কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

ভরতবংশীয়দের ইতিবৃত্ত মহাভারত। এই ভরত কে ছিলেন? যাঁর নামানুসারে কুরুবংশীয়রাও খ্যাত হয়েছিলেন? স্বয়ং মহাভারতকার বলেছেন, ভরতাদ্ভারতী কীর্ত্তির্যেনেদং ভারতং কুলম্। অপরে যে চ পূর্বে বৈ ভারতা ইতি বিশ্রুতাঃ।। ভরত হতেই ভরতবংশীয়দের বংশকীর্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল। ভরতের পূর্ববর্তী রাজগণও ‘ভারত’ নামে খ্যাত হয়েছিলেন। কুরুবংশীয়রা পৌরব নামেও পরিচিত ছিলেন। ভরতবংশীয়দের পূর্বপুরুষ পুরুরাজার নামানুসারে এমন নামকরণ। রাজা পুরুর উত্তরপুরুষ দুষ্যন্তের ঔরসে, পত্নী শকুন্তলার গর্ভে জন্ম নিলেন ভরত, যিনি ভরতবংশীয়দের অপরিসীম যশ বিস্তারের কারণ হয়েছিলেন। রাজা পুরুর বংশধারার রক্ষক, শৌর্যবান, ভরতের পিতা, রাজা দুষ্মন্ত তাঁর রাজত্বকে সমগ্র পৃথিবীজুড়ে প্রসারিত করেছিলেন। তাঁর রাজত্বে ছিল না কোন বর্ণসঙ্কর, কৃষি ও খনিজ আবিষ্কারক মানুষের অভাব ছিল না, কেউ পাপকাজে লিপ্ত হতেন না।

দুষ্মন্তের রাজত্বকালে প্রজারা ধর্মসঙ্গত অর্থলাভ ও কামনাপূরণে যুক্ত থাকতেন। তাঁর রাজত্বকালে চুরির ভয় ছিল না, রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল না। এই ধার্মিক রাজার শাসনাধীন প্রজাদের জীবন ছিল নির্ভয়। যথাসময়ে মেঘ বর্ষণ করত, শস্য ছিল সুস্বাদু, পৃথিবী গবাদিপশুতে সমৃদ্ধ ছিল, ব্রাহ্মণরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, সেখানে কোনও মিথ্যাচারের স্থান ছিল না। বিস্ময়কর শৌর্যশালী, বজ্রসদৃশ দৃঢ়দেহ, যুবক, দুষ্মন্ত জল ও উপবনসহ মন্দরপর্বতবহনে সমর্থ ছিল। তিনি, চারদিক থেকে বিপক্ষের গদাপ্রহারনিবারণে ও সব অস্ত্রসঞ্চালনায় দক্ষ ছিলেন। রাজা দুষ্মন্ত, হাতি ও ঘোড়ার পৃষ্ঠে আরোহণবিষয়ে সুশিক্ষিত ছিলেন। বিষ্ণুতুল্য বলশালী, সূর্যসম তেজস্বী, সমুদ্রসদৃশ ধৈর্য্যধারী এবং সহিষ্ণুতায় পৃথিবীর সমান ছিলেন তিনি। সন্তুষ্ট নগর ও রাষ্ট্রে অধিষ্ঠিত জনপ্রিয় এই রাজা, ধর্মসম্মত ব্যবহারের মাধ্যমে আনন্দিত জনগণকে শাসন করতেন।
ভরতমাতা, দুষ্মন্তের স্ত্রী শকুন্তলা ছিলেন আশ্রমকন্যা। রাজা দুষ্মন্তের সঙ্গে তাঁর মিলন ও পুত্র ভরতের জন্মদান কিভাবে সম্ভব হয়েছিল?
সে এক বিচিত্র কাহিনি। একদা রাজা দুষ্মন্ত প্রভূত সৈন্যবল ও হাতিঘোড়াসহ চললেন মৃগয়ায়। তাঁর সঙ্গী হল, অতি মনোহর চতুরঙ্গ সেনা ও খড়্গ, শক্তি, গদা, মুসল, প্রাস, তোমর প্রভৃতি অস্ত্রধারী শত যোদ্ধার দল। তাদের সিংহনাদ ও দুন্দুভিধ্বনি, রথচক্রের শব্দ, শ্রেষ্ঠ হাতিদের বৃংহনধ্বনি, নানা অস্ত্রের ঝঙ্কার, নানা বেশধারী বীরদের কোলাহল, ঘোড়াদের হ্রেষারবযুক্ত সিংহনাদ, সব মিলিয়ে রাজার যাত্রাপথ ভয়ঙ্কর কলরবমুখর হয়ে উঠল। উঁচু প্রাসাদতল থেকে স্ত্রীলোকেরা যশস্বী বীরের রাজকীয় শোভা দেখতে লাগলেন। তাঁরা ইন্দ্রসম শত্রুহন্তা, বিপক্ষের হস্তীসংহারক রাজাকে সাক্ষাৎ ইন্দ্র মনে করলেন। নারীরা বলাবলি করতে লাগলেন এই সেই নরশার্দ্দূল যিনি সমরে বসুতুল্য শৌর্যশালী, যাঁর বাহুবল সমীহ করে কেউ শত্রুতা করতে সাহসী হন না। নারীরা প্রীতিভরে রাজার মস্তকে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন। চতুর্দিক হতে দ্বিজগণ স্তব করতে লাগলেন। পরমানন্দসহকারে রাজা চললেন মৃগয়ায়। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র নির্বিশেষে সকলে, মত্তহস্তীর পৃষ্ঠে আরূঢ় রাজার সহযাত্রী হলেন।

