
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
ডিএম, এসডিপিও, সিএমওএইচ চলে গেলেন একে-একে। কলকাতা থেকে আসা সেই ছ’ ফুটিয়া গোয়েন্দাও এসডিপিও-র গাড়িতে বেরিয়ে গেলেন দেখল সবাই। অবশ্য যাওয়ার আগে তাঁরা সকলেই উপস্থিত প্রহরারত পুলিশদের সতর্ক থাকার কথা বলে গেলেন। পেশেন্ট ছাড়া আর কেউ যেন ঢুকতে না পারে হাসপাতাল চৌহদ্দির মধ্যে। হাসপাতালের নিজস্ব নিরাপত্তা-ব্যবস্থার জন্য যে-পরিমাণ পুলিশ নিয়মিত থাকে, তারা তো আছেই, আজকে বিশেষ ব্যবস্থা হিসাবে এসআই পদমর্যাদার একজন অফিসার এবং অতিরিক্ত কিছু পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গেটের কাছেই বেশ কয়েকজন পাহারায় রয়েছে। প্রবেশপথেই যদি আটকে দেওয়া যায়, তাতে অনেক ঝামেলা কমে, সেই জন্যই সেখানে নিরাপত্তা-ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রাত্রিবেলা বিশেষ এমার্জেন্সি ছাড়া কোনও পেশেন্ট পার্টির আসার সম্ভাবনা নেই। অতএব পরিচিত অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া আর কাউকে চেক না করে ঢুকতে দেওয়া হবে না সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসআই প্রণব ইয়াংম্যান। শাক্য সিংহ নামের লালবাজার থেকে আসা গোয়েন্দাটি চলে যাওয়ার আগে তাকে ডেকে আলাদা করে কিছু কথা বলেছেন। কিছু পরামর্শ আর কি। এসডিপিও কিছু কথা বলেছেন। আজকের রাতটা প্রণব যদি ভালোয়-ভালোয় উৎরে দিতে পারে, তাহলে তার ভবিষ্যৎ যে উজ্জ্বল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। শাক্য বারবার বলে দিয়েছে, যেমন-যেমন সে বলছে, তেমনভাবেই যেন পাহারা দেওয়া হয়। সামনের গেটেই কেবল থাকলে চলবে না। হাসপাতালের চারপাশেই বাহিনীকে টহল দিতে হবে। বলা তো যায় না, সামনের দিকে নিরাপত্তার বজ্রআঁটুনি দেখে ঘুর পথে পিছন দিক দিয়ে কেউ ঢুকে পড়ল। অবশ্য এমার্জেন্সির মুখেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সত্যব্রতর কেবিনের সামনেও একজনকে রাখা হয়েছে। এসডিপিও নিজে এই দু-তিনজনকে নির্বাচন করেছেন। সকলে চলে যাওয়ার পরে প্রণব সবাইকে ডেকে বুঝিয়ে দিল কী-কী করতে হবে। আজ কেউ ডিউটিতে শৈথিল্য দেখালে চলবে না।
একটু একটু করে রাত বাড়ছিল। হাসপাতাল চত্বরে জীবিত-অর্ধজীবিত পেশেন্টরা যে-যার বেডে ঘুমিয়ে আছে। বাইরেও হাসপাতাল কম্পাউন্ডের মধ্যে ইতস্তত যে-সব শেড, তাতে রোগীর সঙ্গে আসা আত্মীয়-পরিজনেরা চাদর মুড়ি দিয়ে, কেউ-কেউ মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়েছে। ঘণ্টা দুয়েক আগে সকলেই উঠে বসেছিল। এখন তেমন কোনও মজাদার ব্যাপার হল না দেখে হতাশ হয়ে তারাও ঘুমের দেশে চলে গিয়েছে। মশারা এবং কয়েকটি কুকুর কেবল জেগে। যদিও মশারা রাত্রিকালীন ভ্রমণে বেরোলেও কুকুরেরা অধিকাংশই কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে, দু’একটি কেবল এদিক-ওদিক অনির্দেশ্য ভঙ্গীতে ঘুরছে।
