কলকাতায় বৃষ্টি
 

এক

● দৃশ্য এক। সময়কাল : ডিসেম্বর ১৯৯০।
এক গুপ্তচর এসে উপস্থিত হলেন দিল্লিতে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর-এর কাছে। প্রেরক আরাফত। প্যালেস্তাইন লিবারাইজেশন অর্গানাইজেশন, পিএলও-র অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসের আরাফত। আরাফত খবর পাঠিয়েছেন, মৃত্যু সংশয় উপস্থিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর। বার্তা ছিল, সন্ত্রাসবাদী জঙ্গি সংগঠনগুলির কেউ কেউ (পড়তে হবে শ্রীলংকার লিবারেশন টাইগারস অফ তামিল ইলম, এলটিটিই) পরিকল্পনা করছে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের জন্য যখন রাজীব গান্ধী জনসভা করবেন তখন সেখানেই তাঁকে হত্যা করার।

● একটু পিছিয়ে যাই আমরা।
দৃশ্য দুই। সময়কাল : এপ্রিল ১, ১৯৮৯।
প্রায় আড়াই বছরের গোপনীয় সুরক্ষা বলয় থেকে বেরিয়ে এসে এলটিটিই প্রধান প্রভাকরণ জারি করলেন এক প্রেস বিবৃতি। এই প্রেস বিবৃতির প্রেক্ষাপট ছিল ভারতীয় রাজনীতি। ঠিক এই বিবৃতি জারির আগেই কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিল্লিতে ক্ষমতায় এসেছে এক কোয়ালিশন সরকার, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এবং প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি শ্রীলঙ্কা থেকে শান্তিরক্ষা বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রভাকরনের প্রেস বিবৃতি; যেখানে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিলেন, তিনি ভারতের মানুষের বিপক্ষে নয়, বিপক্ষে নয় ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের, তিনি বিপক্ষে ভারতের প্রাক্তন নেতৃত্বের অপরিণামদর্শী নীতির।

আবার একটু এগিয়ে যাই।
দৃশ্য তিন। সময়কাল : মার্চ ৫, ১৯৯১।
আকাশে বাতাসে তখন গন্ধ আসন্ন নির্বাচনের। এই গন্ধ শুঁকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতায় ফিরতে চলেছেন রাজীব গান্ধী। আর সেই বিশেষজ্ঞ-মতামত শুনে রাজীব গান্ধীর সাক্ষাৎপ্রার্থী এলটিটিই-র দূত কাসি আনন্দন। বুঝে নিতে চান রাজীব গান্ধীর ভাবনাচিন্তা। সাক্ষাৎকারে রাজীব গান্ধী পরিষ্কার করে দিলেন তাঁর মতামত। তিনি শ্রীলঙ্কায় শান্তি চান, তবে শান্তি আর সন্ত্রাস দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না।

দৃশ্য চার। সময়কাল : মার্চ ১৫,১৯৯১।
পুনরায় রাজীব গান্ধীর সাক্ষাৎপ্রার্থী এলটিটিই-র দ্বিতীয় দূত অর্জুন সিতরামবালম। রাজীব গান্ধী এবার আরও দ্ব্যর্থহীন। জানিয়ে দিলেন, তিনি ক্ষমতায় ফিরলে শ্রীলঙ্কা সমস্যার সমাধান হবে ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-শ্রীলঙ্কা চুক্তি অনুযায়ীই। বার্তা পৌঁছে গেল ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের কাছে।

দৃশ্য পাঁচ সময়কাল : মার্চ ১৫,১৯৯১।
যেদিন অর্জুন সিতরামবালম রাজীব গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন সেদিনই কংগ্রেস আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। ইশতেহারের ৫৬-তম প্যারাগ্রাফে পরিষ্কার করে উল্লেখ করা হয় “আমরা যদি ক্ষমতায় ফিরি তাহলে শ্রীলংকার জাতিগত সমস্যা সমাধান করব ভারত শ্রীলঙ্কা চুক্তি অনুযায়ী।”

 

দুই

এবার যদি জিগ শ পাজলের এই পাঁচটি টুকরোকে একত্রিত করি, তাহলে কি পৌঁছতে অসুবিধে হয় ২১ মে, ১৯৯১-এর শ্রীপেরামবুদুরে?

