
তিন দিন নাওয়া-খাওয়ার সময় ছিল না সুদীপ্ত অ্যান্ড কোং-এর। আফজল এবং শিবম্ মুণ্ডা সঙ্গে না থাকলে সে পেরে উঠত কি-না সন্দেহ। আর একজন তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে। শাক্যর কড়া নির্দেশ ছিল, যেভাবেই হোক, যেখান থেকেই হোক, কালাদেও নাটকের কুশীলবদের তুলে আনতে হবে। সেই সঙ্গে আজ পর্যন্ত যত ভিকটিম মার্দার হয়েছে, তাদের বাড়ির কাউকে-কাউকে থানায় এনে হাজির করতে হবে। আলাদা-আলাদা স্লট। আলাদা-আলাদা ভাবে ইন্টারোগেশন চলবে। গোটা প্রক্রিয়াটির ভিডিও রেকর্ড করা হবে। যাতে পরে কোর্টে প্রোডিউস করে সাসপেক্টদের কেউ অস্বীকার করতে না পারে কিংবা পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অ্যালিগেশন না আনতে পারে। আজকাল এটা একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে যে, যখন-তখন অপরাধীরা পুলিশের বিরুদ্ধে অত্যাচার কিংবা চাপ দিয়ে বয়ান আদায় করার মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। এটা ঠিক যে, কোন-কোন ক্ষেত্রে থানা বাড়াবাড়ি করে, পলিটিক্যাল প্রেশার ইত্যাদির জন্যও করতে বাধ্য হয়, কিন্তু পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিলে তারা কী না করতে পারে, সেটা দেখিয়ে দিতে পারে তারা। এই বিশ্বাস পুলিশ ডিপার্টমেন্টে যোগ দিয়ে আস্তে-আস্তে জন্মেছে শাক্যর মনে। পুলিশ বিভাগে মালাকারের মতো লোকও যেমন আছে, সুদীপ্ত, আফজলের মতো লোকজনও আছে। সুখের কথা, তারা সংখ্যায় কম নয়।
ইতিমধ্যে রিমিতা এবং পূষণকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে আবার বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে। সেদিন তারা পিশাচ পাহাড়ে আসার সময় যা-যা ঘটেছে তা আবার জানতে চাওয়া হয়েছিল এবং সেদিন পূষণ কৌতূহলী হয়ে নীচে নামার পর যারা-যারা তাকে কালাদেও সম্পর্কে নানা ইনফরমেশন সরবরাহ করেছিল, তাদের নাম আবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। পূষণের সঙ্গেই মেইনলি এমন কিছু লোকের কথা হয়। যদিও বেশ কিছু দিন মাঝখানে বয়ে গিয়েছে, তাও মনে করে-করে পূষণ মোটামুটি বলেছে প্রায় সকলের কথা। আগের বয়ানের সঙ্গে মিলিয়েও দেখেছে সুদীপ্ত। নিরানব্বই শতাংশ মিলে গিয়েছে। এক শতাংশ যে মেলেনি, তার কারণ, স্মৃতি সেগুলিকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে ইতিমধ্যেই ডিলিট করে দিয়েছে।