হাসপাতালের মধ্যে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে গোটা হাসপাতাল-ভবনকে ঘুমন্তপুরীর মতো লাগছিল। আলো জ্বলছে সার-সার, কিন্তু কোথাও প্রাণের সাড়া নেই কোনও। এমার্জেন্সি ওয়ার্ডের মাথার সাইনবোর্ডটি জ্বলজ্বল করছিল। আজকের নাইটডিউটি অফিসার যে ডাক্তার, তিনি তাঁর নিজস্ব চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে ঝিমিয়ে নিচ্ছিলেন। একজন নার্স এবং ওয়ার্ড বয় সময় কাটাবার জন্য যে-যার মোবাইলে চোখ রেখে খুটুর-খুটুর করছে আর থেকে-থেকে হাই তুলছে। আর কিছুক্ষণ দেখে তারাও একটু ঘুমিয়ে নেবে।
হাসপাতালের বাইরে গেটের দু’পাশে সার-সার খান সাত-আট চায়ের দোকান। সস্তার হোটেল। দু’টি দোকান ছাড়া বাকিগুলি এত রাতে বন্ধ। একটি দোকান খোলা থাকলেও তার মালিক ঘুমাচ্ছে। আর একটি দোকানে অবশ্য চা তৈরি হচ্ছিল। পুলিশ থেকে শুরু করে রাতের অন্যান্য নিরাপত্তারক্ষী, হাসপাতালের স্টাফ অনেকেই তার খাতক। তারা কিছুক্ষণ পরে-পরেই চায়ের ফরমাশ দেয়। এখন মোবাইল ফোনের যুগ। এসে দিতে হয় না। দোকানের সামনেই একখানি বড় সাইনবোর্ডে তার ফোন-নম্বর লেখা, তার নিচে ‘২৪ x ৭ আপনার সার্ভিসের জন্য খোলা’ লেখা। অনেকের কাছেই তার দোকানের নম্বর আছে। চা-টাও সে ভালোই বানায়। অতএব রাতে তার ঘুমালে চলবে না। সে বরং দুপুরের দিকটা এক ফাঁকে ঘুমিয়ে নেয়। তখন তার বঊ আর ছেলে এসে দোকান সামলায়। আজকেও অর্ডার আছে তার। অনেক পুলিশ আজ ডিউটিতে আছে। হাসপাতালের সুপার ফোন করে বলে দিয়েছেন, দু’ ঘণ্টা অন্তর তাদের চা-বিস্কুট দিতেআর খরচের হিসেব খাতায় লিখে রাখতে। পরে একসঙ্গে বিল করে দিলে সরকার না-ও যদি দেয়, তিনি নিজের পকেট থেকে পে করে দেবেন। এর আগেও অনেকদিন এমন হয়েছে। তার টাকা কোনওদিন চোট যায়নি। অতএব এই ব্যবস্থায় তার কোনও আপত্তি ছিল না। সে নিজস্ব সুরে “ও সাকি সাকি” গাইছিল।
হাসপাতালের মধ্যে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে গোটা হাসপাতাল-ভবনকে ঘুমন্তপুরীর মতো লাগছিল। আলো জ্বলছে সার-সার, কিন্তু কোথাও প্রাণের সাড়া নেই কোনও। এমার্জেন্সি ওয়ার্ডের মাথার সাইনবোর্ডটি জ্বলজ্বল করছিল। আজকের নাইটডিউটি অফিসার যে ডাক্তার, তিনি তাঁর নিজস্ব চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে ঝিমিয়ে নিচ্ছিলেন। একজন নার্স এবং ওয়ার্ড বয় সময় কাটাবার জন্য যে-যার মোবাইলে চোখ রেখে খুটুর-খুটুর করছে আর থেকে-থেকে হাই তুলছে। আর কিছুক্ষণ দেখে তারাও একটু ঘুমিয়ে নেবে।
