শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
এবছর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনে দেবী সরস্বতীর আবাহন। তাত্পর্যপূর্ণ বটে। চলার পথে কখনও কখনও দুটো ট্রেন ঝমঝমিয়ে পরস্পরকে পার হয়ে যে যার গন্তব্যে চলে যায়। কেউ অপেক্ষা করে না কারও জন্য। তবু তারা মেলে।

যেমন এবছর মিলেছে তেইশে জানুয়ারির দিনে। তিনি মেলান, তিনিই মেলাবেন। কোন শর্তে মিলল? ক্যালেন্ডারের লাল রঙের চলাচলের শর্ত ছাড়া আর কিছু আছে কি? হয়তো, আছে। ভয় থেকে অভয়ের কূলে নবতর জন্মের শর্তেই হয়তো বা।
রূপকথার রাজকুমারের মতো হাতে উন্মুক্ত তরবারি নাকি সোনার কাঠি নিয়ে নেতাজি আসেন। দস্যু দানব যতো ছিল, আছে, থাকবে সক্কলকে হুঁশিয়ার করে নেতাজি বয়ে চলেন সমাজপ্রবাহে।

নেতাজি মিথে প্রবেশ করেছেন। যা “মিথ” তার কতটা সত্য কতটা মিথ্যে, কতটা ইতিকথা, কতটা অতিকথা এসবের থেকেও অনেক বড় হল কিংবদন্তি… সত্য, সম্ভাবনা ও সমাজবিশ্বাস সেই পরিসর তৈরি করে দেয়।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)

রোমহর্ষক গল্প : দেবী

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫০: মধ্যরাতের বিপদ-আপদ

আর বিদ্যা? তাকে নিয়ে কোনও জনশ্রুতি নেই? আছে, আছে, অনেক আছে। এই যেমন, লেখাপড়া কিংবা পড়াশোনা করলেই ভালো হয়ে ওঠা যায়। গাড়িঘোড়া চড়া যায়। সেই গাড়িতে চাপা পড়াও যায় বৈকী! এছাড়াও, পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শোনার চলাফেরা, চোখকান বন্ধ রেখে লেখাপড়া করলে মাঝনদীতে বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই হয়ে ওঠাও যায়। সে যাই হোক, এসব গুরুতর বিষয়ের থেকেও অন্যরকম কিছুও থাকে। পড়াশোনালেখায় নিয়ম মতে চলার একটা অভ্যাস হয়। সেই ভোর হলে দোর খোলা আর গোপাল-রাখালের “হয়ে ওঠা” থেকেই এসব জানা আর কী! কিন্তু “চল নিয়ম মতে”র পাশেই বন্দী প্রাণমনের বাঁধ ভাঙার গর্জন শোনা যায়, এ যে বিপুল বিস্ময়! কিন্তু তা-ই হয়। খোলা মাঠ-পাহাড়ের পাশেই অচলায়তনের গড়ে ওঠা, ভেঙে পড়া, পুনর্গঠন। সেখানেই হুড়মুড়িয়ে এসে বাঁধভাঙা স্রোত হয়ে ঢোকে আমার পাগলা ঘোড়া, ফল্গুধারা হয়ে খোলা তরবারি নিয়ে নেতাজি নিয়ম করে স্বপ্নে আসেন, যান। সত্যি-মিথ্যের বেড়া ভেঙে নেতাজি মিথে প্রবেশ করেছেন যে।
কলকাতায় বৃষ্টি
কিন্তু এই আকস্মিক সাক্ষাতের দিনে বনের পাখি কি সোনার শিকল-ঘেরা পাখিটার পাশেই এসে ডানা ঝাপটায়? পড়াশোনা ভালোমতো করলে, মানে সকল দিক থেকে বিদ্যালাভ সাঙ্গ হলে ডানার জোর, গলার তেজ আর আত্মা, মন, বুদ্ধি-শুদ্ধির মিলনে জেগে ওঠা প্রজ্ঞাটি সোনার শিকল না বনের বাতাস, কোনটাকে পরম ধ্যেয় বলে মনে ভাবে? সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে’র এমব্লেমের ছায়াতলে পুষ্ট পাখি আবার পিঞ্জরের ধ্যান করে নাকি? ধ্যাত্! বিদ্যাবিমুক্ত পারঙ্গম কুশীলব যাঁরা, তাঁরা সবরকম বেড়াজাল ভাঙবেন বলেই তো সমাজ জানে, মানে। বিশেষ করে মুক্তবিদ্যার এই নবতর বিশ্বগ্রামে একথা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হওয়ার কথা।
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৬: কুণ্টণি জাতক : ক্ষতির খতিয়ান

