যেন তাকিয়ে আছে চারপাশের থেমে থাকা অবিন্যস্ত সবুজ পাতার ফ্রেমটার দিকে। একটা টিক। কখন দুটো নীল টিক দেখা যাবে? বর্ষা মনে মনে অশান্ত হয়ে ওঠে।
এরকম চলছে গত ছ’মাস। নাকি আট মাস?
নাকি আরও বেশি?
মাইকের আওয়াজ শোনা যায়। ঢাকের সেই বোলটা বাজছে আবার। “আমাদের প্রতিমাবরণ শুরু হয়ে গেছে। সকলকে অনুরোধ, যাঁরা এখনো বরণ করতে আসেননি, তাড়াতাড়ি মণ্ডপে চলে আসুন। ঠিক সন্ধ্যে ছ’টায় বিসর্জনের শোভাযাত্রা শুরু হবে।” ঘোষকের গম্ভীর উদাস গলা ভেসে আসে।
ঘরের দরজা ঠেলে উঁকি দেয় সমর্পিতা। পিছনে মা, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে। তার চোখদুটো কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয় বোনের দিকে। চেয়ারে স্থির বসে জানলার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে বর্ষা। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখা মোবাইল ফোনটা। বড় বড় ভাবলেশহীন চোখদুটোর কোণে কীসের ছায়া, সেই ছায়া এখন এই পড়ন্তবেলায় দীর্ঘ হয়ে ঠোঁটের পাশে যেন ক্ষীণ তরঙ্গ তুলছে। চোখদুটো ছলছল করে ওঠে সমর্পিতার।
এরকম চলছে গত ছ’মাস। নাকি আট মাস?
নাকি আরও বেশি?
মাইকের আওয়াজ শোনা যায়। ঢাকের সেই বোলটা বাজছে আবার। “আমাদের প্রতিমাবরণ শুরু হয়ে গেছে। সকলকে অনুরোধ, যাঁরা এখনো বরণ করতে আসেননি, তাড়াতাড়ি মণ্ডপে চলে আসুন। ঠিক সন্ধ্যে ছ’টায় বিসর্জনের শোভাযাত্রা শুরু হবে।” ঘোষকের গম্ভীর উদাস গলা ভেসে আসে।
ঘরের দরজা ঠেলে উঁকি দেয় সমর্পিতা। পিছনে মা, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে। তার চোখদুটো কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয় বোনের দিকে। চেয়ারে স্থির বসে জানলার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে বর্ষা। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখা মোবাইল ফোনটা। বড় বড় ভাবলেশহীন চোখদুটোর কোণে কীসের ছায়া, সেই ছায়া এখন এই পড়ন্তবেলায় দীর্ঘ হয়ে ঠোঁটের পাশে যেন ক্ষীণ তরঙ্গ তুলছে। চোখদুটো ছলছল করে ওঠে সমর্পিতার।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

উপন্যাস, পর্ব-৯২ : আকাশ এখনও মেঘলা
বর্ষা আর তিন্নি। বর্ষা তার থেকে বছর চারেকের ছোট। এই সময়টায় মা-বাবা বোনের পাশে তার থাকাটা খুব দরকার ছিল। কিন্তু জগৎ নিজের নিয়মে চলে। শেষ বিকালের বেদনা-মাখা আকাশের ফিকে রঙগুলো নীলকণ্ঠের ডানায় ভর করে কৈলাশের দিকে চলে গেছে। কলকাতার জ্যামের রাস্তায় এখনই না নামলে ফ্লাইট ধরা অসম্ভব হয়ে যাবে। ট্রলির হ্যাণ্ডেলটা চেপে ধরে সমর্পিতা। সেই ঢাকের বোলটা পাগলাঘণ্টির মতো বাজছে এখন। বুকের অনেক গভীরে নেমে কীসের সন্ধান করছে তন্নতন্ন করে কে জানে!