হাসপাতালের বাইরে গেটের দু’পাশে সার-সার খান সাত-আট চায়ের দোকান। সস্তার হোটেল। দু’টি দোকান ছাড়া বাকিগুলি এত রাতে বন্ধ। একটি দোকান খোলা থাকলেও তার মালিক ঘুমাচ্ছে। আর একটি দোকানে অবশ্য চা তৈরি হচ্ছিল। পুলিশ থেকে শুরু করে রাতের অন্যান্য নিরাপত্তারক্ষী, হাসপাতালের স্টাফ অনেকেই তার খাতক। তারা কিছুক্ষণ পরে-পরেই চায়ের ফরমাশ দেয়। এখন মোবাইল ফোনের যুগ। এসে দিতে হয় না। দোকানের সামনেই একখানি বড় সাইনবোর্ডে তার ফোন-নম্বর লেখা, তার নিচে ‘২৪ x ৭ আপনার সার্ভিসের জন্য খোলা’ লেখা। অনেকের কাছেই তার দোকানের নম্বর আছে। চা-টাও সে ভালোই বানায়। অতএব রাতে তার ঘুমালে চলবে না। সে বরং দুপুরের দিকটা এক ফাঁকে ঘুমিয়ে নেয়। তখন তার বঊ আর ছেলে এসে দোকান সামলায়। আজকেও অর্ডার আছে তার। অনেক পুলিশ আজ ডিউটিতে আছে। হাসপাতালের সুপার ফোন করে বলে দিয়েছেন, দু’ ঘণ্টা অন্তর তাদের চা-বিস্কুট দিতেআর খরচের হিসেব খাতায় লিখে রাখতে। পরে একসঙ্গে বিল করে দিলে সরকার না-ও যদি দেয়, তিনি নিজের পকেট থেকে পে করে দেবেন। এর আগেও অনেকদিন এমন হয়েছে। তার টাকা কোনওদিন চোট যায়নি। অতএব এই ব্যবস্থায় তার কোনও আপত্তি ছিল না। সে নিজস্ব সুরে “ও সাকি সাকি” গাইছিল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৩: ক্যান ইউ হ্যান্ডেল ইট?

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৮: সুজাতজাতক—তবু অনন্ত জাগে

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৮: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বানর

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২১: বিবাহ সংবাদ, আদিনাথ-গোরা
প্রায় তিনটে বেজে গেলেও যখন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটল না, তখন সকলে আশ্বস্ত হল এই ভেবে যে, যা ভয় করা গিয়েছিল, তার কিছুই হবে না। দুষ্কৃতিকারীদের দল যদি কোনও প্ল্যান করেও থেকে থাকে, তাহলেও নিরাপত্তার এই কড়াকড়ি দেখে, তারা আর কাছে ঘেঁষেনি। আস্তে-আস্তে পুলিশেরা হতোদ্যম হয়ে পড়ল। আর ঘণ্টা দেড়েক। তারপরেই সকাল হয়ে যাবে। চারটে-সাড়ে চারটে থেকেই দূর-দূরান্তের পেশেন্ট-পার্টি আসতে শুরু করবে। কেউ অ্যাম্বুলেন্সে, কেউ সাধারণ গাড়িতে, কেউ বা হাতেটানা ভ্যানরিক্সায়। টোটো করেও আসে অনেকেই। সাতটা বাজতে-না-বাজতেই গোটা হাসপাতাল চত্বর একেবারে গমগম করতে থাকে। তবে আজ এমার্জেন্সিতে আসা রোগীদের ভালো ভাবে চেক করে তবেই ঢুকতে দেওয়া হবে। তবে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশেরা নিশ্চিত, সকালবেলা সত্যব্রতর উপর হামলা করার দুঃসাহস কেউ দেখাবে না। যা হবে রাত্তিরে। সে আজ না হলে হয়তো আগামীকাল রাত্তিরে, কিংবা তার পরের দিন। সত্যব্রতকে হাসপাতাল কতদিন অবজারভেশনে রাখবে তা তারা কেউ জানে না। তবে যতদিন সত্যব্রত এখানে থাকবেন, ততদিন দিন-রাত বদলি-পাহারার ব্যবস্থা যে থাকবে, তা তারা সকলেই বুঝেছে।
