রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


প্রতিমা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আশেপাশে অফিসফেরতা অনেক চেনা মুখ। প্রতিমাকে এ ভাবে ওভারব্রিজে কথা বলতে দেখলে অনেক মুখচেনা তথাকথিত ভদ্রলোক ভদ্রমহিলারা কৌতুহলী হয়ে পড়বেন। প্রতিমা উলটোপথে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের দিকটায় হাঁটা দিল। অমলেন্দু একটু অবাক হয়ে প্রতিমার পিছনে পিছনে গেল। অমলেন্দু কিন্তু ভাবার চেষ্টা করছে, চিঠিটা প্রতিমাকে দেবে নাকি মুখে বলবে সবটুকু।
এখন অফিসফেরতা ভিড়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মহিলা-পুরুষের কথাবার্তা হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অস্বাভাবিক নয় শহরের ব্যস্ততম রেলস্টেশনে। কিন্তু মফস্বল এখনও মানসিকতায় মফস্বলেই রয়ে গিয়েছে। এপাড়া-ওপাড়া মিলে এখনও একটা পরিচিতির বাঁধনে বাঁধা সকলে। প্রতিমা জানে এই সন্ধে নামার মুখে টিকিট কেটে নতুন করে চেনামুখেরা কলকাতার দিকে যাবেন না। কাজেকর্মে বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে শ্রীরামপুরে আসা অচেনা অজানা মানুষজন সেখানে আসতে পারে।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-৮২: অনুসরণ/৩

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৭: একাকিত্বের অন্ধকূপ/২: অন্ধকারের উৎস হতে

টিকিট কাউন্টারের থেকে প্লাটফর্ম-এর দিকে এলে একটা নিরিবিলি জায়গা আছে। প্রতিমা গিয়ে সেখানে দাঁড়ালো সরাসরি অমলেন্দু মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—
—বলুন কি এমন জরুরি ব্যাপার?
অমলেন্দু বুঝলো এতক্ষণ প্রতিমা তার মুখোমুখি হবার মানসিক জোর সংগ্রহ করেছে। অমলেন্দুরও তাড়া আছে। তাই সে সময় নষ্ট না করে অফিস ব্যাগের মধ্যে থেকে হাত ঢুকিয়ে চিঠিটা বার করে নিয়ে এল। প্রতিমার চোখের দিকে তাকাতে সে খেয়াল করল প্রতিমা তার দিকে নয় তার হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। চিঠিটা মুঠোর মধ্যে ধরে হাতটা বাড়িয়ে দিলে প্রতিমার দিকে।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৮: মা সারদার জন্মতিথিতে তাঁর অপূর্ব অমানবীয় রূপ ফুটে উঠল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৪: জীবনের নশ্বরতা ও আত্মানুসন্ধান বিষয়ে রামের উপলব্ধি যেন এক চিরন্তন সত্যের উন্মোচন

অমলেন্দু জানে ঠিক এই সময়টায় তাকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে প্রতিমাকে লক্ষ্য করতে হবে। এই পরের কয়েক মুহূর্ত ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ঠিকঠাক লক্ষ্য করলে মুখচোখ শরীরের প্রতিটি বিভঙ্গ বলে দেবে প্রতিমা এ বিষয়ে কি জানে কতটা জানে বা বিষয়টা সত্যি কিনা! প্রতিমা অত্যন্ত শান্তভাবে পাতা উল্টিয়ে চিঠিটা পড়ে গেল। তারপর চোখ বুঝিয়ে নিয়ে যেন ভাবতে থাকলো! অমলেন্দু তার উত্তর পেয়ে গিয়েছে। প্রতিমা চিঠিটা অমলেন্দুর দিকে বাড়িয়ে দিল। অমলেন্দু চিঠিটা নিয়ে ব্যাগে রাখল তারপর একটিও কথা না বলে মুখ ফিরিয়ে ওভার ব্রিজের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
—এক মিনিট!
এক মিনিট কেন এরপরে একটা সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না! তবুও প্রতিমার কণ্ঠস্বর অমলেন্দুর চলতিপায়ে যেন শিকল বেঁধে দিল। প্রতিমার দিকে না ফিরেও অমলেন্দু পরিষ্কার বুঝতে পারছে প্রতিমা পায়ে পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে।এতটাই কাছে অমলেন্দু যেন প্রতিমার শরীরের ওম, নিঃশ্বাসের বাতাস অনুভব করতে পারছে।
—এটা কৈশোর বয়সের একটা ভুল! মোহ! ইনফ্যাচুয়েশন! আমি এই অন্যায় সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছি কিন্তু একদিন এটা সত্যি ছিল তাই অস্বীকার করতে পারছি না।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৬: শান্তিনিকেতনে কবির প্রথম জন্মোৎসব