পুরবাসী ও জনপদবাসীদের কণ্ঠে রাজার উন্নতিসূচক জয়ধ্বনি, বহুদূর পর্যন্ত রাজার পশ্চাতে অনুসরণ করল। এরপরে রাজার অনুমতি নিয়ে তাঁরা ফিরে গেলেন। গরুড়তুল্য রথে আরোহণ করে, রাজা দুষ্মন্ত, রথশব্দে পৃথিবী ও স্বর্গলোক পূর্ণ করে তুললেন। যাত্রাপথে তিনি বেল, আকন্দ, খদির, কদ্বেল, ধব প্রভৃতি বৃক্ষে সমাকীর্ণ, যেখানে পর্বত হতে স্খলিত হয়েছ পাথর এমন অসমান ভূমিযুক্ত, জল ও মনুষ্যহীন, বহু যোজন বিস্তৃত, বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য ভয়ঙ্কর বনচরসঙ্কুল নন্দনকাননতুল্য এক বন দেখতে পেলেন।

নরব্যাঘ্র রাজা দুষ্মন্ত, নিজ ভৃত্য ও বাহিনীসহ বিবিধ প্রাণী হত্যা করে বনভূমি আলোড়িত করে তুললেন। রাজা দুষ্মন্ত নির্বিচারে, অব্যর্থ লক্ষ্যে, বহু বাঘ ও দূরবর্তী প্রাণীদের তীরবিদ্ধ করতে লাগলেন। নিকটবর্তীদের খড়্গ দিয়ে ছিন্ন করলেন। গদাযুদ্ধে পারদর্শী, অমিত পরাক্রমশালী, মহাশক্তিধর, দুষ্মন্ত, শক্তি অস্ত্রের সাহায্যে, কতগুলি হরিণকে হত্যা করলেন। তিনি তোমর, তলোয়ার, গদা, মুসল প্রভৃতি অস্ত্র ঘূর্ণায়মান রেখে, বন্য প্রাণীদের সংহাররত অবস্থায় বিচরণ করতে লাগলেন। অদ্ভুত শক্তিশালী রাজা ও তাঁর যুদ্ধবাজ সেনারা বনে আলোড়ন সৃষ্টি করলেন। ত্রস্ত পশুরাজ সিংহ সেই বন পরিত্যাগ করল। দলপতি নিহত হওয়ায় হরিণের দল পলায়ন করল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২০: সত্য ও ন্যায় পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী নয়, তবে? ঔজ্জ্বল্য বেশি কার?