১৯৯১ সালের একুশে মে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরামবুদুরে নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা করতে গিয়ে এলটিটিই আততায়ীর হাতে প্রাণ দেন রাজীব গান্ধী। যে কটি ঘটনার উল্লেখ করা হল, সেখান থেকে বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয় না যে আততায়ীর হাতে রাজীব গান্ধীর প্রাণনাশের যথেষ্ট আশঙ্কা ছিলই, ছিল আগাম খবর‌ও। কিন্তু তারপরেও তাঁর প্রাণরক্ষার জন্য, অন্তত সরকারি তরফে, কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি।

কেন যায়নি, সে প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত; ঠিক যেমন অমীমাংসিত হত্যার আগের এবং হত্যার পরের নানা ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্ক। অমীমাংসিত, এই হত্যার ব্যাপারে ভারতের বেশ কিছু মানুষের ভূমিকা; যাদের মধ্যে রাজনীতিবিদরা আছেন, পুলিশ আছে, আছে সরকার এবং পুলিশ প্রশাসনের অনেক উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের ভূমিকাও। ভারতীয় রাজনীতির তিন বিখ্যাত গান্ধীর মৃত্যু হয় আততায়ীর হাতে। এদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী ও ইন্দিরা গান্ধীর আততায়ীকে ঘটনাস্থলেই ধরে ফেলা গিয়েছিল, যায়নি কেবল রাজীব গান্ধীর হত্যাকারীকে। পুলিশ তদন্ত শুরু করে একেবারে অন্ধকারে জাল ফেলে। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে তত‌ই হত্যাকারীর পরিচয় যেমন ক্রমশ প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে, তেমনি ক্রমশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে কিছু মানুষের ভূমিকা। হত্যাকারীর পরিচয় শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠলেও হত্যার ষড়যন্ত্রে কে কোথায় দাঁড়িয়ে, কে কাকে আড়াল করছে, কেন করছে, এইসব প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিতই থেকে গিয়েছে।

সেই ফোন কলটির কথাই ধরুন না, যেটি এসেছিল শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত ভারতীয় হাই কমিশনের দপ্তরে, একুশে মে বিকেল চারটের সময়, হত্যাকাণ্ডের ঠিক সাড়ে ছয় ঘণ্টা আগে। অজ্ঞাত এক গলা প্রশ্ন করেছিল, “রাজীব গান্ধী কি এখনও বেঁচে আছেন?” এই তথ্য প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখরকে জানিয়েছিলেন তৎকালীন আইবি ডিরেক্টর এম কে নারায়নন, হত্যাকাণ্ডের পরে। কিন্তু এই ফোন কল আসার পর করণীয় কি ছিল? করণীয় কি এই ছিল না, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেই জনসভার কার্যসূচি বাতিল করা অথবা একান্ত না করা গেলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও আঁটোসাঁটো করা?কার্যত কিছুই করা হয়নি। কেন হয়নি? কার নির্দেশে? কোনও উত্তর নেই এইসব প্রশ্নের।

যে ফোন কলের কথা জানত আইবি দপ্তর, সে তথ্য কি জানার কথা নয় রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকাল উইং (র)-এর প্রধান জি এস বাজপাইয়ের? অথচ হত্যাকান্ডের পর র-প্রধান প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর গলায় বারবার এই হত্যায় কোনও বিদেশি শক্তির হাত থাকার কথা অস্বীকার করছিলেন তিনি। যখন প্রধানমন্ত্রী সে কথায় কোনও কান দিচ্ছিলেন না তখন মরিয়া হয়ে বাজপাই বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এলটিটিই যে যুক্ত নয় তার কারণ এলটিটিই-র একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা, যিনি হত্যাকাণ্ডের পর এই হত্যাকাণ্ডে এলটিটিইর জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন, তিনিই তাদের ‘টিকটিকি’। “কে তিনি?”, প্রধানমন্ত্রীর এই প্রশ্নের জবাবে যার নাম বাজপাই বলেন, তার নাম শুনে প্রধানমন্ত্রী বিস্মিত হয়ে যান। সেই টিকটিকি নাকি কিট্টু, এলটিটিইর লন্ডন-স্থিত আন্তর্জাতিক সেক্রেটারিয়েটের প্রধান। এই কথোপকথনের পর কি হয়েছিল তা জানা যায় না, কেবল জানা যায় বাজপাই স্বপদেই অধিষ্ঠিত ছিলেন।