সকলে রিল্যাক্স করছিল। চা-বিস্কুট দু-তিন রাউন্ড খাওয়ার পরেও অবাধ্য চোখ বাধ মানছিল না বলে কেউ-কেউ মোবাইলে মন দিয়েছিল। তাতেও কাজ হচ্ছে না দেখে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে নিচ্ছিল কেউ-কেউ। পুলিশে চাকরি করতে হলে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে নেওয়ার অভ্যাস করে নিতে হয় না, হয়ে যায় অভ্যাস। প্রণবের চোখে অবশ্য ঘুম নেই। সে সতর্কভাবে গেটে লক্ষ্য রাখছিল। সাড়ে তিনটে বেজে গেলেও যখন কিছু হল না, তখন তারও মনে হতে লাগল, স্যারেরা বেকার ভয় পেয়েছিলেন, কালপ্রিটরা এত পুলিশ দেখে নিশ্চয়ই এসেও ফিরে গিয়েছে।
সকলে রিল্যাক্স করছিল। চা-বিস্কুট দু-তিন রাউন্ড খাওয়ার পরেও অবাধ্য চোখ বাধ মানছিল না বলে কেউ-কেউ মোবাইলে মন দিয়েছিল। তাতেও কাজ হচ্ছে না দেখে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে নিচ্ছিল কেউ-কেউ। পুলিশে চাকরি করতে হলে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে নেওয়ার অভ্যাস করে নিতে হয় না, হয়ে যায় অভ্যাস। প্রণবের চোখে অবশ্য ঘুম নেই। সে সতর্কভাবে গেটে লক্ষ্য রাখছিল। সাড়ে তিনটে বেজে গেলেও যখন কিছু হল না, তখন তারও মনে হতে লাগল, স্যারেরা বেকার ভয় পেয়েছিলেন, কালপ্রিটরা এত পুলিশ দেখে নিশ্চয়ই এসেও ফিরে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৭: জরাসন্ধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মত ও তাঁর নামের মাহাত্ম্য
তিনিটে পঁয়তাল্লিশ নাগাদ প্রথম একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল গেটের সামনে। রাতের বেলা মেইন-গেট বন্ধ রাখা হয়। অ্যাম্বুলেন্স বা পেশেন্ট পার্টি এলে খুলে দেওয়া হয়। তবে ছ’টার সময় মেইন গেট পুরো খুলে দেওয়া হয়। চারটে বাজতে আর মিনিট পনেরো বাকি, এইসময় অ্যাম্বুলেন্স আসা কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। তাও আজকের দিনটাই যেহেতু স্বাভাবিক নয়, অতএব প্রণব এবং আরও দু’জন পুলিশ এসে দাঁড়াল গেটের সামনে।
অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের সিটে যে বসে আছে, তাকে সবাই চেনে। চার্চের গাড়ি চালায়। তালেব। অ্যাম্বুলেন্সের সামনের কাঁচে চার্চের নাম ও লোগো লাগানো স্টিকার আটকানো। এইরকম বেশ কয়েকটা অ্যাম্বুলেন্স আছে চার্চের। মাঝেমধ্যেই সেগুলি নিয়ে তালেব এখানে আসে, প্রয়োজন পড়লে অন্য রাজ্যেও যায়। পিশাচপাহাড় বর্ডারে রাতপাহারা দেয় যে-সব পুলিশ, তারা মাঝেমধ্যেই এইরকম ক্রিটিক্যাল পেশেন্টকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তালেবকে নিয়ে যেতে দেখে। এইরকম অবস্থায় তারা