“আর কয়েকটা দিন থাকলে হতো না রে তিন্নি? আজকের দিনটা অন্তত।”
“উপায় নেই মা। ছুটি পাব না। কাল-ই জয়েন করতে হবে। সব-ই তো বোঝো। তোমরা চিন্তা কোরো না। নিজের খেয়াল রাখো। এখন তোমাকে ঠিক থাকতেই হবে। বর্ষাকে আর ডিস্টার্ব করলাম না। সময় লাগবে। একটা শক পেয়েছে। দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“সারাটা দিন-ই প্রায় ওই ঘরে আটকে রাখে নিজেকে। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে কিংবা আঁকার খাতায় আঁকিবুকি। ইচ্ছে করে তোর বাবাকে বলে একদিন ওই কী যেন বলে, হ্যাঁ, আনইনস্টল… হোয়াটস্যাপ আনইনস্টল করিয়ে দি।”
“খবরদার না। ওসব করতে যেও না খবরদার। ও যা বিশ্বাস করে তা-ই নিয়ে থাকুক। সেখানে হাত দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে।”
প্যাণ্ডেলের সামনে এখন একটা বড় হ্যালোজেন আলো জ্বলছে খালি। রাস্তার মোড়গুলোতে চাপ চাপ অন্ধকার। বাপিদা লরির গায়ে আলো ফিট করছে। জেনারেটরের ভ্যানটা স্থির হয়ে আছে। মণ্ডপ এখন প্রায় খালি। কোণার দিকে রাখা ঢাকদুটোর পাশে একটা হাইস্পিড ফ্যান সশব্দে ঘুরে চলেছে। মায়ের মুখটা কি একটু বেশি চকচক করছে? নাকি চোখদুটো? অসুরের সন্দেশমাখা মুখে নিষ্পলক স্থির চোখদুটোর পাশে অন্ধকার জমছে। আর একটু পরেই ঠাকুর তোলা হবে লরিতে। আরো কয়েকটা লরি চলে এসেছে। একদম সামনেরটায় ক্লাবের ব্যানার বাঁধছে টুকাই। এমন সময় রাস্তার কোণা থেকে সুর ভেসে ওঠে ব্যাঞ্জোয় “আয় গো তোরা দেখবি যদি।”
“আর কয়েকটা দিন থাকলে হতো না রে তিন্নি? আজকের দিনটা অন্তত।”
“উপায় নেই মা। ছুটি পাব না। কাল-ই জয়েন করতে হবে। সব-ই তো বোঝো। তোমরা চিন্তা কোরো না। নিজের খেয়াল রাখো। এখন তোমাকে ঠিক থাকতেই হবে। বর্ষাকে আর ডিস্টার্ব করলাম না। সময় লাগবে। একটা শক পেয়েছে। দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“সারাটা দিন-ই প্রায় ওই ঘরে আটকে রাখে নিজেকে। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে কিংবা আঁকার খাতায় আঁকিবুকি। ইচ্ছে করে তোর বাবাকে বলে একদিন ওই কী যেন বলে, হ্যাঁ, আনইনস্টল… হোয়াটস্যাপ আনইনস্টল করিয়ে দি।”
“খবরদার না। ওসব করতে যেও না খবরদার। ও যা বিশ্বাস করে তা-ই নিয়ে থাকুক। সেখানে হাত দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে।”
প্যাণ্ডেলের সামনে এখন একটা বড় হ্যালোজেন আলো জ্বলছে খালি। রাস্তার মোড়গুলোতে চাপ চাপ অন্ধকার। বাপিদা লরির গায়ে আলো ফিট করছে। জেনারেটরের ভ্যানটা স্থির হয়ে আছে। মণ্ডপ এখন প্রায় খালি। কোণার দিকে রাখা ঢাকদুটোর পাশে একটা হাইস্পিড ফ্যান সশব্দে ঘুরে চলেছে। মায়ের মুখটা কি একটু বেশি চকচক করছে? নাকি চোখদুটো? অসুরের সন্দেশমাখা মুখে নিষ্পলক স্থির চোখদুটোর পাশে অন্ধকার জমছে। আর একটু পরেই ঠাকুর তোলা হবে লরিতে। আরো কয়েকটা লরি চলে এসেছে। একদম সামনেরটায় ক্লাবের ব্যানার বাঁধছে টুকাই। এমন সময় রাস্তার কোণা থেকে সুর ভেসে ওঠে ব্যাঞ্জোয় “আয় গো তোরা দেখবি যদি।”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

শারদীয়া স্পেশাল : সুদূর অতীতে উঃপূর্বাঞ্চলে দুর্গাপুজো
