
ছবি : প্রতীকী।
বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে বারাণসীর এক বণিকের কুলে জন্ম নিলেন। তাঁর আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হল যথাসময়ে। নাম হল “পণ্ডিত।” প্রাপ্তবয়স্ক হলে তিনি অপর এক বণিকের সঙ্গে যৌথভাবে বাণিজ্য আরম্ভ করলেন। সেই ব্যক্তির নাম ছিল “অতিপণ্ডিত।” তাঁরা পাঁচশ’ শকট পণ্যভারে পূর্ণ করে জনপদে ব্যবসা করে বিশেষ লাভবান হলেন। ফিরে এলেন স্বস্থানে।
লভ্যাংশের ভাগাভাগি করতে গিয়ে সমস্যা দেখা দিল। অতিপণ্ডিত জানিয়ে দিলেন দুই তৃতীয়াংশ তিনি নেবেন। বাকিটা পণ্ডিতের। কিন্তু কেন? কারণ তিনি অতিপণ্ডিত, তাই মহত্তর। তাই তাঁর শ্রেষ্ঠভাগ। কিন্তু এ আবার কেমন কথা? পণ্যের মূল্য থেকে গাড়ি-বলদ ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই তো উভয়ের সমান অবদান। তাহলে লাভের বেলায় বৈষম্য কেন?
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৩: জরাসন্ধ ও কৃষ্ণের কথোপকথন সূত্রে নিহিত আছে রাজনীতির পাঠ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০০ : প্রাচীন ভারতের ‘স্টিং অপারেশন’-এরও নজির মেলে পঞ্চতন্ত্রের কূটনীতিতে!

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৫ : য-এ যুদ্ধ
তর্ক শেষে কলহে পৌঁছলে অতিপণ্ডিত এর এক সমাধানের উপায় ঠিক করল। তিনি তাঁর পিতাকে এক বৃক্ষকোটরে লুকিয়ে রেখে তাঁকে শিখিয়ে রাখলেন কী বলতে হবে। যখন দুই বন্ধু বৃক্ষের সামনে এসে প্রশ্ন করবেন তখন কোটরের মধ্য থেকে পিতা জানাবেন “অতিপণ্ডিত দুইভাগ পাবে।”
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৯ : ভোরের রক্তাক্ত কবিতা
এরপর অতিপণ্ডিত বন্ধুকে জানালেন যে এই সমস্যার সমাধান একমাত্র বৃক্ষদেবতাই করতে পারবেন। তাহলে তাঁর কাছেই যাওয়া যাক না! বৃক্ষতলে এসে অতিপণ্ডিত অতি ভক্তিভরে বৃক্ষদেবতাকে সম্বোধন করে প্রার্থনা জানালেন। তাঁদের সমস্যাটি সমাধান করে দিতে হবে যে! পিতা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে জানতে চাইলেন “কী প্রার্থনা তব, কীসের বিবাদ?” সকল কিছু শুনে তিনি বিধান দিলেন “অতিপণ্ডিতের দুইভাগ, পণ্ডিতের একভাগ।” ব্যস! তাহলে মিটেই তো গেল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৭: রাজতন্ত্রের শাসন হলেও ত্রিপুরায় তখন ধীরে ধীরে গণচেতনার উন্মেষ ঘটছে

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৬২: আকাশ এখনও মেঘলা
বোধিসত্ত্বরূপী পণ্ডিত এমন বিচার শুনে সন্দিগ্ধ হলেন। বৃক্ষকোটরে দেবতা আছেন কীনা দেখার জন্য তিনি বৃক্ষকোটরে অগ্নিসংযোগ করলেন। ধক করে জ্বলে উঠল সেই স্থান। অতিপণ্ডিতের পিতা অর্ধদগ্ধশরীরে সেখান থেকে নির্গত হয়ে বৃক্ষশাখায় ঝুলতে ঝুলতে ভূতলে অবতরণ করলেন। পণ্ডিতের প্রশংসা করে জানালেন তাঁর নাম সার্থক। আর, অতিপণ্ডিত তাঁর নিজের ও পিতার নাম ডুবিয়েছেন। পুত্রের দোষেই তাঁর এই ক্লেশ। এরপর তাঁরা লভ্যাংশ সমভাগ করে নিলেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গঙ্গার শুশুক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
পণ্ডা শব্দ জ্ঞানার্থক। তাই পণ্ডিত জ্ঞানী, বিবেকবান ব্যক্তি। পণ্ডিতের সত্যদৃষ্টি থাকে। অতিপণ্ডিতের নামে অতি এই উপসর্গের যোগে দ্বিবিধ অর্থসম্ভাবনা জাগে। অত্যয় বা হানি অর্থটি সম্ভবতঃ এখানে প্রযোজ্য নয়। অতিশয়ার্থেই এটি গ্রহণ করা যেতে পারে। বাহুল্য অনেকক্ষেত্রেই হানিকর হতে পারে। অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হয়। পাণ্ডিত্যের এই আতিশয্য বিদ্রূপাত্মক এই নিয়ে সংশয় থাকে না। কারণ, প্রকৃতিতে যে সুস্থ সাম্য ও স্বাভাবিকতার দাবী থেকে যায়, আতিশয্য তার পরিপন্থী বটে। মহাভারতের প্রজাগর পর্বের বিদুরনীতি থেকে সমকাল… পণ্ডিত, মূর্খপণ্ডিত, পণ্ডিতন্মন্য মানুষের বৈশিষ্ট্য নিয়ে নানা পরামর্শ দেয়। গল্পসাহিত্যে পণ্ডিতন্মন্য শেয়াল যে চতুর ও ধূর্ত, জ্ঞানী বা পণ্ডিত নয় তা বুঝতে বাকি থাকে কি? তবুও এরা থাকে। আর পণ্ডিত ও ধূর্তের ব্যবধানটুকু উপলব্ধির জন্য এমন গল্পগুলিও থাকে পথপ্রদর্শক হয়ে। বাস্তববোধ, যাথার্থ্য, নীতি ও সত্যভ্রষ্ট হয়ে কোনও জ্ঞান-ই সফল হয় না। সেইরকম জ্ঞান ও জ্ঞানীদের কী পরিণতি হয় তা-ই জানিয়ে যায় জাতকমালার এই কাহিনি।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