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৭: আলাস্কায় এমন অপরূপ দৃশ্যও দেখা যায়, যেখানে পাহাড়-সমুদ্র-হিমবাহ একসঙ্গে বিরাজমান

অমলেন্দু যেভাবে ভেবেছিল ঘটনাটা সেরকম ঘটলো না। একবার মনে হয়েছিল এক প্রতিমা এ ব্যাপারে সত্যি কিছু জানে না। এটা নিছক পাড়া-প্রতিবেশীর আকচাআকচি। কিংবা, এটাই সত্যি এবং প্রতিমা সেটা অমলেন্দুর কাছে লুকিয়ে ছিল!

কিন্তু প্রতিমার কথা শুনে মনে হচ্ছে সত্যিটা এর মাঝামাঝি! অমলেন্দু জানতে চেয়েছিল বাড়ি থেকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে নাকি প্রতিমার নিজেরই বিয়েতে মত আছে। প্রতিমা বলেছিল তার মত রয়েছে। সে মিথ্যে তো বলেনি। বিয়ের আগে প্রায় ২২-২৩-২৪ বছরের জীবন। তার মধ্যে কোন একটা সম্পর্ক ঘটেছিল। সেটা কমবয়সী ভুল বলে বুঝতে শিখেছে আরেকটু বেশি বয়সে। পারিবারিক সংকট থেকে বেরোবার চেষ্টা করছে মেয়েটি। তাই সে বৈবাহিক জীবনে মত দিয়েছে। অমলেন্দু কিন্তু জানতে চায়নি, প্রতিমার জীবনে কোন প্রেম ছিল কিনা? জানতে চাইলে হয়তো সে সরাসরি হ্যাঁ বলতো, কিংবা চুপ করে থেকে প্রশ্নটা এড়িয়ে যেত। এখন এই মুহূর্তে তো কী হতে পারত সেই সম্ভাবনাটা নিয়ে ভাবা যাবে না। ভেবে লাভ নেই!
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৯: সময় বুঝে প্রত্যাঘাতের জন্য রাজনীতিতে অনেক সময় পিছিয়েও দাঁড়াতে হয়

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০০: নীল কটকটিয়া

এতসব ভাবতে ভাবতে অমলেন্দু যখন পিছন ফিরল তখন দেখল প্রতিমা আর নেই। কোথায় গেল কোন দিকে গেল প্রতিমা? যেতে গেলে তো ওই ওভারব্রিজ দিয়েই তাকে স্টেশনের অপরপারে যেতে হবে। হঠাৎ অ্যানাউন্সমেন্ট হল হাওড়া যাবার ট্রেন আসছে অমলেন্দু যে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে সেটাতেই। হাওড়া থেকে রিটার্ন টিকিট কেটে নিয়েছিল। তাই প্রতিমার পিছনে ছুটোছুটি না করে ফিরতি ট্রেনেই উঠে পড়ার মনস্থ করল।

জানালার পাশে সবে বসেছে। রাস্তার দিকে তাকাতে দেখল প্রতিমা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে লেভেল ক্রসিং এর দিকে।—চলবে।
 

অমলেন্দু পাল মৃত্যুরহস্য। পরবর্তী পর্ব আগামী বৃহস্পতিবার ২৯ মে ২০২৫

* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content