
একঝলকে
বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসে সার্থক ছবি নামে যে সমস্ত ছবিগুলো তালিকাভুক্ত হয়েছে ‘শুন বরনারী’ ছবিটি সে ধরনের একটি পর্যায়ে তালিকাভুক্ত। মানুষ প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে মনের অজান্তে খুঁজে বেড়াতে চায় সেই সূক্ষ্ম অনুভূতির বিনিময়গুলো যেগুলো জৈবিক জীবনে তাদের কাছে অধরা থাকে। এবং সিনেমায় অভিনীত চরিত্র গুলি যদি সেই নির্মাণ পর্বগুলিকে মানুষের কাছাকাছি এনে দিতে পারে তবে সে ছবি সার্থক ছবির পর্যায়ে তালিকা ভুক্ত হয়।
চলচ্চিত্র শিল্পে উত্তম কুমার নামক একজন ক্ষণজন্মা নায়কের আবির্ভাবে বাংলা চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। অতি সাধারণ কাহিনিকে অসাধারণ মোড়কে উপস্থাপন করার এবং দর্শক মনের প্রতিটি স্বরলিপির সাথে নিজেকে সঠিক সরগম-এ বাঁধার একটা অতুলনীয় দক্ষতা তার স্ক্রিন প্রেজেন্সে পাওয়া যেত।
চলচ্চিত্র শিল্পে উত্তম কুমার নামক একজন ক্ষণজন্মা নায়কের আবির্ভাবে বাংলা চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। অতি সাধারণ কাহিনিকে অসাধারণ মোড়কে উপস্থাপন করার এবং দর্শক মনের প্রতিটি স্বরলিপির সাথে নিজেকে সঠিক সরগম-এ বাঁধার একটা অতুলনীয় দক্ষতা তার স্ক্রিন প্রেজেন্সে পাওয়া যেত।
আমাদের আলোচ্য ‘শুন বর নারী’ ছবিটি সে রকমই একটি মনে রাখার মত ছবি। সুবোধ ঘোষের কাহিনি অবলম্বনে ছবিটি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন অজয় কর নামক সেই স্মরণীয় পরিচালক। সবেমাত্র হারানো সুর ছবির জনপ্রিয়তার রেশ গায়ে মেখে ‘সপ্তপদী’ ছবির কর্মযজ্ঞে মেতেছেন। আবারও উত্তম-সুচিত্রা-হেমন্ত মুখোপাধ্যায় -অজয় করের যে বিগ ব্যানার তা হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোতে শুরু করেছে। তার মধ্যেই শুরু হয়েছিল ‘শুন বর নারী’ নামক ছবির কাজ। সে সময় অজয় কর মানেই উত্তম কুমার, উত্তম কুমার মানেই সুচিত্রা সেন সুচিত্রা উত্তম থাকলেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এভাবেই বাংলা ছবির সম্পদগুলো নিজেদের মধ্যে বিনিময় প্রথা চালাতো।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৩ : শহরের ইতিকথা

