শুক্রবার ১৩ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

এরপর একদিন গ্রামের বাইরে কিছু কাজে যেতে হল হরিদত্তকে। যাবার আগে তিনি ছেলেকে বললেন—
“বাবা, আমাকে কাজে গ্রামান্তরে যেতে হবে, তাই তুমি কাল সকালে নাগদেবতাকে দুধ দিয়ে আসবে। পাত্রটা যেন পরিষ্কার থাকে, আর মনে যেন ভক্তি থাকে।”

ছেলেটিও পিতার নির্দেশ মেনে পরদিন সকালে সে উঁইয়ের ঢিবির পাশে গিয়ে পাত্র ভর্তি দুধ রেখে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করে ফিরে এল। কিন্তু পরদিন সকালে সেখানে গিয়ে সেই পাত্রে রাখা স্বর্ণমুদ্রা দেখে সে খুবই বিস্মিত হল। তার কিশোর মনে কৌতূহল জেগে উঠল। সে চুপচাপ মুদ্রাটা হাতে নিয়ে ভাবল— “নিশ্চয়ই এই উঁইয়ের ঢিবির ভিতরটা সোনায় ভর্তি! তাহলে আমি যদি এই সাপটাকে মেরে ফেলি, তবে সব মোহর একসঙ্গে পেয়ে আমি যাব। ধীরে ধীরে এক-একটা করে নয়— সবটা একবারেই!”
লোভের ছায়া যেন তার চোখে ঘনিয়ে এল।

পরদিন সকালে ছেলেটি দুধের পাত্র হাতে নিয়ে আবার এল সেই জায়গায়। কিন্তু এবার তার মনে শ্রদ্ধা ছিলো না, ছিল গোপন ষড়যন্ত্র। পাত্রটি ঢিবির পাশে রেখে সে একটু দূরে এক গাছের আড়ালে লাঠি হাতে অপেক্ষা করতে লাগল। সূর্যের আলো তখন ধীরে ধীরে ঢিবির গায়ে পড়ছে। উঁইয়ের ছোট ফাটল থেকে হঠাৎ এক ঝলক আলো ছিটকে বেরোল—নাগদেবতা বেরিয়ে আসছেন। ফণা তোলা সাপটির গায়ে যেন রৌদ্রের ঝিলিক নেচে উঠছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে ব্রাহ্মণপুত্র লাঠি তুলে আঘাত করল সাপটির মাথায়—প্রচণ্ড এক আঘত! সাপটি যন্ত্রণায় কেঁপে উঠল, কিন্তু মরল না।
চোখের এক পলকে সেই আহত সাপটি ফণা উঁচিয়ে হিংস্র গর্জনে ছোবল মারল ছেলেটির পায়ে। বিষ ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না—ছেলেটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, নিঃশ্বাস থেমে গেল, তার শরীর নিস্তেজ হয়ে গেল অরণ্যের মাটিতে। চারিদিকে স্তব্ধতা নেমে এল—শুধু দুধের পাত্রটি উল্টে গিয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছিল, আর ধীরে ধীরে সেই সাদা দুধের ধারা ঢিবির মাটির ভিতর মিশে যেতে থাকল।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯১: যারা সময়ের স্রোতে নত হতে জানে, তারাই টিকে যায়; যারা আগুনে ঝাঁপায়, তারাই পুড়ে মরে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৯: শেফালিকার বিপদ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৭: বিলেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অস্ত্রোপচার

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৬: বিষণ্ণ সকাল, নিঃসঙ্গ আদিনাথ

পরদিন সদ্যমৃতপুত্রের পিতা সেই ব্রাহ্মণ হরিদত্ত গ্রামান্তর থেকে ফিরে এসে আত্মীয়বর্গের মুখে সবিস্তারে পুত্রের মৃত্যুর কারণ সবিস্তারে শুনে সে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে মাটিতে বসে পড়ল সে। দুই হাঁটুর উপর হাত রেখে দীর্ঘক্ষণ বসে রইল সে নিঃশব্দে। তারপর ধীরে ধীরে বলল —“এইভাবে মরাটাই ওর প্রাপ্য ছিল। যে লোভে অন্ধ হয়, সে নিজের মৃত্যুর বীজ নিজেই বোনে। আমি সততার পথ দেখিয়েছিলাম, কিন্তু সে ধনলালসায় ভেসে গেল। এ মৃত্যু দুঃখের, কিন্তু অন্যায় নয়।”

