রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
সেই যে ডাক্তার তাকে এখানে রেখে গেলেন, আর তাঁর টিকিটিও নুনিয়া দেখতে পেল না গত দু’-দিন। অবশ্য সে জানে, নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে, যার জন্য ডাক্তার আসছে না এখানে। তার একটা কারণ যে, তার নিজেরই সেফটি বা নিরাপত্তা, তা সে জানে। সে এখানে আছে জানতে পারলে, যারা তার পিছু ধাওয়া করেছিল, তারা মুহূর্তের মধ্যে এখানে এসে ঠিক কী-কী-যে করতে পারে, সে-সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা না থাকলেও, আন্দাজ করতে পারে সে। সেদিন যদি সে ধরা পড়ত, তাহলে আজ এই ভাবনাটুকু ভাবার জন্য সে যে বেঁচে থাকত না, সে-ব্যাপারে কোনও সন্দেহই নেই তার। ডাক্তার হয়তো এ-কারণেই এখানে তার লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। ওরা সহজে আন্দাজই করতে পারবে না যে, ডাক্তারের কোয়াটার্সের হাত-খানেকের মধ্যেই সে লুকিয়ে আছে শেফালিকা বিশ্বাস দিদির বাড়ি। সেদিন যদি দিদি রাজি না হতেন, তাহলে ডাক্তার যে তাকে নিয়ে ঘোর বিপদে পড়তেন, তা নুনিয়া জানে। এ-জন্য ডাক্তারের পাশাপাশি সে-ও শেফালিকা দিদির কাছে ঋণী। এখানে আসবার পর যখন সে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল, তখন দিদি তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলেছিলেন, “ভয় কীসের নুনিয়া, আমি বেঁচে থাকতে তোমার গায়ে আঁচটি লাগতে দেব না। কেবল তুমি এই ক’দিন ঘরের মধ্যেই থেকো। জানালায় উঁকি দেবে না বা বারান্দায় বেরুবে না। মুখ ঢেকেও না। কারণ, সকলেই জানে, আমি একা থাকি। সেখানে তোমাকে মুখ ঢেকে বেরুতে দেখলেও সকলে সন্দেহ করবে, তখন যা বা যারা তোমার পিছনে পড়েছে, তারা ছেড়ে কথা বলবে না। মনে রাখবে, আমার মন বলছে, ওরা তোমাকে না পেয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে। যদি ঘুণাক্ষরেও টের পায়, তুমি এখানে আছো…”
কথা শেষ করল না শেফালিকা দি, কিন্তু নুনিয়া বুঝে গেল, তিনি ঠিক কী বলতে চাইছেন। তার যদিও তারপরেও ইচ্ছে করছিল, একবার জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বাইরেটা দেখে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের টাটকা-তাজা হাওয়া খায়, কিন্তু অনেক ভেবে নিজেকে সংযত করেছে। এখানে সে লুকিয়ে আছে, এ-অবস্থায় তার যে-কোন প্রকার গোঁয়ার্তুমি যে আরও বড় বিপদ ডেকে আনবে, তা সে বুঝতে পারছে বলেই নিজেকে সামলে নিয়েছে। তাছাড়া বিপদ তো কেবল তার একার হবে না, ডাক্তারবাবুর হবে, শেফালিকা দিদির হবে। তার জন্য এঁরা সকলে বিপদে পড়ুন, তা সে একেবারেই চায় না।

শেফালিকাদির কোয়াটারে দুটি ছোট শোবার ঘর, একটি ভাঁড়ার ঘর, একফালি কিচেন এবং একটি ওয়াশরুম। এছাড়া জালঘেরা বারান্দাও আছে সামনে-পিছনে। কয়েকহাত করে জমি বাদ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ও-পাশেই রেশমা দিদি বলে আর-একজন নার্স থাকেন, সে জানে। যদিও নুনিয়া যে এখানে, এই শেফালিকাদির বাড়িতে আত্মগোপন করে আছে, সে-কথা এখন রেশমাদিদি জানে না। ডাক্তার না-কি শেফালিকাদিকে পইপই করে বারণ করে দিয়েছেন, যাতে তিনি ছাড়া আর কেউ যেন না জানে, নুনিয়া এখানে লুকিয়ে আছে। সাবধানের মার নেই। কে যে কখন কোন্ বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা যদি আগে থেকে জানা যেত! আসলে কাউকেই বিশ্বাস করেন না ডাক্তার। যা পরিস্থিতি, তাতে কাউকে বিশ্বাস করাও যায় না। ফাদার রডরিগকেও না, সাইকেল মাহাতোকেও না, এমনকি গোবিন্দ সোরেনকেও না!
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৮: আপৎকালীন পরিস্থিতি