ইতিমধ্যে রিমিতা এবং পূষণকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে আবার বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে। সেদিন তারা পিশাচ পাহাড়ে আসার সময় যা-যা ঘটেছে তা আবার জানতে চাওয়া হয়েছিল এবং সেদিন পূষণ কৌতূহলী হয়ে নীচে নামার পর যারা-যারা তাকে কালাদেও সম্পর্কে নানা ইনফরমেশন সরবরাহ করেছিল, তাদের নাম আবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। পূষণের সঙ্গেই মেইনলি এমন কিছু লোকের কথা হয়। যদিও বেশ কিছু দিন মাঝখানে বয়ে গিয়েছে, তাও মনে করে-করে পূষণ মোটামুটি বলেছে প্রায় সকলের কথা। আগের বয়ানের সঙ্গে মিলিয়েও দেখেছে সুদীপ্ত। নিরানব্বই শতাংশ মিলে গিয়েছে। এক শতাংশ যে মেলেনি, তার কারণ, স্মৃতি সেগুলিকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে ইতিমধ্যেই ডিলিট করে দিয়েছে।
পূষণের বক্তব্য থেকে যাঁদের-যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁরা সকলেই পুলিশের নিজেদের তৈরি লিস্টে আগে থেকেই ছিলেন, অতএব তাঁদের সব্বাইকে তুলে আনতে বেগ পেতে হয়নি। সুখের বিষয়, এঁরা সকলেই নিজেদের এলাকার মধ্যেই ছিলেন। পুলিশ দেখে কিছুটা হম্বিতম্বি করেছিলেন সত্য, কিন্তু পরে লক্ষ্মীছানার মতো থানায় এসেছেন।
রিমিতা আগাগোড়া বাসে বসে ছিল। ফলে নীচের লোকজন কে কী বলেছে, তার জানার কথা নয়। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, পূষণ এবং আরও অন্যান্যরা নীচে নেমে যাওয়ার পর বাসের মধ্যে যারা ছিল, তাদের প্রতিক্রিয়া কীরকম ছিল। কোথাও কিছু কি সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছিল তার?
উত্তরে রিমিতা প্রথমে ঝাঁঝ মিশিয়ে বলেছিল, “প্রথম তো আমি বাসের মধ্যে ছিলাম। আদৌ বাইরে দেখিনি। আমার মাথা ধরেছিল। ক্লান্তিকর জার্নি ছিল। আমি চোখ বন্ধ করে বসেছিলাম। পূষণের নেমে যাওয়া নিয়েও ঝামেলা হয়েছিল। বাসে কে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করছিল, তা দেখার বা কোন আগ্রহই বোধ করিনি আমি। কিন্তু একটা কথা বলুন, এতদিন পরে আপনাদের এই রকম একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার কথা মাথায় এলো? এতদিন কি ঘুমাচ্ছিলেন?”
রিমিতা আগাগোড়া বাসে বসে ছিল। ফলে নীচের লোকজন কে কী বলেছে, তার জানার কথা নয়। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, পূষণ এবং আরও অন্যান্যরা নীচে নেমে যাওয়ার পর বাসের মধ্যে যারা ছিল, তাদের প্রতিক্রিয়া কীরকম ছিল। কোথাও কিছু কি সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছিল তার?
উত্তরে রিমিতা প্রথমে ঝাঁঝ মিশিয়ে বলেছিল, “প্রথম তো আমি বাসের মধ্যে ছিলাম। আদৌ বাইরে দেখিনি। আমার মাথা ধরেছিল। ক্লান্তিকর জার্নি ছিল। আমি চোখ বন্ধ করে বসেছিলাম। পূষণের নেমে যাওয়া নিয়েও ঝামেলা হয়েছিল। বাসে কে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করছিল, তা দেখার বা কোন আগ্রহই বোধ করিনি আমি। কিন্তু একটা কথা বলুন, এতদিন পরে আপনাদের এই রকম একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার কথা মাথায় এলো? এতদিন কি ঘুমাচ্ছিলেন?”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৯১: কেন পান্থ, চঞ্চলতা!