যে ফোন কলের কথা বলা হল, সেটি এসেছিল ঘটনার দিন, অর্থাৎ মে মাসের ২১ তারিখে। ঠিক তার আগের দিন আইবি ডিরেক্টর এম কে নারায়নন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর জন্য এনএসজি নিরাপত্তা দেওয়ার অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি দেন। সেই সময় রাজীব গান্ধীর জন্য বরাদ্দ ছিল জেড ক্যাটাগরির নিরাপত্তা। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল স্পেশাল প্রটেকশন গ্রুপ (এসপিজি)- এর নিরাপত্তা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রাক্তন হয়ে যাওয়ার পর রাজীব গান্ধীকে জেড ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দেওয়া হয়। অথচ তার আগেই আইডির চেন্নাই অফিস জাফনা এবং তামিলনাড়ুর মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া বেশ কিছু গোপন মেসেজ ধরে ফেলেছিল চেন্নাই অফিসের জনৈক ডিকোডিং বিশেষজ্ঞ সেই সব মেসেজ ডিকোড করে জানতে পেরেছিলেন রাজীব গান্ধীকে হত্যার একটা চক্রান্ত হচ্ছে। সে কথা দিল্লির সদর দপ্তরে জানানোও হয়েছিল। দিল্লি সেই সমস্ত মেসেজ ফাইল বন্দি করে রেখে দিয়েছিল। সেই ফাইল খোলা হয় রাজীব গান্ধীর হত্যার পর। কিন্তু ফাইল বন্দী করে রাখা হলেও এই তথ্য কি নারায়নন জানতেন না? যদি না জানতেন, তাহলে হঠাৎ করে ২০ মে তারিখে তিনি এমন একটি উপদেশ সরকারকে দিতে গেলেন কেন? উত্তর অদ্যাবধি অমীমাংসিত। এমনকি রাজীব গান্ধী হত্যা তদন্তের জন্য গঠিত বিচারপতি ভার্মা কমিশন তাদের রিপোর্টে কর্তব্যে অবহেলার জন্য নারায়ননের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার সুপারিশ করলে সরকার স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিমকে একটি কেস ফাইল করতে পারে বলে। কেস ফাইল‌ও করা হয় (কেস নম্বর PE 1 of 1995)। কিন্তু সেই কেসের কি হল, আজও কেউ তা জানে না।

আরও পড়ুন:

শারদীয়ার গল্প/১ : ষষ্ঠীর সন্ধ্যা

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৮: ঘরচিতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৯: ইরাবতীর ডায়েরি থেকে

নারায়নন যে কেবলমাত্র আগে থেকে জেনেও রাজীব গান্ধীকে নিরাপত্তা দেননি শুধু তাই নয়, তিনি তদন্তের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও তদন্তকারীদের হাত থেকে সরিয়ে নেন। একথা জানতেন সিটের প্রধান কার্তিকেয়ন‌ও। এবং এই অভিযোগ সরাসরি করেছেন ইনভেস্টিগেটিং অফিসার (আইও) কে রাগোথমন তাঁর ‘অ্যাসাসিনেশন অফ মহাত্মা, ইন্দিরা, রাজীব গান্ধীস’ বইয়ে। কিন্তু কেন? কাকে বাঁচাতে? উত্তর অমীমাংসিত।

বস্তুত যাঁরা রাজীব গান্ধীর প্রাণ বাঁচাতে পারতেন, তাঁরা যেমন নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তেমনি তাঁর হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার যাঁদের হাতে দেওয়া হয়েছিল, তাঁরাও প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন আড়ালের মুখগুলি যেন সামনে চলে না আসে। এবং এই ‘তাঁরা’ বলতে সবার আগে যে নামটি আসছে, যে নামটি তদন্তের সঙ্গে যুক্ত অন্য অফিসাররা বিভিন্ন বইয়ে, ইন্টারভিউয়ে সরাসরি বলছেন, তিনি সিট প্রধান ডি কার্তিকেয়ন। অর্থাৎ দেশের প্রধান দুই গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং ‘আইবি’-র প্রধান জি এস বাজপাই এবং এম কে নারায়নন যেমন চাননি রাজীব গান্ধীকে উপযুক্ত নিরাপত্তা দিতে, তেমনি তদন্তকারী দলের প্রধান ডি কার্তিকেয়ন চাননি হত্যা ষড়যন্ত্রের প্রধান মাথাগুলি চিহ্নিত হয়ে যাক।

কিন্তু কোনগুলি সেই প্রধান প্রধান মাথা? উত্তর নেই। আমরা শুধু প্রশ্ন তুলতে পারি, যেমন তুলেছেন এই তদন্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কিছু অফিসার অথবা কোনও সাংবাদিক অথবা কোনও গবেষক, যিনি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সেইসব প্রশ্ন থেকে উত্তর কেবল অনুমান সাপেক্ষ।

