দুটি স্বল্পপরিচিত তরুণ তরুণী। তরুণটি চাকরি খুঁজছে শহর জুড়ে। তরুণীটি বড়লোকের মেয়ে, দুজনে সন্ধ্যায় এসেছে কলকাতার একটি রেস্তোঁরাতে। হাল্কা কথাবার্তা, দুজনেই দুজনকে পছন্দ করতে শুরু করেছে মনে হয়। দু’জনেই একটা ঠিকঠাক আলোচনার বিষয় খোঁজে, যাতে একটু সাবলীল হওয়া যায়। ছেলেটি মেধাবী, অর্থাভাবে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়েছে। ছেলেটির টাকায় খেতে মেয়েটি খানিক সংকোচ করে। ছেলেটি তাকে অভয় দেয়, তার সামনে নিজের নিম্নবিত্ত চেহারাটা সযত্নে ঢেকে রাখে। খেতে খেতে কথা হয়। মেয়েটি বলেই ফেলে, আপনি ডাক্তার হলে ভাল হতো। ছেলেটি বলে, আপনি ডাক্তারি পড়বেন? আমিইই? ওরে বাবা, না। উচ্ছল হেসে উত্তর করে তরুণী মেয়েটি। আপনাদের কীসব মড়া কাটাছেঁড়া করতে হয়। তা একটু হয়, ছেলেটি হেসে বলে। কেন বলুন তো? মেয়েটি জানতে চায় উত্সুক হয়ে। কেন কাটতে হয় শরীরগুলো? কত কী জানা যায়! অনেককিছু জানা যায় যে। হাড়, মাংস, নার্স, আর্টারিস…
যে কোনও মড়া কাটলেই এসব দেখা যাবে? হ্যাঁ, কারণ বেসিক্যালি তো জিনিসগুলো এক, অবশ্য যদি অ্যাবনর্ম্যাল না হয়। ধরুন, ওই যে ভদ্রলোক বসে আছেন কালো স্যুট পরা, উনি আর আমি বেসিক্যালি এক? অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মেয়েটি জানতে চায় রেস্তোরাঁর অন্য পাশের টেবিলে জনৈক মধ্যবয়স্ক আগন্তুককে দেখিয়ে। ছেলেটি বেশ কিছুক্ষণ দেখে নেয় লোকটিকে, তার ডাক্তারি চোখে কাটাছেঁড়া করে তারপর জানায়, হ্যাঁ প্রায় এক। তবে খানিকটা তো তফাত্ আছেই, উনি পুরুষ। আপনি মেয়ে।
ও… তাও বটে। মেয়েটি উপলব্ধি করে। তারপর অন্য একটি টেবিলে জনৈক স্থূলাঙ্গী মহিলাকে দেখিয়ে বলে, ওই যে মহিলা আমাদের দিকে পিছন করে বসে আছেন উনি?
ছেলেটি হেসে তন্বী মেয়েটিকে বলে, হ্যাঁ অনেকটা এক। তবে আপনার থেকে একটা জিনিস ওনার বেশি আছে। মেয়েটি অনাবিল হাসে সম্মতি জানিয়ে।
কিন্তু, কিন্তু…একটা ডিসকোর্স উঁকি দেয়। এক হলেও কতো তফাত্! দুজন মানুষ তো আর এক্সাক্টলি এক হয় না, তাই না! না, তা তো হয়ই না.. এডুকেশন, টেম্পারামেন্ট, আর তাছাড়া চেহারা তো আছেই।
চেহারার কথা এলোই যখন… তরুণটির উজ্জ্বল সপ্রতিভ চোখ দুটির দিকে অপাঙ্গদৃষ্টি হেনে মেয়েটি জানায়, চোখেই কতো তফাত, একেকজনের চোখ দেখলেই মনে হয় ভাল। সব পথ এসে মিলে গেল শেষে তোমার দুখানি নয়নে। তরুণটি প্রথমে চিন্তিত ভঙ্গী করে দৃষ্টি বিনিময়টুকু এড়িয়ে যায়। শেষে স্থিরচোখে তাকিয়ে উত্তর করে, অবশ্য ভাল মনে হলেই যে ভাল হবে এমন তো না হতেও পারে। ভুলও তো হতে পারে। তরুণের সেই দৃষ্টিটুকুকে আয়ত দুটি চোখে আশ্রয় দিয়ে তরুণী ঠোঁটে লেগে থাকা শ্বেতশুভ্র ক্রিমটুকু চেঁটে নেয়, চোখ নামিয়ে আবার তাকিয়ে জবাবে বলে, ভুল না হওয়াই ভাল। তারপর পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পর্দা ধীরে ধীরে নিবে আসে। ফেড আউট।