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৯: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৭০ : কালনাগিনী

বিশেষ নিবন্ধ : মুকুন্দ দাস: স্বদেশ জাগরণের চারণকবি
সুদীপ্তর মাথা গরম হয়ে উঠেছিল। তার চোখেমুখে ক্ষোভ ফুটে উঠেছিল। হতে পারে রিমিতার মামা লালবাজারের হোমরাচোমরা অফিসার, কিন্তু আপাতত এই কেসে সে একজন সন্দেহভাজন ছাড়া কিছু নয়। শাক্য উপস্থিত ছিল। যদিও দরকার না পড়লে সে কিছু জিজ্ঞাসা করবে না, বলে রেখেছিল, সে লক্ষ্য করেছিল সুদীপ্তর থমথমে মুখ। সুদীপ্ত কিছু ঝাল-ঝাল জবাব দেওয়ার আগেই শাক্য বলল, “এতদিন তো তদন্ত চলছিল ম্যাডাম। এখন তদন্ত গোটানোর মুখে। ফলে যা হচ্ছে তদন্তের এফেক্ট বলতে পারেন। এই ধরুন, এতদিন আমরা মনে করেছিলাম, এই কেসে আপনাদের কানেকশন নেই। তারপর ছানবিন করে দেখলাম, আপনারা আসার সঙ্গে-সঙ্গেই কালাদেও যেন আপনাদের দেখা দেওয়ার জন্য সন্ধ্যার মুখে ওপেন রোডে অপেক্ষা করছিল লাশটি খাবে বলে। আচ্ছা ম্যাডাম, কালাদেও যখন মানুষ মেরে তার মুণ্ডু ছিঁড়ে খেতে পারে, তাহলে একজন মানুষের বডি সে কি জঙ্গলে টেনে নিয়ে গিয়ে তারপর ডিনার সারতে পারতো না? কিন্তু কী আশ্চর্য দেখুন, তার এত খিদে পেয়েছিল যে, আপনাদের বাসের সামনেই সে খেতে বসে গেল। তারপর আপনাদের সামনেই গুটিগুটি জঙ্গলে সেঁধিয়ে উধাও হয়ে গেল। অথচ আপনারা সকলেই বয়ানে বলছেন, কেউ তাকে ভালো করে দেখেননি। মঙ্গল মাহাতো দেখে চেঁচিয়ে উঠেছিল, তারপর আপনারা তার বলা কথায় যখন তাকান, তখন কালাদেও অদৃশ্য হয়ে গেছে। তাহলে কী করে জানলেন কাজটা কালাদেওই করেছে? মঙ্গল মাহাতো ছাড়া আর কারুর তো জানার কথা নয়! বাকিরা তো দেখেইনি। অথচ আগের বয়ানে অন্যদের মতো আপনিও জোরের সঙ্গে বলেছেন, কালাদেওকে লাশটা খেতে দেখেছেন। এমন কেন বলেছিলেন?”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৮১: শিশুপালের মৃত্যু, এক সাধারণের নির্মম পরিণতি

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত
শাক্যর গলার স্বর শেষের দিকে কঠোর হয়ে উঠেছিল। রিমিতা একটু ধাক্কা খেল। তার মামার আবার এই অফিসারের উপর খুব ভরসা। একেবারে চোখে হারায় দশা। অতএব রাগটাকে কন্ট্রোল করতে হবে তাকে। সে ঝাঁঝ একটু কমিয়ে বলল, “সাডেন একটা ঘটনা ঘটলে তার প্রতিক্রিয়ায় তো এমনই করে বলে শুনেছি মানুষ? তাছাড়া আমাদের সাসপেক্ট ভাবার কারণ তো বুঝতে পারছি না!”
“আপনারা আসার আগে পিশাচ পাহাড় রিসর্টে কোন মার্ডার হয়নি। আপনারা এলেন এবং মার্ডারের খেলা যেন শুরু হয়ে গেল, এটা নেহাতই কাকতালীয় বলবেন?”
“হোয়াট ডু ইউ মিন অফিসার? আপনি জানেন…”
হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “জানি একেজি আপনার মামা এবং লালবাজারের তিনি একজন ইনফ্ল্যুয়েন্সিয়াল অফিসার। আমার ইমিডিয়েট বস। কিন্তু তাঁর কাছেই শিখেছি, অন ডিউটি থাকার সময় পারসোনাল রিলেশনগুলিকে মাথায় রাখতে নেই। কেবল মাথায় রাখতে হবে দু’টি কথা, আমি পুলিশ, আর উল্টোদিকে যে আছে, সে অভিযুক্ত, সম্ভাব্য অপরাধী। এই এখন যেমন আপনি…!”