শিব

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৪ : গরুর পালে বাঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২১: বিবাহ সংবাদ, আদিনাথ-গোরা
কাহিনির শুরু গিরিডির একটি অভিজাত পরিবারের বাড়ি উদাসীন এর বাড়ির ঘটনা গুলিকে কেন্দ্র করে। উদাসীন এর মালিক চারু ঘোষ। পেশা ওকালতি। প্রচুর অর্থের মালিক। আভিজাত্য অহংকার। জীবনে তিনি কারোর উপকার করবেন না কিংবা উপকার নেবেনও না— এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি জীবনপথে এগিয়ে চলেছেন। আর অপরদিকে গিরিডির একটি বস্তির বাসিন্দা হিমু দত্তের জীবনের একমাত্র তৃপ্তি নিঃস্বার্থভাবে পরের উপকার সাধন করা। কিন্তু ঘটনা পরম্পরায় এই উদাসীন এর মালিককে মাথা নুইয়ে আসতে হয়। বস্তির বাসিন্দা হিমুর কাছে।
চারুবাবুর মেয়ে যুথিকাকে পাটনা যেতে হবে। কারণ বোম্বে থেকে নরেন আসছে পাটনায়। আর নরেনের সঙ্গে যুথিকার বিবাহের কথাবার্তা চলছে। এ সময় পাটনায় যুথিকার উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত এই হিমু দত্তকেই ডাকতে হোল যুথিকাকে পাটনায় পৌঁছে দেবার জন্য। পাটনা যাবার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে সন্দেহ করে হিমুকে। কিন্তু এই সন্দেহ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তাই পরাজয়ের গ্লানি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
চারুবাবুর মেয়ে যুথিকাকে পাটনা যেতে হবে। কারণ বোম্বে থেকে নরেন আসছে পাটনায়। আর নরেনের সঙ্গে যুথিকার বিবাহের কথাবার্তা চলছে। এ সময় পাটনায় যুথিকার উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত এই হিমু দত্তকেই ডাকতে হোল যুথিকাকে পাটনায় পৌঁছে দেবার জন্য। পাটনা যাবার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে সন্দেহ করে হিমুকে। কিন্তু এই সন্দেহ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তাই পরাজয়ের গ্লানি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫৬: আকাশ এখনও মেঘলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৭: জরাসন্ধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মত ও তাঁর নামের মাহাত্ম্য
কিন্তু পাটনায় পৌঁছে যুথিকার মনে দোলা লাগে এই তথাকথিত সহজ সরল মানুষ হিমুকে লক্ষ্য করে, যার সঙ্গে দেখা করার জন্য যুথিকা গিরিডি থেকে পাটনায় ছুটে এসেছে। সেই নরেনকে আজ তার মনে হয়েছে অতি সাধারণ এবং খেলো। আবার এই হিমুই এলো তাকে পাটনা থেকে নিয়ে যেতে। হিমুর আসল পরিচয় জানবার জন্য যুথিকার কি প্রবল আগ্রহ। কিন্তু হিমুর আসল পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে যায় তার কাছে। পরিচয় না মিললেও অনুভব করে যায় তার প্রাণীর উত্তাপ। গণ্ডিতে বাধা যায় না তাকে। তবু তার সখ্যতার স্পর্শ যেন কঠিন বাঁধনের মতো ঘিরে থাকে যুথিকার ভুলে যাওয়া মনটিকে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৯: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — চিতল হরিণ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস
কাহিনির এই অংশটুকুর প্রলেপ উত্তম কুমার যেভাবে ছবির পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন তা এক কথায় কিংবদন্তি বললেও কম বলা হবে। সাথে সাথে মনে রাখতে হবে সহশিল্পীদের কথা। ছবি বিশ্বাসের আধুনিকতার মিশেলে আভিজাত্য এবং অহংকারের দার্ঢ্য ছবির প্রতিটি দর্শককে যেন সিটের সাথে বেঁধে রেখেছিল। পাশাপাশি তুলসী চক্রবর্তী-র ওই একবার ট্রেন জার্নির মধ্যে অনেককেই ভাবিয়ে তুলছিল বাঁকা চোখে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯২: কৈলাসচন্দ্র সিংহ ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আপসহীন এক ঐতিহাসিক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
সমালোচনার কষ্টিপাথরে যাচাই করলে হয়তো কিছু কিছু ত্রুটি আছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিচার করলে ছবি খানি ট্রিটমেন্ট,সব যথাযথভাবে এক রেখে ছবির অগ্রগতির কাজ প্রশংসনীয়। এখানেই পরিচালকের কৃতিত্ব। তবে ছবি সম্পর্কে দু একটি কথা না বললে ছবির গুণাগুণ বিচার করা হবে না। এর যথার্থ গুণাগুণ, দোষ-ত্রুটি বিচার করার দায়িত্ব দর্শক সমাজের উপরে। যদিও শেষ দৃশ্যে ট্রেনের কামরায় নায়ক নায়িকার মিলনের দৃশ্যটি একটু আরোপিত বলে আমাদের মনে হয়। অতটা বাড়াবাড়ি একটু বিসদৃশ বলেই মনে হয়। এ বিষয়ে নায়ক নায়িকা আর একটু সংযমী হলে বোধ হয় ভালো হতো।

প্রেমিক প্রেমিকার মিলনের আগে যে আবেগ পরিচালক দ্বারা সম্ভব সেটাই প্রস্ফুটিত করে, “মধুরেণ সমাপয়েৎ” করতে চেয়েছেন। কিন্তু আবেগের পরিমাণ একটু বেশি হয়নি কি? যা হোক এই শেষ দৃশ্যের অভিনয় ও আতিশয্য ট্রেন যাত্রার শেষ দৃশ্যগুলির দৈর্ঘ্য সম্পর্কে আরও সতর্কতা গ্রহণ করলে সত্যিকারের একখানা ভালো ছবি বলে সব শ্রেণীর দর্শক সমাজের অভিনন্দন পাবার সৌভাগ্য লাভ করত।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।


