১৯৭০ সালের ছবি প্রতিদ্বন্দ্বী। এই দৃশ্যটিতে মহানগরের বুকে ঘনিয়ে ওঠা দৃপ্ত যৌবনের প্রবল বিদ্রোহের মাঝে প্রেমের চকিত নবোদ্ভাস দেখেছেন দর্শক। আবেগবর্জিত ঠিক না হলেও, মাপা বৌদ্ধিক, চাপা ব্যঞ্জনাদীপ্ত এই চিনে নেওয়ার জেনে ওঠার দৃশ্য, যেগুলো পরিণতি কোনোদিন পেয়েছিল কীনা জানা যায় না, জানা যায় না বিপ্লব শেষ পর্যন্ত রেভোলিউশন আনে কীনা মানুষের মস্তিষ্কে, অ্যানাটমির পথে চিনে নেওয়া দেহে, মনে, দেহাতীত কিংবা জাগতিক ব্যথার পূজার উদযাপনে অথবা সমাপনে। জানা যায় না অনেককিছুই। যেটুকু দেখা যায় তা হল ডাক্তার হতে হতে এক তরুণ মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে চলে যায় শহর ছেড়ে দূরে, নির্বাসনে। তার প্রেম পরিণতি পাবে কীনা জানা নেই। তার অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে দেখা দেশ, দুনিয়া, সময়, বিশ্ব, বিপ্লব, মানুষ, পৃথিবীর অসুখ, অসুখের ওষুধ, চিকিৎসা কিংবা ব্যারাম আর তার ভেতরে জ্বলন্ত আগুনটুকু ঘিরে এই ছবি দর্শককে কোথাও পৌঁছে দিতে চাইবে, অথবা চাইবে না। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল সকলেই এক হয়েও এক নয়, এক হতে হতেও কোথাও স্বতন্ত্র নিজের মতো করে। কেউ সামাজিক, কেউ অসামাজিক, কেউ স্থির সরোবর, কেউ উত্তাল নদী। কিন্তু তারপরেও ওই স্বাতন্ত্র্যটুকু তার অহঙ্কার, কখনও সে নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। ওই ব্যক্তিসত্তাটুকু তাকে গড্ডলিকায় গা ভাসাতে বাধা দেয়, তখন পৃথিবীকে বুঝি মায়াবীর নদীর পারের দেশ মনে হয়। কখনও মনে হতে পারে যে সময় ও দেশকালের মধ্য দিয়ে এই পণ্যায়িত কঙ্কালসার জীবন ছুটে চলেছে, সেই সময়, সেই দিনরাতগুলোও পরস্পরের প্রতিস্পর্দ্ধী হয়ে অ্যানাটমির নেপথ্যের মাংস, রক্ত, মজ্জা, নার্ভ, আর্টারি পার করে করে বিশুদ্ধ বিশুষ্ক হাড়ের শুভ্রতাকে পায়।
ডাঃ অশোক গুপ্তের কি তেমনটাই মনে হয়েছিল? প্রতিদ্বন্দ্বীর সিদ্ধার্থ আর কেয়াকে পার হয়ে অশোক আর মায়ার দিকে তাকানো যাক। তাত্পর্যপূর্ণ হতেও পারে, অথবা কাকতালীয়। যিনি সিদ্ধার্থ তিনি উত্তরজীবনে বোধিসত্ত্ব। প্রতিদ্বন্দ্বীর সিদ্ধার্থ নির্বাণ পেয়েছিল কী না কে জানে, তবে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ অশোক সেই যুঘপুরুষের শরণাগত হয়েছিলেন বটে। আর কেয়া কি মায়া হয়ে উঠল? কী করে হবে, সিদ্ধার্থ ডাক্তারি পড়াটাই শেষ করতে পারেনি।
