
সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পে ইরাবতী ডলফিন। ছবি সংগৃহীত।
ইরাবতী নামটা প্রথম শুনেছিলাম স্কুলজীবনে ভূগোল পড়তে গিয়ে। জেনেছিলাম মায়ানমার অর্থাৎ পূর্বতন বার্মা বা ব্রহ্মদেশের প্রধান নদী হল ইরাবতী। হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে মিশেছে আন্দামান সাগরে। তারপর এই নদীটার নাম আবার দেখতে পাই রবীন্দ্রচর্চা করতে গিয়ে। রবীন্দ্রনাথের ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থের ‘মোহানা’ কবিতায়—
“ইরাবতীর মোহানামুখে কেন আপনভোলা
সাগর তব বরণ কেন ঘোলা।”
সাগর তব বরণ কেন ঘোলা।”
তারপরে ভারতের প্রথম মহিলা নৃতাত্ত্বিক হিসেবে যাঁর কথা জেনেছিলাম তাঁর নাম ইরাবতী। ইরাবতী কার্ভে। আর ইরাবতী নামটা আরও একটা যে কারণে শুনেছি তা হল ডলফিন সম্বন্ধে পত্র-পত্রিকায় পড়াশোনা করতে গিয়ে। জেনেছিলাম সুন্দরবন অঞ্চলে এক ধরনের ডলফিন পাওয়া যায় যার নাম ইরাবতী ডলফিন। পরে জেনেছি যে এই ডলফিন ইরাবতী নদীর মোহনাতে রয়েছে, তবে বর্তমানে তার সংখ্যা খুবই কম।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫০: তারখেল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৭ : হাঙরের পেটে মুক্তো

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড এবং বাংলাদেশে এই ডলফিন কিছু পরিমাণে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সর্বাধিক রয়েছে বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশে। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলের নদী, খাঁড়ি ও মোহনা অঞ্চলে কিছু পরিমাণে ইরাবতী ডলফিন পাওয়া যায়। সত্যি কথা বলতে কি, সুন্দরবনের ভূমিপুত্র হিসেবে ছোট থেকে গঙ্গার ডলফিন অর্থাৎ শুশুক অনেক দেখেছি, এখনও দেখি, কিন্তু ইরাবতী ডলফিন নামটাই শুনেছি পত্রপত্রিকা পড়তে গিয়ে। এই ধরনের ডলফিন যে সুন্দরবন অঞ্চলে দেখা যায় তা আগে আমি কারও মুখে শুনিনি। নিশ্চিতভাবে অনেকেই জানেন কিন্তু আমার সাথে হয়তো সরাসরি তাঁদের কখনও কথা হয়নি। সে যাই হোক, যখন জানলাম তখন ইরাবতী ডলফিনদের কথা কিছু আলোচনা করা যাক।

ইরাবতী ডলফিনের উল্টো লাফ। ছবি সংগৃহীত।
ইরাবতী ডলফিনের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Orcaella brevirostris’। ল্যাটিন শব্দে ‘Orca’ এর অর্থ হল ছোট পেটওয়ালা পাত্র। যেহেতু ইরাবতী ডলফিন আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট ও গাট্টাগোট্টা তাই গণ হিসেবে এই নামকরণ সার্থক। প্রজাতির নাম ‘Brevirostris’ হওয়ার কারণ শব্দটির অর্থ হল ছোট চঞ্চুযুক্ত। এদের মুখটা খুব ভোঁতা যা সচরাচর ডলফিনদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। তাই প্রজাতির নামকরণও যথার্থ। ১৮৫২ সালে বিশাখাপত্তনম থেকে প্রাপ্ত ইরাবতী ডলফিনের একটি নমুনা দেখে বিখ্যাত ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী তথা প্রত্নবিজ্ঞানী স্যার রিচার্ড আওয়েন ১৮৬৬ সালে এই বিজ্ঞানসম্মত নামকরণ করেন।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৩৪: অমিতাভ হত্যারহস্য / ১৫