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৬: বিষণ্ণ সকাল, নিঃসঙ্গ আদিনাথ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯১: যারা সময়ের স্রোতে নত হতে জানে, তারাই টিকে যায়; যারা আগুনে ঝাঁপায়, তারাই পুড়ে মরে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৭: বিলেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অস্ত্রোপচার

নুনিয়া এখানে আছে দু’টি শোওয়ার যোগ্য ঘরের একটিতেও না। সে গত পরশু থেকে লুকিয়ে আছে ভাঁড়ার ঘরে। শোওয়ার ঘরের একটিতেও তাকে রাখার রিস্ক নেননি শেফালিকা। প্রথম কারণ হল, তাকে সে-দুটি ঘরের যে-কোন একটিতে লুকিয়ে রাখতে হলে, সেই ঘরের জানালা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। এতদিন সে-ঘরদুটির জানালা খোলা হত। এখন হঠাৎ করে বন্ধ রাখলে লোকেরা কৌতূহলী হবে কারণ জানতে, তারপর তাদের কৌতূহলের সূত্র ধরে হাজির হবে ভয়ঙ্কর কিছু মানুষের দল। অন্যের ব্যাপারে অসঙ্গত কৌতূহল খুব সাঙ্ঘাতিক জিনিস। আর এ-জাতীয় অসঙ্গত কৌতূহল অনেক অসঙ্গত সন্দেহেরও জন্ম দেয়। শেফালিকা জানেন, এ-ধরণের যাবতীয় সন্দেহের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে হবে নুনিয়াকে। চেষ্টাও করে যাচ্ছেন গত দু’দিন ধরে।

এমনিতে তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন। শাক-পাতা কিংবা নুন-ভাত পেলেই সন্তুষ্ট থাকেন। বিলাসিতা বলতে, সপ্তাহে একদিন হয়তো সামান্য চিকেন আনালেন, কিংবা হাঁসের ডিম। আর প্রতিদিন হাফ লিটার করে দুধ। এটুকুই তাঁর একক জীবনের একমাত্র চাহিদা। বিগত সাত-আট বছর ধরে এখানকার লোক এমনটাই দেখে আসছে। কিন্তু যা তাঁর নিজের জন্য যথেষ্ট, নুনিয়ার জন্য তা নয়। তিনি নিজে নুন-ভাত খান বলে নুনিয়াকেও নুন-ভাত দেবেন, এমন তো হতে পারে না। সুতরাং নুনিয়ার জন্যই তাঁকে গত দু’দিন ভালোমন্দ রান্না করতে হচ্ছে। এখান থেকে বাজার নেহাত কাছে নয়। তাও শাক-সব্জি কিংবা হাঁসের ডিম কিনতে গেলে সপ্তাহে মঙ্গল আর শুক্রবার—যে-দু’দিন হাট বসে, সেজন্য অপেক্ষা করতে হয়। অন্যদিন কিছু দরকার হলে, কিছুটা দূরে খান দুই মুদির দোকান আছে, সামান্য বেশি দানে কিনতে হয়। নিজের জন্য যৎসামান্য দরকার হয় বলে, হাটের দিনে গোবিন্দ গেলে তাকেই ফর্দ ধরিয়ে দেন। গোবিন্দ এনে দেওয়ার বদলে দশ-বিশ টাকা পায়। এটাই তার লাভ। কিন্তু গতকাল গোবিন্দকে না বলে নিজেই গিয়েছিলেন মুদির দোকানে। ডিম, চাউমিনের প্যাকেট, নিমকি বিস্কুট, চানাচুর—এসব কিনে এনেছেন। মুদি একটু অবাকই হয়েছিল। জিজ্ঞাসা করেছিল, “কেউ এসেছে বুঝি? আপনার আত্মীয়স্বজন?”
“কেন?” একটু সতর্ক হয়ে প্রতি-জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি।
“না, আপনি তো একা থাকেন গো। সামান্যই জিনিসপত্র দরকার হয়। এর আগে কুনোদিন চাউমিন, নিমকি বিস্কুট—এ-সব কিনতে দেখি লাই তো! সেজন্য জিজ্ঞাসা করলাম বট্যে!”
“আরে না না, কে আবার আসবে ? এখানে মেয়ে-জামাই আসতে চায় না। আমিও রিট্যায়ারমেন্টের পর এখান থেকে মানে-মানে সরে পড়তে পারলে বাঁচি!”
মুদি একটু আহত হয়, “ক্যানে দিদি? আমরা কি এতই খারাপ বট্যে?”
“না না, তা নয়। এখানে তো একা থাকি। অবসরের পর মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনিদের নিয়ে থাকবো, সেটাই বলতে চাইলাম। এখানে পড়ে থাকলে তো তাদের কাছে পাবো না!”
মুদি বলল, “সিটো ঠিক কথা বলেছেন বটে গো! নিজের জনের চেয়ে বড় আর কে আছে?” তারপর বলল, “তাহলে নিজের জন্যই এ-সব কিনলেন দিদি?”
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৩: সুন্দরবনের পাখি: বাটান

