
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপনের কথা প্রথম ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ। তাঁর পরিকল্পনার অনুমোদন করেছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। তিনি যে ট্রাস্টডিড তৈরি করেছিলেন, সেই ডিডে ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপনের কথা ছিল। অত্যুৎসাহী বলেন্দ্রনাথ প্রস্তাবিত বিদ্যালয়ের একটি খসড়া নিয়মাবলিও তৈরি করেছিলেন। বড় অকালে, তিরিশে পা দেওয়ার আগেই যক্ষ্মা রোগে মারা গিয়েছিলেন কবির এই প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রটি। ভ্রাতুষ্পুত্রের ভাবনা বাস্তবায়িত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের হাতে। এই আশ্রম-বিদ্যালয় উদ্বোধন করেছিলেন কবির অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ।
গুটিকয়েক ছাত্র নিয়ে যে আশ্রম-বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তা দিনে দিনে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে শুধু বাড়েনি, মানুষেরও আস্থা অর্জন করেছে। কবির স্কুলের খ্যাতি বিস্তৃত হয়েছে। নিতান্তই প্রথানুসারী বিদ্যালয় নয়, একেবারে অন্যরকম। এই বিদ্যালয়ের সব ভাবনাই বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে সহায়ক হয়ে ওঠে। পরবর্তী জীবনেরও পাথেয় সংগৃহীত হয়। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, প্রকৃতির মাঝখানে ছোটরা বড় হোক, শৈশব-বাল্যেই গড়ে উঠুক প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। তাই ক্লাসঘরে নয়, পড়ানোর ব্যবস্থা হয় বৃক্ষতলে, গাছগাছালি, পাখপাখালির মাঝে, এক আনন্দময় পরিবেশে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৮: কবির ভালোবাসা, কবির জন্য ভালোবাসা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০২: কণ্ঠী ঘুঘু
আশ্রমে আনন্দের কখনও ঘাটতি পড়েনি। ‘আনন্দধারা বহিছে’ আশ্রমে। আনন্দলাভের জন্য ছিল কত না আয়োজন। রবীন্দ্রনাথ যেমনটি চেয়েছিলেন, আশ্রম-শিক্ষকরা ছিলেন তেমনই। প্রাণময়তার প্রতিমূর্তি। ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে কোনও দূরত্ব ছিল না। ছিল বড় মাধুর্যময়, আন্তরিক সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ দেশে-বিদেশে যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁর মন পড়ে থাকত শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনে থাকলে লেখালেখির যতই চাপ থাকুক না কেন, দু-বেলাই তিনি আশ্রমের জন্য সময় দিতেন। আশ্রম-অধ্যক্ষ ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালের লেখা থেকে জানা যায়, ছেলেদের মধ্যে কে বার বার অসুস্থ হয়ে পড়ছে, শত ব্যস্ততার মধ্যেও সেদিকে কবির নজর থাকত। কার ওজন কমছে, রোগাভোগা হয়ে পড়ছে, সেসবও তাঁর নজর এড়িয়ে যেত না। ছেলেদের নিজেই ওষুধ দিতেন। কেউ পড়া বুঝতে না পারলে ক্লাসও নিতেন, বোঝাতেন। বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মাঝে মাঝেই ছাত্রদের আশপাশের গ্রামে নিয়ে যেতেন। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, মানুষের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে তারা পরিচিত হোক।

ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল।
সবাই মিলে হইহই করে গ্রামে যাওয়ার মধ্যেও ছাত্ররা আনন্দ খুঁজে পেত। আনন্দ পেত নাটক করে, গান গেয়ে। আনন্দ ছড়ানো ছিল আশ্রমের সবদিকে, সবখানে। শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি রং বদলায়, ঋতুর সঙ্গে মানানসই হয়ে ওঠে। বসন্তকে ঘিরে উৎসব, সে উৎসবের কথা আমাদের অজানা নয়। বসন্ত হোক বা শীত, প্রায় ঋতুই স্বমহিমায় উজ্জ্বল, আশ্রমের ছেলেরা হয়ে উঠত আনন্দমুখর। শান্তিনিকেতনে গ্রীষ্ম অবশ্য সুখের নয়। আইঢাঁই গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত। দাবদাহের তীব্রতায় রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন বৈশাখের প্রথমদিবসে পালন করে আশ্রম-বিদ্যালয়ের আগেভাগে ছুটি ঘোষণা করতে হত।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২০: আকাশ এখনও মেঘলা
শান্তিনিকেতনে বর্ষা এখনো অন্যরকম। নগর-জীবনের বর্ষার সঙ্গে ঠিক মেলানো যায় না। সেকালে বর্ষা এলে ছাত্রদের মধ্যে আনন্দের হিল্লোল খেলে যেত। বর্ষায় বাঁধভাঙা আনন্দ, সেই আনন্দ-সমাবেশেও দায়িত্ব-সচেতনতায় ঘাটতি পড়ত না। আশ্রম-শিক্ষক ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালের লেখায় আছে, ‘শিক্ষকেরা অধিকাংশই নবীন যুবা। শান্তিনিকেতনে বর্ষার দৃশ্য বড় চিত্তাকর্ষক হইত। অনেক সময় অধ্যাপকেরা বালকদিগকে লইয়া বর্ষার সময় মাঠে দৌড়াদৌড়ি করিয়া জলে ভিজিতে আনন্দ বোধ করিতেন। অল্পক্ষণ জলে ভিজার পর আমি ছাত্রদিগকে আর ভিজিতে নিষেধ করিয়া দিতাম। শান্তিনিকেতন ফাঁকা ও উচ্চ কঙ্করময় উচ্চভূমির উপর স্থাপিত হইলেও, সেখানে ম্যালেরিয়া জ্বর মধ্যে মধ্যে দেখা দিত। ছাত্রগুলির অধিকাংশই খুব ছোট এবং তাহাদের অভিভাবকেরা বহু দূরে অবস্থিত, পাছে অল্প অবহেলায় তাহাদের অসুখবিসুখ হয় এজন্য আমাদিগকে খুব সাবধানে রাখিতে হইত।’