“অফিসার!” রাগে-ক্ষোভে রিমিতা প্রায় হতভম্ব হয়ে গেল।
“দেখুন, আমাদের হাতে সময় খুব স্বল্প। আপনার মামার সঙ্গে কাল রাতেই আমার কথা হয়েছে। তিনি কিন্তু এখন লালবাজারে বসে আপনার কীর্তিকলাপ লাইভ দেখছেন। অতএব যা বলছেন, তা কেবল আমাদেরকেই নয়, তাঁকেও বলছেন। এটা মাথায় রেখে যা জিজ্ঞাসা করছি, জানা থাকলে তার উত্তর দিন!”
“আপনারা আসার আগে পিশাচ পাহাড় রিসর্টে কোন মার্ডার হয়নি। আপনারা এলেন এবং মার্ডারের খেলা যেন শুরু হয়ে গেল, এটা নেহাতই কাকতালীয় বলবেন?”
“হোয়াট ডু ইউ মিন অফিসার? আপনি জানেন…”
হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “জানি একেজি আপনার মামা এবং লালবাজারের তিনি একজন ইনফ্ল্যুয়েন্সিয়াল অফিসার। আমার ইমিডিয়েট বস। কিন্তু তাঁর কাছেই শিখেছি, অন ডিউটি থাকার সময় পারসোনাল রিলেশনগুলিকে মাথায় রাখতে নেই। কেবল মাথায় রাখতে হবে দু’টি কথা, আমি পুলিশ, আর উল্টোদিকে যে আছে, সে অভিযুক্ত, সম্ভাব্য অপরাধী। এই এখন যেমন আপনি…!”
“অফিসার!” রাগে-ক্ষোভে রিমিতা প্রায় হতভম্ব হয়ে গেল।
“দেখুন, আমাদের হাতে সময় খুব স্বল্প। আপনার মামার সঙ্গে কাল রাতেই আমার কথা হয়েছে। তিনি কিন্তু এখন লালবাজারে বসে আপনার কীর্তিকলাপ লাইভ দেখছেন। অতএব যা বলছেন, তা কেবল আমাদেরকেই নয়, তাঁকেও বলছেন। এটা মাথায় রেখে যা জিজ্ঞাসা করছি, জানা থাকলে তার উত্তর দিন!”
আরও পড়ুন:

দশমী

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট
শাক্যর কথা শুনে রিমিতা হাঁ। লোকটা তলে-তলে এত কিছু করে বসে আছে, আর সে জানে না? মামা তো কিছুই বলেন নি, কেসের ব্যাপারে কোনদিন কিছু বলেনও না। কিন্তু যেখানে নিজের ভাগ্নী জড়িয়ে, সেখানেও এমন মন্ত্রগুপ্তির কারণ কী? দেখা হলে জানতে চাইবে সে।
“কী হল, বলুন?”
“কী?”
“বাসের মধ্যে সেদিন কারুর প্রতিক্রিয়া অদ্ভুত লেগেছিল কি? কিংবা এমন কোন কথা, যা কানে এসেছিল এবং আপনি অবাক হয়েছিলেন? ভাবুন, ভেবে বলুন। অনেকসময় আমরা নিজেরাই জানি না, আমরা কী জানি!”
রিমিতা চোখ বন্ধ করে ভাবল। বেশ কয়েকদিন পার হয়ে গেলেও এমন অদ্ভুতুড়ে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবে বলে কোনদিন ভাবেনি সে। তাছাড়া এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়লে, কোনও মানুষই বোধহয় ভুলতে পারে না নির্দিষ্ট দিনটির কথা। রিমিতাও ভোলেনি। সে মনে করতে চেষ্টা করছিল, কিছু কী দেখেছিল বা শুনেছিল, যা তার দেখা বা শোনার কথা নয়?