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

শেফালিকা দেখলেন, ভবি ভোলবার নয়। ফলে বললেন, “হ্যাঁ নিজের জন্যই বটে। একঘেয়ে খাবার খেতে-খেতে মুখে অরুচি ধরে গিয়েছিল, ভাবলুম, খাই না, সেই কবে কোনকালে খেয়েছি মনেও নেই, তা একটু চাউমিন করে খাবো না-হয় ! আমার রান্নার হাত যদিও খারাপ…!”
মুদি শেফালিকার রান্না খায় নি, ফলে তার জানার কথাও নয়, দিদি কেমন রান্না করেন। অতএব সে বেকুবের মতো তাকিয়ে থাকল শেফালিকার দিকে।
শেফালিকা ব্যস্ততার ভাণ করলেন, যেন এই সামান্য কথা বলতেই কত দেরি হয়ে গিয়েছে তাঁর। জিনিসপত্র থলের মধ্যে ভরতে-ভরতে বললেন, “ইস্, দেখেছ, কথায়-কথায় কত বেলা হয়ে গেল! ওখানে এতক্ষণে হয়তো পেশেণ্টরা এসে আমাকে গালমন্দ করতে শুরু করে দিয়েছে !” বলে দ্রুত চলে এসেছিলেন মুদির দোকান থেকে।

আসছেন, হঠাৎ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন কেমন সতর্ক করল। একটা অস্বস্তি। কেউ কি অনুসরণ করছে তাকে? পিছু-পিছু আসছে তাঁর ? অথবা আড়াল থেকে দেখছে তাঁর কার্যকলাপ? তাহলে কি সেই ধরাই পড়ে গেলেন? ডাক্তার বলার পরে যথেষ্টই সতর্ক ছিলেন তিনি, তাও কি শেষরক্ষা হল না? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন। নাহ্, পিছনে অস্বাভাবিক কাউকেই চোখে পড়ল না। এ-দিকে কিছু বাড়িঘর, কৃষিদপ্তরের একটি অফিস, পান-বিড়ির দোকান ইত্যাদি আছে। সেখানে যেমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দু’-চারজন থাকে, তেমনই আছে। তারা যে-যার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। শেফালিকার দিকে তাকিয়ে বসে নেই কেউই। একজন আদিবাসি মেয়ে মাথায় শুকনো কাঠকুটোর বোঝা নিয়ে দুলকি চালে চলে গেল তাঁকে পেরিয়ে। তবু কেন তাঁর অস্বস্তি যাচ্ছে না বুঝতেই পারলেন না শেফালিকা। পিছন-পিছন কেউ আসছে কি-না দেখবার জন্য খানিক দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, আবার যেই চলতে শুরু করলেন, মন জুড়ে সেই অস্বস্তি ফিরে এল। কেউ যেন দেখছে তাঁকে। কারুর সতর্ক দৃষ্টির আওতায় এখন তিনি। আর-একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন শেফালিকা। কিন্তু নাহ্, আগের মতোই, সব স্বাভাবিক। আর দেরি করলেন না। মনের ভুল হতে পারে ভেবে দ্রুত চলতে শুরু করলেন। মনে যদিও অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করতে লাগলো। নিজের কোয়াটারে ঢুকেও কাঁটাটা গেল না।

দরজায় হুড়কো টেনে তালা দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পিছনের বারান্দার দরজা কেবল ভিতর থেকে বন্ধ। কোনও জরুরি প্রয়োজনে সেদিক দিয়েই বেরোনো যাবে তিনি বাড়িতে না-থাকলে। দরজায় তালা অটুট দেখে কাহ্নিকটা নিশ্চিন্ত হলেন তিনি। না-হলে ওই লোকগুলির কাছে এই পলকা তালা কিছুই না। কিন্তু কী করবেন শেফালিকা? দামি তালা এতদিন দরকার পড়েনি বলেই কেনেননি। তাছাড়া ওইরকম একটা তালার দামও তো কম নয়। হাজারের কাছাকাছি হবে। তাঁর নিজের আছেটাই বা কী যে, দামি তাকা কিনবেন? এতদিন তো দরকার পড়ত না। তিনি ঘরে থাকলে দরজা তো খোলাই পড়ে থাকত। এখানে তেমন চোর-ছ্যাঁচোড় কেউ নেই যে, হেলথসেন্টারের চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে শেফালিকার ঘর থেকে জিনিসপত্র চুরি করবে। আজ অবধি কখন হয়নি তেমন। কিন্তু নুনিয়া আসার পর স্বাভাবিকভাবেই সেই ব্যবস্থার কিছু বদল করতে হয়েছে। হুট করে এখন কেউ ঢুকে পড়লেই বিপদ।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?

ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করার আগে বাইরে উঁকি মেরে দেখে নিলেন তিনি। কেউ দেখছে না তো? বাইরে অবশ্য কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। হেলথসেন্টারে আজ তেমন কোন পেশেন্ট নেই। কাল ডাক্তার ছিলেন না, একটা হুজ্জুতি হয়েছে, সেই কারণেই বোধহয় আজ পেশেন্ট তেমন আসেনি। সকালের দিকে যাও বা দু’-চারজন ছিল, ডাক্তার নেই জেনে তারাও সঙ্গে-সঙ্গে চলে গিয়েছে। এখন একেবারেই ফাঁকা। দরজাটা তাড়াতাড়ি করে বন্ধ করে দিলেন তিনি। সাবধানের মার নেই! তারপরেই কোনমতে মেঝেয় থলেটা নামিয়ে খোঁজ করলেন নুনিয়ার। মেয়েটি যা ছটফটে আর উড়নচণ্ডী স্বভাবের ছিল। কখন যে কী করে বসবে তার ঠিক নেই। ইচ্ছে করে না-হলেও মনের ভুলেও যদি বাইরে উঁকিঝুঁকি মেরে বসে তাহলেই সর্বনাশ। অথচ ওর যা বয়স, তাতে গৃহবন্দি থাকতে পছন্দ করাটাই অস্বাভাবিক। ভাঁড়ার ঘরে যেখানে জিনিসপত্র সরিয়ে মেঝের উপর বিছান পেতে নুনিয়ার থাকার জায়গা করে দেওয়া হয়েছে, সেখানে নুনিয়া ছিল না। ছাঁত্ করে উঠল শেফালিকার বুক। সর্বনাশটা তবে হয়ে গেল না-কি? তাড়াতাড়ি অন্য দুটি ঘর, কিচেনে উঁকি মেরে দেখলেন তিনি। নাহ্, কোথাও নুনিয়া নেই। সর্বনাশ। ওরা কি তবে কোন উপায়ে ধরে নিয়ে গেল মেয়েটিকে? এখন কী হবে? ডাক্তারবাবু ফিরে এলে কী জবাব দেবেন তিনি? এত বিশ্বাস করে তাঁর কাছে নুনিয়াকে রেখে দিয়ে গিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু! নিজের উপর রাগে মাথার চুল খিমচে ধরলেন তিনি। মুদির দোকানে এ-ভাবে না গেলেই হতো! কোথায় ভেবেছিলেন, নুনিয়াকে একটু এগ-চাউ বানিয়ে দেবেন, তাঁড় নিজের নাতনিও খুব ভালোবাসে। মেয়ে-জামাইয়ের কাছে গেলেই আবদার করে, ‘দিদিমা, এগ-চাউ বানাও। মা বানিয়ে দেয় না!’ মনে পড়ায় চোখে জল এসে যায় তাঁর। কতদিন দেখেননি নাতিকে। নুনিয়াও তো তাঁর নাতনিরই মতো। হয়তো সামান্য বড়। কিন্তু সম্পর্কটা একইরকম। কিন্তু তিনি এত কেয়ারলেস যে, তাকে রক্ষা করতে পারলেন না। চোখ ফেটে জল আসছিল তাঁর। এখন কী করবেন? কাকে বলবেন? বললেই তো একরাশ প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে তাঁকে। ডাক্তার ফিরে এলে কি আর মাফ করতে পারবেন শেফালিকাকে? এখন তো তিনিও নেই। কোথায় যে গেলেন মানুষটি! এখন কী করা উচিৎ তা ভেবে পেলেন না শেফালিকা। মাথায় হাত দিয়ে মেঝের উপরে বসে পড়লেন। তাঁর চোখে দিয়ে জল বেরিয়ে এল। লজ্জায় দুঃখে আত্মগ্লানিতে চুরমার হয়ে যাচ্ছেন তিনি এখন। চোখ বন্ধ করে কেবল বললেন, “ও মাই গড্! সেভ হার জেসাস!”
“দিদি, মেঝের উপর বসে আছ কেন? কী হয়েছে?”
আচমকা নুনিয়ার গলার আওয়াজ পেয়েই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন তিনি। কে? কে কথা বলছে ? এইমাত্র জেসাসের কাছে প্রার্থনা জানালেন, আর তা পূরণ হয়ে গেল?
“নুনিয়া! তুই কোথায় ছিলি? আমি যে তোকে সব ঘরে খুঁজেও দেখতে পেলাম না! কোথায় ছিলি?”
“আলমারির পিছনে। নুন মাখিয়ে তেঁতুল খাচ্ছিলাম!”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৬: জীবন নিয়ে কৌতুক আর ‘যৌতুক’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