গতবার পুজোর আগে আগে সৌপ্তিক ফিরেছিল কলকাতায়। পুজোর শেষে আবার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল কর্মক্ষেত্রে। সেদিন শরতের অকালবর্ষণের পর ভেজা পথ আলোর রং মেখে এমনই রঙিন। কীভাবে সীমাহীন গতিতে এসে ডিভাইডারে ধাক্কা লেগে উল্টে গেল সৌপ্তিকের বাইকটা তা নিয়েই চ্যানেলে চ্যানেলে হিমশীতল খবর। পুজোর মুখেই শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একঝলক বিষণ্ণ বাতাস বৃষ্টিকে সেদিন কীভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল কে জানে! যমে-মানুষে টানাটানি দশদিনের মাথায় থেমে গেলে কেমন যেন নিস্পৃহ হয়ে গেল সে। সে পাথরে আজও প্রাণ জাগল কই? ফ্রেমে আটকানো ছবিটাও তাকে বোঝাতে পারেনি যে যমে-মানুষের টানাটানিতে মানুষ সবসময় জিততে পারে না। বোঝেনা বলেই হয়তো হোয়াটস্যাপে এটা ওটা পাঠায় এখনও, অপেক্ষা করে কখন দুটো টিক হয়ে রঙ ছড়িয়ে পড়বে। আকাশ নীল, মৃত্যুও নাকি।
আজ দশমী। বিজয়া। নিখিল অশ্রু-সাগরকূলে তোমার পূজা সারা হয়েছে। তার হাহা রব ছড়িয়ে পড়ছে দূর থেকে আরো দূরে। নীল আকাশের বুকে পাতার ফ্রেমে ঘেরা প্যাণ্ডেলের ছবিটার মোহনরূপের পাশে ফুটে আছে একটাই টিক। নিঃসঙ্গ, একাকী।
ঢাকের বাজনা এখন মিশে যাচ্ছে মাইকের ঘোষণায়, সিন্থেসাইজারের সুর হারিয়ে যাচ্ছে তাসার গর্জনে। বর্ণময় শোভাযাত্রায় আলোর সমুদ্রে ভেসে মা কৈলাশে ফিরে যাচ্ছেন। প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা এখন পাড়ার রাস্তা বেয়ে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বড় রাস্তার দিকে, পিছনে যেন রেখে যাচ্ছে একরাশ অন্ধকার।
বর্ষা কখন যেন ছাদে চলে এসেছিল সকলের চোখ এড়িয়ে, আজ প্রায় বছরখানেক বাদে। এটাই তার নাচের স্টেজ, নিভৃত যাপনের, সাধনার কোণ। ছাদ থেকে রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে। বিসর্জনের আনন্দমুখর মিছিলটা ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে। আওয়াজ ভেসে আসছে আসছে বছর আবার হবে, দুগ্গা মাইকি জয়!
ধীরে ধীরে হাতদুটো কপালে ঠেকায় বর্ষা, তার চোখের কোণে চিকচিক করছে জল! মনে মনে বলে – আবার এসো মা।
মাথার ওপর দিয়ে একটা প্লেন উড়ে গেল দিগন্তের দিকে।শেষ।
আজ দশমী। বিজয়া। নিখিল অশ্রু-সাগরকূলে তোমার পূজা সারা হয়েছে। তার হাহা রব ছড়িয়ে পড়ছে দূর থেকে আরো দূরে। নীল আকাশের বুকে পাতার ফ্রেমে ঘেরা প্যাণ্ডেলের ছবিটার মোহনরূপের পাশে ফুটে আছে একটাই টিক। নিঃসঙ্গ, একাকী।
ঢাকের বাজনা এখন মিশে যাচ্ছে মাইকের ঘোষণায়, সিন্থেসাইজারের সুর হারিয়ে যাচ্ছে তাসার গর্জনে। বর্ণময় শোভাযাত্রায় আলোর সমুদ্রে ভেসে মা কৈলাশে ফিরে যাচ্ছেন। প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা এখন পাড়ার রাস্তা বেয়ে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বড় রাস্তার দিকে, পিছনে যেন রেখে যাচ্ছে একরাশ অন্ধকার।
বর্ষা কখন যেন ছাদে চলে এসেছিল সকলের চোখ এড়িয়ে, আজ প্রায় বছরখানেক বাদে। এটাই তার নাচের স্টেজ, নিভৃত যাপনের, সাধনার কোণ। ছাদ থেকে রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে। বিসর্জনের আনন্দমুখর মিছিলটা ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে। আওয়াজ ভেসে আসছে আসছে বছর আবার হবে, দুগ্গা মাইকি জয়!
ধীরে ধীরে হাতদুটো কপালে ঠেকায় বর্ষা, তার চোখের কোণে চিকচিক করছে জল! মনে মনে বলে – আবার এসো মা।
মাথার ওপর দিয়ে একটা প্লেন উড়ে গেল দিগন্তের দিকে।শেষ।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