দ্রুত তালেবের গাড়ি ছেড়ে দেয়। সামান্য দেরি হলে যদি রোগীর প্রাণ সংশয় হয়, তাহলে তা করা অনুচিত। প্রণব না-চিনলেও, এখানে উপস্থিত পুলিশের কেউ-কেউ তালেবকে চেনে। চার্চের নিজস্ব হাসপাতাল আছে পিশাচপাহাড়ে। সেখানে অনেক ফেসিলিটিজ থাকলেও খুব ক্রিটিক্যাল এবং আনইউজ্যুয়াল কোন কেস, যেগুলি তারা তাদের যে ইনফাস্ট্র্যাকচার আছে, তা দিয়ে সামলাতে অপারগ, সেগুলিকে সদরে রেফার করে দেওয়া হয়। চার্চের সঙ্গে সদর হাসপাতালের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বোঝাপড়া আছে। চার্চের পাঠানো পেশেন্টকে যে-ভাবেই হোক ভর্তি করে নেওয়া হয়।
অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের সিটে যে বসে আছে, তাকে সবাই চেনে। চার্চের গাড়ি চালায়। তালেব। অ্যাম্বুলেন্সের সামনের কাঁচে চার্চের নাম ও লোগো লাগানো স্টিকার আটকানো। এইরকম বেশ কয়েকটা অ্যাম্বুলেন্স আছে চার্চের। মাঝেমধ্যেই সেগুলি নিয়ে তালেব এখানে আসে, প্রয়োজন পড়লে অন্য রাজ্যেও যায়। পিশাচপাহাড় বর্ডারে রাতপাহারা দেয় যে-সব পুলিশ, তারা মাঝেমধ্যেই এইরকম ক্রিটিক্যাল পেশেন্টকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তালেবকে নিয়ে যেতে দেখে। এইরকম অবস্থায় তারা দ্রুত তালেবের গাড়ি ছেড়ে দেয়। সামান্য দেরি হলে যদি রোগীর প্রাণ সংশয় হয়, তাহলে তা করা অনুচিত। প্রণব না-চিনলেও, এখানে উপস্থিত পুলিশের কেউ-কেউ তালেবকে চেনে। চার্চের নিজস্ব হাসপাতাল আছে পিশাচপাহাড়ে। সেখানে অনেক ফেসিলিটিজ থাকলেও খুব ক্রিটিক্যাল এবং আনইউজ্যুয়াল কোন কেস, যেগুলি তারা তাদের যে ইনফাস্ট্র্যাকচার আছে, তা দিয়ে সামলাতে অপারগ, সেগুলিকে সদরে রেফার করে দেওয়া হয়। চার্চের সঙ্গে সদর হাসপাতালের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বোঝাপড়া আছে। চার্চের পাঠানো পেশেন্টকে যে-ভাবেই হোক ভর্তি করে নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১২১: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৩ : শহরের ইতিকথা
একজন পুলিশ এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কোথা থেকে আসছো?”
তালেব বিনীতভাবে বলল, “পিশাচপাহাড় চার্চ হসপিটাল থেকে। লোগো আছে। দেখুন না!”
বলতে-বলতে আরেকজন পুলিশ এগিয়ে এল, “আরে তালেব মিঞা! তুমি? চার্চের কেস?”
“হ্যাঁ। ক্রিটিক্যাল। এক্ষুনি এমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে হবে। ডাক্তারের সঙ্গে চার্চের ফাদারের কথা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। যাই হোক, গেটটা খুলে দিন, এমার্জেন্সির সামনে নিয়ে যাই!”
“হ্যাঁ, খুলছি!” দ্বিতীয় পুলিশটি বলল।
প্রথম পুলিশটি জিজ্ঞাসা করল, “চেনো না-কি? আমি কিন্তু চিনি না!”