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র

বেশ খাপখোলা তরবারির মতো কিংবা খাপছাড়া “তুমি না একদম অন্যরকম” কিংবা “আমি রাতে দু’ঘণ্টা ঘুমোতাম, কোনও কোনওদিন তাও হতো না জানেন” অথবা শান্ত, ভদ্র, ভীষণ মার্জিত, প্রচণ্ড ভালোমানুষ, দারুণরকমের অমায়িক মিষ্টভাষী নিপাট সর্বজনমান্য মহত্ উদার ইত্যাদি ইত্যাদি প্রভৃতিরাই যে প্রকৃত পণ্ডিত ও অসম্ভব রকমের বিদ্বান হবেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নাস্তি। এঁরা পিঞ্জরগত হলেও বিদ্বান, পিঞ্জর থেকে পিঞ্জরান্তরে যাতায়াত করলেও বিদ্বান, বনে ঘুরে, ডালে চড়ে ফলভোগ করে, নতুবা নিছক অ্যাসিডিটির কারণেই ফলভোগটুকু দেখে দেখেই অর্ধভোজন সম্পন্ন করে ভয়ঙ্কর শিক্ষিত, ভয়ানক-রকমের বিদ্বান, ক্রান্তপ্রজ্ঞ, পূর্ণ ও দ্রষ্টা বিধাতা হন। এ বিষয়ে মা সরস্বতীও বোধ করি দ্বিধান্বিতা হবেন না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯২: অবিবেচনা যত দ্রুত সিদ্ধান্ত আনে, তত দ্রুত ধ্বংসও আনে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা

বিদ্যার বাহকের দল ঔপনিষদীয় সেই দুটি পাখি হতে পারেন, হতে পারেন জল-দুধের ভেদটুকু বুঝে নিয়ে সারগ্রাহী পরমহংস, হতে পারেন তাত্ত্বিক, হতে পারেন প্রয়োগকুশল, হতে পারেন সংশয়বাদী, অথবা সমন্বয়বাদী। সে যাই হোক, খাঁচা আর বনের এই বাইনারি এসে উঠল এখন ভাঙা-গড়ায়। প্রথা ভাঙা পাগলা ঘোড়ার দুরন্ত দৌড় আর প্রথা মেনে বিদ্যেবতী সরস্বতীর কাছে পাশের আবেদন পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে আজ। ‘Teach, learn, exercise, Knowledge, education, wisdom’, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শিক্ষা, বিদ্যা কিংবা ফান্ডা ইত্যাদি শব্দাবলির ধারণা ভেঙে চুরে নতুন মানুষ গড়বে এটাই কাঙ্ক্ষিত। ভাঙবে, গড়বে, ভেঙে গড়বে, গড়ে ভাঙবে নবতর লক্ষ্যে। ভাঙাগড়ার পৃথিবীতে এই ভাঙাগড়ায় গড়ার জন্য ভাঙা, ভাঙার জন্য গড়া, ভাঙার জন্য ভাঙা, গড়ার জন্য গড়া… সব-ই থাকে। আর সেসব ঘিরেই বিদ্যাশিক্ষার সাফল্য অসাফল্য, মরা গাঙের বান, নিখিলের সন্তাপভঞ্জন, বকুলনিকুঞ্জের মধুকরগুঞ্জন, নিজের মনে ক্ষয় না মানার বল। তাতেই ইতিহাস রূপকথা হয়, রূপকথা মিথ হয়, মিথ্যে হয়, তার মধ্যেই ঘোড়ার খুরের খটখট শোনা যায়।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮০ : হাত বাড়ালেই বন্ধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