তার বন্ধ চোখের সামনে দিয়ে একের-পর-এক সেদিনের ছবি চলচ্চিত্রের মতো পরপর ভেসে উঠছিল। হঠাৎ করে বাসটা ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মঙ্গল মাহাতো, তখন অবশ্য নামটা জানত না সে, চিৎকার করে উঠল, ‘হায় বুরুংবাওয়া, উটা কি বটে?” পুষণ তার নিষেধ সত্ত্বেও নেমে গেল। সে বিরক্ত হয়ে বাসেই বসে থাকল। তার মাথা টিপটিপ করছিল। লঙ জার্নির এফেক্ট। কিন্তু… তারপরেই সে কাঠ হয়ে গেল। একটা কথা সে তো খেয়াল করেনি! তাহলে কি…! চোখ খুলল সে।
“কী হল, বলুন?”
“কী?”
“বাসের মধ্যে সেদিন কারুর প্রতিক্রিয়া অদ্ভুত লেগেছিল কি? কিংবা এমন কোন কথা, যা কানে এসেছিল এবং আপনি অবাক হয়েছিলেন? ভাবুন, ভেবে বলুন। অনেকসময় আমরা নিজেরাই জানি না, আমরা কী জানি!”
রিমিতা চোখ বন্ধ করে ভাবল। বেশ কয়েকদিন পার হয়ে গেলেও এমন অদ্ভুতুড়ে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবে বলে কোনদিন ভাবেনি সে। তাছাড়া এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়লে, কোনও মানুষই বোধহয় ভুলতে পারে না নির্দিষ্ট দিনটির কথা। রিমিতাও ভোলেনি। সে মনে করতে চেষ্টা করছিল, কিছু কী দেখেছিল বা শুনেছিল, যা তার দেখা বা শোনার কথা নয়?
তার বন্ধ চোখের সামনে দিয়ে একের-পর-এক সেদিনের ছবি চলচ্চিত্রের মতো পরপর ভেসে উঠছিল। হঠাৎ করে বাসটা ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মঙ্গল মাহাতো, তখন অবশ্য নামটা জানত না সে, চিৎকার করে উঠল, ‘হায় বুরুংবাওয়া, উটা কি বটে?” পুষণ তার নিষেধ সত্ত্বেও নেমে গেল। সে বিরক্ত হয়ে বাসেই বসে থাকল। তার মাথা টিপটিপ করছিল। লঙ জার্নির এফেক্ট। কিন্তু… তারপরেই সে কাঠ হয়ে গেল। একটা কথা সে তো খেয়াল করেনি! তাহলে কি…! চোখ খুলল সে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১৩ : ত্রিপুরায় আহোম রাজদূতের গুপ্তচর নিয়োগ/১
শাক্য এবং সুদীপ্ত এবং একজন মহিলা কনষ্টেবল ঘরে উপস্থিত। তারা সকলেই তার দিকে তাকিয়ে। সে ঠোঁট নাড়তেই বলল শাক্য, “মনে পড়েছে কিছু ? আদৌ যদি কিছু বলার থাকে, যতই তুচ্ছ হোক, বলুন…”
“ঘটনাটা ঘটার কিছুক্ষণ আগে বাসের মধ্যে কেউ মোবাইলে গান শুনছিল। কিংবা বাজাচ্ছিলও বলতে পারেন। ফুল সাউন্ড। গানটির কথা অদ্ভুত। লোকাল ডায়ালেক্টে লেখা সম্ভবত। কিন্তু সেটা অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হল, গানটা বাজতে-বাজতে হঠাৎ করে গানের মধ্যে থেকেই একটা অদ্ভুত আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম। তারপরেই গানটা বন্ধ হয়ে যায়। বাসটাও সঙ্গে-সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর মঙ্গল মাহাতো নীচে নেমে চিৎকার করে ওঠে…”
নড়েচড়ে বসল শাক্য। সুদীপ্তও। এই কথাগুলি আগে বলেনি রিমিতা। সুদীপ্ত বলল, “আপনি ইনসিডেন্ট ঘটার পরের দিন এ-সবের কিছুই বলেননি ম্যাডাম!”