“খুব চিনি। এখানে ডিউটি থাকলে প্রায়ই দেখা হয়ে যায়। তালেব। চার্চের গাড়ি চালায়। মানে অ্যাম্বুলেন্স আর কি!”
“ও আচ্চাহ আচ্ছা। তাহলে ত চেনা লোক। কোন লাফড়া হবে না! দাঁড়াও খুলে দিচ্ছি।” বলে প্রথম পুলিশটি গেট খুলে দিল।
প্রণব কিছু বলছিল না। সে অন্যান্যদের কথা শুনে বুঝল, এই অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার পুলিশ ফোর্সের কারও-কারও চেনা লোক। সে এগিয়ে এসেছিল। আর কথা না-বাড়িয়ে একটু দূরে গিয়ে মোবাইল খুলে খুটুরখাটুর করতে লাগল।
তালেব গাড়িটা নিয়ে এমার্জেন্সিতে যাওয়ার আগে জিজ্ঞাসা করল, “এত পুলিশ বলাইদা? কোন অ্যাকসিডেন্ট-ফান্ট হয়েছে না-কি কোথাও?”
“না না,” দ্বিতীয় পুলিশটি বলল, “একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এমার্জেন্সিতে আছেন। তাঁর জন্যই আর-কি। বড়কর্তার লোক। বুঝতেই তো পারছেন। হেঁ হেঁ!”
“ওওও…” বলে তালেব এমার্জেন্সির দিকে গাড়ি নিয়ে আস্তে-আস্তে এগিয়ে গেল। পুলিশ ক’জন সেই সময়ে দেখল, সামনে একজন অচেনা ছেলে বসে রয়েছে ড্রাইভারের পাশের সিটটায়, আর পিছনে একজন চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে আর উঁ-আঁ করছে। তারা অনুমান করল, সামনের সিটে যে বসে আছে, সে আসলে পেশেন্ট-পার্টির কেউ হবে!
তালেব বিনীতভাবে বলল, “পিশাচপাহাড় চার্চ হসপিটাল থেকে। লোগো আছে। দেখুন না!”
বলতে-বলতে আরেকজন পুলিশ এগিয়ে এল, “আরে তালেব মিঞা! তুমি? চার্চের কেস?”
“হ্যাঁ। ক্রিটিক্যাল। এক্ষুনি এমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে হবে। ডাক্তারের সঙ্গে চার্চের ফাদারের কথা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। যাই হোক, গেটটা খুলে দিন, এমার্জেন্সির সামনে নিয়ে যাই!”
“হ্যাঁ, খুলছি!” দ্বিতীয় পুলিশটি বলল।
প্রথম পুলিশটি জিজ্ঞাসা করল, “চেনো না-কি? আমি কিন্তু চিনি না!”
“খুব চিনি। এখানে ডিউটি থাকলে প্রায়ই দেখা হয়ে যায়। তালেব। চার্চের গাড়ি চালায়। মানে অ্যাম্বুলেন্স আর কি!”
“ও আচ্চাহ আচ্ছা। তাহলে ত চেনা লোক। কোন লাফড়া হবে না! দাঁড়াও খুলে দিচ্ছি।” বলে প্রথম পুলিশটি গেট খুলে দিল।
প্রণব কিছু বলছিল না। সে অন্যান্যদের কথা শুনে বুঝল, এই অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার পুলিশ ফোর্সের কারও-কারও চেনা লোক। সে এগিয়ে এসেছিল। আর কথা না-বাড়িয়ে একটু দূরে গিয়ে মোবাইল খুলে খুটুরখাটুর করতে লাগল।
তালেব গাড়িটা নিয়ে এমার্জেন্সিতে যাওয়ার আগে জিজ্ঞাসা করল, “এত পুলিশ বলাইদা? কোন অ্যাকসিডেন্ট-ফান্ট হয়েছে না-কি কোথাও?”