তবে যদি করতো, তাহলে অশোক গুপ্তের মতো হয়ে তার যাবতীয় কথা বলার জন্য সন্ধ্যার নাটমন্দিরকে বেছে নিতো হয়তো। সেখানে তিনি বলবেন আসন্ন বিপদের সম্ভাবনার কথা। ধর্মক্ষেত্র থেকে ছড়িয়ে পড়া জলবাহিত রোগের বিষয়ে জনগণকে সাবধান করে তিনি কিছু বলবেন। দেশের দুর্দিনে সেখানে জড়ো হয়েছে নতুন নজরকাড়া শহর চণ্ডীপুরের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন জনগণ। মঞ্চে প্রতিমার কাঠামোয় খড় চেপেছে। সিংহ, অসুর আর অসুরদলনী জেগে উঠছেন ক্রমে ক্রমে। একটা আসন্ন যুদ্ধের আভাস। সেখানে ক্রমে ক্রমে হাজির হচ্ছে শত্রুপক্ষরাও, কাগজের সম্পাদক, পাবলিশার, পৌরসভার চেয়ারম্যান। মজার বিষয় এই যে, প্রতিদ্বন্দ্বীর সেই রাগী যুবকটির ভূমিকায় অবতীর্ণ অভিনেতাই গণশত্রুর চেয়ারম্যান। ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়।
জলের অন্য নাম জীবন, সেই জল যখন বিপন্ন তখন এমন দৃশ্য ঘনিয়ে ওঠে। এরপর একটি নাটক জমে উঠবে। কীভাবে একটা সদর্থক চেষ্টাকে, বলা ভাল সমষ্টির কল্যাণকে ভেস্তে দেওয়া যায় তা ক্রমে ক্রমে দেখা যাবে। একটি সাধারণ বক্তৃতার আসরে ঠিক করা হবে একজন সভাপতি, সভাকে বিপথগামী করাই যার লক্ষ্য হবে। সভাপতি হলেন জনবার্তার প্রকাশক। পৌরসভার চেয়ারম্যান তাঁর নাম প্রস্তাব করলেন। সম্পাদক সেই প্রস্তাব সমর্থন করলেন। এরপর সভাপতি জানালেন পৌরসভার চেয়ারম্যান বক্তৃতা দেবেন। চেয়ারম্যান বক্তৃতা দিতে উঠলেন। তিনি খানিক উদ্দেশ্য বিধেয় বলে নিয়ে সম্পাদকের হাতে মাইক ছাড়লেন। এভাবে জমে ওঠা রুমালচোর খেলায় সভার বক্তাটি আসলে কে তা সকলে ভুলতে বসল। বলা ভাল, ভুলিয়ে দিতে চাওয়া হল। নানা প্রসঙ্গ উঠল। জল, দূষণ, মন্দির, ভক্তি। কিন্তু যে বক্তৃতা শুনতে এসেছিল সকলে তা বুঝি আর হল না। তাকে শুনতে দেওয়া হল না। বক্তৃতাসভা হয়ে উঠল প্রহসনের বিতর্কসভা যেন। তারপর সেই গোপালভাঁড়ের গল্পের মতো একদল লোক বলল ভাষণ শুনবে, আরেকদল বলল শুনবে না। গোপাল থাকলে কী বলতেন তা সকলেই জানেন, কিন্তু এখানে শেষে বোমা পড়ল। ভেঙে পড়ল নাটমন্দিরের ঝাড়বাতি।
দ্বন্দ্বটা ছিল বৈজ্ঞানিক চেতনা ংআর বিজ্ঞানবিরোধী বিষয়ের। কিংবা চিরন্তন শুভবোধ ও অশুভবুদ্ধির। কেয়া জানতে চেয়েছিল, সকলকে এক বলতে চাইলেই বলা যায় কি? যায় না তো। শিক্ষা, স্বভাব, আকার, প্রকার, সাংস্কৃতিক বোধ, চেতনা কিংবা আর কিছু এক হতে হতেও কোথাও টেনে ধরে। হার্ট, আর্টারি, নার্ভ, মেদ, মজ্জাতে মিললেও হৃদয়, বোধ, বুদ্ধি, আচরণ ও উপলব্ধি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। কেউ কেউ ডাঃ অশোক গুপ্ত হন। কেউ কেউ তার সহোদর হয়ে ওই শিরায় শিরায় রক্তের সম্পর্ক বহন করেও স্বার্থান্বেষী ছদ্মবেশী ভদ্রবেশী চেয়ারম্যান হন।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com