কণ্ঠে তখন তাঁর রাগ, বেদনা আর আত্মগ্লানির মিশ্র সুর। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে নিজের এক আত্মীয়ের দিকে ফিরলেন। তাঁর চোখে তখন এক অন্য রকম দীপ্তি— সে দীপ্তি তাঁর অভিজ্ঞতার, অনুশোচনার, আর জ্ঞানের।

তিনি বললেন, “শোনো ভাই, যে মানুষ নিজের আশ্রয়ে আসা প্রাণীকে রক্ষা করে না, তার সৌভাগ্যও একদিন বিনষ্ট হয়ে যায়। যেমন পদ্মসরোবরে থাকা হংসের দলেকে যেমন রাজা হারিয়েছিল।”
আত্মীয়-পুরুষটি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “পদ্মসরোবরে থাকা হংসের দলকে যেমন হারিয়েছিল মানে? ব্যাপারটা ঠিক কিরকম? —কথমেতৎ?”

ব্রাহ্মণ হরিদত্ত তখন বলতে শুরু করলেন—
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৪: সুন্দরবনের পাখি: গোত্রা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

০৭: স্বর্ণহংসদের কাহিনি

দূর এক রাজ্যে ছিলেন এক বিখ্যাত সম্রাট—রাজা চিত্ররথ। তাঁর রাজ্যে ছিল এক মনোরম পদ্মসরোবর— নীলচে তার জল আর লাল পদ্মে ঠাঁসা। রাজা সেই সরোবরের সৌন্দর্য রক্ষা করতে প্রতিদিন সৈন্য মোতায়েন করতেন। সেই পদ্মসরোবরে বাস করত একদল স্বর্ণহংস—অদ্ভুত সুন্দর, দীপ্ত পালকে তাদের যেন সূর্যালোক ঝলমল করে উঠত। তারা রাজাকে প্রতি ছয় মাস অন্তর একটি করে সোনার পালক দান করতেন। রাজা তাদের নিয়ে গর্ব করতেন, কারণ তাঁর সম্পদ ও ঐশ্বর্যের এক অংশ ছিল সেই হংসদের দান।

একদিন সেই সরোবরে এসে হাজির হল এক বৃহদাকায় স্বর্ণপক্ষী—অজানা, অপরিচিত। তার পালক আরও উজ্জ্বল, রং আরও গাঢ় সোনালি। সরোবরের হংসেরা তাকিয়ে রইল, তারপর সেই স্বর্ণহংসের দল তখন সেই বৃহত্কায় স্বর্ণপক্ষীটিকে বলল, “ভদ্র! আপনি এখানে আমাদের সঙ্গে থাকতে পারেন না, আমরা প্রতি ছ’মাস অন্তর প্রত্যেকে একটি একটি করে সোনার পালক মূল্য হিসেবে দিয়ে রাজার কাছ থেকেই এই সরোবর ভাড়া নিয়েছি।”

বলা বাহুল্য দু’পক্ষের মধ্যে এই নিয়েই কথা কাটাকাটি শুরু হল। সেই বৃহত্কায় পক্ষীটি রাজার কাছে গিয়ে তাঁর কান ভাঙিয়ে নালিশ করে বলল, “মহারাজ, পদ্মসরোবরের সেই হংসেরা আপনার নাম নিয়ে হাসাহাসি করছে! তারা বলছে—রাজা কিছুই করতে পারবে না! অস্মাকং রাজা কিং করিষ্যতি? আমরা অন্য কাউকে এখানে থাকতে দেব না। আমি তো শুধু তাঁদের অনুচিত কথা শুনে বলেছিলাম, ‘এটা তো শোভন নয়—ন শোভনং যুষ্মাভিঃ অভিহিতম্‌—আমি মহারাজকে জানাবো।’ এবার আপনি নিজেই বিচার করুন এবং স্থিতে দেবঃ প্রমাণম্‌। এবার মহারাজ সবটাই আপনার উপর।”

আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?