“না না,” দ্বিতীয় পুলিশটি বলল, “একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এমার্জেন্সিতে আছেন। তাঁর জন্যই আর-কি। বড়কর্তার লোক। বুঝতেই তো পারছেন। হেঁ হেঁ!”
“ওওও…” বলে তালেব এমার্জেন্সির দিকে গাড়ি নিয়ে আস্তে-আস্তে এগিয়ে গেল। পুলিশ ক’জন সেই সময়ে দেখল, সামনে একজন অচেনা ছেলে বসে রয়েছে ড্রাইভারের পাশের সিটটায়, আর পিছনে একজন চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে আর উঁ-আঁ করছে। তারা অনুমান করল, সামনের সিটে যে বসে আছে, সে আসলে পেশেন্ট-পার্টির কেউ হবে!
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯২: কৈলাসচন্দ্র সিংহ ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আপসহীন এক ঐতিহাসিক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
গাড়িটা সোজা গিয়ে থামল এমার্জেন্সির সামনে। সেখানেও দু’জন পুলিশ মোতায়েন। তাদের কেউ যদিও তালেবের মুখ চেনে না, তবুও গেটে যখন অ্যাম্বুলেন্সকে আটকায়নি, ফলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেই তারা ছেড়ে দিল। একজন অবশ্য প্রণবস্যারকে ফোন করেছিল। তিনি বললেন, “চার্চের গাড়ি। ছেড়ে দাও। এখানে অনেকে চেনে ড্রাইভার এবং গাড়িটিকে। প্রায়ই আসে।”
“আচ্ছা স্যার!” বলে সে ফোন রেখে সঙ্গীকে বলল, ছেড়ে দিতে।
গাড়ি থামিয়ে তালেব নামল গাড়ি থেকে। সে চার্চের লোক। অতএব তার পরিচিতি থাকবে এখানে সেটাই স্বাভাবিক। সে ভিতরে গেল। কিছুক্ষণ পরে একজন ডাক্তার এবং সঙ্গে ট্রলি-বেড নিয়ে একজন অ্যাটেনডেন্ট হাজির হল। অ্যাম্বুলেন্সের পিছনের দরজা খুলে গেল। পিছন থেকে চাদর মুড়ি দেওয়া একজন এবং অ্যাটেনডেন্ট দুজনে মিলে ভারিক্কি চেহারার একজনকে নামিয়ে ট্রলিতে শুইয়ে দিল। এই লোকটি বোধহয় পেশেন্টের কেউ হবে। তবে মুখ দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত ঠাণ্ডা লাগার ধাত আছে। সেইকারণে মাংকিটুপি পরে আছে। সেইসঙ্গে মুখে মাস্ক পরা। কোভিডের পর অনেকেই হাসপাতালে আসতে হলে মাস্ক ব্যবহার করে। এই লোকটিও সম্ভবত সেই জাতের। বেশ ভিতুই মনে হচ্ছে। সামনে যে বসে ছিল, সেই লোকটিও তখন নেমে পড়েছে। ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল সে। ডাক্তার তাকে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন, “আরে এত ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আমি চেক করি। তারপর দরকার হলে এখনই বেড দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। চলুন এখন আমাদের সঙ্গে!”
পুলিশ দু’জন সহানুভূতি দেখাল। আহা, সাধারণ মানুষ! নিশ্চয়ই আপন কেউ হবে। তা না হলে ছেলেদের চোখে এত সহজে জল আসে না। আহা বেঁচে যাক্!”
তালেব অবশ্য বেরিয়ে এল। এসে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল। গেটের কাছে তার চেনা পুলিশ একবার জিজ্ঞাসা করল বটে, “চলে যাচ্ছ যে তালেব ভাই? এখানকার কাজ শেষ?”
“হ্যাঁ। যাই, আর কোন কাজ না দিলে আজকের মতো ছুটি। কোয়াটার্সে গিয়ে ঘুমাবো!”