ব্রহ্ম বিদ্যালয়। ছবি সৌজন্যে রবীন্দ্রভবন।
এমনও হয়েছে, ঘোর বর্ষায় ছুটির দিনে ছাত্ররা শিক্ষকদের সঙ্গে আশেপাশে কোথাও বেড়াতে বেরিয়েছে। বৃষ্টি মাথায় করে বেড়ানো, প্রায়শই অল্পস্বল্প ভেজাও হত। রবীন্দ্রনাথ ছাত্রদের না দেখতে পেয়ে উতলা হয়ে উঠতেন। অধ্যক্ষ ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল হয়তো আশ্রমে রয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নির্দেশ দিতেন, ছাত্ররা ফিরলেই কুইনাইন খাইয়ে দিতে হবে। বৃষ্টিতে ভিজলে, জ্বর হলে আপাতভাবে হয়তো ম্যালেরিয়ার সম্ভাবনা নেই, কিন্তু কবির মনে আতঙ্ক রয়েই যেত। সেই আতঙ্কেই কুইনাইন খাওয়ানোর কথা বলতেন। কবির নির্দেশ, যথাযথভাবে পালন করাও হত।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮১: সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য চালাতে গেলে নিজের লোকেদের পিছনেও চর নিয়োগ করতে হয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা
ছাত্ররা আশ্রমে ফেরার পর অধ্যক্ষ ভূপেন্দ্রনাথ তাদের কাপড়চোপড় ছাড়ার ব্যবস্থা করতেন। পরম যত্নে নিজের হাতে গা মুছিয়ে দিতেন। খানিক পরেই রবীন্দ্রনাথের হয়ে কেউ জানতে আসতেন, ওদের কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছে তো! রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে উপভোগ করতে জানতেন। বলতেন, প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কথা। প্রকৃতির প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। মানিয়ে নিতে নিতে সহ্যশক্তি তৈরি হয়ে যায়, চলমান জীবনপ্রবাহের সঙ্গে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ঝড়-বৃষ্টি কিছুই আর তখন বেকায়দায় ফেলতে পারে না।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
রবীন্দ্রনাথের কথা শুনে আশ্রমের অল্প বয়স্ক শিক্ষকরা উৎসাহিত হয়ে উঠত। ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালের লেখা থেকে জানা যায়, একবার প্রচণ্ড শীতে বৃষ্টি হচ্ছিল। মুষলধারায় বৃষ্টি নয়, রিমঝিম গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। ভূপেন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, আশ্রমের এক তরুণ শিক্ষক অজিতকুমার চক্রবর্তী প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা দেখে কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ওই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে খালি গায়ে একা-একা মাঠের দিকে চলেছেন। দেখে তো আশ্রম-অধ্যক্ষ হতবাক, বলেছিলেন, এই শীতে বৃষ্টিতে ভিজে খালি গায়ে মাঠে গেলে নির্ঘাত শরীর খারাপ হবে। জ্বর হবে। একথা শুনেও থামেননি অজিতকুমার। হনহনিয়ে মাঠের দিকেই গিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১: খাওয়াব আজব খাওয়া

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ
প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলার এই বেহিসেবি আচরণ ভূপেন্দ্রনাথকে চিন্তায় ফেলেছিল। নিকটজনের মতোই ভূপেন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন, অজিতকুমার তো কথাই শুনলো না। জ্বরটর আবার না হয়! ক-দিন পরে দেখা গেল অজিতকুমার চক্রবর্তীর সত্যিেই সর্দি-কাশি, সেই সঙ্গে ভীষণ জ্বর। সেবায় শুশ্রূষায় সে যাত্রায় তিনি ভালো হয়ে উঠেছিলেন। ভূপেন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক ছিল। অকপটে কবিকে সব বলতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথও বেশ উপভোগ করতেন। অজিতকুমারের অসুস্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভূপেন্দ্রনাথ কবিকে কী বলেছিলেন, সে সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘একটু অনুযোগ করিলাম, বলিলাম, আপনি কি যে কখন বলেন এরা তো আপনার কথায় প্রোৎসাহিত হইয়া একেবারে প্রকৃতির সব নিয়ম লঙ্ঘন করিতে চায়, এই দেখুন সে দিনে খালি গায়ে সন্ধ্যার সময় মাঠে গিয়া অজিত কীরূপ ভুগিতেছে। রবীন্দ্রনাথ হাসিতে লাগিলেন এবং বলিলেন, এত শীঘ্র যে ইহারা উপদেশ মতো কার্য করিবার চেষ্টা করিবে তাহা আমি ভাবিতে পারি নাই।’

অজিতকুমার চক্রবর্তী।
সেবার অজিতকুমার চক্রবর্তী সুস্থ হয়ে উঠলেও জ্বরেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়েই মাত্র আটাশ বছর বয়সে মৃত্যু হয়। তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জীবনী-রচয়িতা, রবীন্দ্রসাহিত্যের মান্য আলোচক। তাঁর অকাল প্রয়াণের পর রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল, ‘তার যৌবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলি সে দিয়েছে আমাকে ঘিরে।’ শুধু অজিতকুমার নন, এমন আর কেউ কেউ নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁদের ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।


