আবার ফিরে আসি নারায়নন-এর প্রসঙ্গে। কোন ভিডিও তিনি বা তাঁর অধীন সংস্থা সরিয়ে নিয়েছিল? সেদিন শ্রীপেরামবুদুরে সন্ধ্যা থেকে উপস্থিত ছিলেন বাবু নামক এক ভিডিও ফটোগ্রাফার। এই ফটোগ্রাফারকে ভাড়া করেছিলেন ওই লোকসভার প্রার্থী মারাগাথামের ম্যানেজার এ জে ডস। বিস্ফোরণের পরই বাবু তার ক্যামেরা নিয়ে সরাসরি বাড়ি চলে আসেন। এবং কি ঘটল, কীভাবে ঘটল তা বোঝার জন্য ভিডিও চালিয়ে দেখেন। কিন্তু পরদিন সকালেই তার বাড়িতে উপস্থিত হন সিআইডি অফিসাররা, সঙ্গে একজন আইবি অফিসার। তদন্তের নিয়ম অনুযায়ী এই আইবি অফিসারের ওখানে কিন্তু উপস্থিত থাকারই কথা নয়। কিন্তু তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং সেই ক্যাসেটটিকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়েই চলে যান এবং নারায়ননের হাতে তুলে দেন। নারায়নন এই গুরুত্বপূর্ণ নথিটি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে সেটিকে বিকৃত করার চেষ্টা করেন। বিকৃত বলতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটে বাদ দেওয়া। তবে এই কেটে বাদ দেওয়ার সময় যাতে পরবর্তীকালে কোনও সন্দেহ তৈরি না হয় সেজন্য সেই জায়গায় অন্য ভিডিও ফুটেজ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এবং এখানেই তাড়াহুড়োতে ভুল করে ফেলে আইবি। তারা ওই জায়গায় যে ফুটেজ ঢোকায় সেটি বাইশে মে’র। এইসব কর্মকাণ্ডের পর ভিডিও ক্যাসেটটি বাবুকে ফেরত দেওয়া হয় এবং ফেরত দেওয়ার সময় কার্যত তাকে হুমকি দেওয়া হয়, এই ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু বললে রাজীব হত্যার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে কেস দেওয়া হবে।

শুধু ভিডিও ফুটেজ বিকৃত করা নয় নারায়নের বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ ওঠে যে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি বিকৃত করতে চেষ্টা করেছিলেন। একুশে মে হত্যাকাণ্ডের তিনদিন পর (২৪ মে ) ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় একটি ছবি প্রকাশিত হয়। ছবিটি তোলা হয়েছিল বিস্ফোরণে নিহত হরিবাবুর ক্যামেরায়। এই হরিবাবু ছিলেন হত্যা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। মূল ছবিটিতে তিন মহিলার সঙ্গে ছিল এক কুর্তা পাজামা পরিহিত পুরুষের ছবি। পরবর্তীকালে মূল ছবিটি প্রকাশিত হলে দেখা যায় এই পুরুষ হচ্ছেন শিবরাজন, যিনি এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান কুচক্রী ছিলেন। ২৪ তারিখে ‘দ্য হিন্দু’ যে ছবিটি প্রকাশিত হয় সেখানে শিবরাজনকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয় ছবি থেকে। কেন বাদ দেওয়া হয় সে প্রসঙ্গে পরে পত্রিকার সম্পাদক এন. রাম জানান, তিনি ভেবেছিলেন ছবিটি একজন নিরীহ সাংবাদিকের। এই জবাব কি খুব একটা যুক্তিগ্রাহ্য, বিশেষত জবাবটি যখন দিচ্ছেন এন রামের মতো প্রখ্যাত এক সাংবাদিক ও সম্পাদক? রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড সম্বন্ধে গবেষণা করে যিনি একটি আস্ত বই লিখে ফেলেছিলেন, সেই হরিশ ভেনুগোপালন তাঁর বইয়ে একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। যেদিন এই ছবি কাগজে ছাপা হয় তার আগের দিন নারায়নন দিল্লি থেকে মাদ্রাজ উড়ে আসেন এবং এন. রামের সঙ্গে দেখা করেন। মূল ছবি থেকে শিবরাজনকে বাদ দেওয়ার সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারের কি কোনও সম্বন্ধ ছিল? যথারীতি এই প্রশ্ন‌ও অমীমাংসিত।