রিমিতা কিছুটা হালকা গলায় বলল, “এটা বলার মতো কোন ব্যাপার বলে মনে হয়নি অফিসার। লোকাল গান বাজাচ্ছিল কেউ। হয়তো ওই অদ্ভুত চিৎকারটা গানেরই একটা অঙ্গ। কিন্তু কালাদেওর ভয়েই সম্ভবত আর গানটা শেষ পর্যন্ত চালায় নি যে শুনছিল!”
শাক্য বলল, “আপনি ভেবে বলুন তো, গানটা আগে থেমেছিল নাকি বাস?”
রিমিতা অসহায়ের মত মাথা ঝাঁকালো, বলল, “আমার যতদূর মনে হচ্ছে গানটা…”
শাক্য সুদীপ্তর দিকে তাকাল। তারপর বলল, “বাসটা আগে থেমেছিল নাকি মঙ্গল মাহাতো আগে চেঁচিয়ে উঠেছিল?”
“বাসটা আগে থামে। তারপর মঙ্গল মাহাতো নীচে নেমে চিৎকার করে ওঠে…”
“বাসের ড্রাইভার কি তাকে কিছু বলেছিল, মানে কালাদেও কিংবা অদ্ভুত কিছু দেখেছে বলে?”
“যতদূর মনে পড়ছে, না। কারণ, আমি অধৈর্য্য হয়ে বারবারই সামনের দিকে তাকাচ্ছিলাম। তেমন কিছু বললে, আমার মনে থাকতো।”
“মঙ্গল কি সঙ্গে-সঙ্গেই নেমে পড়ে?”
“হ্যাঁ!”
“তার চিৎকার কী অল্প পরে শুনতে পান নাকি নীচে নামার সঙ্গে-সঙ্গেই?”
“নীচে নামার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই সে চিৎকার করে উঠেছিল।”
“পূষণ কখন নামেন?”
“সামান্য পরে। তার আগেই বেশ কয়েকজন নেমে গিয়েছিল। ওই একজন স্কুলমাস্টার…”
“ভবানীবাবু?”
“হবে। আমার সঙ্গে তো আলাপ হয়নি। পূষণের সঙ্গে হয়েছিল। তাছাড়া একজন কালাদেওর মন্দিরের পুরোহিত?’
“কে? মঙ্গল ওঝা? যে মারা গিয়েছে?”
“নাহ্, ঈশ্বরীপ্রসাদ না কী যেন নাম…”
সুদীপ্ত বলল, “তুলে এনেছি স্যার। ফেক্ লোক। কালাদেওর নাম করে ওর বাবা একটা মন্দির খুলেছেন, গ্রামের লোকের সেন্টিমেন্ট নিয়ে কারবার। আয়-উপায় ভালোই হচ্ছে। বিশেষ করে লাশ পড়ার যা ধুম লেগেছে। পূষণ বাবুকে শহরের লোক দেখে গুলতাপ্পি মেরেছে আর কি। সম্ভবত প্রণামী বাবদ কিছু ভালো পরিমাণ দাঁও মারার মতলবে ছিল!”
“আনুমানিক বললে হবে না অফিসার!” শাক্য বলল, “লোকটিকে আমাদের চাই…!”
“ব্যবস্থা হয়ে আছে স্যার!” বলে ইঙ্গিত করল সুদীপ্ত। শাক্য বুঝল, অলরেডি তুলে আনা হয়েছে লোকটিকে।
“বাসে কে মোবাইলে অদ্ভুত গান বাজাচ্ছিল, তা বোধহয় জানা যাবে না তাই না অফিসার?”
“চেষ্টা করে দেখতে পারি স্যার। সেদিন বাসে যারা-যারা প্যাসেঞ্জার হিসাবে ছিল, সকলে নাম ঠিকানা তো সেদিন কালেক্ট করেছি আমরা। সময় লাগবে। কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলে নির্দিষ্ট গানওয়ালার পাতা-ঠিকানা পাওয়া যেতেই পারে। কেবল রিমিতা ম্যাডাম নয়, আর কেউ-কেউ তো নিশ্চয়ই শুনেছে সেই গান!”