শেফালিকা অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর শোওয়ার ঘরে একটা আলমারি আছে। অনেককালের পুরানো। পাল্লা বন্ধ করার সময় বিকট আওয়াজ হয়। এখানকার কোয়াটার্সগুলির মেঝে ভালো করে তৈরি নয়। সমান নয়, এদিক-ওদিক ঢালু। ফলে আলমারি দেওয়ালের থেকে খানিক সামনে এনে রাখতে হয়েছে। অনেককাল থেকেই আছে অবশ্য। পিছনটায় ক্বচিৎ-কদাচিৎ সময় পেলে ঝাড়ু লাগান। নাহলে মাকড়শা আর আরশুলারা তাদের আঁতুড়ঘর হিসেবেই ব্যবহার করে। সেই নোংরার মধ্যে ঢুকে মেয়েটা নুন দিয়ে তেঁতুল খাচ্ছিলো?
তিনি বললেন, “তেঁতুল কোথায় পেলি?”
নুনিয়া হাতের তেঁতুল চাটতে-চাটতে বলল, “কেন যে-ঘরে আছি সেই স্টোর-রুমের তাকেই তো ছিল। খুব খিদে পেয়ে গিয়েছিল, সেজন্য তেঁতুল খাচ্ছিলাম!”
নুনিয়ার খিদে পাওয়ার কথায় শেফালিকা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বললেন, “ওসব ছাইপাঁশ খাস না। আমি এগ-চাউ বানিয়ে দিচ্ছি তাই খা!”
“বেশ। ততক্ষণ তেঁতুলটা খাই,” বলে আবার তেঁতুল চাটায় মন দিল নুনিয়া।
এগ-চাউ বানাতে-বানাতে শেফালিকা জিজ্ঞাসা করলেন, “হ্যাঁ রে, তা এমনিতেই দিব্যি খেতে পারতিস, আলমারির পিছনে গিয়েছিলি কেন?”
“না-হলে ওরা দেখে ফেলত যে?”
“ওরা? ওরা মানে? কারা দেখে ফেলত?”
“ওই যে পিছনের বারান্দার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে যে লোকটা দেখবার চেষ্টা করছিল!”
নুনিয়ার কথা শুনে গা-হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল শেফালিকার। কে? কারা দেখবার চেষ্টা করছিল ? তাদের মতলবটাই বা কী?
চাপা গলায় আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি, “নুনিয়া! কারা তারা? চিনতে পেরেছিস?”
নাহ্। তবে সাইকেল মাহাতোর সঙ্গে দেখেছি। ওরই চ্যালা হবে!” নির্বিকার মুখে বলল নুনিয়া।
“তোকে দেখতে পেয়ে গিয়েছে নিশ্চয়ই?”
“না না, আমি তেঁতুল খাচ্ছিলাম এখানে বসেই। হঠাৎ পিছনের বারান্দায় শব্দ শুনে আমার সন্দেহ হওয়ায় আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখি, একটা লোক বারান্দার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে ভিতরে দেখবার চেষ্টা করছে! আমি ওমনি চুপিসাড়ে আলমারির পিছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকলাম। আর বেরুইনি। তুমি আসতে তবে বেরুলাম!”

শেফালিকা পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। যা সর্বনাশ হওয়ার তা হয়ে গেছে। ওরা সন্দেহ করেছে যে, নুনিয়া এখানে লুকিয়ে থাকতে পারে। আর একবার যখন সন্দেহ হয়েছে, ওরা আবার আসবে, হয়তো আজ রাতেই। তার আগে যেভাবেই হোক নুনিয়াকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু কীভাবে? এগচাউ বানাতে-বানাতে শেফালিকা আসন্ন এই বিপদ থেকে কে তাঁকে বাঁচাতে পারে, তার নাম মনে করার চেষ্টা করছিলেন!—চলবে।

* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content