আইবি বিরুদ্ধে আর‌ও একটি অভিযোগ ছিল এই যে, একেবারে শেষ মুহূর্তে (সম্ভবত ১৭ মে) রাজীব গান্ধীর তামিলনাড়ু যাত্রার খবর পাওয়ার পর আইবি, দিল্লি তামিলনাড়ু পুলিশকে যে রিপোর্ট পাঠায় তাতে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সম্ভাব্য আক্রমণের ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা বলা হলেও কোথাও এলটিটিই-র এর উল্লেখ করা হয়নি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৭২ : ঘটজাতক/৭ : ধরি ধরি মনে করি

রাজীব গান্ধীর নির্বাচনী জনসভার তালিকাতে প্রথমে তামিলনাড়ু ছিল না। তামিলনাড়ুর কংগ্রেস নেতা ভজপরি রামমূর্তি প্রথম থেকেই রাজীব গান্ধীর তামিলনাড়ুতে আসার বিপক্ষে ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সরাসরি অভিযোগ তোলেন কংগ্রেস নেত্রী মার্গারেট আলভার বিরুদ্ধে, যিনি রাজীব গান্ধীর জনসভার কর্মসূচি তৈরীর দায়িত্বে ছিলেন। রামমূর্তি অভিযোগ তোলেন আলভাই কর্মসূচির তালিকা হত্যাকারীদের হাতে তুলে দেন। এই অভিযোগকে হয়তো অভিযোগ হিসেবেই উড়িয়ে দেওয়া যেত, কিন্তু সন্দেহ গাঢ় করে তোলেন আলভা নিজে। রাজীবের জনসভার কর্মসূচি তালিকা তৈরি হয় ১৭ মে। এই কথা বলেছেন রাগোথমন, কার্তিকেয়ন, সবাই। এমনকি যার প্রচারের জন্য রাজীব গান্ধী শ্রীপেরামবুদুর যান, গান্ধী পরিবারের সেই ‘আন্টি’ মারাগাথামের প্রচার সচিব একথাও বলেন যে ১৭ তারিখ সন্ধ্যেবেলায় আলভা নিজে ফোন করে মারাগাথামকে এই কথা জানান। অথচ আলভা তাঁর বইয়ে জানাচ্ছেন, রাজীব যে শ্রীপেরামবুদুর যাচ্ছেন, সে কথা তিনি জানতে পারেন ২০ তারিখে। এই মিথ্যার কারণেই সন্দেহের আরেকটা তীর আলভার দিকে ঘুরে যায়। আলভা নিজেকে সন্দেহের তালিকায় যুক্ত করে ফেলেন আরেকটি কারণে। মারাগাথাম নিজে নাকি রাজীবের আসার ব্যাপারে খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না, কেননা ১৭ তারিখে জানার পর মাত্র তিন দিনের মধ্যে সমস্ত ব্যবস্থা করা একটা মস্ত বড় শক্ত কাজ ছিল। এই অবস্থায় আলভাই নাকি কোন‌ও ওজর-আপত্তি না শুনে যাবার দিনটিকে সুনিশ্চিত করে দেন। অথচ সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা এই যে, নির্বাচন সমাপ্ত হবার পর নতুন সরকার যখন গঠন করা হয়, তখন এই আলভাকেই বসানো হয় এমন একটি মন্ত্রকের মাথায় যে মন্ত্রকের কাছেই সিবিআই এর রিপোর্ট করার কথা তদন্তের অগ্রগতি সম্বন্ধে। যার নিজের ভূমিকাই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়, তিনিই আবার তদন্ত কমিটির মাথা, জিজ্ঞাসাচিহ্ন কি এখানেই তৈরি হয়ে যায় না?