“তাহলে ব্যবস্থা কর। আমার মনে হচ্ছে, ওটা নিছক গান ছিল না। ইঙ্গিত ছিল। গানটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস বন্ধ হবে। বাস বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গল মাহাতো বাস থেকে নেমে, কালাদেও, কালাদেও বলে চিৎকার করবে…! বাসের ড্রাইভারটিকে আমার চাই অফিসার!”
“বাকি ছিল। ভাবিনি ওর দিকটা। বেশ। আনব তুলে। আর কিছু?”
“নাহ্। অরণ্যবার্তার অফিসের ব্যাপারে ম্যাডাম ডিটেইলেই বলেছিলেন। কোন খটকা লাগলে আবার না হয়…” কথা শেষ করল না।
রিমিতা খর চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, ডাকবেন। যখনই মন কেমন করে ডাকবেন। আমরা নফর-বাঁদী আছি, হাজির হয়ে যাব!”
শাক্যর হাসি পেলেও হাসল না। কারণ, এখন সিরিয়াস থাকার সময়। এখন রামগড়ুরের ছানা হয়ে থাকার সময়। অতএব সে ক্লিষ্ট মুখ করে বলল, “এটা আপনার রাগের কথা ম্যাডাম। কিন্তু আমরা জানি আপনি তদন্তে পুলিশকে সবসময়েই সাহায্য করবেন, আপনার মামা…।” —চলবে।
“ঘটনাটা ঘটার কিছুক্ষণ আগে বাসের মধ্যে কেউ মোবাইলে গান শুনছিল। কিংবা বাজাচ্ছিলও বলতে পারেন। ফুল সাউন্ড। গানটির কথা অদ্ভুত। লোকাল ডায়ালেক্টে লেখা সম্ভবত। কিন্তু সেটা অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হল, গানটা বাজতে-বাজতে হঠাৎ করে গানের মধ্যে থেকেই একটা অদ্ভুত আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম। তারপরেই গানটা বন্ধ হয়ে যায়। বাসটাও সঙ্গে-সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর মঙ্গল মাহাতো নীচে নেমে চিৎকার করে ওঠে…”
নড়েচড়ে বসল শাক্য। সুদীপ্তও। এই কথাগুলি আগে বলেনি রিমিতা। সুদীপ্ত বলল, “আপনি ইনসিডেন্ট ঘটার পরের দিন এ-সবের কিছুই বলেননি ম্যাডাম!”
রিমিতা কিছুটা হালকা গলায় বলল, “এটা বলার মতো কোন ব্যাপার বলে মনে হয়নি অফিসার। লোকাল গান বাজাচ্ছিল কেউ। হয়তো ওই অদ্ভুত চিৎকারটা গানেরই একটা অঙ্গ। কিন্তু কালাদেওর ভয়েই সম্ভবত আর গানটা শেষ পর্যন্ত চালায় নি যে শুনছিল!”
শাক্য বলল, “আপনি ভেবে বলুন তো, গানটা আগে থেমেছিল নাকি বাস?”
রিমিতা অসহায়ের মত মাথা ঝাঁকালো, বলল, “আমার যতদূর মনে হচ্ছে গানটা…”
শাক্য সুদীপ্তর দিকে তাকাল। তারপর বলল, “বাসটা আগে থেমেছিল নাকি মঙ্গল মাহাতো আগে চেঁচিয়ে উঠেছিল?”
“বাসটা আগে থামে। তারপর মঙ্গল মাহাতো নীচে নেমে চিৎকার করে ওঠে…”
“বাসের ড্রাইভার কি তাকে কিছু বলেছিল, মানে কালাদেও কিংবা অদ্ভুত কিছু দেখেছে বলে?”
“যতদূর মনে পড়ছে, না। কারণ, আমি অধৈর্য্য হয়ে বারবারই সামনের দিকে তাকাচ্ছিলাম। তেমন কিছু বললে, আমার মনে থাকতো।”
“মঙ্গল কি সঙ্গে-সঙ্গেই নেমে পড়ে?”