মুভি রিভিউ: সত্যিই তো, সবার নিজের নিজের মতো করে সবটাই নর্মাল

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না

উৎকণ্ঠিত দলগুলি ইতস্তত শব্দ করতে লাগল। শারীরিক পরিশ্রমের ফলে ক্লান্তহৃদয় হরিণগুলি বিশুষ্ক নদীখাতে উপস্থিত হয়ে, জলের অভাবে সংজ্ঞা হারিয়ে তারা ভূলুণ্ঠিত হল। ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর, পরিশ্রান্ত হরিণগুলির কয়েকটি ক্ষুধার্ত নরব্যাঘ্রর ভোজ্য হল। বনেচরেরা কয়েকটি হরিণের স্বকৃত অস্থিমুক্ত মাংস, আগুনে পাক করে ভক্ষণ করল। অস্ত্রাঘাতে ক্ষতবিক্ষত, কতগুলি প্রমত্ত, বলবান, গজ, ভয়ে শুঁড়ের অগ্রভাগ সঙ্কুচিত করে সবেগে পলায়ন করতে লাগল। বিষ্ঠা ও মূত্রত্যাগকারী রুধিরাপ্লুত বন্য হাতিগুলির দ্বারা পিষ্ট হল বহু মানুষ। বনটি যেন সৈন্যরূপ মেঘেদের শরধারাবর্ষণে আচ্ছন্ন হল। বনটি যেন রাজার দ্বারা নিহত পশুরাজসমেত বন্য মৃতপ্রাণীদের শবদেহের প্রদর্শনী হয়ে উঠল।

সহস্র মৃগ বধ করে সসৈন্যে, বাহন-সহ, রাজা দুষ্মন্ত, মৃগদের অনুসরণরত অবস্থায় বনান্তরে উপস্থিত হলেন। অদ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ শক্তিমান রাজা ক্ষুৎপিপাসয় কাতর হয়ে সেই বনের শেষ সীমান্তে এক শূন্য প্রান্তরে এসে উপস্থিত হলেন। সেই স্থান অতিক্রম করে, একটি আশ্রমের সন্নিহিত, মনকে প্রসন্ন করে তোলে এমন, অতীব দৃষ্টিনন্দন, প্রবহমান শীতল সমীরণযুক্ত, প্রস্ফুটিত তরুরাজি সমাকীর্ণ, সুখাবহ নবতৃণাচ্ছাদিত অন্য একটি বনে উপস্থিত হলেন। সেখানে বিহঙ্গরা মধুরস্বরে বিপুল কূজনরত, কোকিলের কুহুতানে ভরপুর স্থানটি ঝিল্লীর ঝঙ্কারে মুখরিত, প্রবীণ মহীরুহে সমাকীর্ণ সুখচ্ছায়ায় ভ্রমরগুলি যূথবদ্ধ হয়ে পরম শোভা বিস্তার করে ঘূর্ণায়মান হয়ে বিরাজমান। সেই কাননে পুষ্পফলহীন কোনও তরু নেই, নেই কোনও কণ্টকাকীর্ণ বৃক্ষ, ভ্রমরদের পরিত্যক্ত কোনও তরুই সেখানে নেই। বিহঙ্গের কলরবমুখর, সব ঋতুতেই কুসুমিত তরুরাজির সুখচ্ছায়া ঘিরে আছে পুষ্পশোভিত স্থানটিকে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২২: মহর্ষির নির্দেশে ঘণ্টা বাজত জোড়াসাঁকোয়

