
ছবি: প্রতীকী।
একটানা দেওয়াল ঘড়ির টিকটিকের মধ্যে ঘরের মধ্যে দুটো মানুষের মনেতেও অনেক কথা জমা হয়ে যাচ্ছে। দু’জনেই জেগে আছে। অমলেন্দু ছাদের দিকে তাকিয়ে আর ডান হাত দিয়ে চোখের কাছটা চাপা দিয়ে রেখেছে প্রতিমা! কে প্রথম কথা বলবে, কি কথা বলবে। মনে মনে এই চাপান-উতোরের মধ্যেই অমলেন্দু বলে উঠল—
—কী চাইছ তুমি?
প্রতিমার দিক থেকে কোনও উত্তর এল না। নৈঃশব্দ্যের মধ্যে বেশ কয়েকবার ঘড়ির টিকটিক অপেক্ষাকে দীর্ঘায়িত করল।
—আমি জানি তুমি জেগে আছো! আমি তোমায় একটা প্রশ্ন করেছি।
—সব সময় সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না। এটারও উত্তর আমার কাছে নেই।
—কার কাছে আছে?
—হয়ত তো তোমার কাছে!
—আমি দূরত্ব চাইছি না।
—দূরত্ব এমনি এমনি তৈরি হয় না! তার কারণ থাকে।
—যেমন?
—যা চলছে … সন্দেহ, অপমান, অসম্মান।
—আমি তো এগুলো করিনি।
—করেছো! স্বীকার করতে চাইছ না! যে চিঠির সূত্রে আমাদের সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারত, চিঠিতে তোলা প্রশ্নগুলো সত্বেও তুমি শেষমেশ বিয়েতে যখন রাজি হয়েছিলে তখন এটা ধরে নেওয়া যায় যে তুমি চিঠির প্রসঙ্গটাকে সরিয়ে দিয়ে মানবিক সম্পর্কের জন্য সম্মতি দিয়েছিলে।
—কী চাইছ তুমি?
প্রতিমার দিক থেকে কোনও উত্তর এল না। নৈঃশব্দ্যের মধ্যে বেশ কয়েকবার ঘড়ির টিকটিক অপেক্ষাকে দীর্ঘায়িত করল।
—আমি জানি তুমি জেগে আছো! আমি তোমায় একটা প্রশ্ন করেছি।
—সব সময় সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না। এটারও উত্তর আমার কাছে নেই।
—কার কাছে আছে?
—হয়ত তো তোমার কাছে!
—আমি দূরত্ব চাইছি না।
—দূরত্ব এমনি এমনি তৈরি হয় না! তার কারণ থাকে।
—যেমন?
—যা চলছে … সন্দেহ, অপমান, অসম্মান।
—আমি তো এগুলো করিনি।
—করেছো! স্বীকার করতে চাইছ না! যে চিঠির সূত্রে আমাদের সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারত, চিঠিতে তোলা প্রশ্নগুলো সত্বেও তুমি শেষমেশ বিয়েতে যখন রাজি হয়েছিলে তখন এটা ধরে নেওয়া যায় যে তুমি চিঠির প্রসঙ্গটাকে সরিয়ে দিয়ে মানবিক সম্পর্কের জন্য সম্মতি দিয়েছিলে।
—তুমি বলেছিলে তুমি ওই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছো। মানসিক শারীরিক সব সম্পর্কের ইতি ঘটে গিয়েছে।
—আজও আমি সেই একই কথা বলছি। আর অকারণ সন্দেহ সবসময় ক্ষতি করে! হ্যাঁ, ঠিক হোক, ভুল হোক—একটা মানসিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোনও শারীরিক সম্পর্ক ছিল না!
—ছিল কি ছিল না, সে তর্কে আমি যেতে চাই না!
—কিছু কিছু জিনিস মুখের কথাতেই বিশ্বাস করতে হয়। আত্মবিশ্বাসই সেখানে একমাত্র প্রমাণ। আমাকে বিশ্বাস করার আত্মবিশ্বাস যদি তোমার না থাকে তাহলে প্রমাণ নেই। আমি বলছি শুধু মানসিক সম্পর্কই ছিল, যা থেকে আমি বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। তার মানে মানসিক সম্পর্কটুকুই ছিল। আমি বলেছি শারীরিক সম্পর্ক ছিল না! না মানে না! ছিল না!