“হ্যাঁ!”
“তার চিৎকার কী অল্প পরে শুনতে পান নাকি নীচে নামার সঙ্গে-সঙ্গেই?”
“নীচে নামার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই সে চিৎকার করে উঠেছিল।”
“পূষণ কখন নামেন?”
“সামান্য পরে। তার আগেই বেশ কয়েকজন নেমে গিয়েছিল। ওই একজন স্কুলমাস্টার…”
“ভবানীবাবু?”
“হবে। আমার সঙ্গে তো আলাপ হয়নি। পূষণের সঙ্গে হয়েছিল। তাছাড়া একজন কালাদেওর মন্দিরের পুরোহিত?’
“কে? মঙ্গল ওঝা? যে মারা গিয়েছে?”
“নাহ্, ঈশ্বরীপ্রসাদ না কী যেন নাম…”
সুদীপ্ত বলল, “তুলে এনেছি স্যার। ফেক্ লোক। কালাদেওর নাম করে ওর বাবা একটা মন্দির খুলেছেন, গ্রামের লোকের সেন্টিমেন্ট নিয়ে কারবার। আয়-উপায় ভালোই হচ্ছে। বিশেষ করে লাশ পড়ার যা ধুম লেগেছে। পূষণ বাবুকে শহরের লোক দেখে গুলতাপ্পি মেরেছে আর কি। সম্ভবত প্রণামী বাবদ কিছু ভালো পরিমাণ দাঁও মারার মতলবে ছিল!”
“আনুমানিক বললে হবে না অফিসার!” শাক্য বলল, “লোকটিকে আমাদের চাই…!”
“ব্যবস্থা হয়ে আছে স্যার!” বলে ইঙ্গিত করল সুদীপ্ত। শাক্য বুঝল, অলরেডি তুলে আনা হয়েছে লোকটিকে।
“বাসে কে মোবাইলে অদ্ভুত গান বাজাচ্ছিল, তা বোধহয় জানা যাবে না তাই না অফিসার?”
“চেষ্টা করে দেখতে পারি স্যার। সেদিন বাসে যারা-যারা প্যাসেঞ্জার হিসাবে ছিল, সকলে নাম ঠিকানা তো সেদিন কালেক্ট করেছি আমরা। সময় লাগবে। কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলে নির্দিষ্ট গানওয়ালার পাতা-ঠিকানা পাওয়া যেতেই পারে। কেবল রিমিতা ম্যাডাম নয়, আর কেউ-কেউ তো নিশ্চয়ই শুনেছে সেই গান!”
“তাহলে ব্যবস্থা কর। আমার মনে হচ্ছে, ওটা নিছক গান ছিল না। ইঙ্গিত ছিল। গানটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস বন্ধ হবে। বাস বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গল মাহাতো বাস থেকে নেমে, কালাদেও, কালাদেও বলে চিৎকার করবে…! বাসের ড্রাইভারটিকে আমার চাই অফিসার!”
“বাকি ছিল। ভাবিনি ওর দিকটা। বেশ। আনব তুলে। আর কিছু?”
“নাহ্। অরণ্যবার্তার অফিসের ব্যাপারে ম্যাডাম ডিটেইলেই বলেছিলেন। কোন খটকা লাগলে আবার না হয়…” কথা শেষ করল না।
রিমিতা খর চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, ডাকবেন। যখনই মন কেমন করে ডাকবেন। আমরা নফর-বাঁদী আছি, হাজির হয়ে যাব!”
শাক্যর হাসি পেলেও হাসল না। কারণ, এখন সিরিয়াস থাকার সময়। এখন রামগড়ুরের ছানা হয়ে থাকার সময়। অতএব সে ক্লিষ্ট মুখ করে বলল, “এটা আপনার রাগের কথা ম্যাডাম। কিন্তু আমরা জানি আপনি তদন্তে পুলিশকে সবসময়েই সাহায্য করবেন, আপনার মামা…।” —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

















