
ড. জি মাধবী লতা ১৭ বছর ধরে গড়ে তুলেছেন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রেল সেতু চেনাব।
দেশের নারী মুখ, মানস যখন নিজে ভিক্টিম না তার দ্বারা অন্যে ভিক্টিম, ত্রস্ত নাকি সবই অভিনয়? চূড়ান্ত স্বার্থপর এক নারী প্রজন্ম নাকি অন্যের স্বার্থে নিজেকে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া প্রমাণ করতে ব্যস্ত, এমন দোলাচলে দাঁড়িয়ে তাঁর মতো শিক্ষিকা, বিজ্ঞানী, বিনয়ী প্রযুক্তিবিদ তো সত্যিই দেশের গর্ব। একদিকে ছাত্রছাত্রীদের প্রতি অসীম মমত্ববোধ, নিজের গ্রামের ও সহকর্মীদের গর্ব, অন্যদিকে জম্মুর চেনাব নদীর ওপর দেশের সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজ (রেলওয়ে) নির্মাণের মূল কান্ডারি ড জি মাধবী লতা নিজের কৃতিত্বের সবটুকু দিতে চান ভারতীয় রেল ও তার অজানা নায়কদের, শ্রমিকদের, মজুরদের।
অন্ধ্রপ্রদেশের অখ্যাত এড়ুগুণ্ডলাপাড়ু গ্রামে জন্মে পড়াশোনা তো দূরস্থান, নারীজীবন যখন চার দেওয়ালের অন্তরালে কেটে যাওয়ার কথা, সেই অস্তিত্বের সঙ্কট কাটিয়ে ২০২২ সালে দেশের প্রথম ৭৫ জন মহিলা (STEAM) গবেষকদের তালিকায় উঠে আসে তাঁর নাম। নক্ষত্র ছুঁতে ভয় পাওয়া, আড়ালে থাকা, মহিলা জীবনের অর্ধেক আকাশ তিনি একাই ছোঁয়াতে পারেন। নিজের কৃতিত্ব সম্পর্কে অবলীলায় বলতে পারেন, “Sometimes I win, … sometimes I learn.”
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৯: আশ্রমের ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজলে কুইনাইন খাওয়ানো হত

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০২: শ্রীমার অন্তিম সময়কালীন ভবিষ্যবাণী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬২: এক নির্বাসিত রাজপুত্রের কথা
ব্যাঙ্গালোর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISC) এর এই অধ্যাপিকা চেনাব নদীর এপার, ওপার জুড়তে যে ভূমিকা নিয়েছেন তাতে সাধারণ মানুষ থেকে রাজনীতিবিদ থেকে শিক্ষাবিদ সকলের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন ঠিকই কিন্তু দেশের নবনির্মাণের এই কারিগর প্রশংসার চেয়ে কর্মে ব্রতী থাকা, নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকাকেই জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য বলে মনে করেন; নাহলে দীর্ঘ ১৭ বছর চেনাব রেলব্রিজ প্রজেক্টে জিও টেকনিক্যাল উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন নিজের কর্মক্ষেত্রের অন্যান্য জরুরি দায়িত্ব সামলে।