এসআই প্রণব যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান থেকে এমার্জেন্সির গেট দেখা যায়। সে তাকিয়েছিল। ওরা ভিতরে চলে যেতেই সে আবার মোবাইলে মন দিল।
হাসপাতাল জুড়ে আবার নিস্তব্ধতা ফিরে এল। একটা থমথমে ভোর। এখনও পাখিরা জাগেনি। ঝিঁঝিঁর আওয়াজ ছাড়া আর কিছু নেই। ভোর হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই রাত্রির এই রহস্যময়তা কেটে যাবে। একটা নতুন রিফ্রেশড্ সকাল আসবে। তারই প্রতীক্ষায় নিয়ন বাতিগুলি জ্বলেপুড়ে খাক্ হচ্ছিল যেন! —চলবে।
“আচ্ছা স্যার!” বলে সে ফোন রেখে সঙ্গীকে বলল, ছেড়ে দিতে।
গাড়ি থামিয়ে তালেব নামল গাড়ি থেকে। সে চার্চের লোক। অতএব তার পরিচিতি থাকবে এখানে সেটাই স্বাভাবিক। সে ভিতরে গেল। কিছুক্ষণ পরে একজন ডাক্তার এবং সঙ্গে ট্রলি-বেড নিয়ে একজন অ্যাটেনডেন্ট হাজির হল। অ্যাম্বুলেন্সের পিছনের দরজা খুলে গেল। পিছন থেকে চাদর মুড়ি দেওয়া একজন এবং অ্যাটেনডেন্ট দুজনে মিলে ভারিক্কি চেহারার একজনকে নামিয়ে ট্রলিতে শুইয়ে দিল। এই লোকটি বোধহয় পেশেন্টের কেউ হবে। তবে মুখ দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত ঠাণ্ডা লাগার ধাত আছে। সেইকারণে মাংকিটুপি পরে আছে। সেইসঙ্গে মুখে মাস্ক পরা। কোভিডের পর অনেকেই হাসপাতালে আসতে হলে মাস্ক ব্যবহার করে। এই লোকটিও সম্ভবত সেই জাতের। বেশ ভিতুই মনে হচ্ছে। সামনে যে বসে ছিল, সেই লোকটিও তখন নেমে পড়েছে। ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল সে। ডাক্তার তাকে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন, “আরে এত ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আমি চেক করি। তারপর দরকার হলে এখনই বেড দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। চলুন এখন আমাদের সঙ্গে!”
পুলিশ দু’জন সহানুভূতি দেখাল। আহা, সাধারণ মানুষ! নিশ্চয়ই আপন কেউ হবে। তা না হলে ছেলেদের চোখে এত সহজে জল আসে না। আহা বেঁচে যাক্!”
তালেব অবশ্য বেরিয়ে এল। এসে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল। গেটের কাছে তার চেনা পুলিশ একবার জিজ্ঞাসা করল বটে, “চলে যাচ্ছ যে তালেব ভাই? এখানকার কাজ শেষ?”
“হ্যাঁ। যাই, আর কোন কাজ না দিলে আজকের মতো ছুটি। কোয়াটার্সে গিয়ে ঘুমাবো!”
এসআই প্রণব যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান থেকে এমার্জেন্সির গেট দেখা যায়। সে তাকিয়েছিল। ওরা ভিতরে চলে যেতেই সে আবার মোবাইলে মন দিল।
হাসপাতাল জুড়ে আবার নিস্তব্ধতা ফিরে এল। একটা থমথমে ভোর। এখনও পাখিরা জাগেনি। ঝিঁঝিঁর আওয়াজ ছাড়া আর কিছু নেই। ভোর হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই রাত্রির এই রহস্যময়তা কেটে যাবে। একটা নতুন রিফ্রেশড্ সকাল আসবে। তারই প্রতীক্ষায় নিয়ন বাতিগুলি জ্বলেপুড়ে খাক্ হচ্ছিল যেন! —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