এইখানে আরও একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। মারাগাথাম নিজে যে কেন্দ্রের প্রার্থী, সেখানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং আসতে চাইছেন প্রচারে, অথচ প্রার্থী চাইছেন না, এটা কি হতে পারে? হতে পারে। এখানে সময় ছাড়া আরও একটি ব্যাপার ছিল। তিন দিনের মধ্যে সমস্ত ব্যবস্থা করা অসুবিধাজনক হলেও শেষ পর্যন্ত কিন্তু তা করা হয়েছিল। অর্থাৎ সেটি বড় অসুবিধে ছিল না। বড় অসুবিধে যেটা ছিল সেটা অর্থ। এবং এখানেই আরও একটি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মারাগাথামের সঙ্গে রাজীবের পরিবারের একটা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ফলে প্রথম দিকে তিনি চেয়েছিলেন রাজীব যেন অন্তত একবার আসেন তার লোকসভা কেন্দ্রে। পরে তিনি যখন টাকার কথা ভেবে পিছোচ্ছেন তখন আচমকাই তাঁর ছেলে ললিত চন্দ্রশেখরের বন্ধু দারিল পিটারের মাধ্যমে একটা প্রস্তাব আসে। সেই প্রস্তাব আসে শিবরাজনের কাছ থেকে। শিবরাজন নিজেকে এলটিটিই-র প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন ইলম পিপলস রেভোলিউশনারি লিবারেশন ফ্রন্ট-এর সদস্য হিসেবে উপস্থাপিত করে বলেন তাঁরা রাজীবের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তাই তাঁরা চান রাজীব গান্ধীকে মালা দিয়ে সম্বর্ধনা জানাতে। সেই সুযোগ সম্ভব যদি রাজীব গান্ধী পেরামবুদুরে জনসভায় আসেন। এই জন্যে তিনি পাঁচ লক্ষ টাকা অনুদান পর্যন্ত দিতে চান। মারাগাথাম এই প্রস্তাব গেলেন। প্রশ্ন হচ্ছে মারাগাথামকে টাকা দিয়ে সভা করানোর ব্যবস্থা না হয় করা গেল, কিন্তু রাজীবের নির্বাচনী জনসভার তালিকার মধ্যে কিভাবে, কোনও প্রভাব খাটিয়ে, শিবরাজন সেটিকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেন? আরও একটা ব্যাপার এখানে আছে। প্রথমে স্থানীয় কংগ্রেস নেতারা ঠিক করেছিলেন সভা হবে স্কুল মাঠে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেটিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দির মাঠে। কেন এই পরিবর্তন? এই হত্যা ষড়যন্ত্রের যারা গবেষক, যাদের মধ্যে অন্যতম হরিশ ভেনুগোপালন, যার কথা আমরা আগেই বলেছি, তিনি তাঁর বইয়ে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, স্কুল মাঠটি ছিল মূল রাস্তা থেকে একটু দূরে, সেখান থেকে বিস্ফোরণের পর সহজে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু মন্দির মাঠটি একেবারে হাইওয়ে সংলগ্ন, সেখানে অনবরত যানবাহনের যাতায়াত, ফলে দ্রুত পালিয়ে সহজ হবে বলেই এই স্থান পরিবর্তন করা হয়েছিল। বলা বাহুল্য, শেষ মুহূর্তে এই পরিবর্তন কার নির্দেশে বা কার প্রভাবে তার কিন্তু কোনও উত্তর নেই। এই প্রশ্নও অতএব অমীমাংসিত।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

উপন্যাস, পর্ব-৯২ : আকাশ এখনও মেঘলা

রাজীব গান্ধী হত্যা রহস্যের উন্মোচন করেছিল স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম। কিন্তু সেই ঘটনার প্রায় তিরিশ বছর পরেও এই হত্যা রহস্য নিয়ে মানুষের কৌতুহলের নিরসন যে এখনও হয়নি তার অন্যতম প্রধান কারণ এই তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষের আচরণ, যার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠিক যেমন খুঁজে পাওয়া যায় না সেই প্রশ্নের উত্তর, দেশের এক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করার পরও হত্যাকারীদের মুক্তির জন্য কখনও সরকারি তরফে, কখনও কোন‌ও রাজনৈতিক দলের তরফে, কেন বারংবার উদ্যোগ গ্রহণ, কেনই বা শেষ পর্যন্ত তাদের মুক্তি। স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিমের যিনি ছিলেন মাথা, ডি.আর.কার্তিকেয়ন, অজস্র অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্নের তিনি আর এক অন্যতম প্রধান চরিত্র।

কার্তিকেয়ন একদিকে যেমন তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, তেমনি বারবার তিনি একটা জিনিসকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করেছেন, তাদের তদন্ত যেন কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বের করে না ফেলে। স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিমের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন সিবিআই এর এসপি অমিত ভার্মা। তিনি যখনই চেয়েছেন এই হত্যা ষড়যন্ত্রের পেছনে কোনও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা খুঁজে দেখতে, তখনই তাঁকে আটকান এই কার্তিকেয়ন। অমিত ভার্মা চেয়েছিলেন ফ্রান্সে গিয়ে এলটিটিই নেতা পুষ্পরাজের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু তাঁকে তা করতে দেননি সিট প্রধান। একই রকম অভিযোগ করেছেন সিট টিমের আর এক সদস্য এনএসজি ক্যাপ্টেন এ
কে রবীন্দ্রন।