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি

ধনুর্ধারী রাজা, সেই রম্য উত্তম বনটিতে প্রবেশ করলেন। বায়ুসঞ্চালনের ফলে গগনস্পর্শী সুউচ্চ বৃক্ষগুলির পক্ষীদের সুমধুর কলতানে মুখর কুসুমিত শাখা হতে বিচিত্র পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল। সেখানে তরুগুলির পুষ্পভারাবনত পল্লবগুলিতে বিচিত্র কুসুমরাজি আকাশ স্পর্শ করেছিল। মধুর লোভে মৌমাছিরা মধুর গুঞ্জনরত ছিল। সেই স্থানে লতাগৃহের আকৃতিতুল্য বহু কুসুমিত তরুবেষ্টিত লতামণ্ডপ আনন্দ বৃদ্ধি করেছিল। সেগুলির দর্শনে মহাতেজস্বী রাজা আনন্দিত হলেন। পরস্পরসংযুক্ত পুষ্পিত বৃক্ষগুলি ইন্দ্রধ্বজতুল্য শোভা বিস্তার করেছিল। বনটি ছিল সিদ্ধপুরুষ, চারণগণ, গন্ধর্ব, অপ্সরা, মত্ত বানর এবং কিন্নরগণের বিচরণক্ষেত্র। সুখাবহ, শীতল, সুগন্ধী, পুষ্পপরাগবাহী, বায়ু পরিক্রমান্তে যেন রমণেচ্ছায় বনে বৃক্ষের কাছে উপস্থিত হোত। এমন গুণসমন্বিত জলবিশিষ্টপ্রদেশে উত্তোলিত ইন্দ্রধ্বজসম উচ্চভূমিযুক্ত বনটি দর্শন করলেন রাজা। বনটি নিরীক্ষণকারী রাজা, পরিতৃপ্তবিহঙ্গে পূর্ণ একটি রমণীয়, মনোরম, আশ্রম দেখতে পেলেন।

আশ্রমটি নানা বৃক্ষে পরিবেষ্টিত, সেখানে প্রজ্জ্বলিত রয়েছে হোমাগ্নি। আশ্রমটি, যতি ও বালখিল্যপরিবৃত, মুনিগণ অধ্যুষিত, অগ্নিগৃহসমন্বিত, পুষ্পময়-আস্তরণে আবৃত, দীর্ঘবিস্তৃত জলপ্রায়দেশ দ্বারা শোভিত। সেই আশ্রমে অতুলনীয়,শ্রীমান, রাজা দুষ্মন্ত উপস্থিত হলেন। কাছেই ছিল পুণ্যসলিলা মালিনীনদী, পক্ষীসঙ্কুল,তপোধনমুনিদের উপস্থিতিহেতু মনোরম।সেখানে হিংস্রপশুও শান্তস্বভাবে উপনীত হয়েছে দেখে রাজা আনন্দিত হলেন।

নিজের তুল্য প্রতিপক্ষহীন শ্রীমান দুষ্মন্ত সুরলোকসম সার্বিকভাবে মনোহর আশ্রমে প্রবেশ করলেন। সেখানে আশ্রমের কাছে জননীর মতো জীবনদায়িনী বহমানা পুণ্যসলিলা মালিনী নদী দেখতে পেলেন। নদীর বালুকাবেলায় বিচরণরত চক্রবাকপক্ষী,জলপ্রবাহে সপুষ্প ফেনারাশি, সেখানে কিন্নরগণের আবাস, বানর ভল্লুক প্রভৃতির চারণভূমি,পুণ্য বেদপাঠের ধ্বনিতে মুখরিত, বেলাভূমিশোভিত, মত্ত হস্তী, ব্যাঘ্র, শ্রেষ্ঠ সর্পের বিচরণক্ষেত্র মালিনীতীরে মহাত্মা কাশ্যপের মনোরম আশ্রম, সেখানে বাস করেন মহর্ষিগণ।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২১: খেলা শুরুর প্রস্তুতি

আশ্রমের প্রান্তবর্তী নদী ও আশ্রম দর্শন করে, সেই রাজার, আশ্রমে প্রবেশের ইচ্ছে হল। দ্বীপবতী মালিনীর সুন্দর তীরভূমি গঙ্গার তীরবর্তী নরনারায়ণ ঋষির আশ্রমতুল্য, মত্ত ময়ূরের শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে সেখানে, এমন কুবেরের উদ্যানতুল্য মহান তপোবনে প্রবেশ করলেন রাজা দুষ্মন্ত। অশেষ গুণসম্পন্ন, অনির্বচনীয় তেজের আধার তপোধন মহর্ষি কাশ্যপ কণ্বের দর্শনলাভের ইচ্ছায়, পতাকাযুক্ত অশ্ব, গজ, পদাতিক সৈন্যে পরিপূর্ণ সেনাবাহিনীকে তপোবনের দ্বারদেশে রেখে, রাজা ঘোষণা করলেন, রজোগুণজনিত-কামক্রোধাদিবর্জিত, কাশ্যপমুনিদর্শনে রাজা যাবেন, সৈন্যরা রাজার ফিরে আসার অপেক্ষায় অবস্থান করুন। মুনিং বিরজসং দ্রষ্টুং গমিষ্যামি তপোধনম্। কাশ্যপং স্থীয়তামত্র যাবদাগমনং মম।।