রাজা চিত্ররথের মুখ তৎক্ষণাৎ গাঢ় লাল হয়ে উঠল। অহঙ্কারে ও ক্রোধে তিনি গর্জে উঠলেন—
“কী বললে? তারা বলেছে আমরা কিছুই করতে পারব না!” তিনি তৎক্ষণাৎ আদেশ দিলেন, “ভো ভোঃ! গচ্ছত! সর্বান্‌ পক্ষিণঃ গতাসূন্‌ কৃত্বা শীঘ্রমানযত— যাও সকলে দ্রুত ছুটে যাও আর সকল পাখিদের মেরে শীঘ্র আমার কাছে নিয়ে এসো। রাজা কী করতে পারে আর কী পারে না, তা আজ ওরা জানবে।”

আদেশ পেয়ে সৈন্যরা দলে দলে ছুটল সেই পদ্মসরোবরের দিকে, হাতে লাঠি আর বল্লম।
কিন্তু সরোবরের এক প্রাজ্ঞ বৃদ্ধ স্বর্ণহংস দূর থেকে তাঁদের আসতে দেখল। সে কণ্ঠে তীব্র সতর্কতা এনে ডাক দিল— “ভোঃ স্বজনাঃ! ওহে আপনজনেরা! বিপদ সামনে! রাজার সৈন্যরা আসছে—এখনই সবাই মিলে উড়ে যাও অন্য কোথাও, নয়তো মৃত্যু নিশ্চিত!”

হংসেরা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে উড়ে গেল আকাশে—উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিমে ছড়িয়ে গেল তাদের দল।
ফলে রাজা যখন সৈন্য পাঠালেন, তখন সরোবর শূন্য—কেবল থেকে গেল সেই বৃহদাকায় স্বর্ণপক্ষীটি, যে নালিশ করেছিল। রাজা খুব শিগগিরই বুঝলেন নিজের ভুল—কারণ সেই হংসেরাই তাঁকে নিয়মিত সোনার পালক দান করত, যা রাজকোষ ভরিয়ে রাখত। কিন্তু এক ভুল সিদ্ধান্তে, এক মিথ্যা অভিযোগে, তিনি নিজেরই কল্যাণ ধ্বংস করে ফেললেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৬: জীবন নিয়ে কৌতুক আর ‘যৌতুক’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

গল্প শেষ করে ব্রাহ্মণ হরিদত্ত বললেন, “এই কারণেই আমি বলেছিলাম—
ভূতান্‌ যো নানুগৃহ্ণাতি হ্যাত্মনঃ শরণাগতান্‌।
ভূতার্থাস্তস্য নশ্যন্তি হংসাঃ পদ্মবনে যথা।। (কাকোলূকীযম্‌, ১৩৩)


যে ব্যক্তি নিজের আশ্রয়ে আসা জীবকে রক্ষা করে না, তার সৌভাগ্যও ধ্বংস হয়ে যায়,
যেমন পদ্মবনে হংসদের হারিয়ে রাজা চিত্ররথও নিজের ঐশ্বর্য হারিয়েছিলেন।”

একজন শাসক যদি নিজের উপর নির্ভরশীলদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হন, তবে তার সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়।
চিত্ররথের মতো রাজা, এক মুহূর্তের অবিবেচনা ও রাগে নিজের বিশ্বাসযোগ্য সহযোগীদের হারিয়ে ফেলেন—যাঁরা তাঁকে সম্পদ ও স্থিতি দিতেন। ব্রাহ্মণ হরিদত্ত এই কাহিনিটি বলেছিলেন রাজার নীতিশিক্ষাকে ব্যাখ্যা করতে নয়, বলেছিলেন নিজের জীবনের যন্ত্রণাকে অর্থবহ করে তুলতে। তাঁর পুত্রের মৃত্যু হয়েছিল লোভ, অবিবেচনা ও অবিশ্বাসের কারণে—যে সাপটিকে তিনি ক্ষেত্রদেবতা বলে পূজা করেছিলেন, সেই আশ্রিত দেবতার উপর তাঁর সন্তান বিশ্বাস রাখতে পারেনি। সেই অবিশ্বাসই তার সর্বনাশ ডেকে আনে।

তাই হরিদত্ত এই গল্প শুনিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন—যেমন রাজা চিত্ররথ অবিশ্বাসে নিজের হংসদের হারিয়ে রাজকোষ শূন্য করেছিলেন, তেমনি তাঁর পুত্রও অবিশ্বাসে আশ্রিত দেবতার উপর আঘাত করে নিজের জীবন হারিয়েছে।
রাজা বা সাধারণ মানুষ—উভয়ের ভাগ্যই সমান। যে নিজের আশ্রয়ে আশ্রিতের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস হারায়, সে শেষ পর্যন্ত নিজের আশ্রয়ও হারায়। —চলবে।

* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content