রবীন্দ্রনের অভিযোগ ছিল, শিবরাজনকে ‘জীবিত’ ধরার সুযোগটি হাতছাড়া হয় কার্তিকেয়ন ইচ্ছাকৃতভাবে অনুমতি দিতে দেরি করায়।

সিট প্রধান হিসেবে কার্তিকেয়নের নিয়োগটি বিতর্কিত মনে হবে যদি তাঁর পরবর্তী কার্যকলাপ লক্ষ করি। হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পরে প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর তামিলনাড়ু সরকারের কাছ থেকে তিনটি নামের প্রস্তাব চেয়েছিলেন সিট প্রধান হিসেবে। সেই তালিকা এলে তিনি নাকি সোনিয়া গান্ধীকে সেই তালিকা দেখিয়ে কাকে তিনি পছন্দ করছেন জানতে চান। এবং সোনিয়া গান্ধী নাকি তিনটি নামকেই বাতিল করে দিয়ে কার্তিকেয়নের নাম প্রস্তাব করেন। যদি এই ঘটনা সত্যি বলে ধরে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীকালে যেভাবে কার্তিকেয়ন একের পর এক রাজনৈতিক নেতাদের আড়াল করার চেষ্টা করে গেছেন, তাতে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে প্রশ্নের উত্তর ও যথারীতি অমীমাংসিত, কে তিনি যিনি সোনিয়া গান্ধীকে এইভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন? কারণ সেই মুহূর্তে সোনিয়া গান্ধীর কোনোরকম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই ছিল না। বস্তুত চাকরি জীবনের শুরু থেকেই কার্তিকেয়নের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ ছিল, তিনি যত না বেশি পুলিশ আধিকারিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এবং এই অভিযোগের কারণ ছিল কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। পরবর্তীকালে তদন্তের স্বার্থে যখন ডিএমকে নেতা করুণানিধি বা এমডিএমকে নেতা ভাইকোকে জেরা করার প্রয়োজন হয়েছে তখন তিনি তা করতে দেননি। ১৯৯২ সালের প্রথম দিকে ভাইকোকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল মল্লিগাই-এ সিবিআই-এর অস্থায়ী দপ্তরে ভাইকো এসেছিলেন। কিন্তু তাকে জেরা করার আগেই সেখানে এসে উপস্থিত হন কার্তিকেয়ন এবং ভাইকোকে ডেকে নিয়ে অন্যত্র চলে যান। কখনও এই কেসের আইও রাগোথামনের ইন্টারভিউ, কখনও স্যাম রাজাপ্পার লেখা, কখনও বা হরিশ ভেনুগোপালনের বই থেকে এই সমস্ত তথ্য সহজেই পাওয়া যায়।

যেদিন রাজীব গান্ধীর শ্রীপেরামবুদুরে জনসভা করার কথা রাত্রি আটটায়, ঠিক সে-দিনই সন্ধ্যা ছয়টায় করুণানিধির জনসভা ছিল সেখানেই, তবে অন্য একটি মাঠে। করুনানিধির সভাটি সামান্য আগে বাতিল করে দেওয়া হয়। কেন বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল, এই প্রশ্ন নিয়ে রাগোথামন করুণানিধিকে জেরা করার অনুমতি চাইলে কার্তিকেয়ন তাঁকে অনুমতি দেননি। তিনি বলেছিলেন, স্থানীয় ডিজিপি রঙ্গস্বামীর পরামর্শক্রমেই এই কাজ করা হয়েছিল। অথচ পরবর্তীকালে এই রঙ্গস্বামী ভার্মা কমিশনের সামনে উপস্থিত হয়ে জানান, ডিজিপি হিসেবে তাঁর কর্তব্য ছিল দুটি মিটিংয়ের জন্যই যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রদান করা এবং তিনি তা করেছিলেন। যদি ধরে নিই রাগোথামন মিথ্যা কথা বলছেন, তাহলেও কি একথা ধরা যায় যে একজন ডিজিপি একটি তদন্ত কমিটির সামনে উপস্থিত হয়ে মিথ্যা এফিডেভিট দিয়েছেন? যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে মিথ্যা কথা বলার অভিযোগ কার বিরুদ্ধে তোলা যায়?
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