ইন্দ্রের নন্দনকাননতুল্য সেই তপোবনে উপস্থিত হয়ে, নরেন্দ্র দুষ্মন্ত ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বিস্মৃত হলেন। তিনি অতীব আনন্দিত হলেন। রাজকীয় চিহ্নগুলি (রাজছত্র, মুকুট প্রভৃতি) মুক্ত হয়ে অমাত্যগণ-সহ ও সহায়ক পুরোহিতকে সঙ্গে নিয়ে রাজা উত্তম আশ্রমটিতে প্রবেশ করলেন। পুঞ্জীভূত তপোরাশিসম, তপোবলহেতু অব্যয় অর্থাৎ চিরজীবী সেই মহর্ষির দর্শনেচ্ছু রাজা ভ্রমরদের গুঞ্জনে মুখর, নানা দ্বিজগণসমন্বিত, ব্রহ্মলোকসদৃশ, সেই আশ্রমটি দর্শন করে, বিস্ময়ে উৎফুল্লনয়ন হয়ে প্রীত হলেন। নরশ্রেষ্ঠ রাজা, আশ্রমে বাহুল্যসহকারে কৃত যজ্ঞানুষ্ঠানে ঋগ্বেদিপ্রধানব্রাহ্মণদের পরিশীলিত উচ্চারণে পদ ও ক্রমানুসারে ঋগ্বেদপাঠ শুনতে লাগলেন। সেখানে যজ্ঞাবিদ্যাঙ্গবিদ (ব্যাকরণ প্রভৃতি) ও যজুর্বেদে পারদর্শীগণ, নিত্য ব্রতচারী মধুর সামগানে নিরত ঋষিরা যেন সেই আশ্রমের শোভারূপে বিরাজমান। ভারুণ্ডনামে সামগানের পদাবলী অথর্ববেদের শেষাংশ পাঠরত ব্রাহ্মণদের উদ্গত স্বরহেতু, আশ্রমটি শোভা বিস্তার করেছিল। অথর্ববেদজ্ঞ ও যজ্ঞসম্বন্ধিসামগানকারী মুনিগণ পদ ও ক্রমানুসারে সেই সংহিতা পাঠ করছিলেন। শব্দসংস্কারে পারঙ্গম (উদাত্ত প্রভৃতি স্বরভেদানুসারে) অন্যান্য ব্রাহ্মণদের বেদপাঠের শব্দে ধ্বনিত স্বভাবতই শোভমান সেই আশ্রম যেন অপর কোন ব্রহ্মলোক।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৩: দুর্জনের সম্মান, সাধুর জন্য ফাঁদ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৬: বাজ

যজ্ঞের স্তরগুলি, পর্যায়ক্রম, শিক্ষাশাস্ত্রবিদ এবং ন্যায়তত্ত্বজ্ঞ, আত্মবিদ্যাবিদ (বেদ প্রতিপ্রতিপাদিত উপনিষদ) ও বেদজ্ঞ, নানা মন্ত্রের প্রয়োগবিধির সমাহারবিষয়ে বিশারদ এবং অন্যান্য বেদের সমন্বয়ে পারঙ্গম, বিশেষকার্যবিদ (পাতঞ্জলোক্ত ধ্যানধারণাসমাধি প্রভৃতি বিশেষকার্যবিদ), মোক্ষ বিষয়ক ধর্মে নিরত ব্রাহ্মণগণ, বেদবাক্য বিচার ও সেই বিষয়ে সংশয় এবং সিদ্ধান্তবিষয়ে অভিজ্ঞ, পরমতত্ত্বের জ্ঞানবিষয়ে অভিজ্ঞ, শব্দ(ব্যাকরণশাস্ত্র)-ছন্দ-নিরুক্ত (বর্ণাগমবিষয়ক শাস্ত্র)-জ্যোতিষশাস্ত্রজ্ঞগণ, দ্রব্য অর্থাৎ তরুলতাদির কর্ম ও তার দীর্ঘজীবনাদি বিষয়ক রসায়নশাস্ত্রবিদ, কার্য অর্থাৎ রোগাদি ও কারণ অর্থাৎ অপথ্যসেবনাদিবিষয়ে অভিজ্ঞ অর্থাৎ আয়ুর্বেদীয় শাস্ত্রে পারঙ্গম, পক্ষি ও বানরের স্বরসম্পর্কে অভিজ্ঞ, বিস্তৃতগ্রন্থধারী দ্বিজগণ, আলোচনারত নানা প্রধানশাস্ত্রজ্ঞবৃন্দের (সঙ্গীতাদিনানাশাস্ত্রজ্ঞ) বিষয়াদি, চতুর্দিকে লোকায়ত বিষয়নিপুণ মুখ্যদের আলাপ, সব বিষয়গুলি রাজা শুনতে লাগলেন। রাজা দেখলেন, সেখানে স্থানে স্থানে, দ্বিজশ্রেষ্ঠদের মধ্যে কেউ নিত্য ব্রতধারণ করেছেন, কেউ বা জপে ও হোমে নিরত অবস্থায় রয়েছেন।