ক্যাবলাদের ছোটবেলা, পর্ব-৩৭: লোকে যারে বড় বলে
ডলফিন হিসেবে ইরাবতী ডলফিন আকারে খুব একটা বড় নয়। লম্বায় হয় ৭.৫ ফুট থেকে ৯ ফুট। আর ওজন ৯০ থেকে ২০০ কেজি। তবে এদের চেনার সব থেকে ভালো উপায় হল মাথা পর্যবেক্ষণ করা। এদের মাথাটা অনেকটা গোলাকার আর সচরাচর ডলফিনের মুখ যেমন লম্বা ও বিস্তৃত হয়, সেখানে ইরাবতী ডলফিনের মুখ হয় ভোঁতা। তাছাড়া অন্যান্য ডলফিনের তুলনায় এদের ঘাড়ও হয় বেশ লম্বা ও নমনীয়। এদের একটা পৃষ্ঠ পাখনা থাকে যা বেশ ছোট, তিনকোনা বা কিছুটা গোলাকার। পাখনাটি দেহের দুই-তৃতীয়াংশ পিছনের দিকে অবস্থান করে। শুশুকের থেকে এই বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায় ইরাবতী ডলফিন ও গঙ্গার শুশুক সহজে পৃথক করা সম্ভব। ইরাবতী ডলফিনের ফ্লিপার দুটি যেমন লম্বা তেমন চওড়া, আর আগার দিকটা কিছুটা গোলাকার। এদের বাতাস নেওয়ার জন্য মাথার উপরের দিকে ছিদ্রটি (Blowhole) মধ্যরেখার সামান্য বামদিকে থাকে। এদের নীলচে কালো দুটো চোখ ঠিক যেন কাচের গুলি। মুখটা বাচ্চাদের মতো এত মিষ্টি যে দেখে আদর করতে ইচ্ছে হয়! এদের উপরের চোয়ালে গোঁজের মতো দেখতে ১২ থেকে ২০ জোড়া এবং নিচের চোয়ালে ১২ থেকে ১৮ জোড়া সরু সরু দাঁত থাকে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৮: রাক্ষস খর ও রামের সংঘাতে, যুদ্ধের বিবিধবার্তা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা
ইরাবতী ডলফিন সুন্দরবনের ঈষৎ লবণাক্ত অগভীর জলের নদী, খাঁড়ি ও মোহনার কাছে বসবাস করে। জলের গভীরতা যেখানে মোটামুটি ২০-৫০ মিটার সেখানে এদের পাওয়া যেতে পারে। এরা ঘোলা জল বেশি পছন্দ করে কারণ এই জলে মাছ থাকে বেশি। মাছ হল ওদের খাদ্য তালিকার সবচেয়ে পছন্দসই খাবার। জোয়ারের সময় ওরা স্রোতের অনুকূলে ভেসে যেমন স্থলভাগের অনেকটা ভিতরের দিকে চলে যেতে পারে তেমনই ভাঁটার সময় উল্টো টানে ভাসতে ভাসতে আবার মোহনার কাছে চলে আসে। ইরাবতী ডলফিন সুযোগসন্ধানী মাংসাশী প্রাণী। মাছেদের মধ্যে অস্থিযুক্ত মাছ এদের বেশি পছন্দ। পছন্দের তালিকায় দু’ নম্বরে থাকবে চিংড়ি। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের স্কুইড খেতে দেখা যায়। সাধারণত ছোট ছোট দল তৈরি করে এরা দলবদ্ধভাবে মাছ শিকার করে। সবাই মিলে গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে ছড়িয়ে থাকা মাছকে একটা জায়গাতে কাছাকাছি নিয়ে আসে। অনেক সময় এদের দেখা যায় মৎস্যজীবীদের জালের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে। এরা মাছ তাড়িয়ে জালের কাছাকাছি নিয়ে আসে, আর তাই মৎস্যজীবীরাও এদের পছন্দ করে। এরা জলের গভীরে গিয়ে নদী বা খাঁড়ির তলদেশ থেকে মাছ, চিংড়ি ইত্যাদি শিকার করতে পারে। তাই অনেক সময় এদের মাথায় কাদা লেগে থাকতে দেখা যায়।