শারদীয়া স্পেশাল : সুদূর অতীতে উঃপূর্বাঞ্চলে দুর্গাপুজো

তবে কার্তিকেয়ন রাগোথামনকে জেরা করার অনুমতি না দিলেও কোর্ট কিন্তু যেটা করেছিল এবং সেখানে তাকে একটি ভিডিওর কথা বলা হয়, যে ভিডিওতে নাকি ভাইকোকে প্রভাকরণের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল। ভাইকো তা অস্বীকার করলে তাঁকে সেই ভিডিওটি দেখানো হয়। তৎক্ষণাৎ ভাইকো বলেন যে ভিডিওর লোকটি তিনি, কিন্তু গলাটি তাঁর নয়। পরবর্তীকালে ভিডিওর গলা এবং ভাইকোর গলার ফরেনসিক টেস্ট করে দেখা যায় ভাইকো মিথ্যা বলেছেন। কেন এমন একটি লোককে কার্তিকেয়ন আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন সে প্রশ্নের উত্তর যথারীতি অমীমাংসিত।

কার্তিকেয়ন, যদি ধরেও নিই যে তদন্তভার হাতে নেওয়ার আগে জানতেন না, তাহলেও বিভিন্ন ঘটনাক্রম থেকে একথা মনে না হওয়ার কোন কারণ নেই যে, পরবর্তীকালে তিনি হত্যার পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রটি সম্বন্ধে যেকোনোভাবেই হোক ওয়াকিবহাল হয়েছিলেন, এবং তাই বারবার আসল তথ্যটিকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে পাশাপাশি এই প্রশ্ন উঠতে পারে যে কার্তিকেয়ন কিছুই জানতেন না সেটা কি ঠিক? যদি ঠিক হয়, তাহলে এই তদন্তভার হাতে নেওয়ার শর্ত হিসেবে তিনি কেন বলেছিলেন, এই তদন্তের ভার তিনি হাতে নেবেন তখনই যখন তদন্তের উপর কোনওরকম রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না? পরবর্তীকালে কার্যত যে হস্তক্ষেপ তিনি নিজেই ডেকে এনেছিলেন। তাহলে কি আমরা ভাবতে পারি, চোরের মায়ের বড় গলা?

ষড়যন্ত্রের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানে কার্তিকেয়ন যে বাধা দিয়েছিলেন সেই অভিযোগ প্রায় সবাই করেছেন। শিবরাজনকে শেষ পর্যন্ত যে বাড়ি থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় সেই বাড়ির মালিক রঙ্গনাথ একটি সাক্ষাৎকারে সরাসরি এমন অভিযোগ তুলেছিলেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গডম্যান চন্দ্রস্বামী এবং একজন শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেস নেতার যোগ ছিল। রঙ্গনাথনের বক্তব্য, তিনি এলটিটিইর আততায়ী গ্যাংয়ের এক মহিলা সদস্য সুভা এবং শিবরাজনের কথাবার্তা থেকে সেটা জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই কথা তিনি যখন সিটের কাছে বলতে যান তখন কার্তিকেয়ন তার বিবৃতি নথিভুক্ত তো করেন‌ই-নি, বরং শাসিয়ে ছিলেন যদি এই কথা রঙ্গনাথ অন্যত্র, কোনও ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্য কারও কাছে বলতে যায়, তাহলে তার ফল ভালো হবে না। তবে এই যে সাক্ষাৎকার তার বিরুদ্ধে কিন্তু কোনও পদক্ষেপ কার্তিকেয়নের দিক থেকে নেওয়া হয়নি। যদি তা মিথ্যা হয়, তাহলে কেন নেওয়া হয়নি, এই প্রশ্ন তো আমাদের মনে উঠতেই পারে।

পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ায় এইরকম বহুবিধ জিজ্ঞাসাচিহ্ন বারংবার তৈরি হয়েছে, যার কোনওরকম উত্তর আজও অজানা, প্রশ্ন অমীমাংসিত। তবে তদন্ত কমিটির মাথাদের নানাবিধ কার্যকলাপ থেকে একথা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে, তারা একদিকে যেমন তদন্ত করেছেন, তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করেছেন, তেমনি এই হত্যা ষড়যন্ত্রে এই দেশের মাটিতে কে মীরজাফর তা জানার পরেও তাকে আড়াল করার প্রাণপণ চেষ্টা করে গিয়েছেন। বলা বাহুল্য তারা সফল। তাদের সাফল্য আরেকবার প্রমাণিত করেছে, ভারতবর্ষ মীরজাফরের দেশ।—শেষ।
* অনিন্দ্য ভুক্ত (Anindya Bhukta) অর্থনীতির অধ্যাপক, নেতাজি মহাবিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content