কিন্তু… একটা কিন্তু তো থেকেই গেল। যে বিদ্যা নিয়ে এতকিছু, সেই বিদ্যা এক অবাঙমনস-গোচর পরম ধ্যেয় কিছু, আর জাগতিক, ঐহিক যা কিছুর অনুধ্যান তা অবিদ্যা। কিন্তু কেবল অবিমিশ্র বিদ্যা অথবা অবিদ্যার উপাসনা নিষ্ফল, তা সার্থক করে না, ডেকে আনে বিনষ্টি। শাস্ত্র তাই সমুচ্চয়ের পথে, সমন্বয়ের পথে যেতে বলবেন যে পথ বন্ধুর, প্রীতিপ্রদ অনায়াস নয়, সঙ্কীর্ণ শোণিতপিচ্ছিল, অদ্বিতীয়, নির্বিকল্প। গন্তব্য সেখানে আয়াসলভ্য, কিন্তু সেই পথেই অবিদ্যার উপাসনায় মৃত্যুকে অতিক্রম, নশ্বর দীনতার বিনাশ, মরণ থেকে জেগে ওঠা। সে পথেই বিদ্যার দ্বারা অমৃতত্ব লাভ, অবিনশ্বর শাশ্বত বোধ, চেতনার জাগরণ, ক্ষীরসাগরে চন্দ্রোদয়, সীমাকে ছাড়িয়ে চোখের আলোয় চোখের বাইরের অসীমকে পাওয়া।

তখন হৃদয়ের কমলবনে, মন্দ্রিত মধুর ধ্বনিতে জেগে ওঠেন নিভৃতবাসিনী অমৃতমূর্তি বিদ্যাদায়িনী, সর্বশুক্লা সরস্বতী, বিরহের বীণাপাণি।
কলকাতায় বৃষ্টি
জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত স্কিল-নামক এক নৈপুণ্য, দক্ষতার আদর সর্বত্র। কি প্যাড কিংবা হাতুড়ি, শারীরিক থেকে বৌদ্ধিক, এরোপ্লেন থেকে কলম চালানোর ক্ষমতা; স্কিল লাগে। আজকের পৃথিবী স্কিলের সন্ধানে তত্পর। দক্ষতার এই অন্বেষণে যে বিদ্যা এককালে বিনয়ী, শিক্ষিত করতো, যে বিদ্যার পথে বৌদ্ধিক, আত্মিক জাগরণ, যে বিদ্যা নৈপুণ্যের পাশাপাশিই পূর্ণতাও দেয়, যে অন্তরতর বিদ্যার সাধনা দিনের শেষে নির্মল, নিষ্কলুষ, সার্থক করে সেই বিদ্যা ব্রিজকোর্স, ক্র্যাশকোর্স ইত্যাদির আলোকে পণ্যবাহিনী। বিদ্যার বড়াই বা প্রদর্শন সবকালেই সত্য ছিল, পণ্ডিতন্মন্য অথবা মূর্খপণ্ডিতরাও ছিলেন। তবে আজ বিদ্যাশিক্ষায় দীক্ষার দৈন্য সত্য, প্রদর্শন তার আশ্রয়, বাণিজ্য তার একমাত্র ধ্যেয়। বীণাপাণি আজ আর নিভৃতবাসিনী নেই, পদ্মবন-ও মহার্ঘ্য, বুঝি টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। যেন ইংরাজি বর্ণমালা ধরে এগোতে এগোতে শেষপাতে ‘V’ দিয়ে বিদ্যা-Vidya-র দাবিটুকু। তবে সরস্বতীকে ঘিরে বিচ্ছুরিত ওই দিব্য অমলিন শুভ্রতাটুকু জ্ঞানতাপস, শ্রদ্ধাবান, বিমুক্তিকামীদের ভরসা, যে শুভ্রতায় ভাস্বর শ্বেতবীণার মন্দ্র, গভীর রব সহস্র অ-সুর, কোটি অমানিশার পরেও পঞ্চমে বেজে ওঠে বসন্তপঞ্চমীতে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content