বিচিত্র নানা রূপবিশিষ্ট সব আসন যত্নসহকারে বিছিয়ে রাখা হয়েছে—এই দৃশ্য দেখে বিস্ময়াবিষ্ট হলেন রাজা। তিনি দেখলেন, ব্রাহ্মণরা দেবগৃহগুলিতে পূজা ও আনুষঙ্গিক কর্মে নিরত। দেখে, রাজা নিজেকে ব্রহ্মলোকে অবস্থানরত বলে মনে করলেন।কাশ্যপ কণ্বের তপোগুণ দ্বারা সুরক্ষিত, মঙ্গলময়,তপস্যার গুণযুক্ত, শ্রেষ্ঠ আশ্রমটি দেখতে দেখতে রাজা সম্পূর্ণরূপে তৃপ্ত হলেন না। অমাত্যগণ ও পুরোহিতসহ,শত্রুহন্তা রাজা,চতুর্দিকে মহাব্রতাচারণে রত তপোধনঋষিদের দ্বারা পরিব্যাপ্ত কাশ্যপের আবাস, সেই পবিত্র মনোহর ও শুভ আশ্রমটিতে প্রবেশ করলেন।

মৃগযাবিহারী রাজা দুষ্মন্তের পশুবধ ও মৃগয়াসূত্রে পুত্র ভরতের আবির্ভাববৃত্তান্তের সূচনা। এক প্রখ্যাত রাজার মৃগয়ার সমারোহের মধ্যে রয়েছে, শক্তির অপচয়, অর্থের অপব্যয় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত অথবা সে যুগে সেটাই হয়তো ছিল রাজকীয় জীবনযাত্রার নমুনা। আজ যেটি নিন্দিত কাজ,বিগতদিনে সেই রাজকীয় নিষ্ঠুরতাই ছিল হয়তো স্বাভাবিক এবং কখনও প্রশংসিত কোন কাজ।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

রাজারা বিশ্বচরাচরের রক্ষক। শুধু বিনোদনের লক্ষ্যে পশুবধের জন্যে রাজারা নিন্দিত হতেন না বরং তাঁদের শৌর্যপ্রকাশের একটি প্রশংসিত দিক ছিল প্রাণীহত্যা। রাজাকে উৎসাহিত করে মৃগয়ার সঙ্গী হয়েছিলেন চতুর্বর্ণের মানুষ। দেবরাজ ইন্দ্রের নন্দনকাননতুল্য বনে ভয়ঙ্কর পশুহত্যায় মেতে উঠলেন রাজা। বিশ্বচরাচরের রক্ষক রাজা, তাঁর এই আচরণ কী ভয়ানক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল অসহায় অবোধ প্রাণীদের মনোজগতে, বিশদে বর্ণনা করেছেন মহাভারতকার। পলায়নপর ক্লান্ত, পিপাসার্ত হরিণগুলির মর্মান্তিক পরিণতি, রক্তাক্তদেহ গজরাজের ভীত সন্ত্রস্ত দশা, পশুরাজের বনান্তরে আশ্রয়গ্রহণ, ভয়ার্ত হস্তীর পদপিষ্ট হচ্ছে মানুষ, এই খণ্ডচিত্রগুলি পরিবেশ দূষণের নমুনা বললে অত্যুক্তি হয় না। অতীতে প্রশাসকের বিনোদন আজ শাস্তিযোগ্য অপরাধরূপে চিহ্নিত হয়েছে।