লক্ষ্য স্থির।
বাধা এসেছে, বার বার ভূমিকম্প, খারাপ আবহাওয়া, লুকানো গর্ত, শেষ মুহূর্তে ব্রিজের ছাদে ফাটল, কিন্তু কোনও কিছু তাদের প্রত্যয়কে দমাতে পারেনি। ‘যেমন অবস্থা তেমন মোকাবিলা’ নিয়মে সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করেছেন তিনি এবং তাঁর টিম। সুউচ্চ হিমালয় পর্বতের ওপর নির্মাণের ক্ষেত্রে প্যাটার্ন বলে কিছু হয় না, তিনি তা জানতেন। যদিও শুরুটা সহজ ছিল না, কাঁচামাল বা পণ্য পরিবহনের স্বাভাবিক অবস্থাটুকুও ছিল না, নির্ভর করতে হত খচ্চর ও ঘোড়ার উপর। ধীরে ধীরে উত্তর পাড়ে ১১ কিলোমিটার এবং দক্ষিণ পাড়ে ১২ কিলোমিটার ক্ষণস্থায়ী রাস্তা তৈরি করা হয় ভারী পণ্য পরিবহনের জন্য। পুরো প্রজেক্টটি সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হয়েছিল প্রায় ২৯০০০ টন স্টিল, ৪৬০০০ কিউবিক মিটার কংক্রিটের।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৩: জলপিপি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৮: সত্যনিষ্ঠতার মাপকাঠি কী নাস্তিকতার নিরিখে বিচার্য?
১৯৯২ সালে জওহরলাল নেহরু টেকনোলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি টেক তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, ওয়ারাঙ্গল থেকে এম টেক-এ গোল্ড মেডেল পান। ২০০০ সালে আইআইটি মাদ্রাজ থেকে জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর মাধবী লতা তাঁর গবেষণা শেষ করেন। তাঁর অনেক পুরস্কারের মধ্যে ইন্ডিয়ান জিওটেকনিক্যাল সোসাইটির সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা রিসার্চার, ২০২১ সালে আইআইএসসির প্রফেসর এস কে চ্যাটার্জি পুরস্কার অন্যতম।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ
এই রেলব্রিজ নির্মাণে এপ্রিল ২০২১ সালে আসে সবচেয়ে বড় সাফল্য যখন আর্চটির একদম উপরের অংশ প্রথমবারের জন্য জোড়া হয়। ৪৬৯ মিটার দৈর্ঘ্যের এই আর্চ, যা প্রকাণ্ড ১৩০ মিটার উচ্চ দুটি পাইলন দিয়ে যুক্ত সেখানে সমস্ত অত্যাধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে যাতে জঙ্গি নাশকতা থেকে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ও ভূমিকম্পের বিপদ সহ্য করতে পারে। উন্নতমানের অনলাইন মনিটরিং সতর্কীকরণকে এই ব্রিজ নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যাত্রী সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে। মানুষের প্রাণের বিনিময়ে উন্নয়ন যে উন্নয়ন নয় সেটা খুব ভাল করেই জানতেন অধ্যাপিকা এবং প্রযুক্তিবিদ মাধবী লতা ও তাঁর টিম।

বিশ্বের সর্বোচ্চ এই রেলসেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
আর সেই শিক্ষিকার মন, অন্ধ্রপ্রদেশের অখ্যাত গ্রামের স্কুল থেকে দেশের বিখ্যাত সব টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট হয়ে যখন ব্যাঙ্গালোর ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে এসে থিতু হয় তখন সকাল দশটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জীবনের পথে এগিয়ে দেওয়ার গুরু দায়িত্বকেও সমানভাবে কাঁধে তুলে নেন। বিটেক এর ছাত্র থেকে পোস্ট ডক্টরেটের ছাত্ররা তাই তাঁদের মাধবী ম্যাডামের একনিষ্ঠ ভক্ত কারণ ম্যাডাম শুধু নদীর উপর ব্রিজ নয় জীবনের ব্রিজ গড়ারও কারিগর যে!
* ড. বিদিশা মিশ্র বিগত ষোলো বছর ধরে সরকারি কলেজে, বর্তমানে কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বিষয়— সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী বিদিশা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় হন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল —বাঙালি নৈয়ায়িক চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের গ্রন্থ ‘কাব্যবিলাস’। তাঁর এই গবেষণা ২০২১ সালে কর্ণাটকের আইএনএসসি পাবলিশিং হাউস থেকে ‘দ্য কাব্যবিলাস অফ চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য — এ ক্রিটিক্যাল স্টাডি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রদেশের পত্রিকায় তাঁর শোধপত্রগুলি প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তাঁর তত্ত্বাবধানে একাধিক স্কলার গবেষণার কাজ শেষ করেছেন। বিভিন্ন সরকারি কাজকর্ম ও অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি গুরুজি বিপ্লব মুখোপাধ্যায়ের কাছে হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল শিক্ষারতা। ভ্রমণপিপাসু বিদিশা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরেছেন, সেইসব অভিজ্ঞতা তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে বলে তিনি মনে করেন।


