—শুধুমাত্র পারিবারিক সম্পর্কের জন্যই দূরত্ব চেয়েছিলে নাকি অন্য কোনও কারণ ছিল?
—না অন্য কোনও কারণ ছিল না! আমাদের সমাজে এই সম্পর্ক বৈধ নয়।
—আজও আমি সেই একই কথা বলছি। আর অকারণ সন্দেহ সবসময় ক্ষতি করে! হ্যাঁ, ঠিক হোক, ভুল হোক—একটা মানসিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোনও শারীরিক সম্পর্ক ছিল না!
—ছিল কি ছিল না, সে তর্কে আমি যেতে চাই না!
—কিছু কিছু জিনিস মুখের কথাতেই বিশ্বাস করতে হয়। আত্মবিশ্বাসই সেখানে একমাত্র প্রমাণ। আমাকে বিশ্বাস করার আত্মবিশ্বাস যদি তোমার না থাকে তাহলে প্রমাণ নেই। আমি বলছি শুধু মানসিক সম্পর্কই ছিল, যা থেকে আমি বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। তার মানে মানসিক সম্পর্কটুকুই ছিল। আমি বলেছি শারীরিক সম্পর্ক ছিল না! না মানে না! ছিল না!
—শুধুমাত্র পারিবারিক সম্পর্কের জন্যই দূরত্ব চেয়েছিলে নাকি অন্য কোনও কারণ ছিল?
—না অন্য কোনও কারণ ছিল না! আমাদের সমাজে এই সম্পর্ক বৈধ নয়।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-৮৮: অনুসরণ/৯

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২০: সত্য ও ন্যায় পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী নয়, তবে? ঔজ্জ্বল্য বেশি কার?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না
তাই? আমাদের সমাজে এই সম্পর্ক বৈধ হলে কি হত তো?
প্রতিমা উত্তর দেয় না। এতক্ষণ ভিতরে ভিতরে গুমরোতে থাকা অমলেন্দু লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসে দু’হাত দিয়ে প্রতিমার কাঁধদুটো ধরে ঝাঁকাতে থাকে।
—উত্তর দাও!
একটা নিস্তেজ মৃত মানুষের মতো চুপ করে থাকে প্রতিমা!
—উত্তর দাও! উত্তর দাও! প্রতিমা!
—উত্তর নেই। অলীক সম্ভাবনা অসম্ভব পরিস্থিতিতে কি হতো আমি জানি না।
এখনও তোমাদের যোগাযোগ আছে!!
—না! আর তুমি হয়ত জানো না মেয়েরা মনের সুখ থেকে আনন্দ থেকে খুশির থেকে সাজগোজ করে।
—হঠাৎ করে কোন খুশি থেকে সেদিন…।
প্রতিমা উত্তর দেয় না। এতক্ষণ ভিতরে ভিতরে গুমরোতে থাকা অমলেন্দু লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসে দু’হাত দিয়ে প্রতিমার কাঁধদুটো ধরে ঝাঁকাতে থাকে।
—উত্তর দাও!
একটা নিস্তেজ মৃত মানুষের মতো চুপ করে থাকে প্রতিমা!
—উত্তর দাও! উত্তর দাও! প্রতিমা!
—উত্তর নেই। অলীক সম্ভাবনা অসম্ভব পরিস্থিতিতে কি হতো আমি জানি না।
এখনও তোমাদের যোগাযোগ আছে!!
—না! আর তুমি হয়ত জানো না মেয়েরা মনের সুখ থেকে আনন্দ থেকে খুশির থেকে সাজগোজ করে।
—হঠাৎ করে কোন খুশি থেকে সেদিন…।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২২: মহর্ষির নির্দেশে ঘণ্টা বাজত জোড়াসাঁকোয়

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি
প্রতিমা উঠে বসে।
—সন্দেহ মেটাতে কারও সামনে জবাবদিহি করবো না আমি!!
প্রতিমা ঘর ছেড়ে যায়। পরদিন সকালে অমলেন্দু অফিস গিয়েছিল। সারাদিন পুরো ঘটনাটা বারবার ভাবার চেষ্টা করেছে। একা একা ভাবনার পর তার মনে হয়েছে সে বোধহয় প্রতিমাকে অন্যায়ভাবে সন্দেহ করেছে। প্রথমে ভেবেছিল ফোন করে একবার কথা বলবে। তারপর ভেবে দেখলো কথায় কথা বাড়বে অফিসের মধ্যে বসে এত কথা বলা যাবে না, সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে প্রতিমাকে নিয়ে কোথাও বেরোবে তারপর নিজের দোষ স্বীকার করবে।
—সন্দেহ মেটাতে কারও সামনে জবাবদিহি করবো না আমি!!