ইরাবতী ডলফিন। ছবি সংগৃহীত।
ইরাবতী ডলফিনের ক্ষেত্রে প্রজননের সময় হল সাধারণত প্রাক বর্ষা মরশুম, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন মাস। তবে বছরের অন্যান্য সময়েও সুন্দরবন অঞ্চলে এদের প্রজনন হয়। বর্ষাকালে অধিকাংগশ পরিণত স্ত্রী ইরাবতী ডলফিনকে বাচ্চা প্রসব করতে দেখা যায় কারণ এই সময় খাদ্যের জোগান থাকে বেশি। কেবল প্রজননকালে একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী ইরাবতী ডলফিন অতি স্বল্প সময়ের জন্য জোড় বাঁধে। এই সময় কয়েক মিনিটের জন্য দেখা যায় একটি পুরুষ বা একটি স্ত্রী ইরাবতী ডলফিন পরস্পরের পিছু নিয়েছে। তারপর দেখা যায় দুটি ডলফিন পরস্পরের পেট স্পর্শ করে মিলিত হয়েছে। এদের এই মিলনকাল সর্বাধিক ৪০ সেকেন্ড স্থায়ী হয়। তারপর যৌন মিলন শেষে পুরুষ ও স্ত্রী ডলফিন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে চলে যায়। একটি স্ত্রী ইরাবতী ডলফিন সাত থেকে নয় বছর বয়স হলে প্রজননক্ষম হয় এবং দুই থেকে তিন বছর অন্তর বাচ্চা প্রসব করে। প্রতিবারে একটি করে বাচ্চার জন্ম দেয়। এদের গর্ভাবস্থা ১৪ মাস স্থায়ী হয়। সদ্যোজাত বাচ্চা প্রায় ৩.৩ ফুট লম্বা এবং প্রায় ১০ কেজি ওজন হয়। বাচ্চারা মায়ের সঙ্গে প্রায় দু’ বছর থাকে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!
আগেই বলেছি, এদের মাছ শিকার করার পদ্ধতি বেশ মজাদার। এরা ব্লো হোল দিয়ে তীব্র বেগে প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু পর্যন্ত পিচকারির মতো জলধারা নির্গত করতে করতে মাছের ঝাঁককে অল্প জায়গার মধ্যে তাড়িয়ে নিয়ে আসে। মৎস্যজীবীদের সঙ্গেও যে এদের সখ্যতা রয়েছে তা আগেই বলেছি। যেহেতু মৎস্যজীবীরা জাল টেনে মাছকে এক জায়গায় জড়ো করার চেষ্টা করে তাই সেখানে এদের আনাগোনা বেশি হয়। এদের ঘাড় খুব নমনীয় হয় বলে জলের মধ্যে ডুবে থাকা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের জালের মতো শেকড়ের ভেতরে মাথা গলিয়ে মাছ, চিংড়ি ইত্যাদি সন্ধান করতে পারে। সরু গর্ত বা নালার ভেতরেও মাথা গলাতে এদের সুবিধা হয়। তাছাড়া এদের মুখের সামনে চঞ্চুর মতো লম্বা উপবৃদ্ধি না থাকায় ম্যানগ্রোভের শিকড় এবং অগভীর জলে ও কাদার মধ্যে খাবার খোঁজার সময় চোট লাগার সম্ভাবনা থাকে না। এরা অন্যান্য ডলফিনের মতো ইকোলোকেশান পদ্ধতিতে শিকারের খোঁজ করে। তবে সামুদ্রিক ডলফিনদের তুলনায় এদের শব্দের তীব্রতা কম কিন্তু কম্পাঙ্ক (প্রায় ৬০ কিলো হার্জ) বেশি। এতে অল্প গভীরতায় ম্যানগ্রোভের আবর্জনা এবং শিকড়ের মধ্যে খাবারদাবার খুঁজতে সুবিধে হয়। অন্যান্য ডলফিনদের যেমন দেখা যায় যে সামুদ্রিক জলযানের থেকে জলে যে ঢেউ তৈরি হয় সেই ঢেউয়ের ওপর বিনা পরিশ্রমে ডলফিন ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলে, ইরাবতী ডলফিনদের ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না। আসলে সুন্দরবনের নদীনালায় এত বেশি পরিমাণে জলযান চলাচল করে যে এরা খুব ভয় পায়। ফলে এরা নদীতে জলযান দেখলে বেশিরভাগ সময় জলের নিচে ডুবে যায়।

গোল মাথা ইরাবতী ডলফিন। ছবি সংগৃহীত।
ইরাবতী ডলফিনের সংখ্যা সুন্দরবন অঞ্চলে শুধু নয়, সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির উপকূলে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ গণনায় জানা গিয়েছে ভারতে মাত্র ১১১ টি ইরাবতী ডলফিন রয়েছে। এদের মধ্যে ৯৪টি রয়েছে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের মধ্যে থাকা নদীতে এবং ১৪ টি রয়েছে ব্যাঘ্র প্রকল্পের বাইরে কিন্তু সুন্দরবন অঞ্চল মধ্যস্থ নদীতে। বাকি তিনটি ইরাবতী ডলফিন রয়েছে ডায়মন্ড হারবার থেকে সাগরদ্বীপের মধ্যে হুগলি নদীতে। ভারতীয় সুন্দরবন অংশে সাম্প্রতিককালে কোনও ইরাবতী ডলফিনের মৃতদেহ পাওয়া না গেলেও অন্যান্য দেশে পূর্ণবয়স্ক ও অপরিণত ইরাবতী ডলফিনদের একাধিক মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। মৎস্যজীবীদের জালে আটকে এবং দূষণের ফলে এদের মৃত্যু ঘটছে বলে জানা গিয়েছে। অতি বিপন্ন এই প্রাণীরা ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে শিডিউল-১ এ তালিকাভুক্ত। এরা খুব বেশি লবণাক্ত জল পছন্দ করে না। কিন্তু ভারতীয় সুন্দরবন অংশে নদীর জলে লবণাক্ততা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তাই ভারতীয় সুন্দরবন অংশে ইরাবতী ডলফিনের সংখ্যা দ্রুত কমছে। তুলনায় বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততা কম থাকায় ওই অংশে ইরাবতী ডলফিন অনেক বেশি সংখ্যায় রয়েছে। মাত্র ১১১টি ইরাবতী ডলফিন রয়েছে। অসংখ্য প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এরা কতদিন টিকে থাকবে তা নিয়ে সন্দেহ থাকছেই।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