দুষ্মন্তের মৃগয়ার যাত্রাপথে প্রকৃতির অনাবিল মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য রাজাকে আনন্দ দিয়েছে। অকৃপণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার সেই বনটির কাছেই, মালিনীনদীতীরে আদর্শ বিদ্যাচর্চার স্থান, মহর্ষি কণ্বের আশ্রমটির অবস্থান। সেই অমলিন সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজা ক্ষমতার ঔদ্ধত্য ও দম্ভ ছেড়ে নতজানু হয়েছেন তপোধন মহর্ষিদের কাছে। সৈন্যবাহিনী রইল দ্বারদেশে, রাজার আদেশানুসারে তাদের আশ্রমে প্রবেশাধিকার নেই যে। বিনয়াবনত রাজা রাজকীয় চিহ্নগুলি থেকে মুক্ত হয়ে আশ্রমে প্রবেশ করলেন। যজ্ঞানুষ্ঠানে নিরত আশ্রমিক মহর্ষিদের, চতুর্বেদ, বেদাঙ্গ ও আনুষঙ্গিক শাস্ত্রজ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায় আশ্রমিক ঋষিদের বেদপাঠের নৈপুণ্যে, অনুপুঙ্খজ্ঞানের প্রকাশে।

মহর্ষিবৃন্দের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনে, রাজা দুষ্মন্ত মুগ্ধ হয়েছেন, তেমনই তাঁর বিস্ময়মিশ্রিত আনন্দের প্রকাশ, প্রকৃতির মনোরম রূপদর্শনে। সেই রাজাই নৃশংস হয়েছেন প্রকৃতির অনুষঙ্গ প্রাণীদের প্রতি। বন্যপ্রাণীদের প্রতি তাঁর নির্মম ব্যবহার ঘৃণ্য ও অনুকরণযোগ্য তো নয়ই। রাজা সাধারণের আদর্শ, তাঁর অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্টতায় অনন্য। শাস্ত্রে কথিত রাজধর্ম অনুসারে চর ও অচর প্রাণীদের প্রতি তাঁর সমদর্শিতা বাঞ্ছনীয়। সাধারণ প্রজারা রাজার মৃগয়ার যাত্রাপথে তাঁকে অভিনন্দিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে পশুবধ ও শত্রুবধে কোনও তারতম্য নেই। যুগের রীতি অনুসারে রাজার মৃগয়াযসক্তিতে আপত্তিকর কিছু তাঁরা খুঁজে পাননি। আধুনিক ভরতবংশীয়রা মনুষ্যেতর প্রাণীদের প্রতি সংবেদনশীল, তাঁদের করুণাধারাবর্ষণ, হৃদয়ের উষ্ণতা দুষ্মন্তের শাসনাধীন প্রজাদের থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। গার্হস্থ্যজীবনের পরিমণ্ডলে হয়তো তখন এবং এখনে কোনও বিশেষ পার্থক্য নেই।

কিন্তু প্রশাসকদের বাতাবরণে আমূল পরিবর্তন এসেছে, প্রশাসকরা এখন বন্যপ্রাণিসংরক্ষণ আইনের প্রবক্তা। পুরাতনের সবটাই কী সর্বদাই গ্রহণযোগ্য? বোধ হয় নয়। যুগভেদে পরিবেশ, পরিস্থিতি, মানসিকতা,ধ্যানধারণা পরিবর্তিত হয়। উন্নত সমাজের লক্ষ্যে কোনও পরিবর্তন সূচিত হয়। পুরাতন চেতনার কোনটি গ্রাহ্য হবে কোনটি হবে বর্জনীয় তার নির্ধারণ একটি যুগের মানুষের মানসিকতানির্ভর। তবে সেই পরিবর্তনের গ্রাফ্ ঊর্ধ্বমুখী কি না, সেটি পরবর্তী যুগের বিচার্য বিষয়।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content