প্রতিমা ঘর ছেড়ে যায়। পরদিন সকালে অমলেন্দু অফিস গিয়েছিল। সারাদিন পুরো ঘটনাটা বারবার ভাবার চেষ্টা করেছে। একা একা ভাবনার পর তার মনে হয়েছে সে বোধহয় প্রতিমাকে অন্যায়ভাবে সন্দেহ করেছে। প্রথমে ভেবেছিল ফোন করে একবার কথা বলবে। তারপর ভেবে দেখলো কথায় কথা বাড়বে অফিসের মধ্যে বসে এত কথা বলা যাবে না, সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে প্রতিমাকে নিয়ে কোথাও বেরোবে তারপর নিজের দোষ স্বীকার করবে।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২১: খেলা শুরুর প্রস্তুতি
অমলেন্দু সে সুযোগ পায়নি। বাড়ি ফিরে দেখেছে কাউকে কিছু না জানিয়ে প্রতিমা তাদের বাড়ি ছেড়ে শ্রীরামপুরের বাড়িতে চলে গিয়েছে! রেখে গিয়েছে ছোট্ট একটা চিঠি। চিঠিতে প্রতিমা লিখেছে—
তোমায় অনেকটা সম্মান, অনেকটা শ্রদ্ধা দিয়ে ভালোবাসার চেষ্টা করেছি। তোমার কাছে স্বীকার করেছিলাম, আমি ভুল করেছি, আমার বাড়ির কারও কাছে এ কথা আমি স্বীকার করিনি। নিজের ভুল থেকে নিঃশব্দে সরে এসেছি। কাল রাতে তোমার ওই সমস্ত কথার পর আমার মনে হয়েছে, সরে আসাটা আমার ভুল হয়েছিল। যার থেকে আমি সরে এসেছিলাম, তাকে অযথা কষ্ট দিয়েছি। তাই আমি নিজেও সুখ খুঁজে পেলাম না। মনে হয় আমাদের হিসাবটা গরমিল হয়ে গিয়েছে। তোমার মনে হয়েছে, তোমাকে আমি ঠকিয়েছি। আমার মনে হয়েছে, তুমি আমাকে অযথা সন্দেহ করছো। আমার সহজ স্বীকারোক্তিকে তুমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে পারোনি! এই অবস্থায় মনে হয়, আমাদের নিজেদের দূরে দূরে থাকাই ভালো!
তোমায় অনেকটা সম্মান, অনেকটা শ্রদ্ধা দিয়ে ভালোবাসার চেষ্টা করেছি। তোমার কাছে স্বীকার করেছিলাম, আমি ভুল করেছি, আমার বাড়ির কারও কাছে এ কথা আমি স্বীকার করিনি। নিজের ভুল থেকে নিঃশব্দে সরে এসেছি। কাল রাতে তোমার ওই সমস্ত কথার পর আমার মনে হয়েছে, সরে আসাটা আমার ভুল হয়েছিল। যার থেকে আমি সরে এসেছিলাম, তাকে অযথা কষ্ট দিয়েছি। তাই আমি নিজেও সুখ খুঁজে পেলাম না। মনে হয় আমাদের হিসাবটা গরমিল হয়ে গিয়েছে। তোমার মনে হয়েছে, তোমাকে আমি ঠকিয়েছি। আমার মনে হয়েছে, তুমি আমাকে অযথা সন্দেহ করছো। আমার সহজ স্বীকারোক্তিকে তুমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে পারোনি! এই অবস্থায় মনে হয়, আমাদের নিজেদের দূরে দূরে থাকাই ভালো!
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৩: দুর্জনের সম্মান, সাধুর জন্য ফাঁদ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৬: বাজ
ঠিক এই পর্যন্ত ঘটনা ঘটার পর আচমকা অমলেন্দুকে লালদীঘির পাড়ে একটি বেঞ্চের সামনে ভোরবেলায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পকেটে তার অফিস আইডি, বাড়ির ঠিকানা সমেত ওয়ালেট পাওয়া যায়! আর পাওয়া যায় অমলেন্দুর লেখা একটি চিঠি!—চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।


















